মাথার আবরণ : বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে

  সেলিনা হোসেন ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাথার আবরণ হিসেবে হিজাব বা শাড়ির আঁচলের ব্যবহার বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে একটি প্রথাগত ঐতিহ্যিক ধারণা। শত বছর আগে থেকে মুসলিম নারীরা একদিকে বোরকা পরতেন, অন্যদিকে শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা ঢাকতেন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে তখন হিজাবের প্রচলন বর্তমান বাংলাদেশের মতো ছিল না। এটা বড় ধরনের পর্দা-প্রথা নয়। বিভিন্ন পরিবেশে মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে দেয়া ছিল সাধারণ নম্রতার প্রকাশ। আসলে এভাবে মাথা ঢাকা ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক আচরণ ছিল না। সাংস্কৃতিক দিকটিই ছিল প্রধান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিয়ের পরে মেয়েরা শ্বশুর-শাশুড়ি বা বয়সী প্রবীণদের সামনে মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে দিত। অপরিচিত পুরুষ মানুষের সামনে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, রাস্তায় বা খোলা জায়গায় নারীদের নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী মাথায় কাপড় দেয়ার প্রচলন ছিল। কেউ মৃত্যুবরণ করলে নারীরা সে বাড়িতে গেলে মাথায় কাপড় দেয়ার প্রথা পালন করত। বিষয়টি ছিল পছন্দের ব্যাপার। পালন করতেই হবে এমন কোনো সামাজিক রীতি নয়। এভাবে মাথায় কাপড় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির অংশ হয়। সব ধর্মের নারীরাই পালন করে। মাথার আবরণ ছিল সংস্কৃতির অংশ।

মুক্তিযুদ্ধ ও বোরকা

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বোরকার ব্যবহার করে নারীরা কীভাবে যুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন তার অনেক উদাহরণ আছে। একজন যোদ্ধা নারীর একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা হল। কারণ তিনি হিন্দু নারী। বোরকা তার পোশাকের অংশ নয়। তার নাম ইলা দাস। তিনি এখনও আমাদের মাঝে আছেন। তার কন্যা বনশ্রী বিশ্বাস স্মৃতিকণা তার মায়ের কথা লিখেছেন ‘আমার প্রেরণার যত নারী’ গ্রন্থে। উদ্ধৃতি : ‘যুদ্ধকালীন তিনি বেশিরভাগ সময় নরসিংদী জেলার রায়পুর অঞ্চলে অবস্থান করেন। কিছুদিন তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতের আগরতলায় অবস্থিত ক্যাম্পে সামরিক ট্রেনিং গ্রহণ করেন। কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাদের রেখে গেছেন বলে মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। পরে তিনি নিজ অঞ্চল রায়পুরাতে ফিরে এসে ৩নং সেক্টরের কমান্ডার গয়েস আলী মাস্টারের অধীন যুদ্ধে যোগ দেন। তবে তিনি সম্মুখ রণাঙ্গনের চেয়ে সহযোগিতার ভূমিকায় বেশি কাজ করেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি শাশুড়ি, ননদদের নিয়ে প্রায় একটানা ৫ মাস প্রতিদিন ১০০-১৫০ শত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার রান্না করে কোনো কোনো সময় ক্যাম্প পর্যন্ত খাবার পৌঁছে দিতেন। আবার গুলি, ম্যাগাজিন, গ্রেনেড, বন্দুক পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মুক্তিদের কাছে বিভিন্ন পয়েন্টে পৌঁছে দিতেন। আহতদের গ্রামের ভেতর নিয়ে বাড়িঘরে লুকিয়ে গোপনে রাখতেন। প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন আর ক্যাম্পে ক্যাম্পে সংবাদ প্রেরণ করতেন। আর এসব কাজ তার জন্য সহজতর ছিল এ জন্য যে তিনি পুরনো ঢাকায় বড় হওয়ার সুবাদে নারিন্দা এলাকার বহু বিহারিদের সঙ্গে বসবাসের কারণে উর্দু ভাষাটা রপ্ত ছিল। অনায়াসে উর্দূতে কথা বলতে পারতেন এবং শাখা সিঁদুর খুলে কালো বোরকা পরে এ কাজগুলো করতেন যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ।’

ইলা দাসের সময় ছিল যুদ্ধের। তিনি বোরকার আবরণ ব্যবহার করেছেন যুদ্ধজয়ের স্বপ্নে। স্বাধীনতা ছিল তার কাক্সিক্ষত চাওয়া। এভাবে একটি আবরণ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ধর্মীয় পোশাক ভেবে তিনি তা বর্জন করেননি। যুদ্ধের নেপথ্য শক্তির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

ঘোমটার রাজনীতি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার মন্ত্রিসভায় দু’জন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তারা দু’জনেই মাথায় শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘোমটা দেননি। হিজাব কিংবা বোরকাও পরেননি। এটি ছিল তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। মাথায় ঘোমটা দেয়ার বাধ্যবাধকতা তাদের ছিল না। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে মাথায় ঘোমটা ব্যবহার করছেন। তারা দু’জনেই ক্ষমতায় আসার আগে মাথায় শাড়ির আঁচল ব্যবহার করতেন না। তা হলে প্রশ্ন আসে যে ঘোমটা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক কী? ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় বসার পর মাথায় শাড়ির আঁচল ব্যবহার করেছেন। রাজনৈতিক নেত্রী সোনিয়া গান্ধী রাজনৈতিক সভায় মাথায় শাড়ির আঁচল ব্যবহার করেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল মাথায় শাড়ির আঁচল ব্যবহার করতেন। পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো মাথায় ওড়না ব্যবহার করতেন। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ক্ষমতা ও মাথায় আবরণ ব্যবহার করার একটি রাজনৈতিক সংযোগ আছে। এর দ্বারা এটা প্রত্যাশা করা যায় যে মাথা ঢাকার বিষয়টি পালন করলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শ্রদ্ধা-মর্যাদা লাভ করা যায়। মানুষ এই আচরণকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে। নির্বাচনের সময় ভোটারদের গ্রহণযোগ্যতাও পাওয়া যায় এর দ্বারা। বাংলাদেশের সামনের সারির রাজনৈতিক নেত্রীরাও ঘোমটা ব্যবহার করেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যে নারীরা গ্রামে রাজনীতিতে যুক্ত হন তারাও ঘোমটা ব্যবহার করেন। কোনোভাবেই এই ঘোমটা ধর্মীয় আচরণ নয়। পরিশীলিত সাংস্কৃতিক বিবেচনার দিকটি তুলে ধরে।

নব্বই দশকের সূচনায় একজন প্রগতিশীল নারী লেখক জাহানারা ইমাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমীর মাতা। নিজেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি একজন শিক্ষাবিদও ছিলেন। নিজে গাড়ি চালাতেন। সপ্রতিভ মানুষ ছিলেন। কিন্তু যখন জনসভায় বক্তৃতা করার জন্য মঞ্চে উঠতেন তখন মাথায় আঁচল তুলে দিতেন।

এর দ্বারা বোঝা যায়, শাড়ির আঁচল কিংবা যে কোনো কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে।

এর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ গণমানুষের চেতনার ধারণাকে বিকশিত করে। সামগ্রিক সত্যে নারীর এ মস্তক-আবরণ নারীর অবস্থানের বিষয়টি থেকে উদ্ভূত হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বিষয়টিকে একদিকে সামাজিক মর্যাদা হিসেবে দেখেছে, অন্যদিকে নারী নিজে পরিশীলিত নান্দনিক বোধ থেকে বিষয়টিকে আপন আলোয় ধারণ করেছে। দুয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে সামাজিক অবস্থানের নিগূঢ় সত্য।

ঘোমটার স্বাধীনতা : ঘোমটার ক্ষমতা

বাংলাদেশের কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন সমাজ সচেতন সাহসী নারী। তিনি একজন কবি বা নারী নেত্রী ছিলেন না মাত্র, সাহসের সঙ্গে সব ধরনের ঘটনা মোকাবেলা করতেন। নারীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের জন্য সবসময় সোচ্চার ছিলেন। নারীর মানবিক অধিকার আদায় করার জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। প্রতিবাদী মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে রাজপথে নেমে আসতেন। তিনি সম্ভ্রান্ত নওয়াব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শাড়ির আঁচল দিয়ে সবসময় মাথা ঢেকে বাড়ির বাইরে যেতেন। আমার এক বান্ধবীর মা সংস্কৃতি-মনস্ক নারী ছিলেন। বিভিন্ন সভা-অনুষ্ঠানে সবসময় আসা-যাওয়া করতেন ঘোমটা দিয়ে। আমার বান্ধবী ধারণা করত যে তার মা একদমই স্মার্ট নয়। স্মার্ট হলে মাথায় ঘোমটা দেবে কেন? কিন্তু কবি সুফিয়া কামালকে দেখে তার ভুল ভেঙে যায়। ও বুঝতে পারে যে মাথায় শাড়ির আঁচল তুলে দিলে কোনো নারীর ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না। বরং মাথায় আবরণ দিয়ে যে কোনো নারী তার শক্তির জায়গা থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করতে পারে। সে জন্য ঘোমটা নারীর জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

সব নারীকে মনে রাখতে হবে যে নিজের ব্যক্তিত্বকে খাটো করা, স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা বা প্রগতিশীল হওয়ার ধারণা কখনই ঘোমটার অন্তরালে যেন অবদমিত না হয়। হিজাব বা ঘোমটা পোশাকের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে নিজ জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পোশাক পরা সাংস্কৃতিক বিবেচনা। এই বোধ নিয়ে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশে অনেক দরিদ্র নারী মাথায় আঁচল দিয়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, রাস্তার ধারে চা বিক্রি করে এবং এমন আরও অনেক কাজ করে উপার্জন করে। আর্থিক সঙ্গতি নিয়ে জীবন চালায়। এভাবে মাথার আবরণ নারীর চলাফেরা, স্বচ্ছন্দ যেমন করছে, তেমনি বলা যায় নারীর পছন্দ এবং স্বাধীনতার পরিসর বাড়িয়েছে।

মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ঘোমটা

এই উপমহাদেশে বেগম রোকেয়া একজন অসাধারণ নারীবাদী সমাজকর্মী এবং লেখক। তিনি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঘরে বসে বড় ভাইয়ের কাছে সামান্য লেখাপড়া শিখেছেন। বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি শেখার সুযোগ পান। তার ব্যতিক্রমী লেখা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রোকেয়া স্বামী মৃত্যুর পর মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজের নানারকম প্রতিবন্ধকতার মুখে মেয়েদের জন্য প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি চালিয়ে যান। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করান। এ স্কুলটি এখনও কলকাতায় আছে। দেখা গেছে তিনি সবসময় মাথায় শাড়ির আঁচল দিতেন। এটি ছিল তাঁর মর্যাদার প্রতীক। বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম নারীরা, বিশেষ করে বয়সী নারীরা, শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা ঢাকতে পছন্দ করেন। এর পেছনে সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট কাজ করে। সংস্কৃতির বিবেচনায় এ ধরনের মস্তক আবরণ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে পোশাকের অংশ হিসেবে।

মৌলবাদের উত্থান এবং মস্তক আবরণ

বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দর্শন ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা। কিন্তু চার-পাঁচ বছর পরই মৌলবাদের উত্থান ঘটতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উঠলে দেশের গণমানুষের বুঝতে বাকি থাকে না যে ষড়যন্ত্রের শেকড় চারদিকে ছড়িয়েছে। হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলা এক নৃশংসতম দৃষ্টান্ত। দেশের আরও অনেক এলাকায় জঙ্গি আক্রমণ বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থানের ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছে। ধর্মান্ধ দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের বোরকা ও হিজাবের জাঁতাকলে আবদ্ধ করেছে। ব্যাহত করছে উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের রাস্তা। এমনকি মেয়ে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করেছে কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে হিজাব ও ঘোমটাধারী মেয়েদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। শুধু হিজাব বা ঘোমটা নয় শাড়ির ওপরে একটি চাদর পরার প্রবণতাও ইদানীং দেখা যাচ্ছে। এভাবে নারীদের অবরুদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। সবচেয়ে বড় কথা, সমাজে নারীর মধ্যে বিভাজনও তৈরি করা হচ্ছে। একদল হিজাব ও বোরকা পরে একটি পক্ষভুক্ত হচ্ছে আর একদল নিজস্ব স্বকীয়তা ও সাবলীল পোশাকে অভ্যস্ত থাকছে। নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথ আজকের বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারণ এর ফলে মানবিক অধিকার আদায়ের বিষয়ে একত্রে সোচ্চার হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

পর্দা ও অর্থনীতি

অর্থনীতির দিক থেকে মস্তক আবরণের একটি অতিরিক্ত খরচ আছে। খরচটি বাড়তি আবরণ কেনার দিক। আবার অন্যদিকে অর্থনীতির বিবেচনায় মস্তক আবরণবিহীন চিত্রেরও একটি যোগসূত্র আছে। বাংলাদেশে বিউটি পার্লারের বাণিজ্যিক সাফল্য নানাভাবে দেখা যায়। ঢাকা শহরের বাইরে এবং দূরবর্তী এলাকাতেও বিউটি পার্লারের ব্যবসা ছড়িয়ে পেড়েছে। এর দুটি কারণ আছে। প্রথমটি চুলের স্টাইল বিভিন্ন বয়সী নারীদের ফ্যাশন পরিচর্যার একটি দিক। দ্বিতীয়টি হল দেশের অসংখ্য নারী পার্লারে কাজ করে আর্থিক উপার্জন লাভ করে। বিশেষ করে আদিবাসী প্রান্তিক মেয়েরাও পার্লারে কাজ করে আর্থিক সচ্ছলতা পায়। এর পাশাপাশি অনেক ব্যক্তি প্রসাধনীসামগ্রী তৈরি করে ব্যবসা করে। এসব কারাখানায় অনেক মানুষ কাজ করে জীবিকার ব্যবস্থা করে। ফলে অর্থনীতি সচল থাকার কারণ থাকে। মস্তক আবরণহীন জীবন নির্বাহ করা অর্থনীতির বিবেচনায় একটি বড় পরিসর। কারণ পার্লার বন্ধ হওয়ার সুযোগ নাই। আবার মস্তক আবরণ ব্যবহার করা অর্থনীতির দিক থেকে নিঃসন্দেহে পশ্চাদপসরণ। এর দ্বারা পার্লারের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এখন পর্যন্ত মস্তক আবরণ ও অর্থনীতির কোনো সংঘাত তৈরি হয়নি। ভবিষ্যতে হবে না এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।

বাংলাদেশ মৌলবাদী চেতনার উত্থানের পরও অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ দেশ। সরকার কঠোরভাবে জঙ্গি দমন করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এটা স্পষ্ট যে ধর্মান্ধ মৌলবাদী দল কখনো রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারেনি। সাধারণ মানুষ কখনই ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করেনি।

বাংলাদেশের মানুষ তাদের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বাঙালি জাতিসত্তার অলোকে উদযাপন করে। তাদের ২১ ফেব্রুয়ারি আছে, যেদিন তারা মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিল। তাদের পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপন আছে। তাদের ঋতুভিত্তিক সংস্কৃতির শরৎ, বসন্ত উৎসব আছে। এসব অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করে। তাদের ঈদ-পূজা, বৈশাখী পূর্ণিমা, ক্রিস্টমাসের ধর্মীয় উৎসব আছে। এসব অনুষ্ঠানে যে কোনো মানুষ ধমর্রে ঊর্ধ্বে যোগদান করতে পারে। একটি স্লোগান এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’

এ কথা অনায়াসে বলা যায় যে, বাংলাদেশে পর্দা এখনও আধিপত্যের জায়গা নিতে পারেনি। সরকারি পর্যায় থেকেও ঘোমটার ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি। শেষ কথা হল হিজাব, বোরকা বা মস্তক আবরণ এখন পর্যন্ত ধর্মীয় মূল্যবোধের বাইরে বলে মূল্যায়িত হচ্ছে। বলা হচ্ছে কে মাথার আবরণ ব্যবহার করবে তা তার নিজস্ব চিন্তা। ব্যক্তির স্বাধীনতা। তারপরও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বাঙালির স্বপ্ন। তাকে অবরুদ্ধ করার সাহস কোনো গোষ্ঠীর হবে না। অসাম্প্রদায়িক বোধের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাঙালির সাধনা।

দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পূর্ণ করে দেশের সবটুকু। তাদের পর্দার আবরণ নেই। আছে প্রাণ-বৈচিত্র্যে ভরপুর যাপিত জীবন। এই বৈচিত্র্য মাতিয়ে তোলে বাঙালিকেও। এই প্রাণময়তার ভেতরে ছড়িয়ে আছে পর্দার ক্ষুদ্র পরিসর। পর্দার নানা মাত্রা জীবনের সঙ্গতিপূর্ণ আয়োজন। ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর সাধ্য নেই এই মাত্রাকে বিচ্ছিন্ন করার। বাঙালির শেকড়-সন্ধানী জীবনযাত্রা বৈচিত্র্যের মাঝে বিম্বিত হয়। তার রূপরেখা জীবন সঞ্চালক অনুপ্রেরণা।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter