সংবাদ সম্মেলনে ড. কামাল হোসেন

দেশ অসাংবিধানিক পথে নেয়ার চেষ্টা চলছে

২২ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে নাগরিক সমাবেশ * জনগণ ক্ষমতার নামে রাজতন্ত্র-পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে দেবে না

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

ড. কামাল হোসেন

বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বৈরাচারী আচরণের দিকে ঝুঁকছে। তারা দেশকে অসাংবিধানিক পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, একটি সভ্য দেশকে অসভ্য দেশেও পরিণত করার চেষ্টা করছে তারা। এর পরিণাম ভালো হবে না। দেশে রাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব নয়। কেউ যদি মনে করে থাকেন, তারা ক্ষমতার নামে রাজতন্ত্র-পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন, তা এ দেশের জনগণ কখনই হতে দেবে না।’

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গণফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গণফোরাম নেতাদের মধ্যে অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক, আবম মোস্তফা আমিন, আওম শফিক উল্লাহ, সাইদুর রহমান, মোশতাক আহমদ, রফিকুল ইসলাম পথিক প্রমুখ।

২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক ঐক্যের ব্যানারে আহূত সমাবেশের অনুমতি না দেয়ায় সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘দেশের মালিক কি তারা (সরকার)? তারা কি দেশের জমিদার? তারা চাইলে যে কোনো সময়, যে কোনো স্থানে সভা-সমাবেশ করবে, আর আমরা চাইলে করতে পারব না। অনুমতি দেয়া হবে না।’ ড. কামাল হোসেন আগামী ২২ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে অবস্থিত মহানগর নাট্যমঞ্চে নাগরিক সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আশা করি তারা এখানে সমাবেশ করতে বাধা দেবেন না।’

ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর সোওরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ডাক দেয়া হয়েছিল। এক মাস আগে অনুমতি চেয়েও পায়নি বলে জানা গেছে। ফলে এখন ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশটি হবে গুলিস্তানের মহানগর নাট্যমঞ্চে। তবে সোওরাওয়ার্দী উদ্যানে কেন ঐক্য প্রক্রিয়াকে সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এটা সরকারকে জিজ্ঞাসা করুন। আমরা অনুমতি পাইনি। তাছাড়া আমি অনুমতি শব্দটা বুঝি না। সরকার যখন-তখন যেখানে-সেখানে সমাবেশ করবে, আর আমরা বা বিরোধী দল চাইলে তাদের করতে দেয়া হবে না। এটা কি করে সম্ভব? এটা জমিদারি ব্যবস্থা নয়। তাছাড়া সংবিধানে এসব বৈষম্য তো নেই। সরকার এ ধরনের বৈষম্য করে সংবিধানকে বারবার অশ্রদ্ধা করছে।’

কারাগারে আদালত বসানো সংবিধানসম্মত নয় : এদিকে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, কারাগারে আদালত বসানো সংবিধানসম্মত নয়। তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, সেখানেই বসানো হয়েছে বিশেষ জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাস। আমরা ধারণা, বিএনপি এটা নিয়ে কোর্টে যাবে। কোর্টই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমি কোর্টে গেলে তো এটাই বলতাম- এটা সংবিধানসম্মত নয়।’

তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেত্রীকে আটক করেছেন। তার ব্যাপারে জেলখানায় কারাগারে আদালত বসিয়ে বিচার-টিচার- এসব ঠিক নয়। এক্ষেত্রে কর্নেল তাহেরের উদাহরণ দেয়া হচ্ছে। ওটা ছিল সামরিক শাসনের সময়। ৪১ বছরের আগের একটি উদাহরণ দিয়ে এখন কারাগারে আদালত স্থাপন করে বিচারের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।’ ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় স্থানান্তর আমি বলব, এটা সংবিধানকে অমান্য করা। সরকার যেটা করছে এটা তাদের পক্ষে যাচ্ছে না।’

খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা বিষয় নিয়েও কথা বলেন গণফোরাম সভাপতি। তিনি বলেন, ‘লোকজনের কাছে শুনছি, তার স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে তাকে হাসপাতালে নেয়ার কথা দলের নেতারা বলছেন, তারা দরখাস্তও দিয়েছেন। আমি মনে করি, আমাদের তো একটা ঐতিহ্য আছে পাকিস্তান আমল থেকেই। পাকিস্তান আমল না হয় বাদ দিলাম। আমাদের আমলেও ঐতিহ্য আছে যে কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। সব সময় এটা হয়ে এসেছে। অসুস্থ মানুষকে এভাবে কষ্ট দেয়া উচিত নয়। আমি বলি, সরকারের ভুলে যাওয়া উচিত নয় আমরা একটা সভ্য সমাজে বাস করি। আমরা সভ্য মানুষ, আমাদের সভ্য রাষ্ট্র যেন অসভ্য রাষ্ট্রে পরিণত না হয়।’

জামায়াতকে নিয়ে ঐক্যে নয় : সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে কোনো ‘বৃহত্তর ঐক্যে’ তিনি এবং তার দল যাবে না। জামায়াতকে রেখে বিএনপির সঙ্গে কোনো বৃহত্তর ঐক্যে আপনি যাবেন কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি ও আমাদের দল ঐক্য করবে না। অন্য কোনো দল করবে কিনা আমি জানি না। তবে আমি যতটুকু জানি ওরা (জামায়াতে ইসলামী) তো এখন দলও নয়, ইতিমধ্যে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নিয়ে আবারও প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সারাজীবনই আমি করিনি, শেষ জীবনে সেটা করতে যাব কেন?’

জাতীয় ঐক্য আগাচ্ছে : দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে ‘বৃহত্তর ঐক্য’ প্রক্রিয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এই ঐক্যের কাজ চলছে, ঐক্য গড়ে উঠছে, আগাচ্ছে। আমরা সেটাকে ইতিবাচক দেখতে চাই।’ দেশ সাংবিধানিক শাসনের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক। সিভিল পোশাকে পুলিশি গ্রেফতারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক শাসন থাকলে দেশে সবাই আইন মেনে কাজ করবে। আইন মানা না হলে তো সাংবিধানিক শাসন থাকে না। আমাদের আজকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে হয়, আমরা সাংবিধানিক শাসনের বাইরে চলে যাচ্ছি। একদমই যেটা করার কথা নয় এবং সংবিধানের আওতার বাইরে গিয়ে বেআইনিভাবে মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।’

দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে : ড. কামাল হোসেন বলেন, শিক্ষার্থীরা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেনি। তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছে। কোটা ও নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার যৌক্তিকতা কি? বিএনপির মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে গণগ্রেফতারের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘সামনে নির্বাচন, আমরা চাই দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করুক। কিছুদিন আগেও সংসদে যে প্রধান বিরোধী দল ছিল, তাদের মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে চলে যাওয়ার সময় ব্যাপক ধড়পাকর করা হয়েছে। শত শত লোককে ধরা হয়েছে। আমি মনে করি, নির্বাচনের আগে এটা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা।’

তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ধড়পাকর হওয়া উচিত নয়। আমরা যেহেতু গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, সংবিধানে বিশ্বাস করি- আমরা মনে করি যে, সরকার সংবিধান মেনে কাজ করবে। এভাবে ধড়পাকর থেকে তাদের বিরত থাকা দরকার। সাংবাদিকদের একজন সরকারের টানা সাড়ে ৯ বছরের দেশ পরিচালনার বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে ড. কামাল থামিয়ে দিয়ে বলেন, সরকার ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। এরপর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন করে গত ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। সরকারের বিদায় চান কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা জনগণ বলবে, আমি বলব কেন? আপনি নির্বাচন করতে চান। আপনাদের ব্যক্তি ইমেজ ভালো থাকলেও অনেকে আপনাদের জনসমর্থনহীন বলে। তাহলে কিভাবে নির্বাচন করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, ‘জনগণকে সুযোগ দেয়া উচিত, তারাই বিবেচনা করবেন।’