সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে ভুয়া আইনজীবীর দৌরাত্ম্য

বিচার নিতে এসে প্রতারিত সাধারণ মানুষ * অভিযোগ উঠলে বার কাউন্সিলকে জানাতে হবে : ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন * এসব দুষ্ট লোকের কারণে পেশার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে : মাহবুব উদ্দিন খোকন

  আলমগীর হোসেন ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে ভুয়া আইনজীবীর দৌরাত্ম্য

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্টে বিচারের জন্য এসে পদে পদে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। মামলার ফাইল করা, শুনানির জন্য তালিকায় আনা, বেঞ্চে শুনানি করা ও রায় বা আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে উত্তোলনের ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

একশ্রেণীর দালাল বা ভুয়া আইনজীবীর খপ্পরে পড়ে বিচারপ্রার্থীদের এ ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জামিন জালিয়াতি, জামিনের কথা বলে বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতারণাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এসব দালাল ও ভুয়া আইনজীবীর বিরুদ্ধে।

এদের কেউ কেউ জাল সনদ নিয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। জালিয়াতিতে অভিযুক্ত এক আইনজীবীকে এরই মধ্যে মামলা পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। এদিকে সুপ্রিমকোর্ট থেকে প্রায়ই ভুয়া আইনজীবী আটক করে পুলিশে সোপর্দ করার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এদের কেউ কেউ সমিতি থেকে বহিষ্কার হলেও থেমে নেই তাদের অপতৎপরতা। আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, বিচার বিভাগে স্বচ্ছতা ফিরে আনতে হলে এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবুল কালাম নামে নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জের এক ব্যক্তি জানান, জমিসংক্রান্ত মামলায় স্থিতাবস্থা জারির জন্য এক আইনজীবীকে ফি বাবদ ৫০ হাজার টাকা দেন। এরপর ওই আইনজীবীকে আর তিনি খুঁজে পাননি। পরে বিষয়টি তিনি গণমাধ্যমকে জানান।

সাথী নামে ঝিনাইদহ জেলার এক মহিলার অভিযোগ, তিনি স্বামীকে কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত করতে হাইকোর্টে আসেন। এক সপ্তাহের মধ্যে জামিন করিয়ে দেবেন বলে শিউলি নামে এক আইনজীবী তার কাছ থেকে ফি বাবদ ৩৫ হাজার টাকা নেন।

পরে ওই আইনজীবী জামিনের বিষয়ে আর কোনো আইনি সহায়তা না করে উল্টো টাকার কথা অস্বীকার করেন। বিষয়টি সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতিকে জানান সাথী। এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে শিউলি নামের ওই আইনজীবীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ঝরনা বিবি নামের এক বৃদ্ধার অভিযোগ, তার ছেলেকে জামিন করিয়ে দেবেন বলে কয়েকজন দালাল তার কাছ থেকে একাধিকবার টাকা নিয়েছেন। সাত বছর ধরে তিনি সুপ্রিমকোর্টের বারান্দায় ঘুরছেন ছেলের জামিনের জন্য।

জমিজমা বিক্রি করে সব দিয়েছেন দালালদের। পরে সুপ্রিমকোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে ছেলের জামিনের বিষয়ে আইনি সহায়তার জন্য আবেদন করেন তিনি। এভাবে প্রায়ই প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা।

আইনজীবী সমিতির অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৪ বছর কর্মরত থাকার পর ২০১৫ সালে আইনজীবী সমিতির কাছে ধরা পড়ে খাজা মঈনউদ্দিনের সনদ ভুয়া। সমিতির তৎকালীন সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন এক চিঠিতে ওই ব্যক্তিকে সুপ্রিমকোর্টে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।

এসএম শহিদুল্লাহ নামে এক আইনজীবীর সুপ্রিমকোর্টে মামলা পরিচালনা করার অনুমতি ছিল না। ২০১৫ সালের ১৭ নভেম্বর বিচারপতি রেজাউল হক এবং বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় তার নাম দেখতে পেয়ে সমিতির পক্ষ থেকে ২০১৬ সালের ৩ জানুয়ারি মামলা দায়ের করা হয়।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টে অবকাশকালীন আদালত চলাকালে শুভ্র বোস নামে এক ভুয়া আইনজীবীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন আইনজীবীরা। সুপ্রিমকোর্টের ১৩ এনেক্স আদালতে এ ঘটনা ঘটে।

আইনজীবীরা জানান, আদালত চলাকালে শুভ্র বোস নামের ওই ব্যক্তি আইনজীবীদের গাউন ও কোর্ট পরে এজলাস কক্ষে প্রবেশ করেন। এ সময় অন্য আইনজীবীরা তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি নিজেকে জজকোর্টের আইনজীবী বলে দাবি করেন। পরে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়।

ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে ২০১২ সালের ২ এপ্রিল বার কাউন্সিলের আইনজীবী হিসেবে সনদ নেন লুৎফুন নাহার। ২০১৬ সালের ১২ জুন তিনি সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য পদ লাভ করেন। এর পর থেকে তিনি সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কাজ করে আসছিলেন। তার সার্টিফিকেট অনুযায়ী দেখা যায়, তিনি ২০০০-২০০১ সালের শিক্ষাবর্ষে তৃতীয় বিভাগ নিয়ে এলএলবি পাস করেছেন। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেয়া হয়েছে ১০৫২৬২, যা ভুয়া বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শনাক্ত করেছে।

জানা যায়, মো. তারেকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি লুৎফুন নাহারের সার্টিফিকেট ভুয়া উল্লেখ করে ২০১৬ সালে বার কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করেন। বিষয়টি আমলে নিয়ে বার কাউন্সিল লুৎফুন নাহারের কাগজপত্র ভুয়া না সঠিক, তা জানাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ জানায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট ভুয়া বলে জানানোর পর আইনজীবী সমিতি তার সদস্য পদ বাতিল করে দেয়।

এ বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন যুগান্তরকে বলেন, খাজা মঈনউদ্দিনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিল ঠিক। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি বার কাউন্সিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

তিনি আইনজীবী সমিতিতে ফের আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত সদস্য পদ দেয়া হয়নি। আর লুৎফুন নাহারের সার্টিফিকেট ছিল ভুয়া। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার সার্টিফিকেট ভুয়া জানানোর পর আইনজীবী সমিতি তার সদস্য পদ বাতিল করে।

তিনি বলেন, আইনজীবী না হলে বিচার কাজে অংশ নেয়া যায় না। একজন আইনজীবী কখনোই সুপ্রিমকোর্টের পরিচয় দিতে পারেন না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি নিবন্ধিত হন। তিনি আরও বলেন, ভুয়া আইনজীবীদের কারণে আইনজীবীদের মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। বার কাউন্সিলের এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়া দরকার।

সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্টে বেশ কয়েকটি জামিন জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। এসব জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৮ মে আইনজীবী মো. জালাল উদ্দিনকে মামলা পরিচালনায় নিষিদ্ধ করেন হাইকোর্ট। জালাল উদ্দিন তিনটি মামলায় কখনও জামাল উদ্দিন আবার কখনও জালাল উদ্দিন নাম ব্যবহার করেছেন।

যখন জামাল নাম ব্যবহার করেছেন, তখন তিনি আইডি ব্যবহার করেছেন হারুন অর রশিদ নামে এক আইনজীবীর। আদালত জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে সিআইডিকে বলেন। সুপ্রিমকোর্টসহ দেশের সব আদালতে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারওয়ার কাজল যুগান্তরকে বলেন, জালাল উদ্দিন হাইকোর্টের আদেশের স্থগিতাদেশ চেয়ে আপিল বিভাগে যান। পরে আপিল বিভাগ তার আবেদন নিষ্পত্তি করে হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন। এ বিষয়ে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হবে।

আইনজীবীদের পেশার সনদ প্রদান ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হল বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। নতুন আইনজীবীদের তালিকাভুক্তির জন্য পরীক্ষা গ্রহণ, আইনজীবীদের পেশাগত আচরণের জন্য নীতিমালা নির্ধারণ, সব আইনজীবীর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ, আইন পেশার মান রক্ষা এবং আইনজীবীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার করে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটি।

বার কাউন্সিল পরিচালনার জন্য একটি পর্ষদ রয়েছে, যার মধ্যে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল পদাধিকার বলে এই সংস্থার প্রধান। ভাইস চেয়ারম্যান হলেন অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন।

জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন যুগান্তরকে বলেন, কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে যে কেউ বার কাউন্সিলে লিখিত আবেদন করতে পারেন। এসব অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বার কাউন্সিলে তিনটি ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এ পর্যন্ত ছয়শ’র মতো অভিযোগ পড়েছে সেখানে। শাস্তি দেয়া হয়েছে অর্ধশতাধিক আইনজীবীকে।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter