সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা

  ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

উন্নয়নকে সুশাসন ও গণতন্ত্র থেকে আলাদা করে দেখা ঠিক নয়। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উদাহরণ দেয়া হয়, গণতন্ত্র ছাড়াও বিশ্বের কিছু দেশে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু সে উন্নয়ন টেকসই ও সমতাভিত্তিক নয়।

সেখানে শুধু বস্তুনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও ভোগবাদের প্রসার হয়েছে। মূল্যবোধ, ব্যক্তি স্বাধীনতা এগুলোর প্রাধান্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ওই পথে চলুক, আমরা সেটি চাই না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক স্বাধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি। বাংলাদেশের জন্য আন্দোলনটা বহু আগে থেকে শুরু হয়েছিল, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান।

বিশেষ করে ছয় দফা আন্দোলনের যে ভিত্তি ছিল, সেটা ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অন্যায় আচরণ এবং এখানকার লোকজনকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা থেকে মুক্ত করা। অর্থনীতি মুক্তি অর্জন করার জন্য দরকার ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম। বিভিন্ন দোলাচল, অনিশ্চয়তা ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা এ পর্যায়ে এসেছি।

আমাদের দেশে আসলে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নটা শুরু হয়েছে ১৯৯০ থেকে। প্রথম গণতান্ত্রিক সরকার শুরু হল এবং ১৯৯০-র পর ধারাবাহিকভাবে ভালোভাবেই অর্জনটা ছিল। তারপর আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, গার্মেন্ট এবং অন্যান্য সেক্টরে উত্তরোত্তর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এ কন্ট্রিবিউশনটা বিশেষ কোনো একটা সরকারের সময়ে হয়নি।

ধারাবাহিকভাবে সব সরকারের সময় হয়েছে। তাই এখানে কৃতিত্ব কিন্তু সবার। একক কোনো সরকার এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে না। আবার ব্যর্থতার ব্যাপারেও এককভাবে কাউকে দোষ দিতে পারবে না। এদিকে আমি যাচ্ছি না।

আমি এখন আমাদের যে মূল চ্যালেঞ্জগুলো এবং সেখানে আমাদের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, রাজনৈতিক চিন্তাধারার কিছু কথা বলব। মানে রাজনৈতিক যে বিশ্লেষণ বা অর্থনীতির যে বিশ্লেষণ, সে বিষয়ে আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলব।

প্রথমত, চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের অর্থনীতির দিক দিয়ে, যেগুলো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। প্রথম হল আমরা যে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, সেটি এখন কিছুটা মন্থর, আবার বিনিয়োগও মন্থর হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, দেখছি যে সরকারের যে নীতিগুলো নেয়া হয়েছে, সেগুলোর ধারাবাহিকতা বা নীতিগুলো যে খুব সুষ্ঠু নীতি হয়েছে সেটাও নয়। আবার নীতিগুলো বাস্তবায়ন যারা করবে, আমলা এবং সরকারের যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ আছে তাদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবহুল। সবশেষে সার্বিকভাবে যে উন্নয়নগুলো হয়েছে, বিশেষ করে সূচকের দিকটি বেড়েছে, প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে গড় হিসেবে।

কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে কিনা। যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল কিন্তু বহুলাংশে সাধারণ মানুষ পায় না। কারণ এখন আমরা দেখছি যে, দিন দিন কিন্তু ধনী-দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্তদের ফারাক বাড়ছে। বঞ্চিতের সংখ্যা বাড়ছে। তবে আপেক্ষিকভাবে কেউ বলতে পারে যে, আগে তো কেউ শার্ট পরত না, প্যান্ট পরতে পারত না, মোবাইল সবার কাছে আছে। সেটা হল আপেক্ষিকভাবে।

একজন রিকশাওয়ালার মোবাইল আছে; কিন্তু যে আট থেকে ১০ বছর আগে রিকশায় চড়তে পারত না, তারা এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। তাই ফারাকটা কী। একই ধরনের লোক একই কর্মদক্ষতা; কিন্তু সে চলে যাচ্ছে কোথায়। বিভিন্ন ফাঁকফোকরে, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে, এমনকি দুর্নীতির মাধ্যমে। তাই এই অসম উন্নয়নটা অ্যাক্সেপ্টেবল নয়।

এ চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ব্যাপার। এজন্য আমরা দেখছি যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা না থাকলেও অশ্চিয়তা আছে। কী হবে না হবে। কী ধরনের সরকার হবে। আর এখন যে রাজনৈতিক অবস্থাটা আছে বা যে কোনো সময় রাজনৈতিক যে গভর্নমেন্ট আসে, সেখানে আমরা কিন্তু গুড গভর্নেন্স দেখতে পাচ্ছি না। সুশাসনের অভাব আছে।

সুশাসনের অভাব মানে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতা নেই। কেউ যদি অন্যায় করে তার কোনো শাস্তি হয় না। সব থেকে মারাত্মক হল রুল অব ল’ নেই। আইন আছে কিন্তু এটির বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। রাজনীতির মেজর জিনিসটা যে খালি ভোট দিলে হয়ে গেল তা নয়। সুশাসন ছাড়া কিন্তু কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

অনেকে বলে, কোনো কোনো দেশে তো মার্শাল ল’ছিল। কোনো কোনো দেশে তো ডিক্টেটর ছিল। উন্নয়ন হয়েছে। গণতন্ত্র ছাড়া। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়নটা হয় সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

সেখানে ১০ থেকে ২০ বছর পর দেখা গেছে, বেশিরভাগ লোকই দরিদ্র। তাই ওই পথে যাওয়া যাবে না। তারপর রেগুলেটরি বডি যেগুলো আছে, যেমন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। মানুষের বিবেচনায় তো কাজ করে না, যেভাবে গ্যাস-পেট্রলের দাম বাড়ে। বিটিআরসি নানারকমের নীতি দিচ্ছে।

এগুলোর কোনো কনটিনিউটি থাকে না। সরকার চেঞ্জ হলে অন্য সরকার এসে পুরো সিস্টেমই পরিবর্তন করে দেয়। যদিও অনেক ভালো নীতি অনেক সময় নেয়। মোটামুটি যদি ধারাবাহিক থাকে, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেমন ভারতেও কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক নীতিগুলো একেবারে চেঞ্জ হয়ে যায় না। মোদি এসে তো বলেননি যে, আমরা ইন্ডাস্ট্রি করব না। আমরা এক্সপোর্ট করব না।

আমরা ম্যান পাওয়ার বাড়ব না। আমরা আইটি সেক্টরে কাজ করব না। তিনি বলছেন, আমি করব অন্যভাবে। লোকজন কিছু চেঞ্জ হবে। সেটি অন্য কথা। এটি আমেরিকায়ও করে। কিন্তু আমাদের দেশে দুঃখজনকভাবে এগুলো হয় না।

আর ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তো একেবারেই হয়নি। লোকাল গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন বলে কিছুই নেই। ঢাকা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ঢাকা থেকে করার ফলে যেটি হয়, আমাদের প্রত্যেকটি অঞ্চলের লোকজন কীভাবে বেঁচে থাকে, তাদের চাহিদা আমলে নেয়া হয় না। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ তাদের ভূমিকা নগণ্য। এখন আবার অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ সচিবদের বেতন দেবে তাদের আয় থেকে।

সরকার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বেতন দিয়ে দিচ্ছে হাজার কোটি টাকা। আর ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের বেতন দেবেন না, এটি কোনো কথা হল নাকি? ওদের কি ট্যাক্স পাওয়ার আছে? ওদের কি অথরিটি দেয়া হয়েছে? গরিব মানুষদের ওপর আর কত ট্যাক্স চাপাবে? ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে, এক্সপোর্ট বাড়লে ট্যাক্স বাড়ে। ওদের কি এক্সপোর্টের ওপর ট্যাক্স করার ক্ষমতা আছে? বা আয়ের ওপর ট্যাক্স করার ক্ষমতা আছে? তাই সার্বিকভাবে আমি বলব, আমাদের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, তা হল গতানুগতিক।

মার্কেট ইকোনমির ওপর, বাজারের ওপর ডিপেন্ড করে আমরা চলব এবং বাজার সবকিছু নির্দিষ্ট করবে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই ঠিক করবে। সেভাবে যাবে। আর অর্থনীতিবিদরাও তখন চিন্তা-ভাবনা করছে যে, ঠিক আছে, বাজারের মধ্যে থেকেই আমরা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বিবেচনা করব। তার মানে কিছু কিছু জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে একটু মলম দিলাম। কিন্তু পুরো শরীরে যখন নানা সিস্টেমেটিক ডিজিজ হয়।

আমার যদি ইমিউন সিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়। আমার ব্লাড যদি দূষিত হয়। আমার নাকের মধ্যে ওষুধ দিলে, চোখের মধ্যে ওষুধ দিলে কী লাভ হবে। কোনো লাভ হবে না। এখন আমাদের তো হয়েছে সিস্টেমেটিক ডিজিজ। এক জায়গায় তো নয়। এটি সর্বগ্রাসী।

পুরো সিস্টেম নষ্ট হয়ে গেছে। আর সেই সিস্টেম মানে রাজনৈতিক সিস্টেম। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজারগুলো এবং লোকাল লেভেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে সেগুলো। স্কুলগুলো এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটিগুলোকেও প্রভাবিত করে পলিটিক্যাল মোটিভেশন।

ব্যাংকিং কার্যক্রম হচ্ছে সম্পূর্ণ টেকনিক্যাল, অত্যন্ত প্রফেশনাল একটি বিষয়। এখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকলে কারও পক্ষে সঠিকভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। ব্যাংকের বর্তমান সংকট একটা অশনিসংকেত। এটি যদি ঠিক না করি সংক্রামক ব্যাধির মতো কিন্তু এটি অন্য ক্ষেত্রে চলে যাবে এবং এটি সবাইকে আলটিমেটলি অ্যাটাক করবে।

ভালো জিনিসগুলো খুব আস্তে আস্তে ছড়ায়। খারাপ জিনিস যেমন সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভালো জিনিস কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে না। ব্যাংকিং সেক্টরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখন সার্বিকভাবে ভাবনাটা হচ্ছে, আমরা বাজারের ওপর ডিপেন্ড করি। আমাদের দেশে বিশেষ করে মার্কেট ইকোনমি। বাজার কোনোটাই কিন্তু পারফেক্ট নয়। কম্পিটিশন নেই। যদিও বলে কম্পিটিটিভ।

আমাদের দেশে সবচেয়ে খারাপ হল বাজারটা ম্যানুপুলেট করে মুষ্টিমেয় লোক। ব্যাংকিং সেক্টর বলি, এখানে আরও খারাপ অবস্থা। ব্যাংকের সবাই মিলে ঠিক করে আমানতের হার কমিয়ে দেব। গোষ্ঠী মিলে ঠিক করে সুদের হার এত হবে। বাজার অর্থনীতিতে এ ধরনের কার্যক্রম মোটেও ঠিক নয়। ব্যাংকগুলো আবার তাদের নিজস্ব পছন্দসই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করে।

হঠাৎ করে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যাবে, তাকে ছয় মাস, এক বছর ঘোরাবে। ব্যাংক আবার ঠিকই বড় বড় গ্রুপকে টাকা দেবে। ঋণখেলাপি হলে আবার ঋণ রি-শিডিউল করে আবার নতুন টাকা দেবে।

অন্যদিকে আমরা দেখি যে, বাজারে চাঁদাবাজি হচ্ছে। সেখানে কেন কন্ট্রোল নেই। তারপর সাধারণ মানুষের যে ক্রয়ক্ষমতা। তারা যে বাজারে যাচ্ছে, এক এক বাজারে এক এক দাম। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণের যে কাঠামোটা, এ রকম পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই। আমেরিকায় তো অ্যান্ট্রি ট্রাস্ট ল’ আছে। কেউ যদি একজনকে গ্রাস করতে চায়, কোর্ট থেকে তাকে নির্দেশ দিতে পারে যে নিতে পারবে না।

আমাদের দেশে এগুলোর ধারেকাছেও কিছু নেই। এজন্য দেখা যায়, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক ঋণ নিচ্ছে। একের পর এক গ্রাস করে চলেছে। তারপর কনজুমার্স প্রটেকশন নেই।

পৃথিবীর সব দেশেই কোনোরকম ঝামেলা যদি হয় কোনো পণ্যে, সঙ্গে সঙ্গেই প্রটেকশন নেয়া হয়। আমাদের এখানে ফল খেয়ে বা একটি নকল ওষুধ খেয়ে কেউ মারা গেলে কোনো দোষ হবে না। আমাদের বাজার অর্থনীতিকে আমরা মিসাইন্টারাপ্ট করছি। এটাকে এখন সুসংহত করার সময় এসেছে।

এখন আমাদের সময় এসেছে এ বিষয়গুলো বিবেচনা করার। সরকার গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, গতিশীলতা এনে সুষম ও টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করবে, এটাই এখন বিশেষ প্রয়োজন। সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কর্পোরেশন সার্বিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

কিছু কিছু জায়গায় পাবলিক সেক্টরগুলো, কর্পোরেশনগুলোর মূল্য আছে। যেমন- আমি উদাহরণ দিই বিদ্যুৎ খাত। বিদ্যুৎ খাতে যখন আমাদের ক্রাইসিস হল, তখন ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জের মতো একটা ৫০০, ৬০০ মেগাওয়াটা বিদ্যুৎ প্লান্ট করা যেত সরকারি উদ্যোগে এবং নিয়ন্ত্রণে।

এটি করলে ইন্ডিভিজুয়াল কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট যেটা দেখেছি বেসরকারি খাতে সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল কম হতো, জনগণ স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎ পেত এবং সরকারি খাত থেকে ভর্তুকির খরচ কমে যেত।

পাওয়ার সেক্টরে পাবলিক সেক্টরের ইনভেস্টমেন্ট থাকা উচিত। পৃথিবীর সব দেশেই থাকে। ইনডিপেন্ডেন্ট কিছু কিছু ছোট জায়গায় যেখানে গভর্নমেন্ট একেবারে পৌঁছাতে পারবে না, সেখানে পাওয়ার প্লান্ট কিছু হতে পারে। তবে একেবারে ঢালাওভাবে সব প্রাইভেট সেক্টর করবে না।

মার্কেটিংয়ের বেলায় এগ্রিকালচার মার্কেটিংয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কিন্তু মার্কেট একেবারে ছেড়ে দেয়া হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালিফোর্নিয়া অরেঞ্জ উৎপাদন করে। বিরাট একটা প্রতিষ্ঠান আছে।

ওরা ওটার কন্ট্রোলে থাকে উৎপাদকের স্বার্থ দেখার জন্য। এটা বাজারে ছেড়ে দেয় না। তারপর কানাডায় হুইট বোর্ড আছে। কানাডার ফার্মাররা যে গম উৎপাদন করে, তাদের স্বার্থে এটা কাজ করে এবং ভোক্তাদের স্বার্থও দেখে। আর এখানে কৃষকদের ছেড়ে দেয়া হচ্ছে ফটকাবাজ বা মধ্যস্বত্বভোগী বেপারিদের হাতে। গভর্নমেন্টের তো এখানে কতগুলো রুলস, কতগুলো ফ্যাসিলিটিস থাকবে।

এখানে কিন্তু পাবলিক সেক্টর রুল আছে। এখানে পাবলিক সেক্টরের প্রয়োজন। অনেকে বলে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে হবে। আমি কিন্তু এর পক্ষপাতী নই। বরং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় যদি সততা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসে, তবে প্রতিযোগিতামূলক আবহ সৃষ্টি হবে ব্যাংকিং খাতে। আসলে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী যদি একেবারে নাই থাকে, তখন দেখা যাবে কী অবস্থা। অন্যরা ইচ্ছামতো কাজ করবে।

অতএব রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংক ছেড়ে দিলে কিন্তু চলবে না। একটা-দুইটা-তিনটা কিন্তু রাখতে হবে। যেমন সোনালী ব্যাংক প্রাইমারি স্কুলের টিচারদের বেতন দেয়। এখন প্রাইভেট ব্যাংকে দিলে কী করবে। টিচারদের বেতনও হয়তো পৌঁছাবে না সময়মতো। সরকারের টাকাটা নিয়ে রেখে দেবে।

আরেকজনকে ধার দেবে। তারপর সরকার ট্রেজারি ফি জমা দিল কিন্তু এক-দুই মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকাটা পাঠালই না। অবশ্য কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি আরও স্বচ্ছ এবং জোরদার করা। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে এগুলোকে মুক্ত করতে হবে।

কয়েক বছর আগে ফরাসি অর্থনীতিবিদ নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তার নাম জ্যাঁ তি হল। তার মূল বিষয়বস্তু হল, কী করে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মার্কেটকে লোকজনের হাতে ছেড়ে দেয়া চলবে না। তবে নিয়ন্ত্রণ খুব সোজা কাজ নয়।

আদেশ-নির্দেশে কাজ হবে না। মেকানিজম তৈরি করতে হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স। কেউ যদি এটা না মানে তাহলে তার তখন কী পরিণতি হবে। ফাইন হবে। ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিসের ফলে বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। ইতালি, গ্রিস, স্পেন এখনও এটা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

তাই সেই চিন্তাটা করতে হবে। আমার মনে হয়, আমাদের অর্থনীতিবিদরাও সে চিন্তা করছেন। জ্যাঁ তি হল অন্য লেখকের সঙ্গে আর একটি বই লিখেছেন। ‘ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস’। ব্যাংকগুলো যা ইচ্ছা তাই করবে, লোকজনকে বিপদে ফেলে আমানত নিয়ে ইনভেস্ট করবে। এটার রেগুলেট করা। কেয়ারফুললি করতে হবে। রেগুলেটকারীরা নিয়ন্ত্রণকারী যেন না হয়। বিশেষ করে ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে সেখানে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল। যথাযথভাবে এটাকে দেখতে হবে।

গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে ফুড সিকিউরিটি। গভর্নমেন্ট নিশ্চিত করবে সুশাসন। তার মধ্যে সবাই থাকবে। প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করবে। একটা কথা আছে, বাংলাদেশে এখন সুশাসনের অভাব।

ইনভেস্টমেন্টের আবহ নেই। পরিবেশ নেই। ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রবলেম আছে। আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছি না। যত তাড়াতাড়ি আমরা এগিয়ে যেতে পারতাম, সেটা পারছি না। একেবারেই যে স্থির হয়ে আছি সেটা নয়।

রানওয়েতে কিছুক্ষণ চলার পর প্লেন টেক অফ করে। আমরা কিন্তু টেক অফ স্টেজে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এখনও আমরা রানওয়েতেই আছি। তার মানে চলার গতি কম ও রানওয়েটা দীর্ঘ হচ্ছে। এখনও আমরা টেক অফ করে ওপরে উঠতে পারছি না। টেক অফ হলে আলটিমেটলি গ্রোথ রেটে আমরা ছয়, সাত, আট করে ওপরে উঠে যেতাম। সেটা হলে আমাদের দ্রুত একটা উন্নতি দেখতে পারতাম।

রাজনীতির চর্চা জনগণের স্বার্থে হচ্ছে না। দেশে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব প্রকট। জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত না করার প্রবণতাও বেশি। এতে জনগণের অনেক সমস্যার সমাধান হয় না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল, সমস্যাগুলোর সমাধান না করে বরং তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এর দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা বিদ্যমান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন দুটোই পাশাপাশি চলতে হবে।

আপনি শুধু উন্নয়ন নিশ্চিত করলেন, আর গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে গেলেন- তাহলে কিন্তু স্থায়ী, টেকসই, সমতাভিত্তিক ও অর্থবহ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। নতুন বছরে আমাদের অঙ্গীকার হবে সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এতে দিনে দিনে কেবল সমস্যার পাহাড় জমছে, কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না।

আরেকটা বিষয়, আইনের শাসন আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সব সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter