গান-প্রাণ অভিমান

  গাজী মাজহারুল আনোয়ার ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গান-প্রাণ অভিমান
প্রতীকী ছবি

প্রায়ই একটি অভিযোগ আমাদের কাছে আসে- বর্তমান বাংলা গানগুলো এমন কি চলচ্চিত্রের গানগুলোও ষাট-সত্তর দশকের মতো জনপ্রিয় হচ্ছে না কেন? অভিযোগ আসতেই পারে।

কারণ সময়ের ব্যবধানে শ্রোতার রুচিরও পরিবর্তন আসতে পারে- লেখকের, সুরকারের ও কণ্ঠশিল্পীর গায়কীরও পরিবর্তন আসতে পারে এবং এসেছেও।

আত্মপ্রকাশের এবং আত্মবিকাশের অনেক ধারা আছে। উদাহরণ স্বরূপ বলছি- একটি গরুর বাচ্চা পৃথিবীতে জন্ম নিয়েই ডাকে হাম্বা হাম্বা অর্থাৎ আমি বড়- আবার বৃদ্ধ হয়ে যখন মরে এবং তার রগ দিয়ে একতারা কিংবা দোতারা বানিয়ে- বাজালে তার থেকে সুর আসে- তো-তোঁ- অর্থাৎ তুমি বড়। আমি বড় বা- তুমি বড়? আমি বড়-বা-তুমি বড়- সেই বিচার সব সময় শ্রোতারাই করে থাকেন। শেকসপিয়র ওথেলোতে বলেছেন, ইট ইজ দি সোল- ইট ইজ দি সোল-।

আত্মাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যেই অনেকভাবে সৃষ্টিকর্ম ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বিকশিত হয়। শ্রোতাদের কাছে তা কখন নন্দিত হয়, কখনও নিন্দিত হয়। এখন বোধ হয় নিন্দার পালাটাই বড় হয়ে যাচ্ছে সাধারণ শ্রোতাদের কাছে। আমি বিনয়ের সঙ্গে বলছি- গানের উৎকৃষ্টতা এবং নিঃস্পৃষ্টতার মধ্যে দূরত্ব বেশি নেই- শুধু নির্মাণ ও প্রয়োগের কারণে এই ব্যবধানটা তৈরি হচ্ছে। আমরা যখন একটু পেছনে তাকাই- তখন কী দেখি?

যখন আমি ছোট্ট ছিলাম

লাল মোরগের পাখায় ছিলাম

বৈচী- বনের শাখায় ছিলাম

খেজুর রসের মিঠায় ছিলাম

পৌষ পাবনের পিঠায় ছিলাম-

দাদী নানীর গল্পে ছিল মধুর পরিবেশ-

তখনই তো বুঝে ছিলাম- এটাই আমার দেশ।

আমাদের দেশটাতে কি এখন- সেই পরিবেশে আছে?

পরিবর্তন তো আসবেই-।

আমিই তো বলেছিলাম- নজর লাগবে বলে কাজলের টিপ

দিয়েছিল মা

আমারই এই কপালে

সেই তো নজর লাগল

সেই তো কপাল ভাঙল-

দুঃখেরই লোনা জলে।

অথবা

পাছে না হারিয়ে যাই

দু’পায়ে বেঁধেছি মল শক্ত করে

সেই তো হারাতে হলো

পথেই দাঁড়াতে হলো- অন্ধকারে,

যখন দেখলাম-

অল্টোপেড- কি-বোর্ড, ড্রাম সেট, একতারা, দোতারা

ঢোল-বেহালাকে গিলে খাচ্ছে- এখনই তো প্রতিবাদ

করে বলেছিলাম-

আউল বাউল লালনের দেশে মাইকেল জেকসন আইলোরে

সবার মাথা খাইলরে

আমার সাধের একতারা কান্দে

মাঠের দোতারা কান্দে।

সময়ের স্রোতকে আটকিয়ে রাখা যায় না, কিন্তু তার মধ্যে একটি পরিমিতি জ্ঞান থাকতে হবে। আমরা আধুনিক হতে গিয়ে অতি আধুনিক হয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয় সেই উচ্ছ্বাসটা সঠিক নয়। হ্যাঁ- আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমি লিখেছিলাম জয় বাংলা বাংলার জয়

হবে হবে হবে- হবে নিশ্চয়

কোটি প্রাণ এক সাথে

জেগেছে অন্ধ রাতে-

নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়-

লিখেছিলাম-

মাগো চোখে আর ঘুম পড়ানি

মাসী হীন দেবোনা

লিখেছিলাম-

একবার যেতে দেনা আমায়

ছোট্ট সোনার গায়-

লিখেছিলাম-

একতারা তুই দেশের কথা

বললে এবার বল...

লিখেছিলাম-

আমায় একটি ক্ষুধিরাম দে বলে

কাদিসনে আর মা-

সংগ্রাম শেষে, আর তো উচু-স্বরে কথা বলার দরকার নেই। এবং সাধারণ মানুষের কাছে এসে- তাদের বলতে হবে-

যদি আমাকে জানতে সাধ হয়

বাংলার মুখ তুমি দেখে নিও

যদি আমাকে বুঝতে মন চায়

এ মাটির শ্যামলিমায়

এসো প্রিয়।

মায়ের অনুভূতির কথা বলতে হবে-

বাছারে বাছা তুই আরেকটা দিন বাড়ি থেকে যা।

একজন গীতিকবি, একজন সুরকার, একজন কণ্ঠশিল্পী ও একজন শ্রোতার মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতেই হবে। জ্বানালা খুলে দেশ এবং দেশের মানুষকে দেখতে হবে-।

দেখতে হবে শ্রোতার চাহিদা। যাচাই করতে হবে গ্রহন করার মতো যোগ্যতা-। নইলে- দুঃখের সুরে গাইতে হবে-

তুমি আরেকবার আসিয়া- যাও মোরে কান্দাইয়া

আমি মনের সুখে একবার কানতে চাই।

পোড়া বুকে দারুণ খরা

চোখের পানি চোখে নাই।

লেখক : গীতিকবি ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব

ঘটনাপ্রবাহ : যুগান্তর বর্ষপূর্তি-১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter