যাত্রাপালায় বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনগাথা

  মিলন কান্তি দে ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যাত্রাপালায় বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনগাথা

দেবদেবীর বন্দনা উপলক্ষে খ্রিস্টপূর্ব কয়েক হাজার বছর আগে বৈদিক যুগে গীতবাদ্য সহযোগে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় শোভাযাত্রা বের করা হতো। এই শোভাযাত্রা বা ‘যা’ ধাতু থেকে ‘যাত্রা’ কথাটির জন্ম। এরপর বহু বর্ষ বহু শতাব্দীব্যাপী যাত্রা বন্দি ছিল ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানাদির মধ্যে।

অভিনয় অর্থে যাত্রার প্রথম প্রকাশ ১৬ শতকের একেবারে গোড়ার দিকে। শ্রীশ্রী চৈতন্যদেবের (১৪৮৬-১৫-৩৩) আমলে মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের সূচনা পর্বের ওই সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রার বীজ রোপিত হয়। সময়টা ১৫০৯ সাল।

স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ও অভিনয়ে যাত্রাপালা সাহিত্যে প্রথম মঞ্চায়িত পালাটির নাম ‘রুক্ষ্মিণী-হরণ।’ অবশ্য এ বিষয়ে ডা. সেলিম আল দীন ভিন্ন মত পোষণ করেন। সে যাক, সেটি অন্য প্রসঙ্গ। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা এখানে ‘যাত্রা’ ও ‘যাত্রাভিনয়’ শব্দ দুটির জন্মসূত্র জেনে নিলাম মাত্র।

যাত্রা আবহমান বাংলার এক গৌরবময় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, এ ভূখণ্ডের মানুষগুলোর স্বদেশপ্রীতি, জাতীয় জাগরণ আর সাম্য মৈত্রীর বহু বিচিত্র ঘটনার রূপায়ণ আমরা দেখি বিভিন্ন যাত্রাপালায়। সম্ভবত এ কারণেই কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘যাত্রা উঠে এসেছে বাংলাদেশের হৃদয় হতে।’ কবির এ বাণীর একটি তাৎপর্য আছে।

বাংলার ঐশ্বর্য, ধনসম্পদ আর সবুজ প্রকৃতির ওপর বারবার লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে সাম্রাজ্যবাদী অশুভ চক্রের। ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি প্রতিটি হামলা প্রতিহত করেছে। দেশমাতৃকার জন্য তাদের মরণপণ লড়াই করতে হয়েছে। ‘একই মায়ের সন্তান হিন্দু মুসলমান’- এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছে তারা।

এ বিদ্রোহ জাগরণ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা।

চারণ কবি মুকুন্দ দাশ (১৮৭৮-১৯৩৪) তার স্বদেশি যাত্রা ‘মাতৃপূজা’য় লিখেছেন : ‘আমি দশ হাজার প্রাণ যদি পেতাম/তবে ফিরিঙ্গি বণিকের গৌরব রবি/অতল জলে ডুবিয়ে দিতাম।’ আমাদের একজন স্বনামধন্য যাত্রাপালাকার ব্রজেন্দ্র কুমার দে (১৯০৭-১৯৭৬)।

জন্ম বর্তমান শরীয়তপুর জেলার গঙ্গানগর গ্রামে। রচিত পালার সংখ্যা প্রায় দুইশ’। তার কয়েকটি পালার সংলাপ দেখলেই বোঝা যাবে হৃদয়ের কী গভীর অনুভূতি দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন। ‘বাঙালি’ যাত্রাপালায় শেষ পাঠান নবাব দায়ুদ খাঁ তার অমাত্যবর্গের উদ্দেশ্যে বলেছেন : ‘আমার পিতা, পিতামহের পরিচয় যা-ই হোক, আমি জন্মেছি এই বাংলার মাটিতে।

বাংলা আমার জননী, বাঙালি আমার ভাই’ (প্রথম অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য)। এ লেখকের আরেকটি পালা ‘বর্গী এলো দেশে।’ এখানে মারাঠা দস্যুদের দমন করতে যাওয়ার প্রাক্কালে তরুণ সিরাজের (তখনও মসনদে বসেননি) ভাষণ ছিল এরকম : ‘শস্য শ্যামলা বাংলা।

রূপের তোমার অন্ত নাই, ঐশ্বর্যের তোমার সীমা নেই, আমি তোমায় ভালোবাসি সোনার বাংলা’ (প্রথম অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য)। বর্গী এলো দেশে পালাটি ১৯৭৬ সালে মোস্তাফিজুর রহমানের পরিচালনায় চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়।

যুগে যুগে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য রংপুর-দিনাজপুরের কৃষক নেতা নূরলের সংগ্রামী জীবন নিয়ে সৈয়দ শামসুল হক কাব্যনাট্য লিখেছেন ‘নূরলদিনের সারাজীবন।’

এ উপাখ্যান নিয়ে একটি যাত্রাপালাও আছে। নাম ‘মোঘল হাটের সন্ধ্যা।’ পালাকার-প্রসাদকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। বিগত শতাব্দীর ৮০’র দশকে ঢাকার নাটক পাড়ায় ‘নূরলদিনের সারাজীবন’ এবং গ্রামের যাত্রাপালার আসরে ‘মোঘল হাটের সন্ধ্যা’ মঞ্চায়নের সংবাদ জানা যায়। ‘নূরল দিনের সারাজীবন’-এ প্রস্তাবনা কিছু অংশে পঙ্ক্তিগুলো এরকম : ‘অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায়

যে, আবার নূরলদিন একদিন আসিবে বাংলায়

আবার নূরলদিন একদিন কাল পূর্ণিমায়

দিবে ডাক জাগো বাহে, কোন্ঠে সবায়।’

এ পঙ্ক্তিগুলোর আবহ যেন প্রচ্ছন্নভাবে তরঙ্গায়িত হয়েছে মোঘল হাটের সন্ধ্যা যাত্রাপালার সংলাপে। ইংরেজ ও অত্যাচারী জমিদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে এ পালার নায়ক নূরলের কণ্ঠ গর্জে উঠেছে এভাবে : ‘দেবী সিংহের মতো অসংখ্য ইংরেজের পদলেহী গোলামের দল গোটা বাঙালি জাতির হাড়-পাঁজর কুরে কুরে খাচ্ছে।

তাই নবাবীই যদি আমাকে করতে হয়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা-নবাব মীর কাশেমের মতো আমার জন্মভূমি মায়ের পরাধীনতার শেকল ছিঁড়তে আমি হাতে তুলে নেবো স্বাধীন বাংলার বিজয় নিশান’ (প্রথম অঙ্ক, দ্বিতীয় দৃশ্য)।

জাতীয় জাগরণের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনার কিছু সৃজনশীল সংলাপ আমরা প্রত্যক্ষ করি বিভিন্ন যাত্রাপালায়। তেমনি একটি পালা ‘চন্দ্রশেখর।’

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এ উপন্যাসের পালারূপ দিয়েছেন সৌরীন্দ্র মোহন চট্টোপাধ্যায়। পালা কাহিনীর শেষের দিকে নবাব মীর কাশেমকে যুদ্ধে আহত নায়ক প্রতাপ বলছেন : ‘জাহাঁপনা এই সেই দেশ, যেখানে মুসলমানের মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে হিন্দুর দেবমন্দির, এই সেই দেশ যেখানে হিন্দুর সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টার সঙ্গে মুসলমানের আজান ধ্বনি একই সঙ্গে বাতাসে ভেসে ওঠে। এই সেই দেশ যেখানে হিন্দুর জন্য মুসলমান প্রাণ দেয়, মুসলমানের জন্য হিন্দু জীবন আহূতি দেয়।

এই দেশ এই আমার বাংলাদেশ সারা বিশ্বের অজেয় (চতুর্থ অঙ্ক তৃতীয় দৃশ্য)।’ আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি তথা নাটকে, গল্পে, উপন্যাসে সাম্য-সম্প্রীতির এমন চিরায়ত সংলাপ খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না।

এবার মুক্তিযুদ্ধের পালা প্রসঙ্গে আসা যাক। উল্লেখ করতে হয়, বাংলাদেশে যাত্রাপালাকারের সংখ্যা তেমন সন্তোষজনক নয়। আমাদের যাত্রাদল মালিকদের প্রতিবেশী দেশের পালা লিখিয়েদের ওপর নির্ভর হয়ে থাকতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক ভট্টাচার্য, উৎপল দত্ত, অমর ঘোষ প্রমুখ বিখ্যাত নাট্যকাররাও যাত্রাপালা লিখেছেন। আমাদের এখানে তেমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।

লেখক ও নাট্যকার প্রয়াত নাজমুল আলম এবং নাট্যকার-নির্দেশক মামুনুর রশীদ পালা রচনার কাজ কিছুটা শুরু করেছিলেন, কিন্তু রাশ ধরে রাখতে পারেননি। আমাদের প্রথিতযশা নাট্যকাররা যখন যাত্রাপালা লিখছেন না, তখন এ সাহিত্যকর্মে অনেকটা দায়ভার নিয়েই এগিয়ে আসতে দেখা যায় যাত্রা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

রাতজাগা এ মানুষদের কালি ও কলমে কিছু মুক্তিযুদ্ধের পালাও আমরা পেয়েছি। এই তালিকায় রয়েছেন : খুলনার বাজুয়া গ্রামের পরিতোষ ব্রহ্মচারীর ‘নদীর নাম মধুমতি’, নরসিংদীর জালাল উদ্দিনের ‘রক্তে রাঙা বাংলাদেশ’, খুলনার ডুমুরিয়ার সিদ্দিক মাস্টারের ‘সুন্দরবনের জোড়া বাঘ’, যশোরের সাধন মুখার্র্র্জীর ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’, শ্রীমতি জ্যোৎস্না বিশ্বাসের ‘রক্তস্নাত ৭১’, এমএ মজিদের ‘সোনার বাংলা’, আবদুস সামাদের ‘একাত্তরের জল্লাদ’ এবং বর্তমান প্রবন্ধকারের ‘এই দেশ এই মাটি’।

পালাগুলো বিভিন্ন দলে মঞ্চায়িত হলেও একমাত্র জালাল উদ্দিনের ‘রক্তস্নাত বাংলাদেশ’ ছাড়া আর কোনোটিও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। তপন বাগচী আমাদের জানাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় আরেকটি যাত্রাপালা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

নিরাপদ মণ্ডল রচিত এ পালার নাম ‘মুক্তিফৌজ’। পালাকার একে ‘জয় বাংলা ইতিহাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। গবেষণায় উঠে এসেছে যাত্রা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের দু’জন প্রতিনিধি যাত্রাপালারকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

এদের একজন কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক ড. আমিনুর রহমান সুলতান, আরেকজন কবি-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক মহসিন হোসাইন। মহসিন হোসাইনের ‘মীর জাফরের আর্তনাদ’ বেশ কিছু দলে সুনামের সঙ্গে অভিনীত হয়েছে। ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকে ভিন্ন আঙ্গিকে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় জাগরণমূলক যাত্রাপালা ‘বিদ্রোহী বুড়িগঙ্গা’ লিখেছেন আমিনুর রহমান সুলতান।

এটি তার প্রথম পালা হলেও সংলাপ রচনায় মাঝে-মধ্যে যাত্রাধর্মী কাব্যরস সৃষ্টি করতে পেরেছেন। যেমন- এক জায়গায় নবাব সিরাজ নর্তকীকে যখন বলছেন- ‘তা নর্তকীর আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তিকে বেছে নিয়েছ কেন?’ তখন নর্তকীর সংলাপ : ‘কোন কোন নর্তকীর পায়ের ঘুঙুরের খোড়লের ভিতর শুধু দুঃখই থাকে না জাহাঁপানা, মনের ভেতর বিবেক জেগে থাকে, জেগে থাকে দেশপ্রেমও।’

বিদ্রোহী বুড়িগঙ্গা ২০১৬ সালের ২ আগস্ট দেশ অপেরার পরিবেশনায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রথম মঞ্চায়ন হয়। নতুন পালাকারের নতুন পালা দেখার জন্য উপচে পড়া ভিড় ছিল মিলনায়তনে। প্রতিটি জাতীয় দৈনিকে এর মঞ্চায়ন সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।

এভাবে যাত্রাপালা রচনার পালাবদলের বাঁকে বাঁকে বাঙালির ‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষ’ বিস্ময়করভাবে যাত্রাপালায় বীরদর্পে এসে দাঁড়ালেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন আঙ্গিকে, ভাব ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত হয়েছেন গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, গানে।

কিন্তু তাকে নিয়ে যে কয়েকটি যাত্রাপালা রচিত হয়েছে, এ বিষয়টি নাগরিক সমাজের মধ্যে অনেকেরই অজানা। ‘অজানা’ শব্দটি আমি সচেতনভাবেই প্রয়োগ করলাম এজন্য যে, সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর অনুষ্ঠিত অনেক সভা-সেমিনারে যাত্রাপালায় জাতীয় জাগরণ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ- এসব প্রসঙ্গ একেবারেই ঢাকা পড়ে যায় (প্রবন্ধকার এসব ঘটনার সরাসরি সাক্ষী)।

এ যাবৎকালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত যাত্রাপালার সংখ্যা ১১। ৮টি পালা লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা, যেগুলো মঞ্চস্থ হয়েছিল- মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরবর্তীকালে কলকাতা এবং তার আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৯৬ থেকে ২০১১-এ ১৫ বছরের মধ্যে ৩টি পালা লিখেছেন বাংলাদেশের পালা লেখকরা।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নেই, সমস্যা সংকট লেগেই আছে একের পর এক, অন্যদিকে আবার স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় কখনও কখনও যাত্রা চলে যায় ভিন্ন খাতে। তবুও শিল্পটি টিকে আছে তৃণমূল মানুষের শক্তির জোরে। অনিশ্চয়তা ও অচলাবস্থার মধ্যে থেকেও এ দেশের যাত্রা কিছু কিছু বিষয়ে গর্ব করতে পারে। যেমন- স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘মাইকেল মধুসূদন’, ‘বিদ্রোহী নজরুল’, ‘নটি বিনোদিনী’- এসব জীবন কাহিনী আগে এসেছে যাত্রায়, পরে থিয়েটারে।

এ প্রসঙ্গে ডা. তপন বাগচী এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের থিয়েটার তথা নাগরিক নাট্য সমাজ যা পারেনি, যাত্রা তা পেরেছে। বঙ্গবন্ধু তো বটেই, হিটলার, লেনিন পালাও যাত্রায় এসেছে।’ নাটকের পাদপ্রদীপে আসার আগেই আলো ঝলমল যাত্রার আসরে উদ্ভাসিত হন আমাদের বঙ্গবন্ধু।

একবার নয়, বহুবার। আমাদের জানা মতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম নাটক লিখেছেন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ শফি। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ঈদ সংখ্যায়। এটি ঢাকার কোনো মঞ্চে আসেনি। তবে অন্যভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সফল নাট্য মঞ্চায়নের একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী লোকনাট্য দল। ফিজিক্যাল থিয়েটারের আঙ্গিকে মঞ্চায়িত ‘মুজিব মানে মুক্তি’ নাটকটি অসাধারণ সাফল্য বয়ে এনেছে গ্রুপ থিয়েটারকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায়। নাটকের গ্রন্থনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেন লিয়াকত আলী লাকী, যিনি আঙ্গিক ও বিন্যাসে সংস্কৃতির নব নব সৃজন ধারায় এই সময়ের এক আলোচিত নাম।

লিয়াকত আলী লাকী যাত্রাশিল্প চর্চায়ও ভূমিকা রেখেছেন। যাত্রাশিল্প নীতিমালা প্রণয়ন ও তার গেজেট প্রকাশ, শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনায় জাতীয় জাগরণমূলক ‘ঈশা খাঁ’ যাত্রাপালা মঞ্চায়ন এবং রেপার্টরি যাত্রাদল গঠন করে মুনীর চৌধুরী ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটককে যাত্রাপালার আঙ্গিকে মঞ্চে উপস্থাপন- এসব সৃজনকর্মের মধ্য দিয়ে যাত্রাকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়াসী হয়েছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যাত্রাপালা রচনার একটি প্রেক্ষাপট আছে। ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দেশের বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিকরা যেমন পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা, তেমনি একই উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পালা মঞ্চায়নের এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কলকাতার বিভিন্ন যাত্রাদলে।

স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থী শিল্পীরাও এসব পালায় অভিনয় করেন। একুশে পদকপ্রাপ্ত যাত্রানট অমলেন্দু বিশ্বাসের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে বহু বিলম্বে এবং সম্প্রতি বর্তমান প্রবন্ধকার আবিষ্কার করেন যে, তিনি (অমলেন্দু বিশ্বাস) ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গের একটি যাত্রাদলে অভিনয় শুরুর আগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৭১-এর ১৯ জুন এ সমিতি থেকে তাকে একটি প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়। আমাদের গর্ব করার মতো বিষয় যে, স্বাধীনতার ৪৬ বছরের মাথায় বর্তমান সরকার যাত্রানট অমলেন্দু বিশ্বাসকে মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রদান করেছে। ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর এ সনদপত্র দেয়া হয়, যার নং-২০৪৭৯৮।

বিষয়বস্তুর দিক থেকে পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, কাল্পনিক, সামাজিক, যুদ্ধ, জাগরণ- এভাবে যাত্রার পালাবদলে এক সময় ঠাঁই করে নেয় জীবন ও সাহিত্য। সংগ্রাম ও সংঘাতময় জীবন জীবনীমূলক পালা কিংবা নাটকের জন্য খুবই উৎকৃষ্ট উপাদান। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে নাটকীয় উৎকণ্ঠা (ক্লাইমেক্স), যা তার সংগ্রামী জীবনভিত্তিক পালা রচনায় পালাকারদের আলোড়িত করেছে।

১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন পশ্চিমবঙ্গে রচিত ও অভিনীত পালাগুলো হচ্ছে : মন্মথ রায়ের ‘আমি মুজিব নই’, নরেশ চক্রবর্তীর ‘সংগ্রামী মুজিব’, সত্যপ্রকাশ দত্তের ‘বঙ্গবন্ধু মুজিবুর’, ছবি বন্দোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গবন্ধুর ডাক’। ১৯৭২ সালে এই সিরিজের দুটি পালা হচ্ছে : ব্রজেন্দ্র কুমার দে’র ‘মুজিবের ডাক’ ও অরুণ রায়ের ‘আমি মুজিব বলছি’।

১৯৯৫ সালে কলকাতার যাত্রানট ও নির্দেশক মৃণাল কর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ পালা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল এখানে এটি মঞ্চায়ন করার, কিন্তু অনুমতিজনিত সমস্যার কারণে তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ১৯৯৬ সালে যশোরের চণ্ডী অপেরার মালিক সাধন মুখার্জী রচনা করেন ‘শতাব্দীর মহানায়ক’।

২০১১ সালে লেখা দুটি পালার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’, লিখেছেন ফরিদপুরের সদরপুর থানার বাবুরচর গ্রামের খন্দকার হারুন-উর-রশীদ। ‘বাংলার মহানায়ক’ নামে আরেকটি যাত্রাপালা রচনা করেন বর্তমান প্রবন্ধকার।

এর কয়েকটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (২০১১), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (২০১২), শিশু একাডেমি (২০১৬) ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও লোকজ মেলায় (২০১৬)। উপন্যাসের মতো করে বঙ্গবন্ধুর জীবন কাহিনী ‘ফাদার অব দ্য নেশান’ লিখেছেন ড. এএইচ খান। এটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে।

এ বইটি অবলম্বন করে এবং আরও কিছু গ্রন্থের সহায়তায় রচিত ‘বাংলার মহানায়ক’ যাত্রাপালা ২০১৫ সালে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়। এর ভূমিকা লিখেছেন রামেন্দু মজুমদার।

লক্ষ্য করার বিষয় যে, দু-একটি বাদে উল্লিখিত পালাগুলোর নামকরণ হয়েছে সরাসরি বঙ্গবন্ধু ও শেখ মুজিব নামে। এর বাইরেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বেশকিছু পালা আছে, যেখানে বঙ্গবন্ধু এসেছেন নানাভাবে। পালাগুলো হচ্ছে উৎপল দত্তের ‘জয় বাংলা’, নিরাপদ মণ্ডলের ‘মুক্তিফৌজ’, বিপিন সরকারের ‘মুক্তিসেনা’ এবং দিগিন্দ্র চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের ‘দুরন্ত পদ্মা।’ ‘দুরন্ত পদ্মা’ পালাটি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এটি সোভিয়েত দেশ-নেহেরু পুরস্কার লাভ করে।

সত্যপ্রকাশ দত্তের ‘বঙ্গবন্ধু মুজিবুর’ যাত্রাপালায় বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ এবং কয়েকটি রাজনৈতিক সংগ্রামের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭ মার্চের ভাষণটিও হুবহু রাখা হয়েছে এই পালায়। এটি মঞ্চস্থ হয়েছিল কলকাতার আর্য অপেরার ব্যানারে।

মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করছিলেন, সেই সময় যুদ্ধের নয় মাস রাতের পর রাত যাত্রামঞ্চে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতো বঙ্গবন্ধুর সেই রাজনৈতিক ছন্দময় কাব্য- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম....।’ মুজিব চরিত্রে অভিনয় করেন সে সময়ের পশ্চিমবঙ্গের শক্তিমান যাত্রাভিনেতা স্বপন কুমার। বাংলাদেশের মঞ্জুশ্রী মুখার্জি ছিলেন এক নির্যাতিত নারীর ভূমিকায়।

ব্রজেন দে’র ‘মুজিবের ডাক’ যাত্রাপালায় ছয় দফা আন্দোলন থেকে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকসেনাদের হাতে বন্দি হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের কিছু অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে দেখানো হয়েছে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং আরও কিছু ঘটনার আলোকে বঙ্গবন্ধু সব সময় ছিলেন উচ্চকণ্ঠ।

জীবনের কঠোর কঠিন যাত্রাপথে বাঙালি-মুক্তির সঠিক পথেরই সন্ধান করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শোষিত বঞ্চিত এ ভূখণ্ডের মানুষগুলোকে তিনি দিয়েছিলেন এক স্বতন্ত্র আবাসভূমি।

তাই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। এ শাশ্বত সত্যের আবেদন নাটকীয় ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে অরুণ রায়ের ‘আমি মুজিব বলছি’ পালায়। এখানে ৭ মার্চসহ বঙ্গবন্ধুর দুটি ভাষণ যুক্ত হয়েছে।

পলাশী প্রান্তরে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাবের শোচনীয় পরাজয় সম্পর্কে নাট্যকার শচীন সেনগুপ্তের একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে। ‘সিরাজউদ্দৌলা’ নাটকের ভূমিকায় লিখেছেন : ‘সিরাজের দেশপ্রেম, দয়া-দাক্ষিণ্য, মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালোবাসা তাকে নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

তার অক্ষমতাও নয়, অযোগ্যতাও নয়।’ এই দুটি বাক্যের প্রতিটি শব্দের যথার্থতা আমরা যথাযথভাবে প্রত্যক্ষ করি বঙ্গবন্ধুর নির্মল চরিত্রেও। মা-মাটি-মানুষের প্রতি তার যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল, এটা কোনোক্রমেই দাড়িপাল্লায় মাপা যাবে না। যে নেতা বারবার বলেছেন, ‘কাকে কী বলবো, যেদিকে তাকাই, সবাই আমার ভাই, বন্ধু।’ এই স্বদেশপ্রীতি ও মানবপ্রেমের কারণেই লক্ষ্যচ্যুত ভ্রষ্ট রাজনীতির শিকার হন তিনি।

কোনো কোনো জ্ঞানপাপীদের মতে দেশ পরিচালনায় অপারদর্শিতা কিংবা ব্যর্থতার জন্য নয়। এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিয়ে সাজানো হয়েছে গবেষণাধর্মী যাত্রাপালা ‘বাংলার মহানায়ক’। এই যাত্রাপালায় বঙ্গবন্ধুর একটি সংলাপ এ রকম (ইয়াহিয়া-ভুট্টোকে বলছেন)- ‘হ্যাঁ, আমি মুজিব বলছি।

আমার ছয় দফার মধ্যে বেজে ওঠে বাঙালির ঐকতান, ছয় দফা বাঙালির মুক্তি-সনদ, ছয় দফা বাঙালির বেঁচে থাকার অস্তিত্ব’ (প্রথম অঙ্ক ৪র্থ দৃশ্য)। যাত্রাপালায় বঙ্গবন্ধু এসেছেন ভিন্ন আঙ্গিকেও। ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিল্পগুণসম্পন্ন একটি যাত্রাপালার নাম ‘গঙ্গা থেকে বুড়িগঙ্গা।’

এটিও কলকাতয় মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রচনা। পালাকার শান্তিরঞ্জন দে। এই পালার বিশেষত্ব হচ্ছে সোনারগাঁয়ের অধিপতি সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্কে উপস্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতীকী চরিত্র হিসেবে। গল্পে দেখা যায়, দিল্লির সম্রাট ফিরোজ শাহ্ তুঘলক সসৈন্যের অতর্কিতে বাংলা আক্রমণ করলেন। সাম্রাজ্যবাদী চক্রের এই হামলা প্রতিহত করতে গর্জে উঠলেন সুলতান।

স্বাধীনতা রক্ষার উদাত্ত আহ্বান জানালেন দেশপ্রেমিক জনতাকে- ‘আমার জান কুবল। সোনারগাঁও, সাতগাঁও, ঢাকা-তিন অঞ্চলজুড়ে আমি গড়ে তুলব এক অখণ্ড দেশ, যার নাম হবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। যে দেশের মানুষ একই সুরে গান গাইবে, একই ভাষায় কথা বলবে, একই কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে জয়ধ্বনি দেবে স্বাধীন বাংলার জয়।’

সোনারগাঁওয়ের এই ঘটনার প্রায় সাড়ে ছয়শ বছর পর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের প্রস্তুতির ঘোষণা দিলেন এভাবে- ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর।’

এই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন পালাকাহিনীতে আমরা দেখি, বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুখে তুলে দিয়েছেন ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। বাংলার মাটি থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জয় বাংলা’ কখনও মুছে যাবে না। যাত্রাপালার সুরে ও ছন্দে এই সত্যকথন বারবার ঘুরে-ফিরে এসেছে।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এভাবে : ‘বাংলার পাখির গানে, নদীর কলতানে, বাতাসের উচ্ছ্বাসে, আকাশের গরিমায়... তিনি চিরকালের জন্য জাগ্রত, জীবন্ত।’ ‘বাংলার মহানায়ক’ যাত্রাপালায় বঙ্গবন্ধু-পত্নী আমাদের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা (রেণু) বিপথগামী সেনাসদস্যদের ঠিক এভাবেই বলেছেন- ‘তোমরা আমাদের মেরে ফেলতে পার, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পার, তবে মনে রাখবে বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধুর নাম তোমরা মুছে ফেলতে পারবে না। বাংলার মানুষ তাকে স্মরণ করবে চিরদিন, অনন্তকাল। তার বজ কণ্ঠ কখনও থামবে না।’

‘তার বজ কণ্ঠ কখনও থামবে না’- যাত্রাপালায় বঙ্গমাতার এই সংলাপটি এখন আরও চিরন্তর সত্য হয়ে উঠেছে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব প্রমাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতিদানের মধ্য দিয়ে।

মহান নেতার অনলবর্ষী বক্তৃতার গগনস্পর্শী শব্দ তরঙ্গ ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আছড়ে পড়েছে সাত সাগর আর তেরো নদীর পাড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে ভাষণটি এখন কালোত্তীর্ণ ও শিল্পমানের মর্যাদায় মহাকালের ইতিহাসে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছে। আর ‘যুগস ষ্টা রাজনৈতিক কবি’ হিসেবে অবিসংবাদিতভাবে স্বীকৃত হয়েছেন আমাদের বঙ্গবন্ধু।

উপসংহারে প্রবন্ধকার কিছু সুপারিশ পেশ করছে, যার বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিতে পারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

১. বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুবিষয়ক যাত্রাপালা সংগ্রহ, সংরক্ষণ কয়েকটি খণ্ডে প্রকাশের ব্যবস্থা করা।

২. যেসব যাত্রা দল মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে রচিত পালা মঞ্চায়ন করছে তাদের আর্থিক অনুদান প্রদান।

৩. মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় জাগরণের ওপর রচিত যাত্রাপালা নিয়ে যাত্রা উৎসবের আয়োজন করা।

৪. যাত্রাপালা রচনা ও নির্মাণে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পেশাদার যাত্রাশিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ নাট্যকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা।

৫. যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগ আছে সেখানে যাত্রা অন্তর্ভুক্ত এবং বিষয় সূচিতে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে যাত্রা বক্তৃতা ও যাত্রা মঞ্চায়নের আয়োজন করা।

৬. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে নিবন্ধনপ্রাপ্ত দলগুলো যাতে সুষ্ঠু ও শৈল্পিক পরিবেশে বিভিন্ন স্থানে পালা মঞ্চায়ন করতে পারে সে জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যেক জেলা প্রশাসনে প্রজ্ঞাপন জারি করা।

জাতীয় রাজনীতিতে এখন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি চলছে। এখনই সময় জঙ্গি সন্ত্রাস ও সব অপশক্তি প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই শুরু করা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সব অশুভ তৎপরতা প্রতিহত করতে হবে এখনই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সমাগত।

এখনই তো সময় বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা মহামানবের ওই অবিনাশী কণ্ঠ আমাদের ধারণ করা কী নাটকে, কী যাত্রায়। নতুন প্রজন্মের জন্যও খুবই প্রয়োজন পাদপ্রদীপের আলোয় বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনগাথা উপস্থাপন করা। তারা বঙ্গবন্ধুকে জানবে, দেখবে এবং শুনবে বাঙালির দেহে-প্রাণে শক্তি সঞ্চারকারী বজ কণ্ঠের সেই চিরায়ত সংলাপ- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

লেখক : গবেষক ও সভাপতি, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ

ঘটনাপ্রবাহ : যুগান্তর বর্ষপূর্তি-১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.