প্রশাসনে জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহালের দুয়ার বন্ধ চার বছর

অভিযোগ : নিজের নীতিমালা মানছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় * ভুক্তভোগী কয়েকশ’ কর্মকর্তা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান

  বিএম জাহাঙ্গীর ২১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সচিবালয়

প্রশাসনে জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা বহাল আছে। কিন্তু তা অনেকটা কাজীর গরু কেতাবে থাকার মতো অবস্থা। অফিসিয়ালি কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই চার বছর ধরে ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা প্রদান বন্ধ রয়েছে। এ নিয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের ক্ষোভ-হতাশার শেষ নেই। পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে যারা পরবর্তী সময়ে পদোন্নতির দেখা পেয়েছেন তাদের প্রাপ্য জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহাল করা হচ্ছে না। ব্যক্তিগত ও ব্যাচভিত্তিক একাধিক আবেদন পড়ে আছে। সবই নিষ্পত্তিহীন।

১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর জারিকৃত তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের (বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) জ্যেষ্ঠতার সাধারণ নীতিমালা অনুযায়ী ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা প্রদান বহাল ছিল। এতে বলা আছে, যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজের ত্রুটি বা দোষের কারণে পদোন্নতিবঞ্চিত হন সেক্ষেত্রে তিনি জ্যেষ্ঠতা ফেরত পাবেন না।

তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত ডকুমেন্ট থাকতে হবে। আর যদি কাউকে কোনো কিছুর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী না করে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয় সেক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে তিনি যখন পদোন্নতি পাবেন তখন তার ব্যাচের মেধাক্রমের জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহাল হবে। এটিই এতদিন প্র্যাকটিস হয়ে আসছে।

কিন্তু বিগত চার বছর থেকে কাউকে প্রাপ্য জ্যেষ্ঠতা দেয়া হচ্ছে না। বহুল প্রচলিত সরকারি কর্মচারী আইন বইয়ের লেখক সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া এ প্রসঙ্গে প্র্যাকটিস হয়ে আসছে। কিন্তু বিগত চার বছর থেকে কাউকে প্রাপ্য জ্যেষ্ঠতা দেয়া হচ্ছে না। বহুল প্রচলিত সরকারি কর্মচারী আইন বইয়ের লেখক সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট দায় না থাকলে তার জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহাল করতে হবে। নীতিমালা বহাল রেখে জ্যেষ্ঠতা না দেয়াটা বেআইনি।

প্রসঙ্গত, প্রশাসনে সর্বশেষ ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা প্রদান করা হয় ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে উপসচিব পদে ৪৮ জনকে জ্যেষ্ঠতা প্রদান করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি যেসব লেফটআউট কর্মকর্তা উপসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন তাদের জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহাল করা হয়। সেখানে ১৯৮৪ ও ৮৫ ব্যাচেরও কয়েকজন ছিলেন। বাকিরা ছিলেন জুনিয়র ব্যাচের। এরপর আর কাউকে দেয়া হয়নি। ওই সময়কালে আগে ও পরে কয়েকশ’ কর্মকর্তা বিভিন্ন ধাপে পদোন্নতি পেলেও তাদের প্রস্তাব পড়ে আছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানায়, ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা আর দেয়া হবে না। জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহাল করা হলে ওই পদে পদোন্নতি দেয়ার সময় চাপ বাড়বে। বঞ্চিত করা নিয়ে অভিযোগের পাল্লা আরও ভারি হবে। বিশেষ করে যাদের বিভিন্ন বিবেচনায় ওপরে তুলে আনা হয়েছে তাদের দ্রুত ওপরের দিকে পদায়ন করতে অদৃশ্য সংকট দেখা দেবে। এজন্য বঞ্চিত কর্মকর্তাদের কেউ পদোন্নতি পেলে তাকে ওই পর্যন্তই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

সূত্র জানায়, ’৮৪, ৮৫ ও ৮৬ ব্যাচের জ্যেষ্ঠতা বঞ্চিত কয়েকশ’ কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে এক পর্যায়ে একটি প্রস্তাব সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়। কিন্তু তা অনুমোদন ছাড়াই ফেরত আসে। সেখানে মন্তব্য ছিল- এ ধরনের প্রস্তাব যেন আর পাঠানো না হয়। বিষয়টি শনিবার যুগান্তরকে নিশ্চিত করেন সে সময় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

সম্প্রতি কয়েকজন উপসচিবকে ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা দেয়া হলে বাদ পড়া প্রত্যাশী কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পদোন্নতি হলেও যারা লিয়েন নিয়ে অন্যত্র কর্মরত বা শিক্ষা ছুটিতে ছিলেন তারা চাকরিতে যোগ দেয়ার পর জ্যেষ্ঠতাসহ পদোন্নতির আদেশ জারি করা হয়েছে। এর সঙ্গে পদোন্নতিবঞ্চিতদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা প্রদানের কোনো সম্পর্ক নেই।

এদিকে দীর্ঘদিন থেকে হারানো জ্যেষ্ঠতা ফিরে না পাওয়া কর্মকর্তাদের অনেকে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো নিজের দোষে পদোন্নতিবঞ্চিত হইনি। অন্যায়ভাবে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়। কিন্তু যখন পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি দেয়া হল তখন জ্যেষ্ঠতা ফিরে পাওয়া তো আমাদের আইনগত অধিকার। আর এটি নিশ্চিত না হলে পরবর্তী পদোন্নতিতে তারা বিবেচনায় আসবেন না।’ তাদের দাবি, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক সমনীতি কার্যকর থাকা প্রয়োজন। তারা বলেন, জ্যেষ্ঠতা পুনর্বহাল না হওয়ায় আগে পদোন্নতি পাওয়া ব্যাচমেটদের কাছে খাটো হতে হয়।

যারা অনেক সময় বসের মতো আচরণ করেন। এটি খুবই পীড়াদায়ক। তারা বলেন, সুশাসন সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত না হলে সেবার মান খারাপ হবে। আবার অনেকে প্রকৃত সার্ভিস না দিয়ে ছড়ি ঘুরিয়ে দিন পার করছেন। বিনিময়ে সবই পাচ্ছেন। কেউ আবার সারাদিন গাধার মতো খেটে পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা কোনো কিছুই পাচ্ছেন না। ভেতরের এ সূক্ষ্ম বিষয়গুলো কখনও মন্ত্রী কিংবা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সেভাবে জানার কথা নয়।

এ বিষয়গুলো সঠিকভাবে যথাস্থানে উপস্থাপন করার দায়িত্ব দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র অফিসারদের। যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ’৮৫ ও ৮৬ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেন, ‘বুঝলাম সবাইকে দেবেন না। কিন্তু আমরা তো আপনাদের লোক। আমাদের দেবেন না কেন।’

ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা চেয়ে এসএসবির সভাপতি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণায়ের সচিব বরাবর বেশ কিছু আবেদন ফাইলবন্দি অবস্থায় আছে। এর মধ্যে গত বছরের মাঝামাঝি এসএসবির সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে ১৯৮৬ ব্যাচের ২৪ জন কর্মকর্তা আবেদন করেন। যাদের কয়েকজন ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন।

ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের কয়েকজন বলেন, ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা নিয়ে রিট করলে নিশ্চিত তারা ন্যায়বিচার পাবেন। কিন্তু এতে করে ব্যক্তিগতভাবে রোষানলে পড়া ছাড়াও বাস্তবে দেখা যাবে, চাকরিতে থাকাবস্থায় তারা সুফল পাবেন না। তাছাড়া একজন ক্যাডার কর্মকর্তার জন্য এ ধরনের দাবি আদালতে নিয়ে যাওয়াও শোভন নয়। তারা প্রতিবেদককে বলেন, নিশ্চয় সরকারের দায়িত্বশীল মহল বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় নেবেন। বিশেষ করে তারা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

আরও পড়ুন
pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter