গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

ব্যাংকে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি প্রকট

এমডিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না * আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ছবি-যুগান্তর

ব্যাংকিং খাতে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে। বিশেষ করে পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এমডি ও ডিএমডি) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না।

অনেক পরিচালক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। তবে অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রুটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিনদিন বাড়ছে। উন্নয়নটা সমতাভিত্তিক হচ্ছে না।

শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সুশাসন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। এর আয়োজন করে ‘দ্য ঢাকা ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা, তা নিয়ে বৈঠকে শঙ্কা প্রকাশ করেন কোনো কোনো বক্তা। তারা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মূল প্রবন্ধে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। এখন এ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সুশাসনের অভাব। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন বলতে কিছু নেই। ব্যাংকিং খাতের জন্য যেসব নীতিমালা, আইনকানুন, আন্তর্জাতিক রীতি আছে সেগুলো সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে না।

তিনি মনে করেন, সামগ্রিক অর্থনীতির সূচকগুলোর অর্জন ভালো। প্রবৃদ্ধি ৬ এর বৃত্ত থেকে বের হওয়া গেছে। এটি ইতিবাচক। সার্বিক উন্নতি সন্তোষজনক।

দেশের রাজনৈতিক চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অভাব প্রকট। সবচেয়ে মারাত্মক হল আইনের শাসনটা নেই। আইন আছে কিন্তু এর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা আছে। সুশাসন ছাড়া কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, পুরো সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই সিস্টেম মানে রাজনৈতিক সিস্টেম। বিশেষ করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাজার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো। স্কুল এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলোকেও প্রভাবিত করে পলিটিক্যাল মোটিভেশন।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট এবং নিচের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে কোথাও সুশাসন নেই। সর্বত্রই মারাত্মক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এখন মোটেও ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সমস্যা সবচেয়ে প্রকট।

পরিচালনা বোর্ড ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সার্বিক নির্দেশনা দেবে এবং তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে সেই নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইনে বলা আছে। কিন্তু প্রায়ই শোনা যায় বা অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালনা বোর্ড ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে।

এখন দেখা যায়, ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই যেন বেশি উৎসাহী। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এটা কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যে সব সময় দক্ষ হয়, তা নয়। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রুটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়।

এসব কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি দেখা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ তার প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করেন, ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং এবং সুপারভিশনও খুব দুর্বল। যারা পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ইন্টারেস্ট থাকে। তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে। আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন।

নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদান বা চাকরি প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমনটি ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যারা নিয়োগ পেতেন, তাদের নিযুক্তি অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা পর্ষদের ওপর।

কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং পারফরম্যান্সের ওপর তার টিকে থাকা না-থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না।

পরিচালনা পর্ষদে অনেকেই থাকেন, যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি ব্যাংকের কাজে ব্যবহার করতে চান তাহলেই সমস্যা দেখা দেয়।

ব্যবস্থাপনার মধ্যেও আবার অনেক লোক আছেন, যারা দক্ষ নন বা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি অদক্ষ বা দুর্বল হন, তাহলে তার প্রভাব সর্বত্রই পড়ে। এতে নিচের দিকের কর্মীরা নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অনিয়ম ওপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়।

কাজেই টপ ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষ যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত করে, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়বে। কিন্তু এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও সমস্যা রয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে।

বৈঠকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, পার্লামেন্ট চলাকালে পৃথিবীর কোনো দেশে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে, এমন কোনো নজির কোথাও নেই। তিনি বলেন, সরকারকে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আরেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ভোট আদৌ দিতে পারব কিনা তা নিয়ে সন্দিহান। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান কার্যক্রম হতাশাজনক।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন- ব্যাংক, বীমা থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি। এর থেকে পরিত্রাণ চাই।

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ, প্রকৌশলী এনামুল হক প্রমুখ।