মানববন্ধনে মির্জা ফখরুল

খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বোঝা যাবে সরকার নির্বাচন চায়

তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের পদত্যাগসহ ৬ দফা দাবি * সারা দেশে দুই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতারের অভিযোগ

  যুগান্তর রিপোর্ট ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন হবে না। তাই আমরা বলেছি, দেশনেত্রীকে মুক্তি দিলে বোঝা যাবে সরকার দেশে একটি নির্বাচন চায়। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। আমরা তার মুক্তি চাচ্ছি। কোনো করুণা চাচ্ছি না, কোনো দয়া ভিক্ষা চাচ্ছি না। তার যেটা প্রাপ্য- তিনি জামিন পেয়েছেন। নিু আদালত ও উচ্চ আদালত তাকে জামিন দিয়েছেন। কিন্তু তাকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না।

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সোমবার এক মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকার পাশাপাশি সারা দেশে মহানগর ও জেলা সদরে একযোগে এ কর্মসূচি পালন করেন দলটির নেতাকর্মীরা। মানববন্ধনে বিএনপি নেতারা চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নির্বাচনের আগে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বেলা ১১টা থেকে এক ঘণ্টার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। সকাল ১০টা থেকেই বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আসা শুরু করেন। প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতসহ সড়কের দুই প্রান্তে হাজারও নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে মানববন্ধন একটি সমাবেশে রূপ নেয়। একপর্যায়ে সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ‘মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই’, ‘জেলের তালা ভাঙব, খালেদা জিয়াকে আনব’, ‘খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন মানি না, মানব না’ ইত্যাদি স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।

এদিকে এ কর্মসূচিতে আসা এবং ফিরে যাওয়ার সময় রাজধানীতেই শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে আছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহসম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, নির্বাহী কমিটি সদস্য আবদুল মতিন ছাড়াও ঢাকা মহানগর বিএনপি।

সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আওয়ামী লীগকে দেউলিয়া রাজনৈতিক দল উল্লেখ করে বলেন, আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, এ সরকারকে চলে যেতে হবে। তাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে। জনগণ তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এখন দরকার ঐক্য। ইস্পাত কঠিন ঐক্য। দল ও জনগণের মধ্যে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য তৈরি করে এই দানব সরকারকে সরিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগেই এ ঐক্যের কথা বলে গেছেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা পরিষ্কার করে বলেছি, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। এ সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে তফসিল ঘোষণার আগেই, সংসদ ভেঙে দিতে হবে তফসিল ঘোষণার আগেই। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে, নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করতে হবে।

সরকারের দমনপীড়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার এখন একটা সন্ত্রাসী সরকারে পরিণত হয়েছে। তারা সন্ত্রাস করছে। একদিকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে বিনা কারণে গ্রেফতার, মামলা করে গোটা জাতিকে জিম্মিতে পরিণত করেছে। সারা দেশে পরিকল্পিতভাবে ভৌতিক মামলা তৈরি করে তারা বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে। আমাদের কাছে খবর এসেছে ইতিমধ্যে এক লাখের ওপর মানুষকে আসামি করেছে। ১২ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করেছে। পরিষ্কার করে বলতে চাই, এভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে, গুম-খুন করে, নির্যাতন করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকারের একটাই উদ্দেশ্য- দেশনেত্রীকে ও বিএনপিকে ছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করতে চায়। দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, দেশে আগামী নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। সারা দেশের মানুষ যেমন এই দাবিতে একমত, সারা বিশ্বও বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, এবার কোনো ধোঁকাবাজির নির্বাচন সরকার করতে পারবে না। আমরা খালেদা জিয়াকে মুক্তি করব। তাকে চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করব।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশে এখন যারা জোর করে ক্ষমতায় আছে, তারা ২০১৪ সালের মতো আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এ কারণে খালেদা জিয়াকে তারা মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে আটক করে রেখেছে।

মানববন্ধন কর্মসূচি শেষ হওয়ার ১৫ মিনিট আগেই বিএনপির নেতাকর্মীরা গ্রেফতার এড়াতে হুড়োহুড়ি করে স্থান ত্যাগ করতে থাকেন। এ সময় সাদা পোশাকে থাকা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা মানববন্ধন থেকেই বিএনপির বেশ কয়েকজনকে আটক করে।

দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদের পরিচালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, বরকতউল্লাহ বুলু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, শওকত মাহমুদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, আবদুস সালাম, কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, নাজিমউদ্দিন আলম, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, মীর সরফত আলী সপু, আজিজুল বারী হেলাল, শিরিন সুলতানা, রেহানা আক্তার রানু, মহানগর দক্ষিণের কাজী আবুল বাশার, স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের রাজীব আহসান, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল আলম চৌধুরী, আতাউর রহমান ঢালী, মজিবুর রহমান সরোয়ার, শামীমুর রহমান শামীম, আবদুল আউয়াল খান, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া প্রমুখ।

এদিকে মানববন্ধন কর্মসূচিকে ঘিরে সকাল ১০টা থেকেই জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকার আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। এছাড়া পুলিশের সাঁজোয়াযান ও জলকামানের গাড়িও প্রস্তুত রাখা হয়।

এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে দুই দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল বুধবার দুই ঘণ্টার প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। ঢাকার রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন প্রাঙ্গণ অথবা গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চে এদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত প্রতীকী অনশনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে দলটি।

দুই শতাধিক দলীয় নেতাকর্মী গ্রেফতারের দাবি রিজভীর : ঢাকাসহ সারা দেশে অনুষ্ঠিত দলের মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে দুই শতাধিক নেতাকর্মীর গ্রেফতারের অভিযোগ করেছে বিএনপি। সোমবার বিকালে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ও গাজীপুর, বাগেরহাট, মেহেরপুরসহ সারা দেশে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করতে আসা ও যাওয়ার পথে নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয় নেতাকর্মীদের। সরকারের আজ্ঞাবহ পুলিশ বাহিনী বিনা উস্কানিতে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারে রক্ষা পায়নি সাধারণ মানুষসহ নেতাদের গাড়িচালকরাও। রিজভী বলেন, মানববন্ধন কর্মসূচিতে পুলিশি এ আক্রমণ নৃশংস দস্যুতার নামান্তর মাত্র। তাহলে মানববন্ধন কর্মসূচির অনুমতি দিয়েছিলেন কী ওৎপেতে গ্রেফতার করার জন্য? আমরা সরকারকে বলে দিতে চাই, এতে আপনাদের শেষ রক্ষা হবে না। যতই ট্রেন, লঞ্চে চড়ুন না কেন, ডুবন্ত নৌকাকে আর ভাসানো যাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন প্রমুখ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter