যখন আমি বাবা হতে চেয়েছিলাম

  মাসুদ রানা আশিক ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেই ছোটবেলা থেকেই আমার একটাই স্বপ্ন; আমি একদিন বাবা হব। শয়নে-স্বপনে, জাগরণে আমার একটাই স্বপ্ন। ছয় বছর বয়স থেকেই এ স্বপ্নটা আমার মনে উঁকি দিয়েছে। তখন সবেমাত্র আমি প্লে শ্রেণীতে পড়ি। এ বয়সে অনেকে অনেক কিছু হতে চাইলেও আমি হতে চাইতাম বাবা। এটার একটা কারণও আছে। আমার বাবা খুব রাগী। আমি খুবই ভয় পেতাম তাকে। বাঘের চেয়েও বেশি। আমার মনে হতো আমিও আমার বাবার মতোই হব। তেজ থাকবে। রাগ থাকবে। সন্তানরা ভয় করবে আমাকে। আহা, ভাবতেই ভালো লাগত- আমি বাবা হবো। কিন্তু বয়স তো কম। ওই বয়সে তো বাবা হওয়া সম্ভব ছিল না। কাউকে তো দেখিনি ওই বয়সে বাবা হতে। মনে মনে ভাবতাম আমাকে বড় হতে হবে। অনেক বড়। আমার বাবার মতো। সেটাও তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আমাদের স্কুলের জব্বার স্যার একদিন প্রশ্ন করলেন,‘তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?’

আমি বলেছিলাম,‘ আমি বড় হয়ে কাজ করব স্যার।’

‘সে তো সবাই করে। এই যেমন আমি কাজ করছি।’

আমি স্যারকে থামিয়ে দিই, ‘আপনি কোথায় কাজ করছেন স্যার! আপনি তো শিক্ষকতা করছেন।’

‘আরে বাবা শিক্ষকতা করাও একটা কাজ। তা বল বড় হয়ে তুমি কী কাজ করতে চাও?’

‘বড় হয়ে আমার প্রথম কাজ হবে বাবা হওয়া।’

আমার কথা শুনে স্যার ‘থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘তোমার বাবাকে একটু আসতে বল তো। কথা আছে।’

পরদিনই বাবা এসেছিলেন। কথা বলেছিলেন জব্বার স্যারের সঙ্গে। স্কুল থেকে ফেরার পর বাবা আমার কান ধরে বললেন,‘তুই নাকি বড় হয়ে বাবা হতে চাস!’

‘হ্যাঁ বাবা, বাবা হওয়া খুব আনন্দের। সবসময় সবাইকে ধমক দেয়া যায়। তোমার কাছ থেকেই তো শিখছি।’

তখন মা এসে হাজির। বললেন,‘তুমি ছেলেটার কান ধরে আছো কেন, কী অপরাধ করেছে ও?’

বাবা চিৎকার করে উঠলেন,‘এই বয়সে তোমার ছেলে খুব পেকে গেছে। বড় হয়ে ও নাকি বাবা হতে চায়!’

মাও কম যান না,‘ও তো ঠিকই বলেছে। বড় হয়ে ও তো আর মা হতে পারবে না। বাবাই হবে।’

বাবার চোখ লাল হয়ে গেল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কষে একটা চড় বসিয়ে দিলেন আমার গালে। বাবার বিরাশি সিক্কা চড় খেয়ে আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। মা আমাকে ধরে ফেললেন,‘ চল বাবা, তোর মাথায় খাঁটি নারিকেল তেল দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিই।’

আমি বুঝতে পারি। আমার দাঁতের কোনো একটা অংশ নড়ে গেছে। ভালোই হয়েছে। এই দাঁতটা অনেকদিন ধরে ব্যথা করছিল। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হল না। এমনিতেই পড়ে যাবে। আমি ভাবলাম, আমার মা, øেহময়ী, মমতাময়ী মা। কতই না ভালোবাসা তার ছেলের জন্য। আর বাবা? বলাই বাহুল্য।

তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আমার বাবার চুলে পাক ধরেছে। আমিও অনেক বড় হয়ে গেছি এখন। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়েছি সেই কবে। কিন্তু চাকরি হয়নি এখনও। একটা প্রেমও চালাচ্ছি। কিন্তু বাবা হওয়ার স্বপ্ন থেকে এক চুলও বিচ্যুত হয়নি। এই স্বপ্ন আমাকে ভালোভাবে ঘুমাতে দেয় না। আমার অনেক বন্ধু বাবা হয়ে গেছে। যখন দেখি ওদের কোলে সন্তান তখন মনটা আকুলি-বিকুলি করে। স্বপ্নটা আরও তেড়ে আসে। তখন মনে হয় আজই বাবা হওয়া উচিত। সবাইকে দেখিয়ে দেয়া উচিত। শুধু তোমরাই না, আমিও বাবা হতে পারি। আমার প্রেমিকা রিমিকে বললাম সে কথা, ‘জানো, আমার না বাবা হতে ইচ্ছা করছে।’ আমার কথা শোনার পর রিমির চোখ গরুর মতো বড় হয়ে গেল, ‘অবশ্যই বাবা হবে। সেটা তোমার জন্মগত অধিকার। কিন্তু তার আগে যে তোমার বাবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

বাবার সহযোগিতা! বাবা হব আমি, সেখানে আমার বাবা কী করবে! শুধাই রিমিকে,‘বাবা কেন?’

‘আমাদের বিয়েতে উনাকে রাজি করাতেই হবে। নইলে বুঝতেই পারছ, তোমার বাবা হওয়ার স্বপ্ন অকালেই মাঠে মারা যাবে।’

রিমির কথা মানতে পারলাম না আমি। এতদিনের স্বপ্ন। সামান্য বিয়ে না হওয়ার জন্য সেটা মাঠে মারা যাবে। কোনোভাবেই এমনটা হতে দেয়া যাবে না। বাড়িতে যাই। মাকে বলি, ‘মা আজ বাবার সঙ্গে আমার কথা হবে। আমি বাবা হতে চাই। কিন্তু সেজন্য তো বিয়ে করা প্রয়োজন। কিন্তু আমার তো এখনও বিয়ে হয়নি।’

‘ঠিক বলেছিস। আমি তোর সঙ্গে থাকব। তোর অবশ্যই বাবা হওয়ার বয়স হয়েছে। তোর নানা তো অনেক ছোট বয়সেই বাবা হয়েছিল। তখন তোর নানার বয়স ছিল ২২। সে যুগের ছেলে তো। বয়স একটু কম হলেও কোনো সমস্যা ছিল না।’

মায়ের সঙ্গে কথা বলে আমি ছুটে যাই বাবার কাছে। বাবার বয়স হয়েছে। পত্রিকা হাতে বসে আছেন চেয়ারে। বাবা আমার দিকে তাকালেন,‘কিছু বলবে?’

আমি রাখঢাক রাখি না,‘আমি বাবা হতে চাই। সেজন্য বিয়ে করা উচিৎ। মেয়ে নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। ওই যে রিমি মেয়েটা, খুবই চমৎকার মেয়ে।’

মা পাশ থেকে বললেন, ‘খুবই চমৎকার। একবার এসেছিল। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে গেছে। খুব মায়াবতী। যদি আমার ছেলের বউ হয় মন্দ হবে না।’

বাবা বললেন, ‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছিস তুই!’

মা এসে দাঁড়ালেন আমার পেছনে। হাতে বাটি। বাটির ভেতর নারকেল তেল। বাবা যদি আমাকে চড় মেরে বসে মা তেল মালিশ করে দেবেন। তার পূর্ব প্রস্তুতি।

আমি বাবার কথায় পিছপা হই না। নিজের পায়ের দিকে তাকাই। কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না আমি অন্যের পায়ে দাঁড়িয়ে আছি। বাবাকে বলি, ‘হ্যাঁ বাবা, আমি নিজের পায়েই তো দাঁড়াতে শিখেছি। সেই ছোটবেলা থেকেই।’

ব্যস, সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে গেল। ঠাস করে একটা শব্দ হল। মনে হল আমি ঘুরছি। গালে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কোনো দাঁত নড়েছে কিনা। এ বয়সে বাবার হাতে এত জোর! পেছনে মা এসে বললেন, ‘আমি আছি। তোর মাথায় তেল মালিশ করে দেব।’

আমি দমে যাই না। কাঙ্খিত লক্ষে আমাকে পৌঁছাতেই হবে। পরদিনই রিমিকে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি। বাড়িতে ঢুকে কাঁচুমাচু মুখ করে বাবাকে বললাম, ‘বাবা, এই তোমাদের বউ মা।’

থমথমে নীরবতা ঘরজুড়ে। আমি অপেক্ষায় আছি পরবর্তী ঘটনার জন্য। বাবা আমাকে চড় মারবেন। মা আমার মাথায় তেল মালিশ করে দেবেন। কিন্তু না, ঘটনা ঘটল উল্টো। বাবা রিমিকে বলল, ‘মা এদিকে এসো। এই বেআক্কেলকে তুমি কেন বিয়ে করেছ। পৃথিবীতে আর কোনো ছেলে পেলে না?’

রিমি আমতা আমতা করে বলল,‘ছেলে ভালো। কিন্তু মাথাটা একটু খারাপ!’

বাবা এবার চিৎকার করে আমাকে বললেন,‘বেরিয়ে যা বদমাশ! কিছু একটা কর্ম করে তবেই বাড়ি ফিরবি। ‘কর্ম খালি নাই’ এই কথা বলে বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করবি না।’

যাক, নতুন বউয়ের সামনে চড়টা অন্তত খেতে হয়নি। আমি দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। কর্মের খোঁজে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter