বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

  মোহাম্মদ আরজু ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দায়িত্ব
বঙ্গোপসাগর

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের বড় বিড়ম্বনা হচ্ছে, এটা একইসঙ্গে পৃথিবীর জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের তীর্থভূমি, আবার জলবায়ু বদলের হুমকির মুখে পৃথিবীর সবচেয়ে অরক্ষিত অঞ্চলগুলোর একটা।

এই সাগরপারের আটটি দেশের উপকূলীয় নিন্মভূমিতে প্রায় চল্লিশ কোটি মানুষের বাস, এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ এলাকাই সাগরপৃষ্ঠের চেয়ে এক থেকে কুড়ি মিটার উচ্চতায়, যেখানে জীবন সরাসরি জলজ প্রতিবেশনির্ভর।

সমুদ্রপৃষ্ঠের বাড়তি উচ্চতা, চরম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার বাড়-বাড়ন্ত ও প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মতো জরুরি সব হুমকির মোকাবিলায় এই অঞ্চলের প্রস্তুতির বেশ ঘাটতি রয়েছে। এসব হুমকির থেকে উপকূলীয় সমাজ-প্রতিবেশের সুরক্ষার জন্য প্রস্তুতির পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, প্রধান তিনটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আজকের এই নিবন্ধ।

এই চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে; উপকূলীয় ও সামুদ্রিক প্রতিবেশ সুরক্ষায় সামাজিক তত্ত্বাবধানের দুরবস্থা, প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষা ও উপকূলীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির কাজে নিয়োজিত জনশক্তির অপর্যাপ্ত সামর্থ্য এবং বঙ্গীয় দেশগুলোর মধ্যে জলজ প্রতিবেশের সুরক্ষার জন্য নাগরিক পর্যায়ে দরকারি আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার অভাব।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার কাজে আঞ্চলিক নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ বাংলাদেশের আছে, এবং এই নেতৃত্ব দেয়ার কাজে অগ্রসর হওয়াটা বাংলাদেশের জন্য নানা দিক থেকে খুব উপকারি একটা ব্যাপারও হবে বটে।

প্রথমত, ভারত মহাসাগর আর হিমালয়ের সংযোগস্থলের এ ভৌগোলিক পরিবেশে বাংলাদেশের যেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, এটা কমবেশি অন্যান্য দেশগুলোর কাজে লাগবে। দ্বিতীয়ত, জলজ প্রতিবেশের সুরক্ষা ও জলবায়ু বদল মোকাবিলায় বাংলাদেশের কোনো বিশেষ সাফল্য এ যাবত না থাকলেও যেটা আছে সেটা হচ্ছে এমন কাজের জন্য অত্যাবশক সমাজভিত্তিক প্রতিষ্ঠান।

বঙ্গোপসাগরপারে বাকি দেশগুলো- মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশে সমাজভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি অনেক মজবুত। এই স্থানীয় সামাজিক-প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে যেভাবে বাংলাদেশে শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদি খাতে সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেছে সাফল্যের সঙ্গে, সেটা জলজীবনের সুরক্ষায়ও করা সম্ভব।

কীভাবে? সেই আলাপটা এখন বাংলাদেশের লোকদের করতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকায় শেকড় গাথা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণেই এই স্থানীয় শক্তির আলাপটা তুলতে পারে না, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি থাকলে পরে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামর্থ্যও এখানে ফলদায়কভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। তৃতীয়ত, বঙ্গীয় এই দেশগুলোর সঙ্গে জলজ প্রতিবেশ সুরক্ষায় আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতায় অগ্রসহ হয়ে দায়িত্ব নেয়ার সবচেয়ে বড় উপকারটি হবে বাংলাদেশের জনসম্পদের সদ্ব্যবহারের সুযোগের ক্ষেত্রে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসনের অব্যাহত সুযোগ বাংলাদেশের জন্য এখন কত জরুরি, সেটা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা খুব ভালো উপলব্ধি করেন প্রতিদিন; সামাজিক নেতৃত্বে প্রতিবেশ সুরক্ষার নতুন মডেলের দায়িত্ব যদি বাংলাদেশ নিতে পারে তবে এই খাতে প্রশিক্ষিত জনসম্পদেও বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকবে।

পোড়ামাটি উন্নয়নের নীতির বদলে জলজ প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানমূলক উন্নয়ন কর্মসূচি যদি দেশের তৃণমূলে বাস্তবায়ন শুরু করা যায়, আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্রে সামাজিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রশিক্ষণের কাজে নিয়োজিত হয়ে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত ও পরিশ্রমী জনসম্পদ এ অঞ্চলের চেহারা পাল্টে দিতে পারে।

এই ক্ষেত্রে দরকারি গবেষণা ও কাজগুলো খোঁজ করে এক জায়গায় নিয়ে আসার একটা প্রচেষ্টা আমরা গত তিন বছরে দেশে করেছি, সেটা করতে গিয়ে দেখেছি যে জলজ প্রতিবেশ সুরক্ষা বা জলবায়ু অভিযোজনের জন্য দরকারি সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যেই ধরনের উন্নয়ন-দর্শন দরকার, তার অভাব খুব প্রকট।

ঢাকায় মেরিন কনজারভেশন ও ব্লু ইকোনমি সিম্পোজিয়াম (Marine Conservation and Blue Economy Simposium) পরপর তিন বছর আয়োজন করার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যেটা বুঝতে পারলাম; কাজ ও গবেষণা কমবেশি হচ্ছে, কিন্তু তার প্রায় সবই গতানুগতিক বিদ্যায়তনিক গবেষণা কিম্বা ইউরোপীয় উপনিবেশি ঘরানার প্রতিবেশ-সুরক্ষার কাজ যেই বর্ণবাদী বয়ানের মধ্যে সাবেক উপনিবেশিত দেশগুলোর মানুষকে সক্রিয় কর্তা হিসেবে বিবেচনা করার নীতিগত সুযোগ নেই, ফলে ওই সমস্ত ‘প্রাণীরক্ষার’ ভুল আয়োজন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মতো দেশে প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য উল্টো বিপদের কারণ হয়।

আর দীর্ঘকালের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর থেকে বের হয়ে এসে প্রাণ-প্রকৃতির সামাজিক তত্ত্বাবধানের কর্মসূচি নেয়ার মতো আন্তরিকতা হয়তো অনেকের আছে, কিন্তু সেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আমাদের ঔপনিবেশিক বিদ্যায়তনে নেই, বিশেষত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর প্রচণ্ড অভাব।

ফলে দেখা যাচ্ছে, কাজটা বাংলাদেশের জন্য খুব সহজ হবে না, অল্পদিনের কাজ তো এটা নয়ই, অন্যান্য খাতের মতোই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। কঠিনকে ভালোবাসতে হবে। বাংলাদেশে উপনিবেশিক পরিবেশবাদের অকার্যকরতা ও এর বিপরীত সম্ভাবনা নিয়ে ওয়াকিবহাল মহল মাত্রই সচেতন, আমরাও গত বছরগুলোতে এই নিয়ে প্রচুর লিখেছি।

আর এটা যে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা, তা কিন্তু নয়, ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির থেকে যেই সমস্ত প্রতিবেশ-সুরক্ষার বয়ান ও প্রকল্পের সমস্যা তৈরি হয় তা পৃথিবীর অনেক প্রান্তেই মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

দুটো উদাহরণ দেব, প্রথম উদাহরণটি এমন এক অঞ্চলের থেকে, যেখানেও মানুষের রয়েছে বর্ণবাদের থেকে উদ্ভত অমানবিক জুলুমের করুণ অভিজ্ঞতা- যেই দেশটির সমৃদ্ধি তৈরি হয়েছে সরাসরি দাসপ্রথার ওপর, সেই আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের।

ইতিবাচক ব্যাপার হচ্ছে, সেই ষাটের দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ইতিবাচক চেষ্টা চলছে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা স্তরে, সাধারণ বৈষম্য দূর করার চেষ্টা। কিন্তু বিশেষত উচ্চ শিক্ষা ও প্রতিবেশ-সুরক্ষা খাতে এই চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক উপকূলের একটা স্টেটে এই বিষয়ে একটা কাজ করতে গিয়ে আমরা যেটা দেখছি সেটা হচ্ছে; খুব উন্নত পদ্ধতি ও উপকরণ ইত্যাদি ব্যবহার করে প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, খুবই কঠিন আইন-কানুন করে নানা বিপদাপন্ন প্রাণি বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, বেশ সাফল্যও আসছে এই ক্ষেত্রে।

কিন্তু জলবায়ু বদলের থেকে উদ্ভূত নানা হুমকির মুখে উপকূলীয় অঞ্চলে যেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে জীবন ও জীবিকার লড়াই করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত, তারা এই ‘নেচার কনজারভেশন’কে নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারছে না।

আফ্রিকান-আমেরিকানরা তো বটেই ইউরোপীয়-আমেরিকান লোকদের মধ্যেও যারা নিন্ম ও মধ্য আয়ের তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই নেচার কনজারভেশন আরও কঠিন করে তোলে জীবন।

যেমন ধরা যাক, গতানুগতিক প্রকৃতি-সুরক্ষা আর তার সঙ্গে সম্পর্কিত বাজার অর্থনীতির তাগিদ মিলে আইনকানুন এমন কঠিন হয়েছে যে খুব উচ্চবিত্ত লোকজন ছাড়া বাকিদের পক্ষে জলজ প্রতিবেশ উপভোগ করা কিম্বা প্রতিবেশগত জীবিকা যেমন মাছ ধরার পেশা নেয়া কিম্বা পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য সরাসরি জলজ প্রতিবেশের ওপর নির্ভর করা রীতিমতো অসম্ভব।

ফলে, যেটা হয়, একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটে, দেখতে ভালো এমন কিছু ক্যারিশমাটিক প্রাণী বাঁচানোর বিনিময় মূল্য হিসেবে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর সব কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে সম্প্রসারিত হওয়ার কাজে সাহায্য করে এই পরিবেশবাদ যা দীর্ঘমেয়াদে প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামাজিক ও প্রতিবেশগত সুরক্ষা কমায়।

এবং বিদ্যায়তনে প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষাবিষয়ক যেসব বয়ান আছে তা এর বাইরে খুবই কমই যায়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এই বয়ান নিয়ে বেরোনো জনশক্তি নিজেদের কাজের এই সীমাবদ্ধতা দেখতে পায় না।

কিন্তু আশার ব্যাপার হচ্ছে, গত শতকের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এই গতানুগতিক পরিবেশবাদের সীমাবদ্ধতা কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহযোগিতার একটা মেলবন্ধন ঘটানোর মাধ্যমে।

বিশেষত ফেডারেল সরকারের কর্মসূচির সহায়তায় (National Sea G rant College Program) বিভিন্ন স্টেটে স্থানীয়ভাবে বিদ্যায়তনিক, সামাজিক ও স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে তোলা কর্মসূচিগুলোতে উপকূলীয় অঞ্চলে সামাজিক প্রতিরোধক্ষমতার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষার নতুন এ পদ্ধতির মধ্যে।

এসব কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষার জন্য যেই ধরনের জনশক্তি দরকার, কিম্বা অন্য কথায়; উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রতিবেশগত সুরক্ষার জন্য নাগরিকদের তৈরি করার জন্য- সামাজিক-প্রতিষ্ঠানকাঠামোর শক্তিকে ব্যবহার করে প্রতিবেশগত ও জলবায়ু সুরক্ষার কাজে সক্ষম জনশক্তি তৈরি করার সুযোগ আছে এসব কর্মসূচির মধ্যে।

গতানুগতিক পরিবেশবাদের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য এমন কোনো চেষ্টা এ বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে আমরা দেখেছি কি? ইতিবাচক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের সমাজে প্রস্তুতি আছে, সামাজিক প্রতিষ্ঠান আছে প্রচুর, ভবিষ্যতের জনশক্তি হওয়ার সম্ভাবনা যাদের আছে- তাদের আগ্রহ আছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় তরুণদের সম্পর্কে যতটা জেনেছি তাতে এটা স্পষ্ট যে নিজেদের প্রতিবেশের সুরক্ষার দায়িত্ব সামাজিকভাবে তারা নিজেরা নিতে চায়, কিম্বা শহরাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যতটা এই নিয়ে আমরা কাজ করেছি তাতে দেখা গেছে ঔপনিবেশিক পরিবেশবাদের বয়ান ও বিদ্যায়তনিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে সমাজ-প্রতিবেশের ব্যাপারে এ নতুন চিন্তায় তারা বেশ আগ্রহী। যেটা দরকার সেটা হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণ।

দ্বিতীয় উদাহরণটি এ প্রসঙ্গে দিচ্ছি; সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি গিয়েছিলাম এসব বিষয়ে আলোচনা করার জন্য।

গ্লোবাল ইয়ুথ বায়োডাইভার্সিটি নেটওয়ার্কের (G lobal Youth Biodiversity Network-G YBN) তরফে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ আয়োজনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা চেষ্টা করছে, তার অংশ হিসেবে একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন তারা।

প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষাকে জাতীয় রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন চিন্তার মূলধারায় নিয়ে আসার জন্য ‘কনভেনশন অন বায়োলজিকাল ডাইভার্সিটি’র (Convention on Biological Diversity-CBD) সঙ্গে তরুণদের সংশ্লিষ্ট করাই এ নেটওয়ার্কের একমাত্র কাজ। তো, কোনো ধরনের পূর্ব বক্তৃতা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের যখন বলা হল এই ধরনের মেইনস্ট্রিমিংয়ের জন্য কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে তাদের মনে হয়, তারা কিন্তু কেউই প্রাণবৈচিত্র্যকে সমাজের থেকে আলাদা করে বিবেচনা করেননি লিখিত মতামত দেয়ার সময়।

কর্মশালার সবগুলো গ্রুপের অনুশীলনের ফলাফলেই দেখা গেল সমাজ-প্রতিবেশের সুরক্ষায় করণীয়ের তালিকায় তারা যেসব কাজ রেখেছেন তা কেবল সামাজিক তত্ত্বাবধানের মাধ্যমেই করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। বিগত বছরগুলোতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এর বিশেষ উল্টো কিছু আমরা দেখিনি।

কিন্তু এটা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়, প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কি? এই তরুণদের এমনভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা গতানুগতিক বিদ্যায়তনিক গবেষণা ও পেশার বাইরেও নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারেন প্রতিবেশগত সুরক্ষার জনশক্তি হিসেবে।

এমন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তাদের জন্য করতে হবে যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে কোটি মানুষের সামাজিক সুরক্ষার জন্য, প্রতিবেশ-সুরক্ষার জন্য তারা সেই নাগরিকদেরই সক্ষম করে তুলার দায়িত্ব নিতে পারেন।

ঔপনিবেশিক পরিবেশবাদের বয়ানের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় প্রতিবেশের সুরক্ষার জন্য এই মত স্থানীয় সামাজিক শক্তির ভিত্তির ওপর প্রাণ-প্রকৃতির কর্মসূচি তৈরি করাটাতেই এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে বাংলাদেশকে। যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা পুরনো বিদ্যায়তনিক পরিসরের মধ্যে সম্ভব নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেটা সম্ভব তা হচ্ছে অন্য একটা অভাব দূর করা; প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নানা শাখার গতানুগতিক গবেষণায় বাংলাদেশে উৎকর্ষ নেই, প্রতিবেশগত সুরক্ষার জন্য যেটা সহায়ক সামর্থ্যগুলোর একটি। বিশেষ করে খাতা-কলম-ল্যাবরেটরির বাইরে গিয়ে জল-জঙ্গল মাঠ-ময়দানের থেকে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে গবেষণার উৎকর্ষ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা দরকার।

এর বাইরে বড় কাজ হল; এই অঞ্চলের দেশগুলোতে উপকূলীয় এলাকায় কর্মরত সমাজ-ভিত্তিক তৃণমূল প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যাতে শিক্ষার্থীরা কাজ করতে পারেন তার ব্যবস্থা করা। নিশ্চয়ই আমরা জানি, তৃণমূলের সমাজভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ‘পরিবেশবাদী’ সংস্থা নয়, তারা সমাজ-প্রতিবেশের অন্যান্য ঝুঁকি দূর যেমন দারিদ্র্য, লিঙ্গ বৈষম্য, শিক্ষা বৈষম্য, পানি ও পয়ঃসমস্যা ইত্যাদি দূর করার কাজ করেন।

কিন্তু জলবায়ু বদলের এ সময়ে উপকূলীয় নিন্মভূমিতে উন্নয়ন ও সুরক্ষার কোনো খাতই এই হুমকির বাইরে নয়। জলবায়ু অভিযোজন ও জলজ প্রতিবেশ সুরক্ষার সমন্বিত কর্মসূচির দিকে আমাদের যেতে হবে অন্যান্য খাতগুলোর সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরি করেই।

এই ধরনের সমাজ-ভিত্তিক তৃণমূল প্রতিষ্ঠানের জনশক্তি যাতে তাদের খাতওয়ারি কাজের মধ্যেই জলজ প্রতিবেশ সুরক্ষার কাজকে সমন্বিত করতে পারে, এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে প্রস্তুত করতে পারে, সেই ব্যবস্থাটা করতে হবে।

আর যেহেতু সাগরের প্রতিবেশের ব্যাপার, তাতে তো রাজনৈতিক সীমানাই শুধু বিবেচনা করলে হবে না। জলবায়ু বদলের ঝুঁকি ও জলজ প্রতিবেশের দুরবস্থার থেকে উত্তরণে গবেষণা ও কাজের জন্য এমন উদ্যোগগুলোকে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়তে হবে।

বাংলাদেশের সমাজ-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো একত্রিত হয়ে এমন উদ্যোগ শুরু করলে আমাদের বিশ্বাস, জাতীয় স্তরে শুরু করার জন্যই হোক কিম্বা আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার মাধ্যমে একে আঞ্চলিক উদ্যোগে রুপান্তর করার জন্য হোক, দরকারি বিনিয়োগের অভাব হবে না।

কারণ, বঙ্গোপসাগরসহ পুরো এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই উন্নয়নের ওপর যেই জোর দেয়া হচ্ছে, তার অংশ হিসেবে দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোই সুরক্ষা কাজের বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। সমুদ্র স্বাক্ষরতা, সমাজ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় নাগরিকের নেতৃত্বে সামাজিক উদ্যোগ, এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার সমন্বিত এমন কর্মসূচিতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোও অংশীদার হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সমাজভিত্তিক তৃণমূল প্রতিষ্ঠানগুলো এই দায়িত্ব অনুভব করে কিনা এবং কর্মসূচি প্রণয়নের দিকে সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হয় কিনা।

লেখক : প্রতিবেশবিদ। ফেলো, সি গ্রান্ট, ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া

ঘটনাপ্রবাহ : যুগান্তর বর্ষপূর্তি-১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×