বড় শীত শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে দেয়

  শরীফ শহীদুল্লাহ্ ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শীতের ছুটির পর স্কুল খুলেছে। শিক্ষক জানতে চাইলেন শীতের ছুটি কিভাবে কাটালে তোমরা? এক ছাত্র জবাব দিল- সোয়েটার পরে, মাফলার পরে, মোজা পরে, জ্যাকেট পরে। কেবল স্কুলের শীতের ছুটি নয়, শীতের পুরো বাংলাদেশই এমন কাটছে। কাঁথা-কম্বল-লেপ যার কাছে যা আছে সব নিয়ে শীতের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একসঙ্গে কে কত বেশিসংখ্যক পোশাক পরতে পারে পুরো জাতি সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। পোশাক খুলতে শুরু করলে আর শেষ হয় না। বড়র নিচে মাঝারি, মাঝারির নিচে ছোট। অবশ্য পৌষে যখন মাঘের শীত হাজির, তখন আর কী-ই-বা করা।

এতকাল শীত বলতে কেবল মাঘ মাসের বন্দনা হতো। এই যেমন- মাঘের শীত বাঘের গায় কিংবা এক মাঘে শীত যায় না। সে কারণেই হয়তো এবার পৌষ চটেছে। পৌষও যে শীত ঋতুর অংশ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে বাঙালি। এবারের পৌষের শীতে বাঘ তো বাঘ, চিড়িয়াখানার গণ্ডারও কাঁপছে। শোনা যায়, হিম ঠাণ্ডায় গণ্ডারের মতো মোটা চামড়ার মানুষগুলো সুয্যি মামাকে চাচা-জেঠুও ডেকেছে! কিন্তু সুয্যি মামা ভাগ্নেদের ওপর নাখোশ। তিনি নিরুত্তাপ আলো দিয়েই দায় সারছেন।

শীত অলসকে দিয়েছে নবাবের মর্যাদা; নিজে ছাড়তে চাইলেও কম্বল তাকে ছাড়ে না। ফাঁকিবাজকে এনে দিয়েছে বিশেষ সুযোগ- কথায় কথায় শীতের দোহাই। চোরের সুবিধা সবচেয়ে বেশি। গৃহস্থ এখন কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমান। অতএব কান বন্ধ। কাজেই চোর ঘরে ঢুকে চুরি শেষে দুই পর্ব হিন্দি সিরিয়াল দেখলেও গৃহস্থ টের পায় না। আবার চোর ধরা পড়ে গেলেও মোটা কাপড়-চোপড় গায়ে থাকায় মাইরের ধাক্কাটাও কম লাগে।

কানাডায় যখন তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তখন অস্ট্রেলিয়ার তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে। উত্তর আর দক্ষিণের ৫০-৫০ এর ধাক্কায় বাংলাদেশের তাপমাত্রা ৫০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে এখন সর্বনিম্নে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৫০ বছরের মানুষকে এক ধাক্কায় সত্তরের বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে। আবার ঘন কুয়াশায় ৫০ গজ দূরের কোনোকিছু দেখা না যাওয়ায় লঞ্চ ও ফেরি চলাচল ভীষণভাবে ব্যাহত হয়েছে। দিনের অর্ধেক সময় বিমান ওঠানামাও বন্ধ ছিল কয়েকদিন। কাজেই দেশে শীত পড়ে কি পড়ে না, এ নিয়ে যারা ৫০-৫০ দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন, তারা এবার ১০০% নিশ্চিত হয়েছেন- হ্যাঁ, শীত পড়েছে!

বাঙালি কম পেলেও ব্যাজার, বেশি পেলেও ব্যাজার। গেল বছর শীতকালে ভালো শীত পড়েনি। শীতকাল চলে গেছে অথচ অনেকের শীতের কাপড়চোপড় ধরা লাগেনি। তখন অনেকেই বলেছেন, আহা! শীতের দিনে শীত না পড়লে কি ভালো লাগে? কেউবা বলেছে, হায়, দেশটা মরুভূমি হয়ে গেছে। সেই দেশে এবার শীত একটু গাঢ় হতে না হতেই চারিদিকে হায় হায় শুরু হয়ে গেছে। আহা! শীত এত বেশি কেন? এতটা না পড়লে কি হতো না ইত্যাদি ইত্যাদি। কারও কারও মতে, তীব্র শীতের জন্য ফেসবুক দায়ী। তারুণ্য সূর্যের মতো। অথচ ফেসবুকের কারণে তরুণদের নড়াচড়া বন্ধ, পরস্পরের মধ্যে বাক্যবিনিময় হয় না। তাদের ভাব বিনিময় হয় লাইক-কমেন্টে। আর তরুণরা ঠাণ্ডা বলেই কিনা দেশের তাপমাত্রা নেমে গেছে।

কেউবা বলছে- মানুষের চরিত্র এই শীতের জন্য দায়ী। মানুষের চরিত্র নিচে নামায় তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাপামাত্রাও নিচে নামতে শুরু করেছে। তাই তো, চরিত্র যদি কাম্য সীমার নিচে নামতে পারে, তবে তাপমাত্রা নিচে নামতে দোষ কী?

শীতের সঙ্গে গীতের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। গলা ছেড়ে গীত গাইলে শরীর গরম হয়। এ কারণেই হয়তো বা বলা হয়, লাগে শীত তো গাও গীত। তবে এবারের শীতে কম্বলের নিচে বসে গীত গাইলে কাজ হলেও হতে পারে, তবে কম্বলের বাইরে নয়।

সমালোচকরা বলেন, শীতের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই মানে? শীত তো পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। সরকারই তো সবকিছু ঠাণ্ডা করে রেখেছে। তিন বছর ধরে রাজনীতির মাঠে উত্তাপ নেই, গাড়িতে আগুন নেই, নেতাদের জ্বালাময়ী কথা নেই। মানে সবকিছু ঠাণ্ডা। আর সবদিক ঠাণ্ডা হওয়ায় শীত তো জমবেই। সরকার চায় শীত আসুক, শীত স্থায়ী হোক। কারণ শীতে ফ্যান ঘোরে না, এসি চলে না। ফলে লোডশেডিংও হয় না। শীত যত বেশি, বিদ্যুৎ খাতের সফলতা তত বেশি!

স্কুল-কলেজে চলছে সৃজনশীল পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে বিষয়ের ওপর নিজে সৃষ্ট বা অনুধাবনকৃত জ্ঞান প্রয়োগ করতে হয়। শীতের সকাল বিষয়ে রচনা লিখতে বলা হলে এতদিন শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ে লেখা জ্ঞান পরীক্ষার খাতায় ঢেলে দিয়েছে। আর এবারের শীত সৃজনশীল শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়ে এসেছে দারুণ সুযোগ। শীত কী জিনিস তা এবার শিক্ষার্থীরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করতে পেরেছে। সেই হিসেবে তীব্র শীতের গুরুত্ব অপরিসীম। এবারের শীত উপভোগের পর শিক্ষার্থীরা শীতের সকাল কেন, শীতের দুপুর-বিকেল-রাত যাই পরীক্ষায় আসুক, বাস্তব উপলব্ধি থেকে লিখতে পারবে।

সে যাই হোক, শীত পরস্পরকে নিজের অজান্তেই আপন করে দিচ্ছে। বাসে-ট্রেনে পাশের সিটের যাত্রী মুখে কিছু না বললেও পাশ ঘেঁষে বসছেন, সদ্য পরিচিত বন্ধু বা বান্ধবী রিকশায় পরস্পর চেপে চেপে বসছেন। আবার দাম্পত্য কলহের কারণে যারা বিছানায় দূরত্ব বজায় রেখে রাত্রিযাপন করতেন কিংবা বাড়াবাড়ি করলে ফ্লোরে শোয়ার হুমকি দিতেন, শীত তাদের মান-অভিমান, রাগ-বিরাগ-অনুরাগ ভেদাভেদ ভুলে আপন হতে বাধ্য করেছে। মনের মিল না থাকলেও কেউ বিছানা ছাড়ছে না। যারা ভুলেও অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করেন না তারা একটু উষ্ণতার জন্য প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ঘন ঘন কোলাকুলি করছেন। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানগুলো সর্বস্তরের মানুষের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সবাই একসঙ্গে বসে গরম পানীয় পান করছেন আর সুখটান দিচ্ছেন।

অবশ্য উল্টোচিত্রও আছে। কুকুরে কামড়ায়নি অথচ জলাতঙ্ক রোগ হয়েছে- তীব্র শীতে এমন রোগীর সংখ্যা ঢের বেড়েছে। এই মৌসুমি রোগীদের কাছে জল রীতিমতো আতঙ্ক। কাজেই তাদের প্রাত্যহিক গোসলের কাজটাও আর সারা হয় না। ফলাফল যা হওয়ার তাই, শরীরে ভর করেছে বিকট দুর্গন্ধ। সঙ্গত কারণে তাদের ত্রিসীমানায় প্রিয়জনের আনাগোনাও বন্ধ।

সমাজের অতি ভদ্র মানুষদের বোঝা বড় মুশকিল। তারা হঠাৎ বড়মাপের অঘটন ঘটিয়ে ফেলে। সেজন্য বলা হয়, ঠাণ্ডা মানুষ আন্ডা পাড়ে। অতি শীতও তাই পরস্পরকে কাছে টানে আবার প্রিয়জনকে ছুড়েও ফেলে!

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter