রোহিঙ্গা গণহত্যা

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিসির তদন্ত শুরু

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক

রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। নেদারল্যান্ডসে হেগের এ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোও বেনসুদা মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে বিতাড়ন এবং তাদের ওপর বর্বর হত্যাকাণ্ড চালানোর ঘটনায় যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে হাত দিয়েছে তার দফতর। ফলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর পূর্ণ তদন্তের পথ খুলে গেল। রোহিঙ্গাদের বিতাড়নে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের বিচারের এখতিয়ার আইসিসির রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত আসার ধারাবাহিকতায় এ তদন্ত শুরু হল। খবর বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ানের।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশকিছু স্থাপনায় ‘বিদ্রোহীদের’ হামলার পর রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সেনাবাহিনীর অভিযান। সেনা নির্যাতনের ভয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালাতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। ফলে বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। একে একে দেশটিতে এসে পৌঁছায় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের কথায় উঠে এসেছে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাওপোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়ানমার বলে আসছে, তাদের ওই লড়াই ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে, কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে নয়।

মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য না হওয়ায় সেখানে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার সরাসরি কোনো এখতিয়ার এ আদালতের নেই। কিন্তু রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের বিতাড়নের বিষয়টি যেহেতু আন্তঃসীমান্ত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে এবং বাংলাদেশ যেহেতু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য, সেহেতু আইসিসি বিষয়টি তদন্ত ও বিচার করতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন রেখে এপ্রিলে একটি আবেদন করেন আইনজীবী ফাতোও বেনসুদা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য এবং বিভিন্ন অধিকার সংগঠনের যুক্তি শুনেছে আইসিসি। ৬ সেপ্টেম্বর আদালতের তিন বিচারকের প্রি ট্রায়াল প্যানেল এক রায়ে জানায়, এ বিষয়টি বিচারের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রয়েছে। আইসিসির ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়, ব্যক্তিগত দুর্দশার বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে সেখানে অভিযোগ সাজানো হয়েছে। এর সঙ্গে আইনি যুক্তির কোনো যোগাযোগ নেই। বরং আবেগের জায়গা থেকে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

রিপোর্টে যা বলা হয়েছে : ২৭ আগস্ট ২০ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। মঙ্গলবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় ৪৪৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে মিশন। রিপোর্টে বলা হয়, রাখাইনে অপরাধ সংগঠনের মাত্রা, ধরন ও বিস্তৃতির দিক দিয়ে তা ‘গণহত্যার উদ্দেশ্য’ নিয়েই চালানো হয়েছিল বলে স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মিয়ানমার সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংসহ জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচার করার সুপারিশ করে। মিশন বলেছে, রাখাইনের হত্যাযজ্ঞের হোতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা অস্থায়ী একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। আর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকেই এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

তিন সদস্যের এ মিশনের নেতৃত্ব দেন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মারজুকি দারুসমান। বাকি দুই সদস্য হলেন শ্রীলংকার আইনজীবী নারী অধিকার বিশেষজ্ঞ রাধিকা কুমারস্বামী ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মানবাধিকার কমিশনার ক্রিস্টোফার ডমিনিক সিডোটি। প্রতিবেদনে জেনারেল মারজুকি দারুসমান বলেন, ‘তাতমাদাও (সেনাবাহিনী) যতদিন আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে, ততদিন মিয়ানমারে শান্তি ফেরানো সম্ভব হবে না। মিয়ানমারের উন্নয়ন ও একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে দেশটির সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড় বাধা। তাদের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করা উচিত।’

নিপীড়নের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের হাত ও মাথা গাছের সঙ্গে বেঁধে তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে দাবড়িয়ে ধরা হয়েছে। শরীরে সিগারেটের আগুন ও ম্যাচের আগুন দেয়া হয়েছে। আছোলা বাঁশ দিয়ে পেটানো হয়েছে। মিশন প্রতিবেদন তৈরিতে প্রায় ৮৭৫ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষী নিয়েছে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আমরা তরুণ-যুবতীদের উলঙ্গ হয়ে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দৌড়াতে দেখেছি।

ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন চায় অস্ট্রেলিয়া : জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রাখাইন, শান ও কাচিন রাজ্যে সংঘটিত নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। বুধবার বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়, মিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মিয়ানমারের জবাবদিহিতা ও বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় মানবাধিকার কাউন্সিলের কার্যক্রম সমর্থন করে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালিয়েছে। ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন রাখাইন রাজ্যে মানবতা ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটন এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচারের যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছে। এতে আরও বলা হয়, পাঁচ দশকের সামরিক শাসন থেকে হঠাৎ গণতন্ত্রে ফেরার কারণে মিয়ানমার অব্যাহত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে চলেছে। আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া মিয়ানমারের নাগরিকদের সুবিধার জন্য গণতন্ত্র এবং জাতীয় শান্তি ও পুনর্মিলন অর্জনের প্রচেষ্টায় সমর্থন অব্যাহত রাখবে।