প্রতীকী অনশনে বিএনপি নেতারা

হাতে সময় এক মাস সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিন

খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া দেশে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না * ১০৭ নেতাকর্মী আটকের দাবি রিজভীর

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্দোলন ছাড়া সংকটের সমাধান হবে না জানিয়ে বিএনপি নেতারা বলেছেন, হাতে এক মাসের মতো সময় আছে। তাই সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে। এমন কর্মসূচি দেয়া হবে সরকারের নৌকা ভেসে যাবে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে বিএনপির নেতারা বলেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া একতরফা কোনো নির্বাচন এ দেশে হবে না, হতে দেয়া হবে না।

বুধবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনের সামনে বিএনপি আয়োজিত এক প্রতীকী অনশন কর্মসূচিতে দলটির নেতারা এসব কথা বলেন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও তার মুক্তির দাবিতে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই অনশন কর্মসূচি পালন করেন দলটির নেতাকর্মীরা। এতে ঢাকা মহানগরসহ অঙ্গসংগঠনের হাজারও নেতাকর্মী অংশ নেন। গ্রেফতার এড়াতে কর্মসূচি শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে থেকে অনশনস্থল ত্যাগ করা শুরু করেন নেতাকর্মীরা। এ কারণে অনশন কর্মসূচির সভাপতি ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন উপস্থিতি একেবারে কমে যায়। পরে দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পানি পান করিয়ে প্রতীকী অনশন ভাঙান।

সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এই সরকার যতই ষড়যন্ত্র করুক ২০১৪ সালের মতো নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি এ দেশে হবে না। তফসিল ঘোষণার আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে, বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে হবে। এছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না।

খন্দকার মোশাররফ বলেন, অন্যায় ও মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়াকে ষড়যন্ত্র করে কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে অত্যন্ত অসুস্থ। আমরা দাবি করছি অবিলম্বে তাকে তার পছন্দমতো একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে কোনো প্রকার বিচারের আওতায় আনা যায় না। তাই তার আশু সুস্থতা প্রদান প্রয়োজন। তার সুচিকিৎসা প্রয়োজন। তাকে হাসপাতালে নিন।

ড. মোশাররফ বলেন, সারা দেশ আজ ঐক্যবদ্ধ। দেশি-বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রগুলো বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। আর খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না।

পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকারের সময় শেষ। মামলা, গ্রেফতার করে বিএনপির দাবি আদায়ের আন্দোলন দমন করা যাবে না। পুলিশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, আওয়ামী লীগের কর্মচারী নয়। যারা এখনও আওয়ামী লীগের কথায় কাজ করছেন, তাদের কিন্তু ভবিষ্যতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাই অযথা বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি, গ্রেফতার ও মামলা দেবেন না।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সামনে এমন কর্মসূচি দেয়া হবে, যে কর্মসূচিতে এই সরকারের নৌকা ভেসে যাবে। আর আছে মাত্র মাসখানেক সময়। এ সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। এবার রাস্তায় নামলে আন্দোলন সফল না করা পর্যন্ত যাতে কেউ বাড়িতে ফিরে না যায়।

তিনি বলেন, সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় না। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে না। তাই খালেদা জিয়ার মুক্তির একমাত্র পথ রাজপথ। রাজপথে আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, প্রত্যেকটি থানায় হাজার হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে। ভয়ে কম্পমান এ সরকার। এত অত্যাচারের পরও বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘরে বসে থাকেনি। ঘরে বসে থাকবে না।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আমাদের মধ্যে যদি কেউ মনে করে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, আমাদের মাঝে যদি কেউ আড়ালে-আবডালে নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা করে তাদের ঘরের মধ্যে জবাব দেয়ার জন্য আপনারা সজাগ থাকবেন। বিগত দিনে ১/১১-তে যারা বেইমানি করেছিল তারা হয়তো অনেকেই ভালো। কিন্তু নতুন করে যদি আবার বেইমানি করতে চায়, তাদের সমুচিত জবাব দেবে রাজপথে নেমে।

প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদের পরিচালনায় অনশনে আরও বক্তব্য দেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নেতা মো. শাহজাহান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, আতাউর রহমান ঢালী, ফজলুল হক মিলন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শিরিন সুলতানা, নাজিমউদ্দিন আলম, মহানগর দক্ষিণের কাজী আবুল বাশার প্রমুখ। আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, বরকতউল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিতাই রায় চৌধুরী, শহিদুল ইসলাম বাবুল, রেহেনা আক্তার রানু প্রমুখ। সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর মিয়া গোলাম পরওয়ার, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, ন্যাপের আজহারুল ইসলাম, কল্যাণ পার্টির সাহিদুর রহমান তামান্না।

প্রতীকী অনশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনের বাইরে ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য মোতায়েন করা হয়। কর্মসূচি থেকে ফেরার সময় সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ মৎস্য ভবন মোড় ও কাকরাইল এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করে।

এদিকে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সহদফতর সম্পাদক মুনীর হোসেন, তাইফুল ইসলাম টিপুসহ অফিস কর্মীরা বসে এই প্রতীক অনশনে অংশ নেয়।

রাজধানীতে ১০৭সহ সারা দেশে ১৫১ নেতাকর্মী আটকের দাবি রিজভীর : অনশন কর্মসূচিকে ঘিরে সারা দেশে বিএনপির অন্তত ১৫০ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকার কর্মসূচি থেকে দলের ১০৭ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। আর ঢাকার বাইরে ৪৪ জনকে আটকের তথ্য আমরা পেয়েছি।

রিজভী বলেন, নেত্রীর মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ অনশন কর্মসূচির জন্য ডিএমপি অনুমতি দিলেও তারা ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউশনে আসা যাওয়ার পথে গতিরোধ করে ১০৭ জনকে আটক করেছে।

বুধবার বিকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, খন্দকার মাসুকুর রহমান, যুবদল নেতা জাহাঙ্গীর হাওলাদার প্রমুখ।

রিজভী বলেন, বিরোধী দলকে দলনের এক নতুন ফন্দি অবলম্বন করেছে পুলিশ। বিএনপির কর্মসূচির মৌখিক অনুমতি দেয়ার পরও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে নোতকর্মীদের আটকের এক নতুন স্ট্র্যাটেজি অবলম্বন করেছে সরকার। অর্থাৎ অনুমতির কথা শুনে নেতাকর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ে কর্মসূচির জন্য এক জায়গায় জড়ো হবে, আর সেই সুযোগে পুলিশ অনায়াসেই তাদের ধরতে পারবে। এটি আসলে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরতে পুলিশের একটি নতুন ফাঁদ।

১৬ ও ১৯ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা এবং অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, কারাগারে বিশেষ আদালত নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেট আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও বেআইনি। অবিলম্বে সেই গেজেট প্রত্যাহার করতে হবে। বুধবার দুপুরে কারা অভ্যন্তরে আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচার, মুক্তি ও বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার দাবিতে সুপ্রিমকোর্টে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম আয়োজিত প্রতীকী অনশন কর্মসূচিতে এ কথা বলেন। এদিন তিনি একই দাবিতে সারা দেশের আইনজীবী সমিতিগুলোতে দুই দিনের (১৬ ও ১৯ সেপ্টেম্বর) বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

দুপুর একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত আইনজীবী সমিতির সভাপতির কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এই প্রতীকী অনশনে আরও বক্তব্য রাখেন, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী আলাল, কামরুল ইসলাম সজল, মোহাম্মদ আলী, আবেদ রাজা, আনিছুর রহমান খান, ব্যারিস্টার এহসানুর রহমান, মাসুদ রানা, অ্যাডভোকেট আইয়ুব আলী আশ্রাফী, আরিফা জেসমিন, আয়েশা আক্তার, ফারুক আহমেদ ও আলমগীর হোসেন প্রমুখ।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter