পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং তার আগের ইতিহাস

  রেজাউল করীম ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং তার আগের ইতিহাস
পলাশীর প্রান্তর

কে বড় বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর, হাজী আহমদ না আলিবর্দী খান? এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য এ লেখা। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলী খান ১৭২৭ সালের ৩০ জুন মৃত্যুবরণ করলে তার জামাতা শুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার নবাব হন।

এর আগে তিনি উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। মুর্শিদকুলী খানের কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় শুজাউদ্দিন নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন। প্রশাসনে শুজাউদ্দিনের বড় কৃতিত্ব হল উপদেষ্টা কাউন্সিল (Advisory Council) গঠন।

এ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন আলিবর্দী খান, হাজী আহমদ, জগৎশেঠ ও আলমচাঁদ। এদের মধ্যে আলিবর্দী খান ও হাজী আহমদের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তাদের জন্ম হয় দিল্লিতে। আওরঙ্গজেবের সময়ে। তাদের পিতা আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা আজম শাহের অধীনে চাকরি করতেন।

আজম শাহ হাজী আহমদ ও আলিবর্দীকেও চাকরি দেন। কিন্তু উত্তরাধিকার যুদ্ধে আজম শাহ পরাজিত ও নিহত হলে আলিবর্দীর পরিবারে দুর্যোগ নেমে আসে এবং দুস্থ হয়ে পড়ে। এমন সময় আলিবর্দী উড়িষ্যার ডেপুটি গভর্নর শুজাউদ্দিনের শরণাপন্ন হন। আলিবর্দীর মায়ের দিক দিয়ে শুজাউদ্দিন দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন।

১৭২০ সালে আলিবর্দী স্ত্রী ও তিন কন্যাসহ শুজাউদ্দিনের কাছে উপস্থিত হলে তিনি তাদের সাদরে গ্রহণ করেন। আলিবর্দীর প্রকৃত নাম ছিল মির্জা বন্দে বা মির্জা মুহাম্মদ আলি।

শুজাউদ্দিন তাকে আলিবর্দী খান উপাধি দেন। অল্পকাল পর আলিবর্দীর ভাই হাজী আহমদও তার তিন ছেলেকে নিয়ে শুজাউদ্দিনের কাছে আসেন। তিন ছেলের নাম মুহাম্মদ রেজা পরে নওয়াজিস মুহাম্মদ খান, মুহাম্মদ সাঈদ পরে সাঈদ আহম খান এবং মুহাম্মদ হাশিম পরে জৈনুদ্দিন আহমদ খান।

হাজী আহমদ শুজাউদ্দিনের প্রধান পরামর্শক হিসেবে রাজধানী মুর্শিদাবাদে অবস্থান করেন। বড় ছেলে সেনাবাহিনীর বকশী এবং মুর্শিদাবাদের শুল্ক ভবনের তত্ত্বাবধায়ক, দ্বিতীয় ছেলে রংপুরের ফৌজদার এবং তৃতীয় ছেলেকেও ফৌজদারের পদ প্রদান করা হয়।

হাজী আহমদের জামাতা আতাউল্লাহ খান এক সময় রাজমহলের ফৌজদার নিযুক্ত হন। আলিবর্দী খান প্রথমে রাজমহলের ফৌজদার রূপে চাকরি নেন এবং ১৭৩৩ সালে সুজাউদ্দিন তাকে বিহারের ডেপুটি গভর্নরের পদে অধিষ্ঠিত করেন।

নবাব শুজাউদ্দিন কাউন্সিলর সদস্যদের গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি ১৭৩৯ সালের ১৩ মার্চ তার ইন্তেকালের পর তার পুত্র সরফরাজ খান ‘আলাউদ্দৌলা হায়দার জঙ্গ’ উপাধি ধারণ করে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব পদে অধিষ্ঠিত হন।

মৃত্যুশয্যায় শুজাউদ্দিন পুত্র সরফরাজ খানকে নবাবী পরিচালনার ব্যাপারে কিছু উপদেশ দেন। তার মধ্যে একটি হল, শাসনকার্যে বিভিন্ন বিভাগের প্রবীণ কর্মকর্তাদের স্ব স্ব পদে বহাল রাখা। প্রবীণ কর্মকর্তাদের অন্যতম ছিলেন হাজী আহমদ, আলিবর্দী খান এবং আলমচাঁদ।

সরফরাজ খান পিতার উপদেশ পালন করে প্রবীণ কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা রক্ষা করে শাসনকার্য পরিচালনায় ব্রতী হন। কিন্তু পিতা-পুত্র কেউ ওই প্রবীণ লোকদের আসল চেহারা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। সরফরাজ খান পিতার মতো তাদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি নিজে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে থাকেন।

আলিবর্দী খান ছিলেন অতিশয় উচ্চাভিলাষী। তিনি সরফরাজ খানকে সরিয়ে নিজে মুর্শিবাদাদের মসনদ দখল করার পরিকল্পনা করেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তার বড় ভাই হাজী আহমদ। তিনি আলিবর্দীর এজেন্টরূপে কাজ করতে থাকেন।

হাজী আহমদ উপদেষ্টা কাউন্সিলের অন্য দুই সদস্য আলমচাঁদ ও জগৎ শেঠকে নিজের বাগে আনেন। হাজী আহমদের কাজ ছিল আলিবর্দী ও তাদের পরিবারের সবার স্বার্থ রক্ষা করা এবং উন্নতির পথ সুগম করা।

এদিকে ১৭৩৯ সালে নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করে রাজধানীর অনেক স্থাপনা বিধ্বস্ত করে দেন। দিল্লির সম্রাট মুহাম্মদ শাহও তখন অসহায় এবং দিশাহারা। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ওই সময়ে বাংলায় কোনো বিদ্রোহ দেখা দিলে দিল্লির সম্রাটের পক্ষে তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল না।

আলিবর্দী খান এ সময়টাকেই মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করার উপযুক্ত সুযোগ মনে করে ষড়যন্ত্র করা শুরু করেন। তাদের এ গোপন ষড়যন্ত্র একেবারে গোপন থাকেনি। সরফরাজ খানের কয়েকজন কর্মকর্তা তা বুঝতে পেরে বিষয়টি নবাবকে অবহিত করেন। এদের মধ্যে ছিলেন হাজী লুৎফে আলি, মীর মর্তুজা, মর্দান আলি খান এবং আরও কয়েকজন।

সফরাজ খান এ ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কথা জেনে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোগী হন। তিনি বিহারের ডেপুটি গভর্নরের পদে আলিবর্দীর জায়গায় নিজ জামাতা সৈয়দ মুহম্মদ হোসেন খানকে, তোলয়াগড়ি ও সিকরিগলি গিরিপথ ও রাজমহলের ফৌজদার পদে হাজী আহমদের জামাতা আলাউল্লাহ খানের জায়গায় মীর শরীফউদ্দিনকে এবং দিউয়ানের পদে রায় রায়ানের পরিবর্তে যশোবন্ত রায়কে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

কিন্তু এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগেই কাউন্সিল সদস্যরা কৌশলে নিজেদের দীর্ঘকালের চাকরি, রাজস্বের বিপুল অনাদায়ী এবং তাদের নিজেদের ক্ষতির কথা বলে বাৎসরিক হিসাব-নিকাশ তৈরি ও শেষ করার জন্য তিন মাস সময় প্রার্থনা করেন। সরল বিশ্বাসী সরফরাজ খান তাদের ফাঁদে পা দেন এবং তিন মাস সময় মঞ্জুর করেন।

ষড়যন্ত্রকারীরা এতেই ক্ষান্ত হননি। তারা রাজকোষে অর্থের অভাবের অজুহাতে সরফরাজ খানকে সৈন্য সংখ্যা হ্রাস করতে রাজি করান। তারা যুক্তি দেন যে, রাজ্যের রাজস্ব সম্পদ সীমিত হয়ে পড়লেও রাজস্ব ব্যয় অনেক বেশি। তাই তারা সৈন্য সংখ্যা হ্রাস করতে পরামর্শ দেন। সরফরাজ খান তাদের পরামর্শ গ্রহণ করে সৈন্য ছাঁটাই করতে থাকেন।

এদিকে ছাঁটাইকৃত সৈন্যদের আলিবর্দী খান নিজ দলে ভর্তি করতে থাকেন। এতে সরফরাজ খানের সৈন্য সংখ্যা হ্রাস পায় এবং আলিবর্দী খানের সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে আলিবর্দী খান সম্রাটের দরবারে এজেন্ট নিয়োগ করেন। সম্রাটের উজির ইসহাক খান ছিলেন আলিবর্দীর বন্ধু।

তার মাধ্যমে তিনি সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবাদারি লাভের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। বিনিময়ে তিনি সম্রাটকে দেয় রাজস্বের অতিরিক্ত এক কোটি টাকা দেয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি ইসহাক খানকে লিখবেন যে তিনি যেন সম্রাটের অনুমতি নেন যাতে বলপ্রয়োগ করে হলেও তিনি মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করতে পারেন।

আলিবর্দী খান সব প্রস্তুতি ও সতর্কতা গ্রহণ করে ১৭৪০ সালের মার্চে বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে পাটনা থেকে মুর্শিবাদাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি অবশ্য প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, তিনি নবাব সরফরাজ খানের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে সম্মান প্রদর্শনের জন্য যাত্রা করেছেন।

তিনি দ্রুতগতিতে তেলিয়াগড় ও সিকরিগলি গিরিপথ অতিক্রম করে বাংলার সীমান্তে উপস্থিত হন। ওই গিরিপথদ্বয় এবং রাজমহলের ফৌজদার ছিলেন হাজী আহমদের জামাতা আতাউল্লাহ খান। তিনি তার শ্বশুরের আদেশ মতো কাজ করেন যাতে কোনো দূত বা সংবাদবাহক বা গুপ্তচর এ অঞ্চলে ঢুকতে না পারে। ফলে আলিবর্দী খান যে বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে বাংলার দিকে ধাবিত হচ্ছেন সে সংবাদ যথাসময়ে নবাবের কাছে পৌঁছেনি। এ সংবাদ নবাবের কানে গেলে তিনি ঘাবড়ে যান।

তারপরও নবাব সরফরাজ খান সঠিক ও ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হাজী আহমদকে বন্দি করেন। আলমচাঁদ তখনও তাকে কুপরামর্শ দেন যে, আলিবর্দী খান তাকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য মুর্শিদাবাদে আসছেন। কিন্তু সরফরাজ খান তার কথায় কর্ণপাত না করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন।

তখনও তার বাহিনীতে বেশ কিছু সাহসী যোদ্ধা এবং ফৌজদার ছিলেন। আলিবর্দীর তুলনায় তার বাহিনী কোনো অংশে দুর্বল ছিল না। আলিবর্দীকে মোকাবেলার উদ্দেশ্যে তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে যাত্রা শুরু করেন। গিরিয়ার কাছে পৌঁছে তিনি দেখেন যে, ষড়যন্ত্রকারীদের পরামর্শে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অস্ত্রাগারে গোলার পরিবর্তে ইটের টুকরা এবং কামানের ভেতর ধুলোবলি ভরে রেখেছে।

গোলন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন হাজী আহমদ ও আলিবর্দী খানের ভাই শাহরিয়ার খান। তাকে তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত ও বন্দি করা হয়। তদস্থলে পর্তুগিজ এন্টনির পুত্র পাঞ্জুকে নিয়োগ দেয়া হয়। গিরিয়ার প্রান্তরে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে আলিবর্দীর বাহিনী বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত পরাজয়ের সম্মুখীন হয়।

এমন সময় ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম আলমচাঁদ তার মনিবকে পরবর্তী দিন পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের পরামর্শ দেন। কেননা গ্রীষ্মের দুপুরে যুদ্ধ চালালে সৈন্য ও অশ্ব উভয়ই অতিরিক্ত গরম ও পানির পিপাসায় মরতে থাকবে। তাই তখনকার মতো যুদ্ধ বন্ধ করে পরদিন সকালে আবার যুদ্ধ শুরু করলে শত্রুকে সহজেই পরাজিত ও ধ্বংস করা যাবে।

আলমচাঁদের পরামর্শে সরফরাজ খান যুদ্ধ বন্ধের আদেশ দেন। প্রতিপক্ষের পরাজয় নিকটবর্তী বুঝতে পেরে তার সেনাপতিরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। কিন্তু সরফরাজ খান তাদের শাস্তির ভয় দেখান। ফলে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রত্যাশিত বিজয়ও হাতছাড়া হয়ে যায়।

এ সুযোগে আলিবর্দী খান আবারও কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি নবাবকে চিঠি লিখে জানান যে, তিনি নবাবের অনুগত। তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই, তিনি শুধু তার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে সম্মান প্রদর্শন করবেন। সরফরাজ খান চিঠির প্রত্যেকটি শব্দ বিশ্বাস করে ফেলেন। তিনি খুশি হন।

হাজী আহমদকে মুক্তি দেন এবং তাকে আলিবর্দী খানকে স্বাগত জানানোর জন্য পাঠিয়ে দেন। আলিবর্দী খানকে দরবারে আসার অনুমতি দেয়া হয়। হাজী আহমদ ও তার অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের বন্দিতে আলিবর্দী খান চিন্তিত ছিলেন। হাজী আহমদের মুক্তিতে তিনি চিন্তামুক্ত হন।

সরফরাজ খান অবশ্য শুজাকুলী খান ও খাজা বসন্ত নামক দু’জন বিশ্বস্ত কর্মকর্তাকে আলিবর্দীর শিবিরে পাঠান। তাদের আদেশ দেয়া হয় তারা যেন আলিবর্দীর শিবিরের হালহকিকত পর্যবেক্ষণ করেন এবং যুদ্ধ বা শান্তি সম্পর্কে আলিবর্দীর মনোভাব জানতে চেষ্টা করেন।

তাদের সামনে আলিবর্দী খান ইটভর্তি একটি বাক্স স্পর্শ করে বলেন, এর মধ্যে পবিত্র কোরআন শরিফ রয়েছে। এ কোরআন শরিফের বাক্স স্পর্শ করে বলছি আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। তিনি পরদিন সকালে নবাব সমীপে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করবেন এবং তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।

শুজাকুলী খান ও খাজা বসন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে আসেন এবং নবাবকে জানান যে আলিবর্দী খান সম্পূর্ণ অনুগত এবং তার খারাপ কোনো উদ্দেশ্য নেই। তিনি আপনাকে কুর্নিশ করতে আসবেন। নবাব এ খবর শুনে অত্যন্ত খুশি হন এবং ভূরিভোজ ও পানাহারের আয়োজন করার নির্দেশ দেন। সরফরাজ খান এবং তার সেনাপতিরা ভূরিভোজ ও পানাহার করে নিশ্চিন্ত চিত্তে ঘুমিয়ে পড়েন।

পরবর্তী সকাল হওয়ার আগেই আলিবর্দী খান ১৭৪০ সালের ৯ এপ্রিল রাত দুইটার সময় সসৈন্যে সরফরাজ খানের শিবিরের দিকে যাত্রা করেন এবং খুব ভোরে নবাব বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।

সরফরাজ খান তার ভুল বুঝতে পারেন। তখন তার করার কিছুই ছিল না। তবুও তিনি যুদ্ধ ক্ষেত্রে গমন করেন এবং সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। হঠাৎ একটি গুলি এসে তার কপালে বিদ্ধ হয় এবং তিনি মারা যান। তার অনেক লোকবল ক্ষয় হয়। গিরিয়ার যুদ্ধে আলিবর্দী খান জয়লাভ করেন এবং বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার সুবাদারি এবং মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করেন।

আলিবর্দী খানের ক্ষমতা দখলে যারা সহযোগিতা ও ষড়যন্ত্র করেছেন তাদের অন্যতম হলেন হাজী আহমদ, আলমচাঁদ, জগৎ শেঠ।

অথচ সরফরাজ খান আলিবর্দী খান, হাজী আহমদ, আলমচাঁদ বা জগৎশেঠ কারও প্রতি কোনো থরনের মানহানিকর ও স্বার্থহানির কোনো কাজ করেছেন বা তাদের কোনোভাবে অসন্তুষ্ট বা অপমানিত করেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায় না।

স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা এসব করেছেন। অথচ তারা ভুলে যান যে, সরফরাজ খানের পিতা সুজাউদ্দিনের অনুগ্রহে ও দয়ায় তারা চাকরি পেয়েছেন, স্ব স্ব পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং শরফরাজ খান তা বহাল রেখেছেন। তাদের কার্যকলাপ একটা চরম অকৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসঘাতকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আমরা মীরজাফরকে বিশ্বাসঘাতক বলি। মীরজাফর পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে নির্বিকার দাঁড়িয়েছিল। তিনি কোনো পক্ষেই যুদ্ধ করেননি বা কাউকে হত্যা করেননি। তিনি ছিলেন আলিবর্দী খানের ভগ্নিপতি এবং সেনাপতি। তারও ইচ্ছা ছিল নবাব হওয়ার। কারণ তিনি মনে করতেন যে, তিনি সিরাজউদ্দৌলার চেয়ে সিনিয়র।

এ ছাড়া সিরাজের দুর্ব্যবহারে তার আত্মীয়স্বজন, সভাসদরা ছিল অপমানিত এবং বিরক্ত। এ জন্য তারা সিরাজের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু সরফরাজ খান কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন এমন প্রমাণ মেলে না। তারপরও পলাশী প্রান্তরে মীরজাফর যা করেছে তা অবশ্যই দায়িত্বহীনতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা।

তারপরও প্রশ্ন জাগে, মীরজাফর যদি বিশ্বাসঘাতক হয় তা হলে আলিবর্দী খান, হাজী আহমদ, আলমচাঁদ কি কম বিশ্বাসঘাতক? পাঠকদের কাছেই এর বিচারের ভার রইল।

লেখক : অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ

ঘটনাপ্রবাহ : যুগান্তর বর্ষপূর্তি-১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter