সানেমের কর্মশালা

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সানেম
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছরই বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছে। এই প্রবণতা অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করছে। গত এক দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দেশ অনেক এগিয়েছে। কিন্তু সুশাসন, জবাবদিহিতা ও সহজে ব্যবসা করার সূচকে আবার পেছনে হাঁটছে। দারিদ্র্য নিরসন হলেও আয়বৈষম্য বাড়ছে। এজন্য দায়ী রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ের ঘাটতি।

সোমবার সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত দিনব্যাপী কর্মশালায় অর্থনীতিবিদ, শিক্ষক ও সাবেক আমলারা এসব কথা বলেন। মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইন্সটিটিউশনের গবেষণা কর্মসূচির আওতায় ‘বাংলাদেশ ইন্সটিটিউশনাল ডায়াগনস্টিক টুল’ বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করতে যাচ্ছে সানেম। এরই অংশ হিসেবে কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার বেশি। আর প্রতিবছরই পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৭ সালে বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ খেলাপি। ২০১৫ সালে তা ছিল ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। পুঁজিবাজারও শক্তিশালী নয়। এছাড়াও মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ যেমন কাঠামোগত রূপান্তর, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ, দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন তিনি।

প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এতে অতিথি ছিলেন পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দেশের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এখন জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে অনেক সুযোগ যেমন কাজে লাগানো যাচ্ছে না, আবার অনেক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জমির অভাবে যেমন শিল্পকারখানা করা সম্ভব হচ্ছে না, অপরদিকে অনেক জমি অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। জমি বেদখল হয়ে অনুৎপাদনশীল কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। আবার শিল্পায়ন যেভাবে হচ্ছে তাতে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এসবই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অভাব।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক চর্চাও এক্ষেত্রে জরুরি। কোনো সরকার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকলে সেদেশে ‘ধামাধরা পুঁজিবাদ’ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ একটি শ্রেণী কোনো ধরনের উদ্ভাবন ছাড়াই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বড় হয়, যা সমাজে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করে। এগুলো দূর করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জরুরি, নতুবা এসডিজি অর্জন সম্ভব হবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে নিয়মকানুনের ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে পেশাদারিত্বে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, দক্ষতার অভাবে রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে সময় মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এক্ষেত্রে তিনি চাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো ও কমানোর উদাহরণ দেন। তিনি এফডিআই, করবহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় মনিটরিং জোরদার করার সুপারিশ করেন।

পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, রেমিটেন্স ও রফতানি আয় দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে ঠিকই; কিন্তু জিডিপির হিসাবে রেমিটেন্স ও রফতানি আয়ের তুলনায় গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা অনেক বেশি। কিন্তু রফতানি খাতে যেসব প্রণোদনা আছে, গ্রামীণ উন্নয়নে সেই প্রণোদনা নেই বা প্রণোদনার বাস্তবায়ন সেভাবে হয় না। অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু সেগুলো সময়মতো শেষ হচ্ছে না। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এখনও ব্যক্তিনির্ভর, প্রতিষ্ঠান সেখানে কাজ করে না। যদিও উপজেলা প্রশাসন আগের তুলনায় বেশি জনমুখী। মনিটরিংয়ে ঘাটতি রয়েছে। তিনি সামাজিক পুঁজি গঠনের পরামর্শ দেন।

পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান সা’দত হুসাইন বলেন, দেশে সাংবিধানিক, স্বায়ত্তশাষিত, রাষ্ট্রীয়, বেসরকারি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনেক ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা থাকলেও কেউ-ই তা করছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে যার যে কাজ নয়, সে সেই কাজ করছে। আবার যে কাজ করার কথা, তা করছে না। এককথায়, বাংলাদেশে সরকার ছাড়া আর কেউই স্বাধীন নয়। ফলে উন্নতির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক কেএএস মুর্শিদ বলেন, মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা এখন অনেক বেশি। যে কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা বেড়েছে। যার সুফল পাচ্ছে দেশ। তবে সরকারের কাজের গতি কম। দাতাদের সম্পৃক্ততা আছে এমন প্রকল্প যত দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, সরকারের অর্থায়নের প্রকল্প তত গতিশীল নয়।

দ্বিতীয় অধিবেশনে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রাসোয়া বুরগিনন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্যানেল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ছাড়াও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বেসরকারি খাত বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×