সংসদে প্রধানমন্ত্রী

বিএনপির আমলে অনেক এমপি নির্যাতনের শিকার হন

মোস্তফা রশিদী সুজা ও তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গৃহীত

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সংসদ রিপোর্টার

ছবি: পিআইডি

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ে ক্লিন হার্ট অপারেশনের নামে অনেক সংসদ সদস্যসহ অসংখ্য মানুষকে নির্যাতন করা হয়। প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। সংসদ সদস্য এসএম মোস্তফা রশিদী সুজার (প্রয়াত) পা ড্রিল দিয়ে ফুটো করে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছিল।

তারপর থেকেই তিনি অসুস্থতা নিয়ে বেঁচেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুবরণ করতে হল। এই সংসদের অনেক সদস্যই বিএনপির দ্বারা নির্যাতিত।

রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর দিনে এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুতে আনীত শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনায় আরও অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সরকারি দলের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মীর শওকাত আলী বাদশা, আবদুস সালাম মোর্শেদী, মো. মনিরুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, কাজী ফিরোজ রশীদ, নুরুল ইসলাম ওমর ও মো. ফখরুল ইমাম।

আলোচনা শেষে স্পিকার শোক প্রস্তাবটি ভোটে দিলে সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়। এরপর তাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত করে এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন সরকারি দলের ফজলুল হক হারুন। দু’জন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে অধিবেশনের দিনের অন্যান্য কার্যক্রম স্থগিত রেখে সংসদ মুলতবি করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দু’জন সংসদ সদস্যকে হারিয়েছি। তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মোস্তফা রশিদী সুজা খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিল। তিনি একজন ক্রীড়া অনুরাগী এবং প্রাণবন্ত সুদক্ষ নেতা ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীর ওপর যে অত্যাচার করা হয়, সেই অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন মোস্তফা রশিদী সুজাও। তার পা ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করে দেয়া হয়েছিল। তার ওপর অমানুষিকভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল। তার ভাই ও শিশু সন্তানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল অপারেশন ক্লিন হার্টের সময়।

তিনি বলেন, ওই সময় খুলনার যুবলীগ নেতা মাসুদকে মেরে ফেলা হয়েছিল। এ রকম অসংখ্যা নেতাকর্মীকে নির্যাতন করা হয়। ১৫০ জনের মতো নেতাকর্মী নির্যাতনে মারা যায়। এই সংসদের অনেক সংসদ সদস্যই আছেন যারা বিএনপির দ্বারা নির্যাতিত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরেকজন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার বিরাট ভূমিকা ছিল। আমরা দু’জন দক্ষ সংসদ সদস্যকে হারিয়েছি। এই সংসদের প্রায় ১৫ জন সংসদ সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি সব নেতার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ বলেন, প্রয়াত দুই নেতাই অসম্ভব ভালো ও ত্যাগী রাজনীতিবিদ ছিলেন। ভালো মানুষগুলো একে একে চলে যাচ্ছে। দশম জাতীয় নির্বাচনের সময় অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তাজুল ইসলাম চৌধুরী। কে কখন আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, তা কেউ জানে না। আমৃত্যু তারা নিজেদের এলাকার মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। তাদের মৃত্যুতে রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়।

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, খুলনায় অসম্ভব জনপ্রিয় নেতা ছিলেন মোস্তফা রশিদী সুজা। ছাত্রজীবন থেকেই সাহসী একজন রাজনৈতিক যোদ্ধা ছিলেন। খুলনা বিভাগে আওয়ামী লীগের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য সুজার অত্যন্ত শক্তিশালী অবদান ছিল। কিন্তু বিএনপির আমলে তার পা ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করা, হাতের আঙুলে সূচ ফুটিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। যার কারণেই তার এই অকালমৃত্যু।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মোস্তফা রশিদী সুজার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সৈনিক সুজা অত্যন্ত ত্যাগী ও সাহসী নেতা ছিলেন। ক্লিন হার্ট অপারেশনের নামে সুজাসহ অসংখ্য নেতাকে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। সাতবারের এমপি তাজুল ইসলাম চৌধুরীও অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ও অসম্ভব সৎ মানুষ ছিলেন। আজীবন ভাড়া বাড়িতে থেকেছেন। এ দু’জনের মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে অনেক ক্ষতি হল।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মোস্তফা রশিদী সুজার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। ক্লিন হার্ট অপারেশনের নামে খালেদা জিয়ারা সুজাকে হত্যার উদ্দেশ্যে অমানুষিক নির্যাতন করে। যার ফলে অসম্ভব জনপ্রিয় নেতাকে চলে যেতে হল। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীও অসম্ভব জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে রাজনীতির জন্য বিশাল ক্ষতি হল।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তি ছিল বলে সুজাকে শেষ করার পরিকল্পনা নেয় খালেদা জিয়ারা। আর সেজন্য তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তাজুল ইসলাম চৌধুরীও একজন ভালো ও দেশপ্রেমী মানুষ ছিলেন।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মোস্তফা রশিদী সুজা দু’জনই সংগ্রামী ও ত্যাগী নেতা ছিলেন। সাতবারের এমপি তাজুল ইসলাম চৌধুরীর চলে যাওয়াই রাজনীতিতে বিশাল একটি শূন্যতার সৃষ্টি হল।

প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মোস্তফা রশিদী সুজা দু’জনই গুণী মানুষ ছিলেন। অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। সাতবার সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকলেও তাজুল ইসলাম চৌধুরীর ঢাকা শহরে এক ছটাক জায়গা নেই। এখনও তার পরিবার ভাড়া বাড়িতে থাকেন। জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম ওমর বলেন, তাজুল ইসলাম চৌধুরী জনমানুষের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হওয়ার নয়।

মোস্তফা রশিদী সুজার মৃত্যুতে শূন্য আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী সাবেক তারকা ফুটবলার আওয়ামী লীগের আবদুস সালাম মুর্শেদী শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, প্রয়াত নেতা মোস্তফা রশিদী সুজা আমৃত্যু খুলনার উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। শুধু রাজনৈতিক নেতাই নন, খেলাপাগল লোক ছিলেন তিনি। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে তথাকথিত ক্লিন হার্ট অপারেশনের নামে সাবেক হুইপ সুজার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়।

কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, জন্ম হলে মৃত্যু হবেই। কিন্তু একে একে আমরা ত্যাগী ও জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের হারাচ্ছি। ক্লিন হার্ট অপারেশনের সময় অমানুষিক নির্যাতনের পর থেকেই আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি মোস্তফা রশিদী সুজা। তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মোবাইল নম্বরও ডিলিট করতে হবে। এটা যে কত কষ্টের তা বলার মতো নয়।