চিন্তার বিষয়

অসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

  শরীফ শহীদুল্লাহ্ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাত্রীর বাবার কাছে ঘটক বলল, ‘ছেলে এতই ভালো যে, কারও দিকে চোখ তুলে তাকায় না।’ আবার পাত্রের মায়ের কাছেও ঘটকের একই কথা, ‘মেয়ের কথা কিছু বলার নেই। মেয়ে কারও দিকে ফিরেও তাকায় না’। মোটকথা ছেলেও ভালো, মেয়েও ভালো। কেউ চোখ তুলে তাকায় না। কিন্তু সমস্যা হল বিয়ের পরে। বর-কনে কেউ কারও দিকে তাকায় না, আলাদাভাবে দু’জনের চোখ সারাক্ষণ ফেসবুকে!

একসময় কারও দিকে না তাকানো কিংবা মুরব্বিদের চোখে চোখ না রেখে কথা বলা ছিল ভালো ছেলে-মেয়ের নমুনা। আর সেই ভালোকেই সবাই পছন্দ করত। এখন সেই চোখ না তুলে তাকানোই হয়েছে বিপদ। এখনকার তরুণরা বন্ধু-বান্ধবী, মা-বাবা, আÍীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কারও দিকেই তাকায় না। সবাই ফেসবুকে বুঁদ। বাবা-মা’রা ছেলে-মেয়েদের এই কর্মকাণ্ডে নাখোশ। কিন্তু তরুণরা অনড়-তুমি ‘সুন্দর’ তাই চেয়ে থাকি সে-কি মোর অপরাধ! জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, ফেসবুক হল জেলখানার মতো। এখানে ওয়াল আছে। সারাদিন ওয়ালে লেখালেখি করে সময় কাটে। আমাদের তরুণরা এখন স্বেচ্ছায় ওয়ালবন্দি!

মূলত ফেসবুক আমাদের মুরগিতে পরিণত করেছে। ডেস্কটপ, ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টফোন যার যা আছে তাতে চোখ রেখে সবাই ডিমে তা দেয়া মুরগির মতো চুপচাপ বসে থাকে। আর মুরগি ডিম পাড়া শেষে হলে কক্ কক্ শব্দ করে সবাইকে যেমন জানান দেয়, মানুষেরও হয়েছে সেই দশা। কোথাও বেড়াতে গেলে, বিশেষ প্রাপ্তি ঘটলে, পদোন্নতি হলে, ভালো খাওয়ার আয়োজন হলে ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সবাইকে জানান দেয়া চাই। কে কোথায় কখন কার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছে তা আর ফোন করে জানতে হয় না, ফেসবুক আপডেট দেখলেই বোঝা যায়। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই এই জ্বরে আক্রান্ত। অনেকেই ইন্টারনেটের ব্যবহার বোঝে না, কিন্তু ফেসবুক বোঝে। আর এ কারণেই বোধকরি দেশে ব্যবহৃত অর্ধেক ব্যান্ডউইথ ফেসবুক দেখার পেছনে ব্যয় হয়। আর ঢাকা শহর ফেসবুক ব্যবহারে বিশ্বে হয় দ্বিতীয়। রান্না-বান্না, খাওয়া, ঘুমানো, সবকিছুই এখন আপডেটের বিষয়। বাবা বেডরুমে বসে পোস্ট দেন আর ড্রইংরুমে বসে ছেলে তাতে লাইক দেয়। নানা পোস্ট দেয়, নাতি তাতে কমেন্ট করে। গিন্নী বেগুন ভাজতে গিয়ে পুড়ে ফেলেছে, সেই পোড়ার ঘ্রাণ ড্রয়িংরুমে পৌঁছেনি, কিন্তু পোড়া বেগুনের ছবি ফেসবুকে আপডেট হয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই, কানাডা থেকে বড় মামার ফোন আসে কর্তার কাছে- কী হল, রান্নাঘরে বেগুন পুড়ছে কেন?

অবশ্য ফেসবুকের সব বন্ধু বাস্তবের বন্ধু নয়। এরা অনেকটা কাজীর খোয়াড়ের গরুর মতো। খাতায় আছে, গোয়ালে নেই। সমীক্ষা চালালে দেখা যাবে ফ্রেন্ডলিস্টে যত বন্ধু আছে তার ৬০-৭০ ভাগ বন্ধুর সঙ্গে জীবনে কোনদিন সামনা-সামনি দেখাই হয়নি, অথচ তারা বন্ধু। বন্ধুদের নামধামও আজব। কেউ মেঘলা আকাশ তো কেউ আবার অঝোর বৃষ্টি। প্রোফাইল পিকচারেও ছবি নেই। তারপরও বন্ধু। এমনও হয় যে, ফেসবুকের দুই বন্ধু পাশাপাশি সারাদিন ট্রেন জার্নি করেছেন, অথচ পরস্পর কথা-বার্তাই হয়নি। ফেসবুকের কল্যাণে বাবা ছেলের বন্ধু, জামাই শ্বশুরের বন্ধু, কাজের মেয়ে গৃহকর্তার বন্ধু। আগে একই বয়সী সমলিঙ্গের মানুষ পরস্পর বন্ধু হতো। এরপর আধুনিকতার ধাক্কায় জানা গেল বন্ধুর কোনো লিঙ্গ-বর্ণ-বয়স নেই। আর ফেসবুক সেটাকে দিয়েছে ব্যাপকতা। এখন ঘরে বসে আঙুলের স্পর্শে বন্ধু বানানো যায়। বন্ধু বানানো যত সোজা, বাদ দেয়া তার চেয়েও সোজা। কারও স্ট্যাটাস বা কমেন্ট ভালো লাগল না তো বন্ধুর তালিকা থেকে তাকে বাদ। একদা বন্ধু বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াত। সেসব এখন ইতিহাস। এখন বন্ধুত্বের বন্ধন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাইক কমেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখন দুই বন্ধু মারামারি করলে তৃতীয় বন্ধু থামানোর উদ্যোগ নেয় না, সে মনোযোগ দিয়ে ভিডিও করে ফেসবুকে আপলোড করার জন্য। ফেসবুক মূখ্য, বন্ধুত্ব নয়।

আরেক সমস্যা হল সেলফি বাতিক। সেলফি তোলা আর ফেসবুকে আপলোড করা এখন অনেকেরই নৈমত্তিক কাজ। সেলফিস মানুষরা অন্তত নিজের কথা ভাবে, কিন্তু সেলফিওয়ালারা নিজের কথাও ভাবে না। কে কত ব্যতিক্রম ও ভয়ংকর সেলফি তুলতে পারে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। এক বন্ধু পানিতে ডুবে যাচ্ছে তো আরেক বন্ধু সেলফি তুলছে। ব্যতিক্রম সেলফি তুলতে গিয়ে জীবন সংহারের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। তবুও সেলফি তুলতে হবে। মায়ের কবর খুঁড়তে গিয়ে ছেলে সেলফি তুলছে, হাসপাতালের ডাক্তার সেলফি তুলছে অপারেশন টেবিলের রোগীর সঙ্গে। একজন তো আবার কোরবানির গরুর সঙ্গে সেলফিসহ তুলে স্ট্যাটাস দিয়েছে যে, তাকে কেমন লাগছে। আরেক বন্ধু কমেন্ট করেছে-মানুষের চেয়ে গরুটাকেই বেশি ভালো লেগেছে। যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল!

কারও হয়েছে লাইকের রোগ। নিজে যেমন লাইক পেতে পছন্দ করেন, তেমনি ভালো-মন্দ, সাত-পাঁচ ভেবে না ভেবেই লাইক দেন। একটা ছবি আপলোড বা স্ট্যাটাস আপডেট করার পর ঘন ঘন পকেট থেকে মোবাইল বের করে আর দেখে নেয়-কয়টি লাইক পড়েছে। তাদের কাছে একেকটা লাইক জাতীয় নির্বাচনের ভোটের মতো। লাইকের সংখ্যা যত বাড়ে শরীরে উত্তেজনাও তত বাড়ে।

অবশেষে পুরনো কৌতুক আরেকবার। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, ‘জাকারবার্গ বিলিয়নার হতে পেরেছেন কেন জানিস?’ দ্বিতীয় বন্ধু: ‘কেন?’ প্রথম বন্ধু : ‘কারণ, তার মা কখনও তাকে বলেননি যে, সারাদিন কেবল ফেসবুক আর ফেসবুক! তুই ফেসবুকের পেছনে অনেক সময় নষ্ট করছিস!’

ভাইরে, স্কুল পালিয়ে যেমন রবীন্দ্রনাথ একজনই হন তেমনি সারাক্ষণ ফেসবুক ফেসবুক করে একজনই জাকারবার্গ হয়। কাজেই ফেসবুকে তরুণদের অতিমাত্রায় সময় নষ্ট করার বিষয়ে মা-বাবাদের এখনই সচেতন হতে হবে, অন্যথায় এই সোসাল মিডিয়া একদিন আমাদের সবাইকে আনসোস্যাল করে ছাড়বে!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

E-mail: [email protected], [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter