ছয় বছরে ব্যয় ৪০ কোটি টাকা

সুফল নেই জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির

বঞ্চিত প্রকৃত অনগ্রসর জনগোষ্ঠী

  মিজান চৌধুরী ২৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছয় বছরে ব্যয় ৪০ কোটি টাকা
হিজড়াদের পেছনে ছয় বছরে ব্যয় ৪০ কোটি টাকা। প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশি ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে জঙ্গিরা ঢাকার রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করে। এ সময় হাতেনাতে এক ঘাতককে ধরে ফেলে লাবণ্য নামের এক হিজড়া। তার এই সাহসিকতার কারণে পরবর্তীতে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়।

সে সময় লাবণ্যের এই সাহসিকতার জন্য দেশজুড়ে তুমুল প্রশংসা শুরু হয়। কিন্তু একই সঙ্গে লাবণ্য প্রশ্ন তোলেন কবে হিজড়া সম্প্রদায় দেশের অন্যান্য নাগরিকের ন্যায় চাকরি ও আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে সমান সুযোগ পাবে। দেখা হবে সমান চোখে।

২০১৩ সালে সরকার হিজড়া সম্প্রদায়কে দেশের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর তাদের জীবনমান উন্নয়নে ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর বিগত ৬ বছরে সরকার হিজড়াদের পেছনে ব্যয় করে ৪১ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে আরও ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সমাজসেবা অধিদফতরে হিসেবে দেশে হিজড়ার সংখ্যা ১০ হাজার। আর সরকারি ব্যয়ে এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছে ৭ হাজার। প্রশিক্ষণের পর ৫ হাজার ২৮০ জনকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা দেয়া হয় আত্মকর্মসংস্থানের জন্য।

কিন্তু আদৌ কি এ প্রশিক্ষণ ও সহায়তা হিজড়াদের পরিবর্তন ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে? আদৌ কি প্রকৃত হিজড়া এর সুবিধাভোগী হচ্ছেন? সরকার কতটুকু স্বপ্ন পূরণ করতে পারছে সাহসী লাবণ্যের মতো হিজড়াদের। এ প্রশ্ন এখন অধিকাংশ হিজড়াগোষ্ঠীর। এ নিয়ে অনুসন্ধান করা হয় যুগান্তরের পক্ষ থেকে।

কথা হয় রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর জুটপট্টির বাসিন্দা হিজড়া আখতারের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়ন প্রশিক্ষণের নামে চলছে এক ধরনের কমিশন বাণিজ্য।

হিজড়ার ন্যায় চালচলন-কথাবার্তার একশ্রেণীর পুরুষ কমিশনের বিনিময়ে এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। নেপথ্যে কতিপয় ব্যক্তি প্রশিক্ষণের তালিকায় নাম তুলতে আদায় করছে জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে কমিশন।

তিনি বলেন, যে কারণে সেন্টারে প্যান্ট-শার্ট পরেই এসব পুরুষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অথচ হিজড়াগোষ্ঠী কখনও পুরুষের পোশাক পরে না। শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণ শেষে ১০ হাজার টাকা সহায়তার চেক গ্রহণের সময় তাদের শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজ পরে আসতে শিখিয়ে দেয়া হয়।

কারণ চেক হস্তান্তরের দিন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। তাদের চোখ ফাঁকি দিতেই এ কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। হিজড়াদের ন্যায় এসব পুরুষ সরবরাহকারী ব্যক্তিটির সঙ্গে গোপন আঁতাত রয়েছে অনেক সেন্টারের সঙ্গে।

আখতার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমার নিয়ন্ত্রণে ৩০ জন হিজড়া থাকলেও প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়নি কেউ। প্রশিক্ষণ নিতে সেন্টারে যোগাযোগ করলে আমাকে বলা হয় কোটা পূরণ হয়ে গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি এমন অভিযোগ যশোরে হিজড়া প্রশিক্ষণ স্থান শহরের নাজির শংকরপুর জিরো পয়েন্ট শিশু পরিবার কেন্দ্রে গিয়ে প্রতিবাদ করেছেন হিজড়ারা। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে চলমান প্রশিক্ষণ বন্ধ করে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ওই অঞ্চলের গুরু মা সোহেলীর দাবি, প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া অনেকেই সন্তানের জননী। আর চালচলনে ও হাঁটাচলার ভাবভঙ্গিতে হিজড়া মনে হলেও তারা আসলেই হিজড়া না।

সমাজসেবা কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই না করেই তৃতীয় লিঙ্গের এই মানুষদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দিচ্ছেন। এতে প্রকৃত হিজড়ারা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, হিজড়াদের স্বনির্ভর করার উদ্দেশ্যে সরকার এ অর্থ দিচ্ছে। দিন আনে দিন খায় এমন পরিস্থিতিতে থেকে বের করা এবং আয়-রোজগারের পথ তৈরি করতে এ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কার্যকর না হলে এটি আমরা খতিয়ে দেখব এবং রিভাইস করার চেষ্টা করব।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ নিয়ে অধিকাংশ হিজড়া সমাজের মূল ধারায় আত্মকর্মসংস্থান তৈরির কোনো কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়নি। মিরপুর ১০ নম্বর সমাজকল্যাণ বিভাগের অফিসে প্রশিক্ষণ নিয়েছে হিজড়া রেশমি। সহায়তার অর্থ দিয়ে কিছুই করতে পারেনি। রেশমির মতে সুযোগ পেয়েছি বলে এই কাজ শিখেছি। বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে প্রশিক্ষণের তালিকায় নাম লিখলে পাওয়া যাবে ১০ হাজার টাকা। এই প্রবণতা মাথায় নিয়ে অনেকে নাম লেখাচ্ছে।

এ সহায়তার পুরোটাই চলে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। মূলত অস্বচ্ছতা এবং কার্যকর পরিকল্পনা না থাকায় ভেস্তে যাচ্ছে হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি। প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা ছাড়াও শিক্ষা উপবৃত্তি দেয়া হয়েছে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৬৭৫ জনকে। বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ২ হাজার ৩৯১ জন। অভিযোগ রয়েছে উপকারভোগীর তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার কারণে এখনও অনেকে এ ভাতা পাচ্ছে না।

মিরপুরে গুরু মা সত্তরোর্ধ্ব আনুরি বেগম বয়স্ক ভাতার বাইরে আছেন। মিরপুর সাত নম্বরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব শাহজাদিও ভাতা পাচ্ছেন না। তার অধীনে আরও অনেক বয়স্ক হিজড়াদের অবস্থা একই।

হিজড়াদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’র নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ বলেন, হিজড়াগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি ভালো উদ্যোগ। তবে প্রশিক্ষণ শেষে সিড মানি হিসেবে প্রতিজনকে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। এটি যথেষ্ট নয়।

এ টাকা খাটিয়ে কিছু করতে চাইলে এর থেকে রিটার্ন আসার সুযোগ নেই। এজন্য জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি কার্যকর কীভাবে হয় সেটি সরকারকে ভাবতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×