উদাহরণ

  কাজী সুলতানুল আরেফিন ০৬ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল থেকেই মেজাজ চড়ে আছে আসমা বেগমের। যেমন জ্বলন্ত উনুনে খই ফুটে তেমনি ফুটছে আসমা বেগমের মুখের বুলি। তার মেজাজ বুঝতে পেরে চুপচাপ থাকার চেষ্টা করেন আরমান সাহেব। শুক্রবার ছুটির দিন। সকালে নাস্তা দিতে দিতে আরমান সাহেবকে কয়েক দফা ঝেড়ে দিয়েছে আসমা।

‘আপনার বোনরে তো দেখছি তার স্বামী এই সময়ে মুখে তুলে খাওয়াই দিছে! আমারে তো খাইতেও কন না!’

‘শুধু উদাহরণ দেখাও কেন?’

‘উদাহরণ দেখামু না তো কী করুম? কী পাইছি আপনের লগে থাইকা?’

‘এ দুনিয়ায় সবার জীবন এক রকম হয় না!’

‘এক রকম হয় না ঠিক আছে, আমার তো কোনো রকমই হয় না! আপনার বোনরে তো এমএ ভর্তি করাইছে আর আমারে তো একাদশ পাস করার পর আর ভর্তি হইতে দিলেন না! তাও ভাগ্যিস বিয়ের আগে ভর্তি ছিলাম নাইলে সেটাও পাস করতে পারতাম না!’ বলতে বলতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাঁটে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা আসমা বেগম।

আরমান সাহেব নড়ে চড়ে উঠে আবারও বলেন, ‘আরে তখন তোমার ছোট বাবু ছিল তাই ভর্তি হতে দিই নাই।’

‘এখন আপনার বোনেরও ছোট বাবু আছে! তবুও সে ভর্তি হইছে।’ খেঁকিয়ে উঠে আসমা বেগম।

‘শুধু বোনের উদাহরন দাও কেন? অন্য কারো কথা বলতে পারো না?’

‘আচ্ছা। অন্য কারো কথা বলছি! গত ঈদে আপনার জানের বন্ধু স্বপনের বউ ২০ হাজার টাকা দিয়ে নিজের জন্য শাড়ি কিনছে।’

‘স্বপন তো আমেরিকায় থাকে!’

‘আপনে আমেরিকা থাকেন না কেন?’

‘আমি তো তোমার কাছেই আছি।’

‘কাছে থাকার দরকার নাই। পারলে আমেরিকা যান, আর এবারে বাবু হওয়ার সময় আমি আমার মা’র কাছে থাকমু কইয়া দিলাম। আপনার বোন যেমন বাবু হওয়ার সময় আপনার মায়ের কাছে ছিল তেমন। প্রথম বাবুর সময় যাইতে দেন নাই মনে আছে!’

‘আচ্ছা আচ্ছা যেও। এবার থামো- উদাহরণ আর ভালো লাগে না। উদাহরণ দিলে সবার দিতে হবে- শুধু ধনীদের দাও কেন? এ সমাজে গরিব বলে কি কেউ নেই? তুমি অনেক গরিব থেকে হাজার গুণে ভালো আছ!’

‘হ্যাঁ, গরিবের উদাহরণও আছে। আমাদের কাজ করে যে শহীদ মিয়া তাকে দেখছি বউ পোয়াতি হইছে আর ডিম সিদ্ধ কইরা নিজের হাতে বউরে খাওয়াইছে। আমার সময়ে কপালে একটা ডিমও জুটে নাই।’

‘এবার থামো। যাও, আইজকাই ডিম এনে সিদ্ধ করে তোমারে খাওয়ামু।’

‘লাগবে না থাক।’ বলেই হন হন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল আসমা বেগম।

কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি পায় আরমান সাহেব। কিন্তু এ স্বস্তি বেশিক্ষণের জন্য নয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আসমা বেগম এসে দুনিয়ার উদাহরণ ঝেড়ে যায় তার ওপর। যতক্ষণ অফিসে থাকেন তিনি ততক্ষণ শান্তিতে থাকেন। পুরাটা সময় অবশ্য শান্তিতে থাকেন বললে ভুল হবে। মাঝে মাঝে আসমা বেগম ফোন করেও উদাহরণ ঝাড়েন।

একদিন বিকালে আরমান সাহেব অফিস থেকে বাড়ি ফিরে দেখতে পেলেন হাসিনা বেগম সবকিছু গোছগাছ করে রেডি। পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটাও নাচছে খুশিতে। নানুবাড়ি যাচ্ছি বলে বলে আনন্দে লাফাচ্ছে। আরমান সাহেবকে দেখেই আসমা বেগম চেঁচিয়ে জানতে চাইল,‘সিএনজি ড্রাইভারকে ফোন দেবেন নাকি আমি রাস্তায় গিয়ে নিজেই ভাড়া করে নিমু!’ এ কথা শুনে আরমান সাহেব বললেন, ‘একি বলছ! এখনও ২ মাস বাকি আছে!’

‘আপনার বোন ৬ মাস আগে থেকেই ছিল। শুধু আপনার বোন না! পাশের ঘরের রুবিনা ভাবী ৫ মাস আগেই চলে গিয়েছিল। আমি শুধু ২ মাস থাকতেই যাচ্ছি।’ আসমা বেগমের উদাহরণ চলতেই থাকে।

‘আম্মাকে বলেছ? এভাবে চলে যাচ্ছ!’ আরমান সাহেব প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

‘বলেছি আপনি আমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আশা করি আপনিও সেটা বলবেন!’

আরমান সাহেব অনেক্ষণ নিশ্চুপ থেকে কী না কী মনে করে নিজেও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

আসমা বেগমকে তার মায়ের কাছে দিয়ে আসার পর আজ ২ মাস আরমান সাহেবের কান জোড়া স্বস্তিতে আছে। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া। সেদিন তিনি ছুটে যান স্ত্রী-সন্তানের কাছে। তা না হলে কপালে খারাফি আছে নিশ্চিত। কারণ ছুটির দিনে আসমা বেগমের বাড়ির সব মেয়ের স্বামীরা ছুটে আসে।

অবশেষে একদিন খুব সকালে সুখবর এলো। ২য় সন্তানটিও ছেলে। স্বাভাবিক প্রসব। সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে যে রমরমা বাণিজ্যিক আর জটিল অবস্থা চলছে তা থেকে পর পর ২ বার বেঁচে গেলেন আরমান সাহেব। এজন্য তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

সবাইকে সুখবরটা দিলেন তিনি। সকালের আলো ফুটতেই দু’হাতে দেদারছে খরচ করে ছুটলেন শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে আরমান সাহেব। শাশুড়ির জন্য শাড়ি নিলেন, দামি মিষ্টিও নিলেন। শ্যালিকাদের জন্য রসমালাই, চকবার আইসক্রিমও নিলেন। আরও আরও একগাদা বাজার করলেন। বারবার চিন্তা করতে লাগলেন। কোনো কমতি যেন না থাকে। আসমা যেন কোনো উদাহরণ দেখাতে না পারে। আসমা আর সন্তানদের জন্য জামা কাপড়ও নিলেন।

কুশল বিনিময় পর্ব শেষ। মিষ্টি মুখ পর্বও শেষ। আগুন ছুঁয়ে নতুন অতিথি দেখার জন্য রুমে প্রবেশ করলেন আরমান সাহেব। নতুন মেহমানকে কোলে তুলে আনন্দে আত্মহারা আরমান সাহেব। এমন সময় আসমা বেগম গম্ভীর গলায় জানতে চাইল আরমান সাহেব আসার সময় কী কী এনেছেন?

আরমান সাহেবও বুক ফুলিয়ে লিস্ট শুনিয়ে দিলেন।

আসমা বেগমের মুখ প্রথমে উজ্জ্বল হলেও আচমকা নিমিশে কালো হয়ে গেল। একসময় মুখ খুলল সে,‘সবই ঠিক আছে- একটা জিনিস আনেন নাই!’

‘কী, কী আনি নাই?’ তোতলাতে তোতলাতে জানতে চাইলেন আরমান সাহেব।

এ সময়ে দুনিয়ার সবাই তাদের বউকে কবুতরের বাচ্চা খাওয়ায়। কবুতরের বাচ্ছা না খেলে রক্ত পূরণ হয় না।’ বলেই নাকি সুরে কেঁদে উঠল আসমা বেগম।

‘এই থাম থাম বলছি। কবুতরের বাচ্ছা এক্ষুনি এনে দিব।’

শুনে আসমা বেগমের সাদা দন্ত বিকশিত হয়ে উঠল। হেসে বলল, ‘আমি কিন্তু মা’র কাছে ৬ মাস থাকব। দেখেন নাই- আমাদের পাশের ঘরের ফারহানা ৬ মাস ছিল।’ আরমান সাহেব একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন। হ

আরও পড়ুন
pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.