কবিতায় পাঠকের বিচ্ছিন্নতা

  মতিন বৈরাগী ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বহুকাল থেকে কবিতা সুরে ছন্দে দোলায় রচিত [যদিও আজকে তার রূপ বদলেছে] হয়ে মানুষের প্রকাশের আনন্দে মানুষেরই প্রেরণা, আশা ও আশ্বাস হয়ে মানুষকেই আহ্লাদিত করেছে। কবিতা মূলত ব্যক্তির প্রকাশ, ‘ব্যক্তি যিনি ব্যক্ত হন’ ‘রবীন্দ্রনাথ’। কবি ব্যক্ত হন তার প্রকাশের মধ্য দিয়ে, ব্যক্ত হন তার পাঠকের কাছে, তার সমাজে। সমাজ জীবনে বিচরণশীল পাঠক যিনি পাঠ করেন, শোনেন, শোনান তিনিও ব্যক্ত হন তার নিজস্ব প্রিয়তার মধ্যে। তৈরি হয় আরেকটি কবিতা, তা হয়তো লিখিত রূপ পায় না; কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে আর কেউ বা কোনোর মধ্যে। কবিতা আদি শিল্প, আদিতে যা ছিল কেবল বিষয়যুক্ত পরবর্তিতে ভাব আর বর্তমানে ভাব, বিষয় ও প্রকাশের এক সমন্বিত রূপের এ শিল্পটিই সেই কাল থেকে সমাজে রাষ্ট্রে, সাম্রাজ্য শাসকের বাণীতে, আইনে, নিয়মে, ঘোষণায়, ধর্মগন্থে, সুর ছন্দ-সঙ্গতিতে বিস্তৃত হয়ে আছে। কত যুগ এর মধ্যে পাড় হয়ে গেছে, কত সময়ের ঝড়ে ঝাপটায় হত্যায় ধ্বংসে কেটে গেছে, কত মানুষ হয়েছে বলিদান- তবু মানুষ উঠে দাঁড়িয়েছে, আপন বিকাশে, আপন প্রয়োজনে শুরু করেছে জীবন অভিযান, কবিতাও তার সঙ্গী হয়েছে। শুধু কবিতা কেন সব শিল্প সৃজনই এমন উদ্দীপনা-উদ্দীপ্ত করেছে মানুষকে। তাকে অবগত করিয়েছে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, তার চিন্তা-চেতনা তার সংস্কৃতির অতীত ও বর্তমান দূর বর্তমান রূপ। রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্য প্রবন্ধে লিখেছেন ‘নিজের অন্তরে একটি মানবপ্রকৃতি আছে এবং লেখকের বাইরে সমাজে একটি মানবপ্রকৃতি আছে। অভিজ্ঞাসূত্রে প্রীতিসূত্রে এ নিগূঢ়ক্ষমতায় এ উভয়ের সম্মিলন হয়; এ সম্মিলনের ফলেই সাহিত্য নতুন নতুন প্রজা জন্মগ্রহণ করে। সেসব প্রজার মধ্যে লেখকের আত্মপ্রকৃতি এবং বাইরের মানবপ্রকৃতি দুইই সমন্ধ হয়ে আছে, নইলে কখনোই জীবন্ত সৃষ্টি হতে পারে না।’ আবার ব্যক্তি ভিন্নতার প্রকাশ ভিন্নতা সৃষ্টি করে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘কালিদাসের দুষ্মন্ত-শকুন্তলা আর মহাভারতকারের দুষ্মন্ত-শকুন্তলা এক নয়, তার প্রধান কারণ কালিদাস এব বেদব্যাস এক লোক নন’। তাই কবিতা বিষয় এক হলেও ভিন্ন ভিন্ন কবির সৃজনে তার রূপ রস ও সৌন্দর্য আলাদা হয়ে ফোটে। কিন্তু এ ফোটা যদি মানবপ্রকৃতির বাইরের হয় এবং সমাজসত্তার বাইরের সৃষ্টি হয়, তাকে পাঠক গ্রহণ করতে পারে না; কারণ তার নিজ বুদ্ধি উপলব্ধি প্রয়াস গণ্ডিকে অতিক্রম করে নতুন হয়ে নতুনকে গ্রহণে প্রস্তুত থাকে না। সেখানেই কবি ও পাঠকের বিচ্ছিন্নতা। সাহিত্যিক কবির প্রথম কাজ হচ্ছে সাহিত্যকে সফল করা। কাব্যকে কাব্য হিসেবে উত্তীর্ণ করা। বিজড়িত থাকা প্রতিশ্রতিবদ্ধ থাকা।

কবিতা ফুটেছে কবির হাতে ভাষায়, পথিকের মুখে পথে, হোমারের পথচারণগীতে, গীতিগাঁথায়। চারণ কবিদের একতারায়। কবিতা সময়কে অতিক্রম করেছে, সময়ের সাহস কে ধারণ করেছে এবং মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করতে ভাষা-উচ্চারণ হয়ে অতৃপ্তকে তৃপ্ত করেছে, অসুন্দরকে সুন্দর রূপে রূপ দিয়েছে। বনবাসী হয়েছে, পালিয়েছে, দেশান্তরী হয়েছে, শাসকের ক্রুদ্ধতায় পড়েছে শাস্তি ভোগ করেছে, জীবন দিয়েছে। আবার প্রেরণা হয়ে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছে। এমনি বহু পথ পরিক্রমায় মানুষ যেমন পেছনকে ফেলে প্রাচীন সময়কে ফেলে বিশ্বাসের বহু ভঙ্গুরতাকে ঠেলে সামনে এসেছে বদল করে নিয়েছে রূপ ও রূপলাবণ্যকে তেমনি কবিতাও বদলিয়েছে তার শরীর তার নির্মাণ তার আকার তার আকৃতি। সেই আগের ভাব ভাবনা চিন্তাচেতনা যেমন আজকে বদলে নিতে হচ্ছে বা বদলে যাচ্ছে বিজ্ঞান দর্শন ইতিহাসের কালখণ্ড তেমনি কবিতাও রুচিতে অভ্যেসে প্রজ্ঞায় প্রসারে বদলে নিচ্ছে তার শরীর। আধুনিক মনস্ক শিল্প সত্তায়। নিকট অতীতের যেমন অনেক কবি বেঁচে নেই তেমনি নিকট সময়ের বহু কবিতাও আর টিকে নেই। আবার দীর্ঘ অতীতের অনেক কবি যেমন জীবিতই আছেন তার কবিতার মধ্য দিয়ে আবার মরেও গেছেন কবিতা নিয়েই। যারা বেঁচে আছেন কারণ তাদের সেই কবিতার মর্মবাণী সেইকাল থেকে এই কালেও তার রূপ নিয়ে তার সুর নিয়ে তার শিল্প ও নন্দন নিয়ে পাঠকের মনকে তৃপ্ত করতে পারছে, আমোদিত করতে পারছে, এখনও আশা হতে পারছে, সান্ত্বনার পাখা হয়ে বাতাস দিতে পারছে- অতৃপ্ত আত্মাকে। কবিতা যখন মানুষের হয় তখন মানুষও কবিতার হয়ে কবিতার কথা বলে। আর কবিতা যখন কেবল কাব্যকৈবল্যবাদীতায় ডোবে তখন পাঠকও তা থেকে বিযুক্ত হয়। যেমন সমাজ তার স্বভাব দ্বারা, তার আচরণ দ্বারা তার রাজনীতিদ্বারা কলুষিত হলে সমাজের শান্তি-স্থিতি বিঘিœত হলে ব্যক্তি আর তার সঙ্গে তাল রাখতে পারে না, সে বিযুক্ত হয়, তেমনি কবিতা আশা পূরণ না করতে পারলে পাঠকও কবিতা থেকে সরে পড়ে, সটকে পড়ে। তখন কথা ওঠে কবিতা মানুষ পড়ে না, কবিতা শুধু কবিরাই পড়ে।

২.

কবিতার মূল বিষয় কেবল সুন্দর নয়, সত্যের সুন্দরই কবিতার সুন্দর। অনেকে মনে করেন কবিতার কোনো সত্য নেই, শিল্পের সত্য শিল্পে কথাটি কতকটা উন্নসিক মানসিকতাকেই প্রকাশ করে কারণ জগতের কোনো কিছু কোনো প্রয়োজন কোনো অনুসন্ধান কোনো আবিষ্কার কোনো নির্মাণ অনর্থক অকারণ নয়, এর উদ্দেশ্য আছে একটা রাজনীতি আছে। যারা তা’ বলে তারা আসলে এক ধরনের রাজনীতিই বলে, বলে কখনও জেনে কখনও অসচেতন হয়ে। এ অসচেতনতা কতভাবে কত রকমে মানুষের আশা আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে মানুষকে তার চেতনা থেকে বিচ্যুত করে তা ওই কবিরা, লেখকরা, শিল্পীরা অনুভব করে না বা করতে চায় না; কারণ তার লক্ষ থাকে কৃপা পাওয়ার ফিকিরে-ফন্দিতে। তাই সে উপাধি দেয় উপাধি নেয়। আর সে যে সৃষ্টি করে তা হল ভোগবাদিতার পূজা, তাতে জনগণের প্রত্যাশা থাকে না, তাদের সম্পৃক্ততাও থাকে না সে হয় এমন এক সৃষ্টি যা তাকে ঘুম পাড়ায়, নেতিয়ে দেয় এবং অর্থহীন এক ভাষার পাহাড়ে আড়াল করে। ফলে কবিতা আর কবিতা থাকে না। এমনিতেই কবিতা গভীর গূঢ়জ্ঞানকে নানা কাব্যিক শৈলীতে উপস্থাপন করে যা মূলত প্রকাশিত হয় কবির মনের উদ্দীপনাকে সঙ্গী করে এক দেহগঠন নিয়ে যে প্রকৃত বস্তু নয়, বস্তুর নতুন একরূপ যা বস্তু নয়, বস্তু থেকে উৎপন্ন এক আবেগ কবির কল্পনা ও প্রজ্ঞায় মিলে অন্তর প্রকাশে রূপবান হয়েছে তাতে রয়েছে কেবল একটি প্রতিভাস একটা ইমেজ নির্মাণের, নানা কৃতকৌশল প্রয়োগের। তাই সে বুদ্ধির গম্যতায় না থাকলে পাঠক আর আগ্রসর হতে পারে না। কবিতা পাঠক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।

৩.

সাধারণ যুক্তি থেকে কাব্যের যুক্তি পৃথক। সিজারোত্তির মতো হল ‘প্রকৃতিকে উন্নত মানের মর্যাদা দেয়ার মাধ্যমে প্রাণবন্ত চিত্রময় কল্পনা সমৃদ্ধ এবং সমন্বয় মুখর যে আলোচনা তাই হল কাব্য বা শিল্প’। বামগার্টেনের ছাত্র মেনডেলসন ‘সুন্দরকে বস্তুর ত্রুটিহীন রূপের অপরিচ্ছন্ন প্রতির্চ্চারূপে কল্পনা করলেন এবং বললেন যে ভগবানের পক্ষে সুন্দরকে প্রত্যক্ষ করা কখনই সম্ভব নয়, কেননা সুন্দর হল মানুষের অপূর্ণতার একটি দৃষ্টান্ত। তার মতে, সুখের প্রাথমিক রূপ হল ইন্দ্রিয়গত এবং আমাদের শারীরিক সুস্থতার আধিক্য থেকে জাত। সুখের মাধ্যমিক রূপটুকু হল ইন্দ্রয়জাত সুন্দর এবং তাকেই নন্দতাত্ত্বিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন’। এভারহার্ড মনে করতেন যে, তাই হল সুন্দর যা আমাদের নির্দিষ্ট ইন্দ্রিয়গুলোকে সুখ দেয়। অর্থাৎ চোখ-কান এ দুটি ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন করে’ এমনি নানা মত কবিতার ক্ষেত্রে তৈরি হয়ে থাকলেও একটি মতকে গ্রহণ করতেই হবে যে কবিতা সমাজ জীবনের তার লাগাতার সংগ্রামের জমাটবদ্ধ ইতিহাস, যা বলেছেন কডওয়েল তার ইলিউশন অ্যান্ড রিয়েলিটি গ্রন্থে।

বাস্তব হল এই যে কেন সৃষ্টি তার ভোক্তা থেকে দূরে থাকে এবং একটি দীর্ঘ ইতিহাস সমৃদ্ধ সৃষ্টিশীল কাজ কেন অধিক মানুষের কাছে যেতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না। ‘জয় বাংলা স্লোগান কোটি’ মানুষ গ্রহণ করল, আর একটি কবিতা কেন দুই-একশ’ লোক পড়ছে না বা গ্রহণ করছে না এটা ভাবা কেবল একজন কবিরই দায়িত্ব নয় তা নয় অবশ্য এখানে সামাজিক শক্তি বা উৎপাদিকা শক্তিরও ভূমিকা রয়েছে। উৎপাদিকা শক্তি যদি হয় লুটেরা, আধিপত্যবাদী এবং তারা যদি নিজ দেশ নিজ সমাজকে কেবল শিকারের পুকুর বলে বিবেচনায় রাখে এবং লুটে যদি তা নিজভোগ বিলাসকে লম্বা-চাওড়া করে, কেবল তার প্রয়োজনে তার পণ্য গমনা গমনে তার ব্যবসা-বাণিজ্য সুবিধার জন্য উন্নয়নকে ব্যবহার করে শিক্ষাকে চেতনা বিস্তারকে অকারণ অপ্রয়োজনীয় মনে করে, বই উৎপাদন, বই বিপণনকে কেবল ব্যবসায়িক পুঁজি বাড়ানোর হাতিয়ার করে, তা হলে সেই সমাজে যেমন কবি-সাহিত্যিকের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে পড়ে, তার সৃষ্টিতে নিরাশা-হতাশা-ক্লান্তি যৌনতা ভাঁড়ামি বাহুল্যতা, বাচলতার ভাষা ফুঁড়ে বেরিয়ে অখাদ্য অপ্রয়োজনীয় সৃষ্টির স্তূপ করে, যা জীবন নয় তাকে চালিয়ে পুঁজির শরীর স্ফীত করার সাহায্যে লাগে, তার বিলাসে নিজেকে বিক্রি করে কবি তার মেধা কারণ সেও চেতনাহীন এক স্রষ্টা, তেমনি ধীরে ধীরে মানুষের মননে চেতনার ঊর্ধ্ব-অংশে অসাড়তা চেপে বসে, তখন কবিতা যেমন কবি হতে দূরে সরে কবিতার খোলসটাই পুরনো চর্বিত চর্বণজাত বিষয়-আসয় নিয়ে শরীর গঠন করে, তেমনি পাঠকও আস্তে আস্তে কবিতা থেকে বিচ্যুত হয়। ‘এ লাশ রাখব কোথায় এমন যোগ্য সমাধি কই’ এই কবিতার জনপ্রিয়তা এই কবিতার অন্তর আর্তির ভেতরেই প্রথিত রয়েছে। কাণ্ট সৃষ্টিতে সম্মোহনের কথা বলেছেন, অর্থাৎ যা মানুষকে সম্মোহিত করতে পারেনা সে সৃষ্টির সঙ্গে মানুষের যোগ যুক্ত হয় না, বিয়োগই থেকে যায়। তবে এ-ও সত্য যে, সম্মোহন তখনই সম্ভব যখন বিষয় সামাজিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মানুষের আকাক্সক্ষা ছলকে ওঠে তখন মানুষ তা গভীরভাবে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করে।

৪.

আসলে সৃষ্টির প্রেরণা যদিও সবটাই সামাজিক, যা শোভন নয় তা-ও এ সমাজের গায়ে লেগেলেপ্টে থাকা আবর্জনা আর যা তার ভেতর সুন্দর ঢাকা পড়ে আছে তাকে উদ্ধার এবং তার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিষয়কে নতুন করে বলা নতুনভাবে উপস্থাপিত করতে পারলেই পাঠক কবি এবং কবিতা পরস্পরের প্রিয় ও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। মানুষের স্বাধীনতা, সাম্য, সুন্দরকেই আজ সৃষ্টির বিষয় করে তুলতে হবে, তুলতে হবে একটি গণতান্ত্রিক কল্যাণকামী রাষ্ট্র নির্মাণ প্রার্থনায়। যা হবে নতুন, চলমান নয়; শিল্পের উদ্দেশ্য এখন কেবল এইটুকুই ।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.