‘প্রাণের বর্জ্যে’ প্রাণ যায়!

ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস শুধু মুখে মুখে * ডিসি বললেন, কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে

  যুগান্তর রিপোর্ট, নাটোর ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাসায়নিক বর্জ্যরে কারণে শুধু জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না, জলাশয় ও পুকুরের মাছও মরে যাচ্ছে। ছবি: যুগান্তর
রাসায়নিক বর্জ্যরে কারণে শুধু জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না, জলাশয় ও পুকুরের মাছও মরে যাচ্ছে। ছবি: যুগান্তর

কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে ২০০০ সালে নাটোরের একডালায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ কার্যক্রম শুরু করে। উন্নয়নের কথা চিন্তা করে এলাকার মানুষ তখন আপত্তি তোলেনি। কিন্তু এখন ‘প্রাণের বর্জ্যে’ এলাকাবাসীর প্রাণ যায়যায়!

অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, রাসায়নিক বর্জ্যরে কারণে শুধু জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না, জলাশয় ও পুকুরের মাছও মরে যাচ্ছে। ওদিকে বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে এলাকাবাসীকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আশ্বাস দিলেও এক বছরে তা বাস্তবায়ন করেনি প্রাণ এগ্রো লিমিটেড।

তাদের আশ্বাস শুধু মুখে মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিষয়টি তারা জেনেছেন। ক্ষতিপূরণ আদায়সহ সাত দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এলাকার চাষীদের কাছ থেকে প্রাণ এগ্রো লিমিটেড আম, টমেটো, হলুদ, মরিচ, চিনাবাদাম ও মুগ ডাল কেনে। এসবের কিছু একডালার কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বাকি পণ্য সেমিপ্রক্রিয়াজাত করে নরসিংদীর ঘোড়াশালসহ অন্য কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। যেসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়, সেগুলোর বর্জ্য কারখানার বিভিন্ন স্থান দিয়ে আশপাশের খোলা জমি ও জলাশয়ে ফেলে দেয়া হয়। এতে নাটোরের একডালা, জংলী, তেবাড়িয়া ও চাঁদপুরের বিস্তীর্ণ এলাকার জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর মরে যাচ্ছে জলাশয়ের মাছও। কারখানার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নারদ নদীটি এখন এসব বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। প্রাণ কোম্পানির সিংহভাগ বর্জ্যই নারদ নদীতে ফেলায় নদীর পানি এখন আর ব্যবহারযোগ্য নয়। এছাড়া গত বছর কারখানাটির বর্জ্য পানিতে মিশে একডালা এলাকার প্রায় দু’হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট করে দেয়।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি যুগান্তরকে জানান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খানের বাড়ি নাটোর শহরে। ২০০০ সালে এলাকাবাসীর ভাগ্যোন্নয়নের কথা বলে এখানে তিনি কৃষিভিত্তিক প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডের কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত জমির দাম কম হওয়ায় এবং বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্যের সহজলভ্যতার কথা বিবেচনায় নিয়ে কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এলাকার মানুষকে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখান। সে সময় প্রাণের দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে এগিয়ে এসেছিলেন স্থানীয় লোকজন। কিন্তু দেড় দশকেরও বেশি সময় পর এখন সেই কারখানাই হয়ে উঠেছে তাদের গলার কাঁটা। প্রতি বছর কারখানাটির হাজার হাজার টন দূষিত বর্জ্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শত শত হেক্টর জমির ফসল আর পুকুরের মাছ।

এছাড়া বর্জ্যে ও বিষাক্ত পচা গ্যাসের দুর্গন্ধে এলাকায় বসবাস করাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময়েও কৃষক আর মাছচাষীদের আকুতি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ কর্তৃপক্ষ কানে তোলেনি। উল্টো গত বছর থেকে প্রাণ কারখানার বর্জ্য আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। পার্শ্ববর্তী আয়মান ও চাঁনপুর বিলে বিষাক্ত এই বর্জ্য প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট করে দিয়েছে।

মরে গেছে ওই এলাকার জলাশয়ের সব মাছ। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। কিন্তু আজও ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। প্রশাসনও কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বানু জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষীরা অভিযোগ করলে তিনি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত শুরু করেন। এরপর প্রাণ কর্তৃপক্ষের আশ্বাস ও চাপে ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিলে তিনি আর তদন্তে এগিয়ে যেতে পারেননি।

এ ব্যাপারে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহীনা খাতুন জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। প্রাণ কোম্পানিকে সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। জেলা প্রশাসক বলেন, প্রাণ কর্তৃপক্ষ তাদের দেয়া আশ্বাস অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নতুন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter