আর্থিক প্রতিষ্ঠান

এখনও ডাবল ডিজিটে বিনিয়োগে সুদহার

  দেলোয়ার হুসেন ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেই নিষ্পত্তির আবেদন হচ্ছে
প্র্রতীকী ছবি

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানিগুলোতে এখনও কমেনি বিনিয়োগের সুদহার। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই এই হার এখনও ডাবল ডিজিটেই রয়ে গেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমানতের সুদহার কমালেও কমায়নি বিনিয়োগের সুদহার। হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তা ও গৃহঋণের সুদহার সামান্য কমিয়েছে। অন্য খাতে তেমন একটা কমায়নি। বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগের সুদহার আগের অবস্থায় রেখেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাংকে তারল্য সংকট হওয়ায় উদ্যোক্তারা সেখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ পাচ্ছেন না। যে কারণে অনেকেই এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানমুখী। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে তহবিল সংকট। ফলে তারাও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ তহবিল সংগ্রহ করে ব্যাংক থেকে।

কিন্তু তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলো এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তহবিল রাখছে না। কিছু ব্যাংক রাখলেও সুদহার ৯ থেকে ১২ শতাংশ। আমানতকারীদের কাছ থেকে ৭ থেকে ১০ শতাংশ সুদে আমানত নিচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে তাদের তহবিল ব্যবস্থা ব্যয় দাঁড়াচ্ছে গড়ে ৯ থেকে ১১ শতাংশ। এ কারণে তারা বিনিয়োগের সুদহার কমাতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানতের গড় সুদহার ২০১৭ সালের জুনে ছিল ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং বিনিয়োগে গড় সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এ বছরের জুনে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে আমানতে ১০ দশমিক ১৬ এবং বিনিয়োগে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গত ১ জুলাই থেকে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট করার উদ্যোগ নেয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেউই সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাতে পারেনি। জুলাইয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুদহার সামান্য কমিয়ে গড়ে আমানতে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ এবং বিনিয়োগে ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ করেছে।

দেশে ৩৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২২৫টি শাখা আছে। তাদের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। দেশে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ।

গত মে মাসে গণভবনে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর এক সভায় প্রধানমন্ত্রী ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন। সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। তাকে উদ্দেশ করেই প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংক নানা ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ ও ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করে এই হার কমানোর উদ্যোগ নেয়।

এর আলোকে গত ২০ জুন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভায় সব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদ হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর করার কথা জানায় তারা। বিএবির সদস্য ৩৭টি ব্যাংকের মধ্যে ওইদিন ২৬টি ব্যাংকের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তারা সুদহার কমাতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামছে না।

এরপর ২১ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) কয়েক নেতার সঙ্গে অনির্ধারিত এক বৈঠকে তাদের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিতে বলেন।

৩ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমডিদের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে তারা সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রাথমিকভাবে শিল্প, রফতানি ও নারী উদ্যোক্তা ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর কথা বলেন তারা। এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন সুদহার কার্যকর করার অঙ্গীকারও করেন। অন্যান্য খাতে সুদহার কমাতে ১ থেকে ২ মাস সময় লাগবে বলেও বৈঠকে জানান। কিন্তু এরপর দুই মাসের বেশি সময় গেলেও এখনও তারা সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাননি।

এ প্রসঙ্গে বিএলএফসিএ সভাপতি ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও কস্ট অব ফান্ড বেশি। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কম সুদে সরকারি ব্যাংক থেকে তহবিল পাচ্ছে না। যে কারণে সব প্রতিষ্ঠান সুদহার কমাতে পারছে না। পর্যায়ক্রমে তারা সুদহার কমাচ্ছেন।

সূত্র জানায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ব্যাংক থেকে ৭ শতাংশ সুদে আমানত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সেটি দেয়া হচ্ছে না। উল্টো আমানতের সুদহার কমানোয় অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে আমানত তুলে নিচ্ছে। ফলে তাদের তহবিল সংকট প্রকট হচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে না। তারা গ্রাহককে বিভিন্ন সেবা বা পণ্য কিনে দেয়। এর বিপরীতে সুদসহ কিস্তি আদায় করে। এ কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চয়ে কিছুটা বেশি মুনাফা পাওয়া যায়। তেমনি তাদের অর্থায়ন কর্মকাণ্ডেও সুদহার কিছুটা বেশি। তবে সেবার মান ভালো হওয়ায় এবং ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা বেশি ঋণ নিতে পারে না বলে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকের ঝোঁক থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলতি মূলধন, হাউজিং, নারী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুবিধা দিচ্ছে। এসব খাতে তাদের সুদের হারও কম।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগের সুদহার সাড়ে ৯ থেকে ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিজ অর্থায়নের ক্ষেত্রে সুদ ১০ শতাংশ হলেও নানা ধরনের চার্জ যোগ করে এ হার পড়ে প্রায় ১৩ শতাংশ পড়ছে। গৃহায়ন খাতে বিনিয়োগে তারা নিচ্ছে গড়ে ১৪ শতাংশ সুদ।

লংকা বাংলা বিভিন্ন মেয়াদি লিজ অর্থায়নে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ, চলতি মূলধনে ১০ শতাংশ, সাসটেইনেবল অর্থায়নে ১০ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। এর সঙ্গে আছে সার্ভিস চার্জ। তারা গাড়ি কেনায় অর্থায়ন সুবিধা দিচ্ছে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে। গৃহায়নে ১৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ২২ শতাংশ সুদ নিচ্ছে।

আইডিএলসি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চলতি মূলধন দিচ্ছে গড়ে ১০ শতাংশ সুদে। লিজ অর্থায়ন করছে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে। মেয়াদি অর্থায়ন করছে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে। ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিজ অর্থায়নে সুদ নিচ্ছে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ, হাউজিংয়ে ১৪ শতাংশ, ভোক্তা খাতে ১৫ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ করছে।

ন্যাশনাল হাউজিং গৃহায়নে অর্থায়ন করছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে। এর সঙ্গে রয়েছে চার্জ। লিজ অর্থায়ন করছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে। ভোক্তা খাতে অর্থায়ন করছে ১৫ শতাংশ সুদে। প্রাইম ফাইন্যান্স লিজ অর্থায়নে সুদ নিচ্ছে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ, প্রকল্পে অর্থায়নে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ নিচ্ছে।

এদিকে ব্যাংকগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে ঋণ দেয় তার সুদহারও চড়া। এর মধ্যে ইস্টার্ন ব্যাংক সাড়ে ১০ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়া ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১২ শতাংশ, মেঘনা ব্যাংক সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ, যমুনা ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংক ৯ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক ১০ থেকে ১৩ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংক ১১ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, পূবালী ব্যাংক ১৪ শতাংশ, সোনালী ব্যাংক ৯ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংক সাড়ে ১০ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়।

এছাড়া ব্যাংকগুলোও এখন লিজ অর্থায়ন করে। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিজ ফাইন্যান্স করে সাড়ে ১২ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক সাড়ে ১৩ শতাংশ, এনসিসি ১২ শতাংশ, মধুমতি ব্যাংক ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter