আমাদের বনাঞ্চল উজাড়

  কানিজ কবির ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের বনাঞ্চল উজাড়
বনাঞ্চল উজাড় করে তৈরি করা হচ্ছে বসতবাড়ি

বর্তমান বিশ্বের বহুল আলোচিত এক নাম-রোহিঙ্গা। এটি পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রাষ্ট্রবিহীন ইন্দো-আরিয়ান জনগোষ্ঠী। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও কিছু সংখ্যক হিন্দু ধর্মের অনুসারীও রয়েছে এখানে।

বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। মিয়ানমার কর্তৃক তাদের দেশের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও রোহিঙ্গারা তা পায়নি। সেখানে তারা সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের ধারণা এরা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। আদতে কিন্তু তা নয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরে বহু জাতির সংমিশ্রণে উদ্ভুত এই সংকর জাতি চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেছে আমাদের দেশে। আর এর কারণ আমরা সবাই জানি। মিয়ানমার এর সামরিক বাহিনী দ্বারা চরম নির্যাতিত এ জনগোষ্ঠীর উপায়ান্তর না দেখে পিল পিল করে এদেশে প্রবেশ, মানবাধিকার লংঘনের একটি চরম নিদর্শন বটে। এসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে এদেশেরই সবচেয়ে বড় পর্যটন এলাকা কক্সবাজার, টেকনাফসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়।

যে যেভাবে পেরেছে, সেভাবেই আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। মানবতার ঝাণ্ডা হাতে আমাদের দেশের লক্ষকোটি মানুষ ও সরকার মহল পারেনি তাদের সঙ্গে অমানবিক হতে। তারই ফলস্বরূপ আজ প্রায় তিন মাস যাবত এদেশের আশ্রয় প্রশ্রয়ে তারা লালিত-পালিত হচ্ছে। প্রচুর পরিমাণ দেশি-বিদেশি ত্রাণ তাদের বাঁচার পথ দেখিয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিচ্ছে অন্য জায়গায়। জ্বালানির কোনো সংস্থান না থাকায় তারা প্রাকৃতিক বন থেকে তা জোগাড়ের প্রয়াস চালাচ্ছে। ফলশ্রুতি আমাদের বনাঞ্চল উজাড়। বন অধিদফতর এর হিসেব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শুধু বনের ক্ষতি দেড়শ’ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি নিঃসন্দেহে ততোধিক। সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানবজাতির আহার, বাসস্থান, অর্থনৈতিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম উৎস বনভূমি। একে পৃথিবীর ফুসফুসও বলা যায়।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে এর পরিমাণ মাত্র ১৭.৪ ভাগ, জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় যা সত্যিই অপ্রতুল। তার ওপর যদি এভাবে নির্বিচারে গাছ নিধন চলে, তাহলে তা অদূর ভবিষ্যৎ এ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর হুমকি স্বরূপ কাজ করবে। বন না থাকলে পশুপাখি কীটপতঙ্গ নিঃশেষ হয়ে যাবে ধীরে ধীরে।

বৈষ্ণিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেবে ঝড় জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রলয়ঙ্করী ব্যাপার যা স্বল্পোন্নত দেশটির জন্য মোটেও শুভ সংবাদ নয়। আর এসবের জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী থাকবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

অশিক্ষিত উদ্বাস্তু অসহায় এই শ্রেণী জানতে বা অজান্তেই দেশের আশু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী হয়ে যাচ্ছে। মূলত রোহিঙ্গাদের পক্ষে-বিপক্ষে গোটা জাতি আজ দ্বিধাবিভক্ত। কেউ বলছে মানবিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো উচিত, কেউ বলছে বাংলাদেশ যেহেতু অর্থনৈতিকভাবে এখনও পুরোপুরি স্বাবলম্বী নয়, তাই তার পক্ষে এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে সেভাবে লালন-পালন করাও দুরূহ।

জাতিগতভাবে রোহিঙ্গারা যতটা অসহায়, ঠিক ততটাই অলস, কর্মবিমুখ, অশিক্ষিত ও দিক নির্দেশনাহীন। এত শত বছরেও তারা নিজেদের সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারেনি। বংশ বৃদ্ধি, সহজ উপায়ে পয়সা উপার্জন, অপরাধ কাজে লিপ্ততা এসবই তাদের মূল লক্ষ্য।

কয়েক শতাব্দী ধরে মিয়ানমারে বাস করা এ জাতি আজ অবধি সেই দেশ কতৃক কোনো বৈধতা বা স্বীকৃতি পায়নি কিছুটা তাদের জাতিগত দুর্বলতা ও কমতির জন্য। একথা ঠিক তাদের প্রতি চরম অমানবিক আচরণ আজ তাদের এ পর্যায়ে এনে পৌঁছিয়েছে, তারপরও নিজেদের এ বর্ধিত জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের তারা কেন আজ অবধি সুশৃংখল ও সুসংগঠিত করেনি, তা সত্যিই বিবেচ্য বিষয়।

এ কথার সূত্র ধরে বলা যায়, দেশবিদেশ এর প্রচুর ত্রাণ পাওয়া এ মানুষগুলো বর্তমানে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে আছে। তারা যেহেতু আমাদের দেশের নাগরিক নয় এবং নিজ দেশেও সেভাবে নিজেদের বৈধভাবে দাবি করতে পারছে না, তাই বর্তমান আরাম ও স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিকেই তারা পুঁজি করছে। অকাতরে বনাঞ্চল নিধন তাদের খুব বেশি প্রভাবিত বা চিন্তিত করছে না।

বনাঞ্চল ধ্বংস আমাদের দেশের জন্য যে পরিমাণ মারাত্মক হুমকি স্বরূপ দেখা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তা বোঝার মতো অবস্থান বা পরিস্থিতি তাদের নয়। এটি আমাদের দায়িত্ব। আমাদের দেশের সম্পদ আমরা কিভাবে সংরক্ষিত রাখব, এটা আমাদের ভাবনা, ওদের নয়।

রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থান তাদের সেই পর্যন্ত চিন্তা করার প্রয়াস দিচ্ছে না। তাই সময় এসেছে আশু পদক্ষেপ নেয়ার। প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার। যেহেতু তাদের প্রতি চরম অমানবিক কিছু প্রদর্শন করা আমাদের উচিত হবে না, তাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাঝে প্রথমেই পড়বে আন্তর্জাতিক অর্থাৎ দেশি-বিদেশি পরামর্শ ও সাহায্য নেয়া।

তাদের সঠিকভাবে পুনর্বাসন এবং নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করানোর জন্য সরকারিভাবে আন্তর্জাতিক মহল ও মিয়ানমার সরকারকে চাপ প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। সরেজমিন এ প্রদক্ষিণ করে দেখা গেছে যে প্রতিটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অস্থায়ী ছাপড়া, বস্তি বা বাড়িঘরের সামনেই কয়েক মাসের জ্বালানি মজুত রাখা। এটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

সংরক্ষিত বনের পাশ থেকে অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোকে অন্যত্র সরিয়ে ফেলতে হবে যাতে তারা যখন তখন ইচ্ছামাফিক জ্বালানি সংগ্রহ করতে না পারে। দ্রুত বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে। এ লক্ষ্যে বায়োগ্যাস বা বায়োপ্ল্যান্ট প্রকল্পের পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।

স্যানিটারি ল্যাট্রিনগুলোর বর্জ্যপদার্থকে বায়োগ্যাস তৈরির মাধ্যমে জ্বালানির চাহিদা মেটানো যায়। এছাড়া কেরোসিনের চুলা ও কম তাপে রান্না করা যায় এরূপ সরঞ্জামও সরবরাহ করা যেতে পারে। বন উজাড় হওয়া খালি জায়গাতে অবিলম্বে গাছ লাগিয়ে নতুন বনায়নের চিন্তা ভাবনা করা আশু প্রয়োজন।

আর এভাবেই সম্ভব বর্তমান উদ্ভুত দেশের এত বড় সমস্যার মোকাবেলা করা। এ জাতি বহুবার নিজেদের বীর জাতি উপাধির প্রমাণ দিয়েছে, আরেকবার না হয় হোক চলমান এ পরিবেশ গত সমস্যাকে শক্ত হাতে সমাধান করার। আমরা সেই প্রত্যাশায় রইলাম।

লেখক : প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

ঘটনাপ্রবাহ : যুগান্তর বর্ষপূর্তি-১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter