শ্রী চৈতন্যের ‘কীর্তন’ এবং সমকালীন সমাজ

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের ক্ষেত্রে পনের-ষোল শতকে শ্রী চৈতন্যের আবির্ভাব ছিল একটি বড় ঘটনার সংযোজন। এটি এমন এক সময় যখন বাঙালি-সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়া ঘটছিল সাড়ম্বরে। মুসলিম রাজানুকূল্যে একদিকে যেমন মুসলমান সমাজ বিকাশ দ্রুততর গতি লাভ করছিল, অন্যদিকে হিন্দু ধর্মের অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্য এই ধর্মাশ্রিত সমাজ কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। বাঙালি সমাজে সামাজিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং ধর্মীয় কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। হুসেন শাহী যুগের কৃতী পুরুষ আলাউদ্দিন হুসেন শাহ অবশ্য এসময় নতুন আশাবাদ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। তার উদারনৈতিক মনোভাব ধর্মীয় ক্ষেত্রে একটি সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছিল। সুলতানের কাজের গতিশীলতা সাময়িক শান্তির পরিবেশ সৃষ্টিতে অনেকটা সফল হয়েছিল। নবসৃষ্টির প্রেরণায় এসময় বাঙালি জাতির যেন অভ্যুত্থান ঘটে। সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রচেষ্টায় তিনি ও অন্যান্য মুসলিম শাসকরা শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। পৌরাণিক কাহিনীর হিন্দু অনুবাদকদের এবং কবিদের সার্বিক আনুকূল্য প্রদান করেন। হিন্দু কবিদের প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হতো এ সময়। এসবকিছুর পরও তৎকালীন বাংলার পরিমণ্ডলে একটি শূন্যতা বিরাজ করছিল। সে শূন্যতা অখণ্ড-উদার মানবতার প্রশ্নে। প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যেন দানাবাঁধে। এসব কারণে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে একটি ভাব-বিপ্লবের আবশ্যকতা স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। এরই পথ ধরে আবির্ভূত হন শ্রী চৈতন্যদেব তার নব্য বৈষ্ণব দর্শন নিয়ে। এ ধর্ম-দর্শন ভক্তির জোয়ারে ভাসিয়ে নেয় সমকালীন বাঙালি সমাজ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ভক্তির বাঁধনে বাঁধা পড়ে বাঙালি জাতির পক্ষে অখণ্ড রূপ নেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ আলোড়নে চৈতন্যদেব তার ভক্তি-বাণী প্রচারে যে মাধ্যমটি উপস্থাপন করলেন তা-ই ব্যাপক অর্থে কীর্তন। কীর্তনের গীত-প্রবাহ বর্ণবিভক্ত সমাজের প্রাচীরে আঘাত হানল। ভক্তির অভিন্ন মিছিলে এনে জড়ো করল বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কীর্তনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আত্মপ্রকাশ করে। তাই এ দেশের তৎকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকে কীর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উপস্থিত হতে পারে।

কীর্তনের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘গুণবর্ণনা’ (মহিমা কীর্তন) যশঃপ্রচার। কোনো মৃত বৃক্তির যশঃপ্রচার কীর্তি হিসেবেই আমাদের সামনে পরিচিতি পেয়ে থাকে; যা জীবিত ব্যক্তির বেলায় আমরা বলি ‘খ্যাতি’। কিন্তু মধ্যযুগের ভাব-বিপ্লবের জোয়ারে শ্রী চৈতন্যের মধ্য দিয়ে যে কীর্তনের উপস্থিতি তা আভিধানিক এ অর্থকে অতিক্রম করে একটি নিজস্ব অর্থ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তা হচ্ছে একটি বিশেষ ধারার সঙ্গীত। যা ভাগবতবিষয়ক। অর্থাৎ শ্রী কৃষ্ণের মহিমা কীর্তন করে সুর তাল সংযোজনে পরিবেশিত সঙ্গীতই সাধারণ অর্থে কীর্তন। সাধারণ দৃষ্টিতে এই ব্যাখ্যা একটি সমাজ ইতিহাসের গতি নিয়ন্ত্রণে অথবা বিশেষায়িত করার ব্যাপারে এমনকি গুরুত্বের দাবি রাখে- এটি একটি স্বাভাবিক ও সঙ্গত প্রশ্ন হিসেবে উত্থাপিত হতে পারে। সে কারণেই শ্রী চৈতন্যের প্রবর্তিত কীর্তনের অভিনবত্ব খোঁজার আবশ্যকতা রয়েছে। সমকালীন সমাজ আলোড়নে এ সঙ্গীত ধারার যদি বিশেষ কোনো ভূমিকা থেকে থাকে, তবে অবশ্যই কীর্তনের ঐতিহাসিকতা খোঁজার প্রয়োজন রয়েছে।

গীতায় ঈশ্বরের গুণ কীর্তনের জন্য ভক্তের শ্রদ্ধা লাভের একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। আর এরই পথ ধরে ভারতবর্ষব্যাপী হিন্দু ধর্মাশ্রয়ী বিভিন্ন গোষ্ঠী ঈশ্বর আরাধনার নানা পথ বেছে নিয়েছেন। সেদিক থেকে বলা যায়, ঈশ্বরের গুণবর্ণনা অর্থাৎ ‘কীর্তন’ বিষয়টি এককভাবে ‘বঙ্গীয়’ কোনো স্বকীয় ধারা নয়। মহারাষ্ট্রের সাধক-কবি তুকারাম যে সঙ্গীত করতেন তা-ও কীর্তন নামে কথিত হয়েছে। তিনি তার একটি অভঙ্গে (ভক্তি গীতি) বলেছেন যে, জাহ্নবীর ধারা যেমন ভগবানের পাদপদ্ম থেকে উত্থিত হয়ে মরধামে নেমেছে কীর্তনের ধারা তেমনি মানুষের হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে ভাগবত পাদপদ্মে গিয়ে নেমেছে। উভয় ধারাই পতিত পাবনী। মানুষের হৃদয় পবিত্র করতে, পাপরাশি ধৌত করতে কীর্তন গঙ্গারই মতো ফলপ্রদ। ভক্তিমার্গের প্রতি আকৃষ্ট তুকারাম যে ভক্তিবাণী রচনা করেন তা কীর্তনেরই নামান্তর। তবে তার প্রকাশ, ভক্তি ও আরাধনার ধারা বঙ্গীয় কীর্তনের ধারার অনুরূপ নয়। কীর্তন যে একটি অভিনব সঙ্গীতপদ্ধতি হিসেবে একমাত্র বাংলায় আত্মপ্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সে ব্যাপারে দ্বিমতের অবকাশ নেই। মহারাষ্ট্রে তুকারামের ভক্তি গীতি বাদ দিলেও ভারতের অন্যান্য অংশে ভগবত সঙ্গীতের যে উপস্থিতি দেখি তা সাধারণত ‘ভজন’ নামেই অধিক পরিচিত। ভজনের শৈল্পিক পদ্ধতিও ভিন্ন। যা কীর্তনের সঙ্গে মেলানো যায় না।

বহির্বঙ্গীয় বিভিন্ন অঞ্চলের সাধনার ধারা থেকে শ্রী চৈতন্যের সাধনার ধারা কীর্তন যে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে তা আরও স্পষ্ট করতে হলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধনার ধারা উপস্থাপন করা যেতে পারে। উত্তর ভারতে রামানন্দ ও তার শিষ্য কবীর এবং তুলসীদাসের রাম ও বিষ্ণুর আরাধনায় প্রেম ও ভক্তির পাশাপাশি বৈরাগ্যের উপস্থিতি ছিল। তবে লক্ষণীয় যে, পনেরো ও ষোল শতকে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের ভক্তিসে াত, বিষ্ণু-কৃষ্ণ ও রামোপাসনা পূর্ব ভারতের ধর্মচিন্তার সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের তথা মিথিলা ও নেপালের ধর্মচিন্তা এবং সাহিত্য ভাবনার সঙ্গে অসমীয়া বৈষ্ণব সাহিত্য সংস্কৃতির যোগাযোগ ছিল। ভারতের বিভিন্ন ভূখণ্ডের ধর্মচিন্তায় শৈব-শাক্ত-তন্ত্র ও বৈষ্ণব ধর্মমত দশ-এগারো শতক থেকেই লক্ষিত হয়। নির্গুণ নিরাকার ও সগুণ-সকার উপাসনা, জ্ঞান, যোগ ও ভক্তিমার্গের কথাও মধ্যযুগে ভারতের নানা প্রদেশে নানা রূপে দেখা গিয়েছে। ভক্তি ভাবনায় মধ্যযুগের তিন প্রধান ব্যক্তি হলেন- উত্তরে বল্লভাচার্য, বাংলায় শ্রী চৈতন্য এবং আসামে শঙ্করদেব। ভক্তিপথের পথিক হলেও এদের মধ্যে সাধ্য ও সাধনার ভেদ আছে। চৈতন্য দেবের ভক্তিমার্গ রাগময়ী, উপাস্য রাধা কৃষ্ণ। ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তি সম্পর্ক বিধানই চৈতন্য প্রবর্তিত রাগানুগামার্গের বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই কীর্তনের অভিনবত্ব। শ্রী চৈতন্যের কীর্তনের বিকাশমান পর্যায়ে এসে নগর সংকীর্তন একটি আবশ্যকীয় ধর্মীয় কর্ম হিসেবে রূপলাভ করে। ঢোল, করতাল, মৃদঙ্গ, মন্দিরাসহ নৃত্যগীতে এ কৃষ্ণভক্তি মিছিল সহযোগে নবদ্বীপের পথঘাট মুখরিত করে তোলে। এভাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণবের প্রসারিত মিছিলে কীর্তনীয়ার সদস্যে পরিণত হয় সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ।

চৈতন্য প্রবর্তিত কীর্তনের মধ্যে একটি স্বকীয় রূপ ছিল। তাই কৃষ্ণলীলার অবলম্বনে রচিত সঙ্গীতই কীর্তন নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কীর্তনের ব্যবহারিক ধারাকে প্রথমত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়- নাম কীর্তন ও লীলা কীর্তন বা রস কীর্তন। কৃষ্ণের নাম গীতার বাণীর মধ্য দিয়ে উপস্থাপনই মূলত নাম কীর্তন। সংকীর্তন এবং কীর্তন সমার্থক। উচ্চৈস্বরে হরিনাম করাই সংকীর্তন।

বৈষ্ণব মতে নাম সংকীর্তনের সার্থকতা হচ্ছে চিত্তশুদ্ধি লাভ। শ্রী চৈতন্যের সংকীর্তনের বিশেষজ্ঞ হচ্ছে এখানে সম্মিলিতভাবে সঙ্গীতের উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে কৃষ্ণ নামকে মূল প্রতিপাদ্য বিবেচনায় সূর মূর্ছনায় ভক্তি সাগরে অবগাহন করবে। এ ভক্তির স্রোতে এসে জড়ো হলো সমাজের সব শ্রেণীর সদস্য। ভারতবর্ষের অন্য সব ভক্তি সঙ্গীতে সম্মিলিত সঙ্গীতের এ অভিনব মাধ্যমের উপস্থিতি ছিল না। এখানে কৃষ্ণের নাম নিয়েই নাম সংকীর্তন। যেমন- ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।’ এই নামেরই পৌনঃপুনিক ও বিরামশূন্য আবৃত্তিতে অষ্টপ্রহর, চব্বিশ প্রহর অতিবাহিত হতে পারে। অথবা শ্রী চৈতন্যের নাম ও এর সঙ্গে জুড়ে দেয়া যেতে পারে, যথা- ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রী রাধে গোবিন্দ।’ ‘নিতাই গৌর রাধে শ্যাম হরে কৃষ্ণ হরে রাম।’ শ্রী চৈতন্য ও ভগবান বা ভগবানের অবতার বলে পূজিত হন। মূলত যে কোনো রূপকে উচ্চৈস্বরে হরিনাম করাই নাম সংকীর্তন। এই নামযপের মধ্য দিয়েই ভাব-সমাধি লাভ বা নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে মোক্ষ লাভ সম্ভব। আর এটিই হচ্ছে চৈতন্যের বৈষ্ণববাদের আধ্যাত্মিকতার মূল লক্ষ।

কীর্তনের দ্বিতীয় ভাগ লীলা কীর্তন বা রসকীর্তন। শ্রী কৃষ্ণের অবলম্বনে যেসব গীত রচিত তাই লীলা কীর্তন। লীলা কীর্তনকে রসকীর্তন নামে অভিহিত করা হয়। রস অর্থ যা আস্বাদন করা যায়- অর্থাৎ যা চিন্তা করলে বা শুনলে হৃদয় আনন্দে আপ্লুত হয়। এর নাম রস। আনন্দময় ভগবানের লীলাও আনন্দের সৃষ্টি করে। এজন্যই লীলা কীর্তনের অপর নাম রস কীর্তন। তবে সবকিছু মিলিয়েই শ্রী চৈতন্যের উদ্ভাবিত কীর্তন, যা তার দর্শনেরই বাহ্যিক প্রকাশ। আর পুরো দর্শনটিই প্রেমাশ্রিত। ঈশ্বরকে ভালোবাসার নাম ঈশ্বরপ্রেম। মানবকে ভালোবাসার নাম মানবপ্রীতি। দুইয়ের মধ্যে গভীর ঘনিষ্ঠতা। মানবপ্রীতি দাঁড়াতে পারে না ঈশ্বর প্রেমের ভিত্তিভূমি ছাড়া। মানবপ্রীতি বিশ্বপ্রেম এসব সম্পূর্ণ অসম্ভব শ্রী ভগবানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক না হলে।

নব্য বৈষ্ণব আন্দোলনে ধর্মীয় দিক থেকে কীর্তনের এই অভিনবত্বের আলোকে সমকালীন সমাজ ও ধর্মের স্থান নির্ধারণ করতে গেলে সঙ্গত কারণেই কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। প্রথমত কীর্তনের এই অভিনবত্ব কতটা মৌলিক? এটি কি চৈতন্যেরই একক উদ্ভাবন? অর্থাৎ বলা চলে এটি কি বঙ্গজ? নাকি পূর্বকালীন বা সমকালীন কোনো ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আচরণ থেকে এর উৎসারণ? দ্বিতীয়ত সমকালীন বাংলার সমাজ ও ধর্মে কীর্তনের প্রভাব কতখানি? এই প্রশ্নাবলীর নিষ্পত্তির মধ্য দিয়েই কেবল এদেশের সমাজ ও ধর্মের ক্ষেত্রে কীর্তনের অবস্থান নির্ণয় করা চলে।

প্রথম প্রশ্নের নিষ্পত্তির জন্য নব্য বৈষ্ণববাদের উৎসমূল খোঁজা প্রয়োজন। প্রেমভক্তি ছাড়াও চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল এর উদারনৈতিকতা। যদিও নব্য বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দু ধর্মের একটি সাম্প্রদায়িক শাখা মাত্র। তথাপি এই ধর্মে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা নেই। মধ্যযুগের বাংলায় হিন্দু ধর্মে যখন প্রচণ্ড অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছিল, জাত বিচারের প্রশ্নে সচেতন ছিল সমাজপতিরা, সাধারণ মানুষের ধর্মে প্রত্যক্ষ কোনো অধিকার ছিল না, সে সময়কালেরই শ্রী চৈতন্য এমন উদারতার মধ্য দিয়ে সাম্যের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন।

ভাগবত বা বৈষ্ণব ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল পশ্চিম ভারতে। এর প্রবক্তারা তাদের প্রধান দেবতা কৃষ্ণ সুপ্রাচীন বৈদিক দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গে অভিন্ন বলে ঘোষণা করেন। বৈদিক দেবগোষ্ঠী থেকে এরা বিষ্ণুকে বেছে নিয়েছিলেন। সর্বশক্তিমান একেশ্বর হিসেবে এবং সে কারণেই ভাগবত ধর্মের পরবর্তী পর্যায় বৈষ্ণব ধর্ম রূপে খ্যাত, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতক থেকেই এ ধর্মের জনপ্রিয়তার সূত্রপাত।

একেশ্বরবাদ স্বাভাবিকভাবেই রাজানুকূল্য পেয়ে থাকে; যা বৈষ্ণব ধর্ম ও শৈব ধর্ম বরাবরই পেয়েছে। একেশ্বর ভক্তি এক রাজাকেই ভক্তির নামান্তর। বৈষ্ণব ধর্ম এদেশে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশেষ সহায়তা করেছিল। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে চৈতন্যের নব্য বৈষ্ণববাদ প্রাচীন বৈষ্ণব দর্শন থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এসেছে। চৈতন্যদেবের ডাকে সাড়া দিয়েছিল সমাজের বেশিরভাগ নিঃসহায় ও পিছিয়ে পরা মানুষ। তথাকথিত ধর্মীয় সংগঠনগুলোর পেছনে যেমন বিত্তবানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা থাকে চৈতন্য দেবের পেছনে তেমন কোনো সহযোগিতা ছিল বলে জানা যায়নি। বরঞ্চ তিনি ছিলেন সে যুগের সমাজপতি তথা বিষয় ভোগীদের চক্ষুশূল। তাই তারা প্রতি পদে পদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল শ্রী চৈতন্যের চলার পথে। হিন্দু সমাজপতিরা সামাজিক বিধানের মাধ্যমে এতকাল অস্পৃশ্য করে রেখেছিল নিম্নশ্রেণীর বিশেষত শূদ্রদের। ধর্মাচরণের কোনো রকম অধিকার তাদের ছিল না। এখন শ্রী চৈতন্যের নামসংকীর্তনে এ অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে কৃষ্ণনাম করতে দেখে বিক্ষুব্ধ হয়েছে এরা।

ক্ষুব্ধ এই সমাজপতিরা শ্রী চৈতন্যকে নিরস্ত্র করার জন্য কাজীর কাছে অভিযোগ উত্থাপন করেছে। তার সূত্র ধরে কাজীর সঙ্গে কীর্তনীয়াদের সংঘাত ও পরবর্তীকালে আপসরফার কাহিনী সমকালীন বাংলার ইতিহাস ও সাহিত্যে বিভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দু’টো লক্ষণীয় দিক এখানে উপস্থিত। প্রথমটি শ্রী চৈতন্য দেবের প্রবর্তিত ধর্মাচারণের বাহ্যিক পদ্ধতি ‘কীর্তন’ প্রাচীন বৈষ্ণববাদ বা ভারতীয় সমকালীন সাধারণ ধারা থেকে স্বতন্ত্র। এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে শ্রী চৈতন্য তারই ধর্মের নেতৃত্বে বসা উচ্চবর্ণের সমাজপতিদের দ্বারা ধর্মবাণী প্রচারে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে চৈতন্য দেবের এই অভিনব কৃষ্ণনাম আরাধনা রীতির উৎস কী? এবং কেনই বা নিজ ধর্ম তথা সমাজপতিদের ক্ষুব্ধতার মুখেও এই প্রেমবাণী প্রচার করলেন?

শ্রী চৈতন্য দেব যে একজন উঁচু স্তরের সমাজ সংস্কারক ছিলেন এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমতের অবকাশ নেই। মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংঘাতময়। সেন রাজত্বের বর্ণ-বিভক্ত সমাজ কাঠামোয় নিগৃহীত নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা সবদিক থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তের শতকের শুরুতে রাজশক্তি হিসেবে মুসলমানদের আগমন সূচিত হলেও চৌদ্দ শতকের মাঝপর্বে এসেই মুসলিম রাজশক্তির আওতায় সমগ্র বাংলা অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এদেশে ধীরগতিতে হলেও এগার শতক থেকেই সুফিদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত হতে থাকে। এদেশে সুফিদের আগমনের সর্ব প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহে শাহ সুলতান রুমী ও ১১১৯ খ্রিস্টাব্দে বিক্রমপুরে বাবা আদম শহীদের নাম পাওয়া যায়। এদেশের নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা যারা এতদিন নিজ ধর্মে ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল, তারা সাম্যের বাণী বয়ে আনা সুফিদের দেখে স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। অন্তত অপেক্ষাকৃত ভালো আশ্রয়ের জন্য হলেও তারা ধীরে ধীরে মুসলমান হতে থাকে। চৌদ্দ শতকে মুসলিম রাজশক্তির আনুকূল্যে সুফিদের প্রচারণা বেড়ে যায়। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচার করা হয় দু’টি পন্থায়- একটি তুর্কানা তরিকা, অন্যটি সুফিয়ানা তরিকা। তুর্কানা তরিকাই হল তুর্কি, আরব, পাঠান ইত্যাদি সৈনিকদের দ্বারা বল প্রয়োগে ধর্ম প্রচারের পন্থা এবং সুফিয়ানা তরিকা হল মরমি সুফি সাধকদের প্রেমধর্ম প্রচারের পন্থা। অস্ত্র শক্তিকে যেভাবে ভারতীয়রা ধর্ম-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল প্রেমশক্তিকে সেভাবে প্রতিরোধ করতে পারেনি। যেখানেই সুফিয়ানা তরিকাতে ইসলাম ধর্ম প্রচার করা হয় সেখানেই ইসলাম ধর্মকে প্রতিরোধ করা কট্টর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পক্ষে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। এবং বঙ্গ বা পূর্ব বাংলাকে এ ব্যাখ্যায় প্রকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা চলে।

শ্রী চৈতন্যের যখন উত্থান তখন স্বাধীন সালতানাতের কৃতীপুরুষ আলাউদ্দিন হুসেন শাহের শাসনকাল। এসময় বাংলা মুসলিম অধ্যুষিত দেশে পরিণত হয়েছে। তার সময় ধর্মীয় বিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। হিন্দুদের উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাজতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিলেন। হিন্দুরা যাতে নির্বিঘ্নে ধর্মাচারণ ও ধর্ম প্রচার করতে পারে তার জন্য হুসেন শাহ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। চৈতন্যদেবের ধর্মকাজে বাধা না দেয়ার জন্য তিনি কাজী ও কোতোয়ালদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময়েও হিন্দু সমাজপতিরা হিন্দুদের ধর্মত্যাগের জোয়ারকে রোধ করার জন্য তাদের আভিজাত্যের অহঙ্কার ও রক্ষণশীলতার কল্পতরু থেকে নেমে আসতে পারেননি। সম্ভবত এ বাস্তবতা সংস্কারক শ্রী চৈতন্যের মানসভূমিতে আলোড়ন তুলেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন একটি প্রতিরক্ষা আন্দোলনের আর সেজন্য প্রয়োজন জাত্যাভিমানের প্রাচীর ভেঙে মানবিক আবেদন উপস্থাপন করা। তাই চৈতন্যের আরাধনায় কীর্তনের অভিনবত্ব খুঁজতে গিয়ে তার ধর্ম-দর্শনের স্বাতন্ত্র্যের উৎস অনুসন্ধানে একটি ইতিহাসনিষ্ঠ প্রেক্ষিত বেরিয়ে পড়ে। তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি অনুদার হিন্দু সমাজে যদি ইসলামের উদারতা ও সাম্যের অনুকরণে একই স্রোত প্রবাহিত করা যায় তবে ধর্মান্তরের জোয়ারকে হয়তো রোধ করা সম্ভব। তাই চৈতন্যের অভিনব ধর্মাচারণ ‘কীর্তন’ বা ‘নাম সংকীর্তনে’র উৎস পাওয়া যায় সুফি ধারার আরাধনার ভেতর। ইসলামী অতীন্দ্রয়বাদ আকৃষ্ট করেছিল শ্রী চৈতন্যকে। সুফিদের ‘হালকা’ (জিকির) অর্থাৎ ঈশ্বরের নামজপ এবং ‘সামা’ অর্থাৎ সঙ্গীতের মাধ্যমে ঈশ্বর প্রেমের প্রকাশ, স্পষ্টতই নাম সংকীর্তনের সঙ্গে এর কোনো প্রভেদ নেই। জাত, ধর্ম নির্বিচারে সুফিদের খানকায় এসে এক পাত্রে অন্ন গ্রহণ এবং ঈশ্বর আরাধনা যদি নিগৃহীত হিন্দুদের ধর্মান্তরে উৎসাহিত করে থাকে তবে একই আকর্ষণের ক্ষেত্র নিজ ধর্মে গড়ে তুললে হিন্দু ধর্ম রক্ষার শেষ চেষ্টা হয়তো হতে পারে। তাই বোধ হয় শ্রী চৈতন্যের নব্য বৈষ্ণব দর্শন নতুন ভাব-বিপ্লব নিয়ে উপস্থিত হল। কীর্তন সমাজ ও ধর্মক্ষেত্রে একটি অনুকূল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। আরও পরিষ্কারভাবে বললে বলতে হয়, ইসলাম যখন বাংলাদেশে দ্রুত প্রসারমুখী তখনই ব্রাহ্মণ্য সমাজের ত্রাণকর্তা রূপে চৈতন্য দেবের আবির্ভাব। দক্ষিণ ও উত্তর ভারতের দ্বৈতা-দ্বৈত তত্ত্বভিত্তিক ভক্তিবাদ সুফি প্রভাবে তার চেতনায় প্রেমবাদ রূপে প্রতিষ্ঠা পেল। তার এ প্রেমতত্ত্বের প্রভাবে কিছু কালের জন্য বাঙালির অন্যসব চিন্তা-চেতনা যেন ভেসে গেল। চৈতন্য আন্দোলনে ইসলামের প্রসার অনেকটা রুদ্ধ হল। কেননা, ইসলামের যেসব বৈশিষ্ট্য নিপীড়িত অবজ্ঞাত জনগণকে আকৃষ্ট করেছিল, এর সব চৈতন্য মতবাদে গৃহীত হল। যেমন- মানুষে মানুষে সমতা, মিত্রতা ও ভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার, মানুষের স্বাধীনভাবে আত্মবিকাশের ও আত্মবিস্তারের অধিকার, বর্ণভেদ-জাতিভেদ কিংবা সম্পদ ভেদে মানুষের মর্যাদার তারতম্য অস্বীকৃতি, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কের মূল সূত্র রূপে প্রীতির স্বীকৃতি, অসবর্ণ বিবাহ ও তালাক, নামকীর্তন বিষয়ে আসক্তি, কৃষ্ণে সমর্পিত জীবন ইত্যাদি।

এভাবে শ্রী চৈতন্য তার কীর্তনের গীত প্রবাহে মানবতার স্বরূপ উন্মোচন করে হিন্দু সমাজ ও ধর্মীয় কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। সুতরাং সমকালীন সমাজ ও ধর্মক্ষেত্রে কীর্তনের অবস্থানকে গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করা যায়। শ্রী চৈতন্য ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে নিম্নবর্ণের মানুষদের এক সারিতে এনে দাঁড় করালেন। একে সমাজ বিপ্লব বলা চলে। তিনি ঘোষণা করলেন শূদ্রও যোগ্যতা বলে আধ্যাত্মিকতার উচ্চাঙ্গে উঠতে পারে। চৈতন্য-পূর্ব ও উত্তরকালের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধকদের অধিকাংশই ছিলেন নিচু বংশজাত। এসব থেকে ধারণা করা চলে যে, সমাজের নিম্নাংশেই শান্তির, ঐক্যের এবং সংস্কৃতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল সর্বাপেক্ষা বেশি। কেননা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অরাজকতার মধ্যে সমাজের নিম্নশ্রেণীর অধিবাসীরাই পীড়িত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি। রাষ্ট্রীয় কলরবের বিষময় আবর্জনা তাদের জীবনকেই গ্রাস করতে চায়। তাই জীবনের বলিষ্ঠ প্রেরণায়, বাঁচার সহজাত তাগিদে তারা এ সর্বগ্রাসী কলরবকে প্রতিরোধ করতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ প্রতিরোধে তাদের অস্ত্র ছিল মানবতা এবং হৃদয়ের প্রীতিরস। জীবনের নামে এ যে বিদ্রোহ তাকে সামাজিক উচ্চবর্ণের ভাবাদর্শের বিরুদ্ধে, তাদের অকল্যাণধর্মী জীবন দর্শনের বিরুদ্ধে, সামাজিক নিম্নবর্ণের ভাবাদর্শের বিদ্রোহ বলে অভিহিত করা যেতে পারে। এবং সব প্রকৃত সত্য বিদ্রোহের মতো এ বিদ্রোহেরও আদর্শ ছিল একটা সঠিক কল্যাণবোধ সৃষ্টির আনন্দে পরিপূর্ণ এক মানবতার চেতনা। কারণ সব বর্ণগত, শ্রেণীগত, সম্প্রদায়গত এবং ধর্মগত বিরোধ অতিক্রম করে এ বিদ্রোহ মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবেই স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। এ বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করতে, বিদ্রোহীদের অভিনব পদ্ধতিতে একত্রিত করতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল নাম সংকীর্তন। ভক্তদের একই সারিতে আনার জন্য এর চেয়ে বেশি এবং কার্যকর মাধ্যম আর কিছু হতে পারে না। এ মহামিলনের ক্ষেত্রভূমিকে দৃঢ়করণে শুধু মৌখিক নাম জপেই থেমে থাকেননি, বরঞ্চ চৈতন্যদেব জাত্যাভিমানের দেয়াল ভাঙতে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন সরলভাবে। এ প্রসঙ্গে পূর্বেও কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে। জাতিভেদের অসারতা প্রতিপন্ন করার জন্য তিনি শূদ্র রামরায়কে দিয়ে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করিয়েছিলেন; আর তার ব্রাহ্মণ অনুচর ভক্তরা নিজেদের ব্রাহ্মণ্য অভিমান লুপ্ত করে শুধু ‘দাস’ বলে আত্মপরিচয় প্রকাশ করেছেন। ঈশান নামীয় এক ব্রাহ্মণ উপবীত ছিঁড়ে তাদের সেবার অধিকারী হয়েছিলেন। কীর্তনের ভাববন্যা এদেশের সমাজ ও ধর্মে গভীর রেখাপাত করেছিল। তাই বাঙালি হিন্দু- সমাজে এসেছিল নব সৃষ্টির প্রাণচাঞ্চল্য। চৈতন্য বাঙালি হিন্দুকে সত্যিকার অর্থেই প্রভাবিত ও উদ্দীপ্ত করতে পেরেছিলেন বলেই তার জীবনী রচনার উপাদানের প্রাচুর্য দেখতে পাওয়া যায়। চৈতন্যের নবদ্বীপ লীলার প্রধান পরিকর মুরারিগুপ্ত সংস্কৃতিতে তার জীবন সম্বন্ধে এক কড়চা লিখেছিলেন- মহাপ্রভুর দেহাবসানের অব্যবহিত পর সম্ভবত ১৫৩৩ থেকে ১৫৪২ সালের মধ্যে। ‘কর্ণপুর’ উপাধি দ্বারা পরিচিত কবি পরমানন্দ সেন চৈতন্যের পারিষদ শিবানন্দ সেনের পুত্র, তিনি চৈতন্য সম্বন্ধে সংস্কৃতিতে তিনটি বই লিখেছেন, ‘শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত’ (কাব্য), ‘শ্রী চৈতন্য চন্দ্রোদয়’ (নাটক), ‘গৌর গণোদ্দেশ দীপিকা’। এই বইগুলো সম্ভবত ১৫৪২ থেকে ১৫৭৬ সালের মধ্যে লেখা হয়েছিল। বাংলায় লেখা চৈতন্য জীবনগুলোর মধ্যে প্রথম ও সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় বৃন্দাবন দাসের ‘চৈতন্য ভাগবত’ কাব্য অনুমান ১৫৪৮ সালে রচিত হয়েছিল। জয়ানন্দের ‘চৈতন্য মঙ্গল’ কাব্য প্রায় সমসাময়িক হলেও বৈষ্ণব সমাজে অসমাদ্রিত ছিল। রচনাকাল আনুমানিক ১৫৬০ সাল। এর কয়েক বছর পরই ১৫৬০ থেকে ১৫৬৬ সালের মধ্যে লোচন দাসের ‘চৈতন্য মঙ্গল’ কাব্য লেখা হয়। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃত কাব্য কখন লেখা হয়েছিল সে সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতৈক্য নেই। সংস্কৃত ও বাংলা ছাড়া উড়িষ্যা, অসমীয়া এবং হিন্দি ভাষায় বিভিন্ন শ্রেণীর রচনায় চৈতন্য জীবনী সম্বন্ধে তথ্য পাওয়া যায়। শুধু বাংলা নয়, চৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে ভারতবর্ষের নানা স্থানে রাখা কৃষ্ণলীলা প্রচারিত হয় এবং ওই লীলা অবলম্বনে বহু পদ রচিত হয়। পদাবলির দিক দিয়ে দেখলে এই ভাবধারা শুধু বাংলা নয়, সমগ্র ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পদ। ভারতবর্ষকে জানতে হলে এ ভাবধারার সঙ্গে বিশেষ পরিচয় বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যে আবার বাংলার উচ্চাঙ্গের কীর্তন সুরতাল ও ব্যঞ্জনায় একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছে।

সঠিক আলোচনায় যে জিনিসটি স্পষ্ট হয়েছে, তা হচ্ছে সমাজ-সংস্কার ও ধর্ম রক্ষার প্রয়োজনে সমকালীন প্রবাহকে উপেক্ষা না করে গ্রহণ বর্জনের ঔদার্যে যে প্রাপ্তি যোগের সম্ভাবনা থাকে, শ্রী চৈতন্যের নব্য বৈষ্ণববাদ এর আরাধনার মাধ্যম কীর্তনের উদ্ভাবন ও প্রচারের মধ্য দিয়ে একেই প্রতিষ্ঠিত করলেন।

কীর্তনের নৃত্যগীত শুধু একটি ভাব-বিপ্লবের জোয়ার বইয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি বরঞ্চ বর্ণ বিভক্ত ক্ষুয়িষ্ণু হিন্দু সমাজকে সাম্যের ধারণা দিয়ে পুনর্বাসিত করতে চেয়েছিল। কীর্তনের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, শ্রী চৈতন্য এত বড় সাম্যবাদী হয়েও নিপীড়িত জনগণের কতটুকু উপকার করতে পেরেছিলেন? সে প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের কোনো বৈষ্ণব গবেষক দিতে পারবেন। তবে তাত্ত্বিক দিক থেকে একথা বলা হয়তো প্রাসঙ্গিক হবে যে, ভারতের বুকে সর্বহারাদের জাগরণের প্রথম দিকে উৎসাহের উন্মেষ বোধ করি এদিক থেকেই এসেছিল। কীর্তনের ভাব-বিপ্লব যে আন্দোলনের সূচনা করেছিল তা ছিল মানব চৈতন্যের মূর্ত প্রতীক। আর তার পুরোধা শ্রী চৈতন্য। তাই কীর্তনের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থান নির্ণয় করে শ্রী চৈতন্যকে ভক্তের ভগবানের আসনে বসিয়ে প্রভুত্ব দান করলে হয়তো সুবিচার করা হবে না বা তাতে ইতিহাসনিষ্ঠতা ও পরিচয় পাওয়া যাবে না। বরঞ্চ তাকে আর্তমানবতার নেতৃত্বে আসীন করে একজন সমাজ সংস্কারের মর্যাদায় বসানো যথার্থ দায়িত্ব পালন।

লেখক : ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×