একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

পছন্দের ভোট কেন্দ্র পেতে তদবির

চেষ্টা চালাচ্ছেন বর্তমান, সাবেক এমপি ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা * ইসি সচিবালয় ও ৬৪ জেলায় সহস্রাধিক দাবি-আপত্তি * আওয়ামী লীগ ও বিএনপিরই অধিকাংশ আপত্তি

  কাজী জেবেল ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভোট কেন্দ্র স্থাপনে চলছে নানামুখী তদবির। এ লক্ষ্যে বর্তমান এমপি, সাবেক এমপি এবং সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরে ব্যস্ত।

নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ভোট কেন্দ্র বসাতে চান আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নেতারা। অনেকেই নিজ নামে, আবার কেউ কেউ নিজের অনুসারীদের নামে পছন্দের স্থানে ভোট কেন্দ্র বসাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় ও জেলা অফিসগুলোতে চিঠিও দিয়েছেন। কেউ কেউ খসড়া ভোট কেন্দ্র নিয়ে আপত্তিও জানিয়ে বিদ্যমান কেন্দ্র বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

ইসি সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে সহস্রাধিক দাবি-আপত্তি জমা পড়েছে। এসব দাবি আপত্তিকারীর সিংহভাগই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা। এসব দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি করে আগামী বৃহস্পতিবার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোট কেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করবে ইসি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রসঙ্গত, আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, অনেকে নতুন স্থানে ভোট কেন্দ্র স্থাপনের আবেদন করেছেন, আবার অনেকেই ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য আবেদন করেছেন। কেউ আবেদন করেছেন আগের কেন্দ্র বহাল রাখার জন্য। আমাদের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একই স্থানে পাশাপাশি দুটি প্রতিষ্ঠান আছে। একটি প্রতিষ্ঠানের চারদিকে দেয়াল আছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো। সেখানে ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য কেউ আবেদন করেছেন।

ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, পছন্দের জায়গায় ভোট কেন্দ্র করার জন্য নির্বাচন কমিশনেই প্রায় একশ’ আবেদন জমা পড়েছে। ৬৪ জেলার নির্বাচন অফিসে আবেদন পড়েছে সহস্রাধিক। আবার অনেক এমপি সরাসরি কমিশনে এসে পছন্দের ভোট কেন্দ্রের জন্য তদবিরও করেছেন। এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদেরই এসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। সাতজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তাদের পাঁচজনই নিজ নিজ জেলার ভোট কেন্দ্র নির্ধারণে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে পড়েছেন। পরে স্থানীয়ভাবে ম্যানেজ করে ভোট কেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করছেন। কোনো ক্ষেত্রে এমপিদের দাবি মেনে নেয়া হয়েছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোট কেন্দ্র স্থাপন নীতিমালা মানতে গিয়ে তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করতে হয়েছে।

জানা গেছে, লালমনিরহাট পাটগ্রাম উপজেলার একটি ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য ইসির সচিবকে একটি উপানুষ্ঠানিক পত্র দিয়েছেন লালমনিরহাট-১ আসনের এমপি মো. মোতাহার হোসেন। এতে তিনি ওই উপজেলার বানিয়াডাঙ্গী ভোট কেন্দ্রটি পরিবর্তন করে ‘মধ্য ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানান্তরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানান। এর সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বানিয়াডাঙ্গী কেন্দ্রটি জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে এ কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া এ কেন্দ্রের যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো নয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া ঢাকা-৯ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী মুগদার মাণ্ডা ইউনিয়নের একটি ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে চিঠি দেন। নিজ প্যাডে দেয়া ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, মাণ্ডা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে অবস্থিত জান্নাতুল ফোরকানিয়া মহিলা মাদ্রাসা ভোট কেন্দ্রটি স্থানান্তর করে আইসিএস পাবলিক স্কুলে স্থাপন করার জন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আবেদন জানানো হয়েছে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখনও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কেন্দ্রটির অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক ও রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাবের হোসেন চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমি চিঠি দেয়ার পর নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে এমন কিছু আমার জানা নেই। তবে জনগণের চাহিদা আইসিএস পাবলিক স্কুলে কেন্দ্র করা হোক। সেই দাবিই আমি ইসিকে জানিয়েছি।

এদিকে ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় তিন হাজার ভোট কেন্দ্র ও ২০ হাজার ভোটকক্ষ বাড়তে পারে। খসড়া ভোট কেন্দ্রের তালিকা অনুযায়ী, এ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪০ হাজার ৬৫৭টি ও ভোটকক্ষ (বুথ) ২ লাখ ৯ হাজার ৪১৮টি। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর ভোট কেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যার কিছুটা কমবেশি হতে পারে। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৭০৭টি ও ভোটকক্ষ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮টি। এ হিসাবে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৯৫০টি ভোট কেন্দ্র ও ২০ হাজার ৩৪০টি ভোটকক্ষ বেড়েছে।

জানা গেছে, ফরিদপুর-৪ আসনের দুটি কেন্দ্র বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়ে সিইসিকে চিঠি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বেগম নিলুফার জাফর উল্লাহ।

চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারসহ নানা রকম পাঁয়তারা চলছে। ভাঙ্গা উপজেলার চান্দ্রা ইউনিয়নের সিঙ্গারডাক কেন্দ্রটি নদীর অপর পাড়ে নিয়ে যেতে ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পাঁয়তারা করছেন। অপরদিকে আজিমনগর ইউনিয়নের কার্নিকান্দা বোড অফিসে আগে ভোট কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে এ কেন্দ্রটি এএস দাখিল মাদ্রাসায় স্থানান্তর করা হয়। ফলে দুটি গ্রামের ভোটারদের অনেক পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয়।

এ অবস্থায় আগের দুই প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র বহাল রাখার দাবি জানান তিনি। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বেগম নিলুফার জাফর উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আমার ও জনগণের সুবিধার জন্যই আগের প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র দুটি রাখার অনুরোধ জানিয়েছি। আমার জানা মতে, চান্দ্রা ইউনিয়নে বিএনপি থেকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান কেন্দ্র সরাতে ইসিতে আবেদন করেছে। এখন নির্বাচন কমিশনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, ভোলা-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম সিইসির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে খসড়া ভোট কেন্দ্র নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, তার আসনে বেশ কয়েকটি ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বহু ভোটার কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হবে। চিঠিতে তিনি কয়েকটি ভোট কেন্দ্রের উদাহরণও দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, লালমোহন থানার পাশে পাবলিক লাইব্রেরি ও সংলগ্ন ভবনে অবস্থিত ভোট কেন্দ্র বাদ দিয়ে বর্তমান এমপি প্রভাবিত সদ্য প্রতিষ্ঠিত উত্তর মেহেরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সংলগ্ন নুরুল ইসলাম চৌধুরী কওমি মাদ্রাসায় স্থাপনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সুষ্ঠু ভোট ব্যাহত হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভোট কেন্দ্র নীতিমালা না মেনেই লালমোহন উপজেলার কয়েকটি ভোট কেন্দ্র বাতিল করা হয়েছে। প্রধান বা বড় সড়কের পাশের কেন্দ্র সরিয়ে অলিগলিতে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র বসানো হয়েছে। একটি মহলের প্রভাবাধীন এলাকায় কেন্দ্র করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও জানা গেছে, ঢাকার ২০টি আসনে ২ হাজার ৮৬৯টি ভোট কেন্দ্র নির্ধারণ নিয়ে ৩০টির বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-৫ আসনের কয়েকটি ভোট কেন্দ্র বাতিল করে নতুনভাবে ভোট কেন্দ্র বসানোর জন্য আবেদন করেন ডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীন।

এতে তিনি আমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র বাতিল করে হাজী এমএ গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় নতুন কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন। একইভাবে বাওয়ানা উচ্চ বিদ্যালয়ের কামারগোপ খলপাড়া (পশ্চিম পাশের ভবন) ভোট কেন্দ্রটি বাতিল করে কামারগোপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তার এসব দাবি ভোট কেন্দ্র নীতিমালার পরিপন্থী।

এছাড়া ভোট কেন্দ্র পরিবর্তনের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি ও শরীয়তপুর-২ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) শওকত আলী, খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ মো. নুরুল হকসহ কয়েকজন চিঠি দিয়েছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter