একটি যুগসন্ধির পত্রিকা যুগান্তর

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

‘যুগান্তর’ কথাটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় স্কুল-পাঠ্যপুস্তকে কবি নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠ করে। তার একটি কবিতার প্রথম লাইন ছিল ‘দেখবো এবার জগৎটাকে/কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’ নজরুলের কবিতায় যুগান্তর কথাটির আরও উল্লেখ আছে। তার একটি কবিতায় (গান) আছে, ‘বল ভাই মাভৈ মাভৈ/নবযুগ ওই এলো ওই/এলো ওই রক্ত যুগান্তররে।’ এখানেই যুগান্তর নামের সঙ্গে আমার পরিচয় শেষ নয়।

গত শতকের ত্রিশের দশকে ভারতে ব্রিটিশ রাজত্ব উচ্ছেদের জন্য দুটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী দল গড়ে ওঠে। দল দুটির একটির নাম ‘অনুশীলন পার্টি’, অন্যটির নাম ‘যুগান্তর পার্টি’, এই যুগান্তর পার্টি তখনকার অবিভক্ত বাংলার পূর্বাংশে (বর্তমান বাংলাদেশে) ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। অনুশীলন ও যুগান্তর পার্টির লোকজনদের টেরোরিস্ট আখ্যা দেয়া হলেও পরে তারা পেট্রিয়ট বলে পরিচিত হয়েছেন।

ত্রিশের এই সন্ত্রাসীরা বর্তমানের জিহাদিস্ট বা মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের মতো নিরীহ মানুষ হত্যা করতেন না। তারা বেছে বেছে ব্রিটিশ রাজকর্মচারী এবং তাদের দেশীয় দালালদের হত্যা করতেন। সরকারি কোষাগার লুট করতেন। ভারতে শক্তিশালী কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে ওঠার পর কারামুক্ত অধিকাংশ টেরোরিস্ট নেতা (কমরেড মুজাফ্ফর আহমদসহ) কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। মুজাফ্ফর আহমদ তো কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

যুগান্তর নামটির কথায় ফিরে আসি। শৈশবে (সেই ব্রিটিশ আমলে) আমাদের গ্রামে দেখেছি, অনেকের বাড়িতেই যুগান্তর নামে একটি দৈনিক পত্রিকা আসত। তখন কলকাতায় প্রধান তিনটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা বলতে আনন্দবাজার, যুগান্তর এবং আজাদ। যুগান্তরের প্রচলন ছিল পূর্ব বাংলায় বেশি। তার কারণ, যুগান্তরে পূর্ব বাংলার খবরাখবর একটু বেশি থাকত। তাছাড়া যুগান্তরের তৎকালীন সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বী ও অসাম্প্রদায়িক মনের সাংবাদিক। তখন আনন্দবাজার পত্রিকায় ছিল প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতা। অন্যদিকে আজাদ পত্রিকা তো প্রকাশ্যেই ছিল মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমর্থক। এ ক্ষেত্রে যুগান্তরই ছিল সম্পূর্ণভাবে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাগজ। ফলে তার বহু মুসলমান পাঠক ছিল। লিখতে ভুলে গেছি, তখন দৈনিক বসুমতী নামেও একটি প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক ছিল কলকাতায়। কিন্তু পত্রিকাটি ছিল হিন্দু মহাসভাপন্থী।

কলকাতার ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে সেই গত শতকের ষাটের ও সত্তরের দশকে। বাংলাদেশে তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় দফার আন্দোলনে দেশ উত্তাল। পাকিস্তান সরকার কলকাতার কোনো কাগজ, বইপত্র তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে আসতে দিতেন না। তথাপি যুগান্তর চোরা-গোপ্তা পথে আসত। তাতে ছয় দফা আন্দোলনের পুরো খবর থাকত। থাকত সমর্থনও। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে তখন কলকাতার অনেক প্রধান কাগজেই তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু যুগান্তর প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিশাল ছবি ছেপে ব্যানার হেডিং দিয়েছিল, ‘পূর্বের আকাশে নতুন সূর্যোদয়।’

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কলকাতার প্রতিষ্ঠিত বাংলা ও ইংরেজি দৈনিকগুলো প্রথমে এই যুদ্ধকে সমর্থন দিতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখায়। যুগান্তর সর্বপ্রথম এই সমর্থন দিতে এগিয়ে আসে। যুগান্তরের এই সময়ের বার্তা সম্পাদক (কার্যত নির্বাহী সম্পাদক) ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন বসু। তার বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে। যুগান্তরের আরেক সাংবাদিক ছিলেন ঢাকার সাভার এলাকার পরেশ সাহা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে তারা একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে আমি যখন কলকাতায় গিয়ে পৌঁছি, তখন প্রথমে যুগান্তরেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিয়মিত কলাম লেখা শুরু করি।

দুই.

কলকাতার যুগান্তরের কথা থাক, এবার ঢাকার যুগান্তরের কথায় আসি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কিছুকাল পর কলকাতার যুগান্তর নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়। অগ্রসরমান বাংলা সাংবাদিকতায় যুগান্তরের মতো কাগজের অনুপস্থিতিতে দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু আমার তো কিছু করার ছিল না। এর দীর্ঘকাল পর কলকাতার যুগান্তরের স্মৃতি যখন মনের অতলে তলিয়ে গেছে, তখন একদিন দেখি, এনায়েতুল্লা খান সম্পাদিত ঢাকার ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন। ঢাকা থেকে ‘যুগান্তর’ নামে একটি বাংলা দৈনিক বের হবে। বহুকাল পর যুগান্তর নামটি শুনে মনের আবেগ সম্ভরণ করতে পারেনি। ভাবলাম, এই কাগজের কর্তৃপক্ষ যদি চান, তাহলে একটি নিয়মিত কলাম লিখব। কিন্তু কারা এই কাগজের কর্তৃপক্ষ এবং কাগজের পলিসি কি হবে তা জানি না তখনও।

আমাকে বেশি দিন ভাবনা চিন্তা করতে হল না। দু’দিন না যেতেই ঢাকা থেকে টেলিফোন এলো। করেছেন আমার পরিচিত অনুজ প্রতিম সাংবাদিক

গোলাম সারওয়ার। দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক হিসেবে তার যথেষ্ট নাম ডাক ছিল। বললেন, তারই সম্পাদনায় ঢাকা থেকে দৈনিক যুগান্তর প্রকাশ হবে। আমাকে নিয়মিত কলাম লিখতেই হবে। বললাম, কাগজের পলিসি কি হবে? সারওয়ার বললেন, অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষের পত্রিকা। আপনি স্বাধীনভাবে লিখবেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম।

কাগজটির মালিক নুরুল ইসলাম একজন শিল্পপতি। তার কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নেই। তা যে সত্যই নেই, তার প্রমাণ পরে পেয়েছি। আমি যুগান্তরে আমার তৃতীয়মত কলামটি লেখার সিদ্ধান্ত নিই। এই তৃতীয়মত নামেই প্রথম স্বনামে কলাম লেখা শুরু করি। মাঝখানে তা বন্ধ ছিল। যুগান্তরে তার পুনঃপ্রকাশ ঘটে। যুগান্তর বের হতেই বিরাট পাঠক প্রিয়তা অর্জন করে। প্রতিষ্ঠিত দৈনিকগুলোর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যুগান্তর আঠারো বছর পার হয়ে এখন উনিশ বছরে পা দিয়েছে। কিন্তু তার এই প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা এখনও ধরে রেখেছে।

কলকাতার যুগান্তর পত্রিকার একাধিকবার সম্পাদক বদল হয়েছে। কিন্তু কাগজটির নীতি বদলায়নি। কলকাতার যুগান্তরের সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার। তিনি চলে যাওয়ার পর আসেন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, তারপর আরও কেউ কেউ। কিন্তু যুগান্তর নীতি ও চরিত্র বদলায়নি। এবং তার জোরেই বহুকাল টিকে রয়েছে। ঢাকার যুগান্তর সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে। বহু স্বনামধন্য সাংবাদিক পত্রিকাটির সম্পাদক হয়ে এসেছেন। আবার চলে গেছেন। যেমন গোলাম সারওয়ার, এবিএম মূসা, আবেদ খান। তারা চলে যাওয়ার পরেও সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্যের জোরে যুগান্তর টিকে আছে। শুধু টিকে থাকা নয়, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত এবং প্রথম সারির কাগজগুলোর মধ্যে যুগান্তর একটি।

আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ এবং যুগান্তর পরিবারেরই একজন সালমা ইসলাম যখন পত্রিকাটির সম্পাদক, তখন বিস্মিত হয়ে দেখেছি, একজন আইনজীবী, পার্লামেন্ট সদস্য এবং রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও একটি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনাতে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নাম সর্বস্ব সম্পাদক ছিলেন না। আমি কয়েক বছর আগে যতবারই লন্ডন থেকে ঢাকায় গেছি, যুগান্তর অফিসে আমন্ত্রণ পেয়েছি। দেখেছি সালমা ইসলাম সম্পাদকের কক্ষে কর্তব্যরত। স্টাফদের নিয়ে বৈঠক করছেন। লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করছেন। পত্রিকাটির আরও মানোন্নত করা নিয়ে সহযোগী সাংবাদিকদের উপদেশ দিচ্ছেন।

যুগান্তরের বর্তমান সম্পাদক সাইফুল আলম নবপ্রজন্মের সম্পাদক। কিন্তু যুগান্তরের সাংবাদিকতার মান তিনি শুধু ধরে রাখেননি, উন্নত করেছেন। যুগান্তরের ফিচার, উপসম্পাদকীয় পৃষ্ঠার লেখাগুলো উন্নতমানের। আমি বিদেশে থাকলেও আমার পরবর্তী প্রজন্মের শক্তিশালী কলামিস্টদের অনেকের লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি যুগান্তরের কল্যাণে। তাদের মধ্যে আছেন মিজানুর রহমান খান, সোহরাব হাসান এবং আরও অনেকে।

এরা এখন যুগান্তরে নেই। কিন্তু পুরনো ও নতুন প্রজন্মের অনেক শক্তিশালী সাংবাদিক আছেন যুগান্তরে। এককালের শীর্ষ বাংলা সাপ্তাহিক (অধুনা লুপ্ত) যায়যায়দিনে একাধিক দুর্দান্ত কলামিস্টের আবির্ভাব হয়। যেমন বিভুরঞ্জন সরকার, মাহবুব কামাল, স্বদেশ রায়। এই মাহবুব কামাল এখন যুগান্তরে। বিভুরঞ্জনও যুগান্তরের একজন কলামিস্ট। আমার প্রজন্মের রফিকুল হক (দাদুভাই) এখন যুগান্তরে। ষাটের দশকে তার সঙ্গে বিভিন্ন কাগজে একসঙ্গে কাজ করেছি। এছাড়া আছেন আরও অনেকে। যাদের নাম লিখতে গেলে নিবন্ধনটি অনেক বড় হয়ে যাবে।

যুগান্তরের মালিক নুরুল ইসলাম একজন শিল্পপতি। রাজনীতির ধার ধারেন না। নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় শিল্প-সাম্রাজ্য ও মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তথাপি তাকেও বিএনপি আমলে রাজনীতির দায়ে নির্যাতিত হতে হয়েছে। বিএনপি থেকে বেরিয়ে ড. বদরুদ্দৌজা চৌধুরী তখন বিকল্প ধারা নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এই উদ্যোগের পেছনে শিল্পপতি নুরুল ইসলামের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা আছে এই সন্দেহে বিএনপি সরকার তাকে নানা মিথ্যা ও সাজানো মামলায় জড়িয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে। এই নির্যাতন দ্বারা শিল্পপতির মনোবল ভাঙা যায়নি তার মিডিয়া গোষ্ঠীরও নীতি বিচ্যুতি ঘটানো যায়নি। যুগান্তর তার প্রতিষ্ঠার দিন থেকে যে নীতি গ্রহণ করেছে, এখনও তা অনুসরণ করছে। সবচেয়ে বড় কথা নিরপেক্ষতার কোনো মুখোশ নেই যুগান্তরের। নিরপেক্ষতার মুখোশের আড়ালে যে দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কোনো চক্রান্তের রাজনীতির সহায়ক মিডিয়া নয়, সরকারের ভালো কাজের যে প্রশংসা করে, মন্দ কাজের সমালোচনা করে। পাঠক-ঠকানোর প্রবণতা তার নেই।

যুগান্তরে আমার কলামে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমার আছে। আমি ঢাকার বহু দৈনিকে কলাম লেখি। তারা আমাকে লেখার স্বাধীনতা দিয়েছেন। যুগান্তরে এই স্বাধীনতা একটু বেশি খাটিয়েছি, সে কথা অপকটে স্বীকার করব। কয়েক বছর আগে, তখন আমি তথাকথিত নিরপেক্ষ দৈনিকটিতেও কলাম লিখি। একটি লেখায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সাহাবুদ্দীন লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা তৎপরতার কথা লিখেছিলাম। নিরপেক্ষ দৈনিকটি তা ছাপাতে অসম্মতি জানায়। যুগান্তর সেটি প্রকাশ করেছিল।

আরেকবার যুগান্তরের তখনকার সম্পাদকীয় বিভাগের এক সদস্য (বর্তমানে অন্য পত্রিকায় গেছেন) সাবেক প্রধান বিচারপতি (এখন প্রয়াত) মোস্তফা কামালের একটি লেখা যেচে এনে যুগান্তরে প্রকাশ করেছিলেন। তাতে তিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ঘাতক গোলাম আযমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। (যে তিন বিচারপতি এই নাগরিকত্ব দানের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, বিচারপতি মোস্তফা কামাল তার অন্যতম সদস্য ছিলেন)।

বিচারপতি মোস্তফা কামাল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ছিলেন। যদিও তার ও আমার রাজনৈতিক মত ও পথ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। আইনের যুক্তিতর্ক দেখাতে পারদর্শী। তথাপি তার লেখায় গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দানের যুক্তিতর্ক খেলো মনে হল। আমি যুগান্তর সম্পাদককে জানালাম, আমি এই লেখাটির প্রতিবাদ জানাতে চাই। তিনি বললেন, অবশ্যই আপনার প্রতিবাদ করার অধিকার আছে।

আমি তার পরদিনই বিচারপতির লেখার প্রতিবাদ জানাই আমার তৃতীয় মত কলামে। আমি তার যুক্তিগুলো খণ্ডন করি এবং নাগরিকত্ব জন্মগত অধিকার হলেও তা যে দেশদ্রোহিতার দায়ে বাতিল করা যায় ব্রিটেন ও ইউরোপের ইতিহাস থেকে তার নজির তুলে ধরি। যুগান্তরে লেখাটি ছাপা হয়। বিচারপতি মোস্তফা কামাল আমার লেখার জবাবে আরেকটি লেখা লিখেছিলেন। তা আমার যুক্তিতর্কের জবাব নয়। তিনি এই বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন যে, গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দানের পক্ষে যে রায় দেয়া হয়, তাতে সম্মতি দিয়েছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় প্রগতিশীল বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান শেলীও। সুতরাং একা বিচারপতি মোস্তফা কামালকে দায়ী করছি কেন? আমি বিদেশে থাকি। গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দানের ব্যাপারে বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার কথা আমি জানতাম না, জেনে হতবাক হয়েছিলাম।

তিন.

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় ‘যুগান্তরের’ আরও একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে, সে কথাটি উল্লেখ করে আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এক নতুন মোড় নেয়। দেশে পলিটিক্যাল জার্নালিজমের বদলে কমার্শিয়াল জার্নালিজম প্রাধান্য বিস্তার ঘটায়। বেসরকারি শিল্পোদ্যোগ বাড়ায় সংবাদপত্রের ওপর সরকারি বিজ্ঞাপনের প্রাধান্য ও প্রভুত্ব হ্রাস পায়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিসর বাড়ে।

এই নতুন সুযোগ-সুবিধার ফলে ঢাকায় নব্য পুঁজিপতিদের মালিকানায় দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। তাদের মধ্যে একটি শিল্পপতি গোষ্ঠীর মিডিয়া মনোপলি প্রতিষ্ঠার এবং এই মনোপলির সাহায্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় হস্তক্ষেপ এবং নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের স্বার্থ-বিরোধী দল ও জোটকে ক্ষমতায় বসানোর চক্রান্তে সহযোগী হয়।

এভাবে বিলাতের রূপার্ট মারডোকের মতো বাংলাদেশেও একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিরপেক্ষতার আচরণে মিডিয়া মোগল থেকে যখন দেশের রাজনীতিতে অশুভ প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চলেছিল, তখন দৈনিক যুগান্তরের আত্মপ্রকাশ। ফলে বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পে অশুভ মনোপলি প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং যুগান্তর প্রকাশ হওয়ার পর আরও একাধিক ভালো বাংলা দৈনিক প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্পে মনোপলি প্রতিষ্ঠা এবং তাকে অশুভ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের একটি চক্রান্ত অন্তত এভাবে ব্যর্থ হয়ে যায়। যুগান্তর হয়তো নিজের অজান্তেই এই ব্যাপারে একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

যুগান্তর উনিশ বছর বয়সে পা দিয়েছে। সাধারণত : ১৮ বছর বয়সে মানুষ সাবালক হয়। সেদিক থেকে একটি দৈনিক কাগজ হিসেবে যুগান্তরও সাবালকত্বে পৌঁছেছে বলা চলে। তার সাংবাদিকতার মধ্যে এই সাবালকত্বের লক্ষণগুলো এখন স্পষ্ট। উনিশ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে যুগান্তরের কর্তৃপক্ষ, সাংবাদিক ও কর্মীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। প্রার্থনা করি যুগান্তর অমিতায়ু হোক। আমি সাংবাদিক হিসেবে এখনও যে যুগান্তর পরিবারের একজন এজন্য গৌরব বোধ করি। ‘যুগান্তর যুগ যুগ জিও।’

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ঘটনাপ্রবাহ : যুগান্তর বর্ষপূর্তি-১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter