বিবির হালনাগাদ প্রতিবেদন

কু-ঋণে ন্যুব্জ ব্যাংকিং খাত

আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ৭৫ হাজার কোটি টাকা

  হামিদ বিশ্বাস ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ৭৫ হাজার কোটি টাকা
প্র্রতীকী ছবি

ব্যাংকিং খাতে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি বা কু-ঋণ বেড়েই চলেছে। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে বেড়েছে খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ। কারণ ব্যাড অ্যান্ড লস বা ক্ষতিজনক খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছে, সেই ঋণই এখন কু-ঋণে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকদের যোগসাজশ বা ভাগাভাগি করে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছে, সে ঋণের লক্ষণও ভালো নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত আদায় অনিশ্চিত খেলাপি বা কু-ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৬৪ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে কু-ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের কু-ঋণ ৩৬ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। বেসরকারি ৪০ ব্যাংকের কু-ঋণ ৩১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। বিদেশি ৯ ব্যাংকের কু-ঋণ ১ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। আর সরকারি বিশেষায়িত ২ ব্যাংকের কু-ঋণ ৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা।

মাত্রাতিরিক্ত এই কু-ঋণের প্রভাবে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে ১৩টি ব্যাংক। চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১২ বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৯টি ব্যাংক প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছিল। এরপর চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে ১২টিতে উন্নীত হয়। সর্বশেষ জুনে আরও বেড়ে ১৩টি ব্যাংকে উন্নীত হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণেই প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে বলে মনে করছেন আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে সরকারি লোকের দাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বেশকিছু ঋণ দেয়া হয়েছিল। যা পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ ঢেকে রাখা হয়েছিল। এ ধরনের মন্দ ঋণ এখন খেলাপি হয়ে বেরিয়ে আসছে। একইভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয়ও কিছু দুষ্ট লোক রয়েছে। তাদের দাপটে যেসব ঋণ দেয়া হয়েছিল, তা এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতে দুরবস্থা চলছে। যেভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, তাতে উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া আর কিছু বলার নেই। খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশন ঘাটতি বাড়বে। আবার ঋণ অবলোপনের পরিমাণও বাড়ছে। ফলে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, জুন শেষে ১৩ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। মার্চে ১২ ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। ৩ মাসের ব্যবধানে ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে ৩৭৫ কোটি টাকা। মার্চের ১২টি ব্যাংক ছাড়াও নতুন করে একটি ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১৬০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে যুক্ত হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, যাচাই-বাছাই ছাড়া যে ঋণ দেয়া হয়েছে তা খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা বেশি। এসব খেলাপির কোনো জবাবদিহিতা নেই। বরং উল্টো তারা সুযোগ-সুবিধা বেশি পায়। অনেক ক্ষেত্রে খারাপ গ্রাহকরা পুরস্কৃত হচ্ছেন। আর তিরস্কৃত হচ্ছেন ভালো গ্রাহকরা। মূলত বিচারহীনতার কারণে এমনটি হচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি থাকলে প্রভিশন ঘাটতি বাড়ে। এ ছাড়া ব্যাংকের লেজার বুক পরিষ্কার করতে হলেও প্রভিশন ঘাটতিতে পড়ে ব্যাংক।

তথ্যমতে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রভিশন ঘাটতিতে আলোচিত বেসিক ব্যাংকের অবস্থান প্রথম সারিতে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত আরও দুটি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি যথাক্রমে ৩ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা ও ৮৯০ কোটি টাকা। এবি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১৪৭ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৪২২ কোটি, একটি ইসলামী ব্যাংক ১৬০ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের প্রায় ২১ কোটি এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১০৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৪৭৮ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঘাটতি ১১৬ কোটি টাকা, অপর একটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৩৬৮ কোটি টাকা এবং স্টান্ডার্ড ব্যাংকের ঘাটতি কিছুটা কমে ৪৬ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত, আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে ঋণের শ্রেণীমান বিবেচনায় প্রতি ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। সাধারণ ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে শুরু করে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন রাখার নিয়ম রয়েছে। আর যথাসময়ে আদায় না হওয়া নিুমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি মানে শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে যথক্রমে ২০, ৫০ ও ১০০ ভাগ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকগুলোর অর্জিত মুনাফা থেকে এ অর্থ রাখার নিয়ম রয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter