চিন্তার বিষয়

কথাভর্তা

  শরীফ শহীদুল্লাহ্ ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কথার মাধ্যমে যখন পরস্পরের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হয় সেটা কথাবার্তা। আর একই কথা বারবার বলা, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলা কিংবা প্রসঙ্গে স্থির থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় পার করা হল কথাভর্তা। কথাবার্তা থেকে নতুন তথ্য আসে, সেই নতুন তথ্য পরস্পরের কাজেও লাগে। অপরদিকে, কথাভর্তা থেকে নতুন তথ্য বের হয় না, আলোচনার নতুন শাখা-প্রশাখা গজায় না, কেবল একটি কথাকেই কচলানো হয়। অকারণে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কচলিয়ে কচলিয়ে মণ্ড করা হয় অতঃপর সেটাকে আবারও কচলানো হয়। কচলাকচলির পর যেটা দাঁড়ায়, সেটা ভর্তা নয়তো কী?

আমাদের বন্ধু মীরনকে আমরা ডাকি ‘পীড়ন’ বলে। হ্যাঁ, মীরন অন্তত একটা ক্ষেত্রে বন্ধুদের জন্য পীড়নই! মীরন সাধারণের চেয়ে বেশি কথা বলে, প্রচুর কথা বলে, একই কথা বারবার বলে। এবং সেই কথা নিউটনের প্রথম গতিসূত্রের মতো বাহ্যিক বাধা না আসা পর্যন্ত সুষম গতিতে চলতেই থাকে। গতকালের আড্ডায় যে গল্প সে বলেছে সেই গল্প আজ আবার কিছুটা বাড়িয়ে নতুন রূপে আরও একবার বলবে- হয়তো কালও আবার শুনতে হবে! ওর সঙ্গে আড্ডায় বসলে কথাবার্তা হয় না, এফএম রেডিওর উপস্থাপক বা উপস্থাপিকার অনর্গল কথার মতো একমুখী বাকবাকুম শুনতে শুনতে কানের চৌদ্দটা বাজে। চোখ ও মুখ ইচ্ছে করলেই বন্ধ করা যায়, কিন্তু কান সেই গোছের ইন্দ্রিয় নয়; উন্মুক্ত কান দুটো বাধ্য হয় মীরনের ভর্তাসমগ্র শোনার জন্য।

কোনো একটা বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, মীরনের তাতে অংশগ্রহণ করা চাই-ই চাই। সে তর্জনী তুলে বিনয়ের সঙ্গে বলবে, ‘জাস্ট এক মিনিট।’ তারপর সে তার এক মিনিটের কথা বলতে শুরু করে। লোকাল ট্রেনের বেলায় যেমন বলা হয়, একটার ট্রেন কয়টায় ছাড়বে? মীরনের বেলায়ও তাই-এক মিনিটের কথা কয় মিনিটে শেষ হবে কেউ জানে না। সেই এক মিনিট অন্য কেউ তাকে না থামিয়ে দেয়া পর্যন্ত শেষ হয় না। থামিয়ে দিলেও সমস্যা। সে রেগে বলবে, ‘আমাকে কথা বলতে দিবি না? যা, তোদের সঙ্গে আর কথা নেই।’ সবাই ধরে-টরে রাগ প্রশমন করি। সে বলতে থাকে। আড্ডা থেকে কেউ উঠে গিয়ে কান রক্ষা করে, কেউ হালকা তন্দ্রায় যায়, তবু মীরনের কথা চলতেই থাকে। এক পর্যায়ে সেই কথা ভর্তায় রূপ নেয়!

এদেশে ভর্তার কদর বেশি। একই ইতিহাস একেক জন একেক রকম বলেন, মনের মাধুরী মিশিয়ে বলেন। তখন ইতিহাসবিষয়ক বক্তব্য আর কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকে না, ভর্তায় রূপ নেয়। টিভি টকশোর নামে একই বিষয়ে প্রতিরাতে যে আলোচনা চলে সেটা তো ভর্তাই! একই ব্যক্তি এক টিভিতে ভর্তা বানানো শেষ করে পরের ঘণ্টায় আরেক টিভিতে ভর্তা নতুন করে পিষতে শুরু করেন। দেশে যদি কোনোদিন ‘কথাভর্তা টিভি’ নামে কোনো টিভি চ্যানেল লাইসেন্স পায়, মীরন সেটার প্রধান নির্বাহী হওয়ার যোগ্যতা রাখে! অন্তত আমাদের বিশ্বাস সেরকমই।

এরিস্টটল বলেছেন, পাগলামির মিশ্রণ ছাড়া কোনো বড় প্রতিভা থাকতে পারে না। তো অপ্রয়োজনে যারা বেশি কথা বলেন, কথাকে ভর্তা বানান, এমন মানুষদের পাগল বলার সুযোগ নাই। ওনারা বড় প্রতিভা! এ প্রতিভাধর মানুষে দেশটা ভরা। বন্ধু মীরন তাদের একজন।

সময়টা এখন ভর্তা বিশেষজ্ঞদের। হাজি-গাজী-সুপার বিরিয়ানি আর শাহী মোরগ পোলাওর যুগে বুদ্ধি খাটিয়ে যারা ভর্তা-ভাজির দোকান দিয়েছেন, তারা কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজটিই করেছেন। ইতিহাসের বইয়ে-রেডিওতে-টিভিতে কথাভর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির মুখে কথাভর্তা। সেই ভর্তা কখনও বাসি, কখনও তেষ্যা। এরা একই ভর্তার গল্প রোজ শোনান। কিছু করতে পারুক না পারুক, ভর্তা তৈরিতে তারা একদম পাক্কা।

যা হোক বন্ধু মীরনের কথা বলি, যার প্রবল কথার বর্ষণ আমাদের কাছে পীড়ন। বন্ধুরা একত্রিত হয়েছি; কিন্তু আলোচনার কোনো বিষয় নেই এমন সময় হয়তো কেউ কৌশল করে ‘বিগ ব্যাং থিউরি’ নিয়ে আলোচনা শুরু করল। যে শুরু করছে সে এই বিষয়ে কিচ্ছু জানে না। ভরসা ওই মীরন। তাকে প্রসঙ্গ ধরিয়ে দিতে দেরি, তার কথাভর্তা তৈরির কাজে দেরি হয় না। দেখা গেল, ইতিহাসের ছাত্র মীরন ‘বিগ ব্যাং’ বিষয়ে আধাঘণ্টার লেকচার দিয়ে ফেলেছে!

হরিনা বৈরী আপন মাংসে আর মীরনের অতিকথনই মীরনের শত্র“। কীভাবে? সেই গল্প বলে শেষ করি। আমরা একবার সিদ্ধান্ত নিলাম শের শাহের রাজধানী সোনারগাঁ যাব। সারা দিন ঘুরব, আড্ডা দিব, খাওয়া-দাওয়া করব। মীরন থাকবে না, গ্রামের বাড়িতে কী এক অনুষ্ঠান সেখানে যাবে। সবাই রিকোয়েস্ট করলাম। কাজ হল না। সে আমাদের না জানিয়ে টিকিট কেটেছে। গোপন সূত্রে সেই খবর আমাদের কানে এসেছে। শলাপরামর্শ করে ঠিক করা হল ওকে ঘায়েল করতে ওকেই ব্যবহার করা হবে, মানে মাছের তেলে মাছ ভাজা কিংবা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা হবে।

বাস কখন ছাড়বে মীরনের রুমমেট সূত্রে সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মীরন ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে প্রায় রেডি। অমনি আমরা পাঁচজন গিয়ে হুড়মুড় করে মীরনের রুমে হাজির। ‘মঙ্গলগ্রহে মানুষের বসবাসের সম্ভাবনা’ শীর্ষক অনির্ধারিত আলোচনা শুরু করলাম। আলোচনা কিছুদূর এগোতেই মীরন বলল, ‘আমি এক মিনিট বলি।’ আমরা পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম- কাজ হয়েছে! সে ছায়াপথ, সৌরজগৎ, গ্রহ-নক্ষত্র ও চাঁদের আবহাওয়া এবং জলবায়ুর বর্ণনা শেষে করে মঙ্গলগ্রহ যখন শুরু করেছে, ততক্ষণে দেড় ঘণ্টা পার! মানে মীরনের পকেটে যে বাসের টিকিট, সেটা ততক্ষণে ছেড়ে গেছে। আমরা পূর্বনির্ধারিত কৌশল মোতাবেক উঠতে গেলে মীরন সংবিত ফিরে পেয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।

বেশি কথা বলা অর্থাৎ কথাভর্তা বানানো মানুষগুলো টিউবলাইটের মতো। একটু পরে জ্বলে। মীরনও অসময়ে তার রুমে আমাদের আগমনের কারণ অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে, তবে একটু দেরি হয়েছে, এই আর কী!

আরও পড়ুন
pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter