ফের আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বলি বাংলাদেশ

ফাইনাল মানেই দুঃখগাথা

  স্পোর্টস রিপোর্টার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান লিটন দাস
ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির পর বাংলাদেশের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান লিটন দাস। শুক্রবার দুবাইয়ে ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ফাইনালে দারুণ লড়াই করে শেষ বলে বাংলাদেশ তিন উইকেটে হারলেও দুরন্ত শতকের সুবাদে লিটন হয়েছেন ম্যাচসেরা -এএফপি

ক্রিকেটীয় ব্যাখা-বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে নিয়তি বলে একটা ব্যাপার আছে। যা খণ্ডানোর সাধ্য নেই কারও। ফাইনালের মঞ্চে হারই যেন বাংলাদেশের নিয়তি। শেষ যুদ্ধ একপেশে হোক বা চরম রুদ্ধশ্বাস, শেষ অঙ্কে স্বপ্নভঙ্গের বেদনাই চেনা ছবি। অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ধূসর ছবিটা এবারও বদলালো না। বাংলাদেশের জন্য দুঃখগাথাই হয়ে রইল ফাইনাল।

শুক্রবার দুবাইয়ে উত্থান-পতনের নাটকীয়তায় ঠাসা এশিয়া কাপের স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে একেবারে শেষ বলে ভারতের কাছে তিন উইকেটে হার মানতে হল বাংলাদেশকে। শিরোপা নামের সোণার হরিণটা অধরাই রয়ে গেল মাশরাফিদের। অথচ শুরুটা কী স্বপ্নমাখাই না ছিল। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ওপেনিংয়ে নামা মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে লিটন দাসের ১২০ রানের দুরন্ত উদ্বোধনী জুটি। লিটনের অনবদ্য সেঞ্চুরি।

এরপর ফাইনালের চাপে চিড়েচ্যাপটা হয়ে মিডলঅর্ডারের অভাবনীয় ব্যর্থতায় ১০২ রানে ১০ উইকেট হারিয়ে ২২২ রানে গুটিয়ে যাওয়া। ছোট্ট সেই পুঁজি নিয়েই বোলারদের বীরোচিত লড়াই। ১৬০ রানে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়ে ভারতকে কাঁপিয়ে দেয়া। রুবেল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমানের আগুনে বোলিংয়ে শেষ ওভার পর্যন্ত পেন্ডুলামের মতো দুলছিল ম্যাচ। মাহমুদউল্লাহর করা শেষ ওভারে ভারতের দরকার ছিল ছয় রান। শেষ বলে এক। লেগবাই সূত্রে আসা জয়সূচক রানটি লাল-সবুজের হৃদয় ভেঙে ভারতকে এনে দিল এশিয়া কাপের সপ্তম শিরোপা। গত আসরেও ফাইনালে ভারতের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ।

এমন দুর্দান্ত লড়াই করে শূন্য হাতে ফেরাটা ভীষণ কষ্টের। আক্ষেপটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বিতর্কিত আম্পায়ারিং। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে বাতিঘর ছিল লিটন দাসের ১২১ রানের অসাধারণ ইনিংসটি। তৃতীয় আম্পায়ার রড টাকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বলি না হলে ইনিংসটি আরও দীর্ঘ হতে পারত। ক্রিজে পা থাকার পরও বিস্ময়করভাবে স্টাম্পিং হয়ে ফিরতে হয় লিটনকে। ভারতের বিপক্ষে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও এমন বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়ের বলি হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে।

মেলবোর্নের সেই দুঃস্মৃতিই কাল ফিরে এল দুবাইয়ে। লিটন কাল আরেকটু সময় উইকেটে থাকলে বাংলাদেশের সংগ্রহ নিঃসন্দেহে আরও স্ফীত হতো। সে ক্ষেত্রে ঘুচে যেতে পারত ফাইনালের দুঃখ। ভারতের সঙ্গে খেলা হলেই যেন বাংলাদেশের আরেক অদৃশ্য প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে আম্পায়ার। রুবেল-মোস্তাফিজদের বাউন্সার, কাটারের সাধ্য নেই সেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার।

তবে শুধু বিতর্কিত আম্পায়ারিংই বাংলাদেশের হারের একমাত্র কারণ নয়। মিডল অর্ডারের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ের দায়ই বরং বেশি। তবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে বোলাররা নিজেদের উজাড় করেই দিয়েছিলেন কাল। বিপজ্জনক শিখর ধাওয়ানকে (১৫) ঝড় তোলার আগেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নাজমুল ইসলাম অপু। আরেক ডেঞ্জারম্যান রোহিত শর্মাকে ৪৮ রানে থামিয়ে দেন রুবেল। দিনেশ কার্তিক (৩৭) ও এমএস ধোনি (৩৬) উইকেটে থিতু হয়েও ফিফটির আগেই সাঝঘরের পথ ধরেন। কার্তিককে ফেরান মাহমুদউল্লাহ, ধোনিকে মোস্তাফিজ।

ধোনির বিদায়ের পরে রবীন্দ্র জাদেজা (২৩) ও ভুবনেশ্বর কুমার (২১) ম্যাচ যখন প্রায় বের করে নিয়েছিলেন তখনই ফের বাংলাদেশের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। দুই রানের ব্যবধানে তাদের বিদায়ের পর প্রবল চাপে পড়ে যায় ভারত। কিন্তু চোট সঙ্গী করেই ঠাণ্ডা মাথায় কুলদীপ যাদবকে নিয়ে শেষ বলে ভারতকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন কেদার যাদব (২৩*)। দুর্দান্ত বোলিংয়ে রুবেল ও মোস্তাফিজ নিয়েছেন দুটি করে উইকেট।

রুবেল ১০ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ২৬ রান আর মোস্তাফিজ ৩৮ রান। অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজা ৩৫ রানে নিয়েছেন এক উইকেট। তিন পেসারের বুক চেতানো লড়াইয়ের পরও শেষ দৃশ্যে সেই কান্নার ছবি। এশিয়া কাপের শেষ চার আসরে তিনবার ফাইনালে খেলে তিনবারই শূন্য হাতে ফিরতে হল বাংলাদেশকে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ছয়টি ফাইনালের প্রতিটিতেই হার। যার শুরুটা হয়েছিল ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে দুই রানের সেই অশ্রুভেজা হার দিয়ে।

এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের অসহনীয় কন্ডিশনে শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বড় দুই ভরসা তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানকে ছাড়াই দল ফাইনালে উঠলেও শেষ যুদ্ধে মানসিক বাধার দেয়ালটা গুঁড়িয়ে দিতে পারলেন না মাশরাফিরা। তবে গোটা আসরে বাংলাদেশের লড়াকু পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। ফাইনালেও উন্নতির ছাপ রাখতে পেরেছে টাইগাররা। দল হারলেও ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির সুবাদে লিটন হয়েছেন ম্যাচসেরা।

ওপেনিং জুটির টানা ব্যর্থতায় নিরুপায় হয়ে ফাইনালের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে লিটন দাসের নতুন সঙ্গী হিসেবে মেহেদী হাসান মিরাজকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে বড় ধরনের জুয়া খেলেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। সেটা ক্লিক করে গেল দারুণভাবে। প্রায় দুই বছর ও ২৬ ম্যাচ পর ওয়ানডেতে শতরানের উদ্বোধনী জুটি পেল বাংলাদেশ। সব সংস্করণ মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আরাধ্য প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেলেন লিটন। তবু গল্পটা সেই আক্ষেপের। ১২০ রানের উদ্বোধনী জুটি ও লিটনের অনবদ্য সেঞ্চুরির (১২১) পরও শুক্রবার দুবাইয়ে ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ফাইনালে আড়াইশ’ করতে পারল না বাংলাদেশ।

স্বপ্নমাখা শুরুর পরও মিডল অর্ডারের সীমাহীন ব্যর্থতায় ৪৮.৩ ওভারে ২২২ রানে গুটিয়ে গেছে বাংলাদেশ। দুই ওপেনার লিটন ও মিরাজ ছাড়া দুই অঙ্ক ছুঁতে পেরেছেন শুধু সাতে নামা সৌম্য সরকার। বাকিরা ছিলেন ক্ষণিকের অতিথি। এমন দারুণ শুরুর পরও আড়াইশ’র নিচে গুটিয়ে যাওয়ায় দায় অবশ্যই ব্যাটসম্যানদের। তবে তাতে বিতর্কিত আম্পায়ারিংয়েরও একটা ভূমিকা ছিল। ১২ চার ও দুই ছক্কায় ১১৭ বলে লিটনের ক্যারিয়ারসেরা ১২১ রানের দুর্দান্ত ইনিংসটি আরও দীর্ঘ হতে পারত।

সেটি হয়নি থার্ড আম্পায়ার রড টাকারের বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে। কুলদীপ যাদবের গুগলি পা বাড়িয়ে খেলতে চেয়েছিলেন লিটন। বলে-ব্যাটে করতে না পারায় পেছনের পা বেরিয়ে আসে, সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত বেল ফেলে দেন উইকেটকিপার এমএস ধোনি। টিভি রিপ্লেতে দেখা গেছে- ঠিক ওই মুহূর্তে লিটনের পা ক্রিজের মধ্যেই ছিল। তবুও আম্পায়ার জানিয়ে দেন লিটন আউট। অবশ্য স্টাম্পিংয়ের শিকার হয়ে লিটন ফেরার আগেই পথ হারিয়েছিল বাংলাদেশ। বিনা উইকেটে ১২০ থেকে ১৫১ রানেই নেই পাঁচ উইকেট। সেই ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেনি দল। ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ তিন উইকেট নেন কুলদীপ যাদব এবং দুটি কেদার যাদব।

এশিয়া কাপে উদ্বোধনী জুটির হতাশা কেটে গেল ফাইনালে। পুরো টুর্নামেন্টে স্বস্তি দেয়া মিডল অর্ডারই ভাসালেন হতাশায়। জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো মিরাজকে ওপেনিংয়ে নামিয়ে চমক। মিরাজও দেখিয়েছেন চাপের ম্যাচে কীভাবে প্রতিপক্ষের বাধা হয়ে দাঁড়ানো যায়। এশিয়া কাপের এবারের আসরে প্রথমবারের মতো পাওয়ার প্লেতে কোনো উইকেট হারায়নি বাংলাদেশ। লিটন ও মিরাজের ব্যাটে ফাইনালে ভালো শুরু পায় বাংলাদেশও। ১০ ওভার শেষে দল তুলে ফেলে বিনা উইকেটে ৬৫। পাওয়ার প্লেতে ঝড় তোলেন লিটন। এ সময়ে পাঁচ চারের সঙ্গে মারেন দুটি ছক্কা।

প্রথমবার ওপেনিংয়ে নামা মিরাজের ব্যাটিংয়ে কোনো চাপের ছাপই ছিল না। আগের ম্যাচেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪১ রান করে ছন্দে ফেরার আভাস দিয়ে রেখেছিলেন লিটন। ভারতের বিপক্ষে বিস্ফোরক ইনিংসে পুরো এশিয়া কাপের ব্যর্থতার জ্বালা মেটালেন। মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে সহজেই শতরানের জুটি গড়ে ফেলে লিটন। দল ও জুটির রান তিন অঙ্কে নিতে দুই ব্যাটসম্যান খেলেন ১০৭ বল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের পর এটাই বাংলাদেশের প্রথম শতরানের জুটি। ভারতের বিপক্ষে ২০১৫ সালে তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার উদ্বোধনী জুটিতে করেছিলেন ১০২ রান।

লিটনের সঙ্গে ১২০ রানের রেকর্ড গড়া জুটি উপহার দিয়ে ফেরেন মিরাজ। তাকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন কেদার যাদব। অফ-স্পিনারের বল জায়গা করে নিয়ে কাভার পয়েন্টের ওপর দিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন মিরাজ। ঠিকমতো পারেননি। সহজ ক্যাচ যায় ফিল্ডার অম্বাতি রাইডুর হাতে। ৫৯ বলে তিন চারে ৩২ রানে ফেরেন। তার বিদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশেরও পেছনে ছোটা শুরু হয়।

তার বিদায়ের পর আট রানের ব্যবধানে ফেরেন ইমরুল কায়েস। বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের স্বস্তি মুশফিকুর রহিম কেদার যাদবকে উড়িয়ে মারতে গিয়েই বাউন্ডারি লাইনে ধরা পড়েন। এরপর দুই রানের ব্যবধানে রানআউট হয়ে ফেরেন মোহাম্মদ মিঠুন। বাংলাদেশের আস্থার আরেক নাম মাহমুদউল্লাহও দ্রুত বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। তখন বাংলাদেশের স্কোর ১৫১/৫। ৩১ রানের ব্যবধানেই সাজঘরে ফেরেন পাঁচ ব্যাটসম্যান। শুরুতে চাপে পড়া ভারত তখন বাংলাদেশকে চাপ ফিরিয়ে দিতে শুরু করে।

লিটনের ভালো শুরু প্রায়ই শেষ হয় বাজে শটে। জাদেজাকে চার হাঁকিয়ে পঞ্চাশ ছোঁয়ার পর হতে যাচ্ছিল তার আরেকটি মঞ্চায়ন। অফ-স্টাম্পের বাইরের বল স্লগ সুইপ করে তুলে দিয়েছিলেন ক্যাচ। তবে মিডউইকেটে যুজবেন্দ্র চেহেল অনেক উঁচুতে ওঠা বল মুঠোয় নিতে না পারায় বেঁচে যান এই ওপেনার। সে সময় ৫২ রানে ব্যাট করছিলেন লিটন। এরপর প্রায় নিখুঁত ব্যাটিং করেছেন। সেঞ্চুরির পর এগিয়ে যাচ্ছিলেন আরও বড় স্কোরের দিকে। তখন আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বলি হন তিনি। লিটনের পর সৌম্য কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আভাস দিলেও তিনিও রানআউট হন ম্যাচের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩ করে। বাংলাদেশ থামে ২২২ রানে।

এশিয়া কাপ চ্যাম্পিয়ন ভারত

বাংলাদেশ ২২২/১০, ৪৮.৩ ওভারে

ভারত ২২৩/৭, ৫০ ওভারে

ফল : ভারত ৩ উইকেটে জয়ী

ঘটনাপ্রবাহ : এশিয়া কাপ ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×