ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মূল্যায়ন

প্রবৃদ্ধি-কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লক্ষ্য

অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করে সরকার।

এতে পরিকল্পনার শেষ বছরে এসে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮ শতাংশ। কিন্তু অর্জিত হয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, অনেক বেশি এবং দ্রুত উন্নয়ন ইত্যাদি আকাঙ্ক্ষা থেকেই এ ধরনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। যেটি বাস্তবতার সঙ্গে মিল ছিল না।

কিন্তু তারপরও যে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে সেটি বিশ্বের সমমানের অন্য দেশগুলোর মধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া দেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়ে গেলেও আয় বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল্যায়ন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশনে পরিকল্পনাটির সমাপ্তি মূল্যায়ন প্রতিবেদন অবহিতকরণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলমের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) আবুল কালাম আজাদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। তবে যে পরিমাণ মানুষ কর্মের বাজারে প্রবেশ করেছে তার চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। যেমন পরিকল্পনায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৪ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করার। কিন্তু এর বিপরীতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৭৯ লাখ। অন্যদিকে ওই পাঁচ বছরে কর্মের বাজারে প্রবেশ করেছে ৬২ লাখ মানুষ। সুতরাং লক্ষ্যপূরণ না হলেও এক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধও উপস্থাপন করেন ড. শামসুল আলম। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা মেয়াদে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। এ পাঁচ বছরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ হার সন্তোষজনক বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এ সময়ে যে হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ছিল তা সম্ভব হয়নি বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়। ওই পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ছিল শিল্প ও ম্যানুফাকচারিং খাতে। এ খাতে যথাক্রমে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২ ও ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে ছিল সেবা খাত এ খাতের গড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে কৃষিতে। যার হার সাড়ে তিন শতাংশ।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সামষ্টিক অর্থনীতির বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম আমদানি ও রফতানির লক্ষ্য পূরণ না হওয়া, জাতীয় সঞ্চয় মোট জিডিপির মাত্র ২৯ শতাংশে আবদ্ধ থাকা, কর-জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধির পরিবর্তে উল্টো কমে যাওয়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্ত বেষ্টনী কার্যক্রমে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে না পারা, সহজে ব্যবসা করার সূচকে সন্তোষজনক অবস্থান করতে না পারা (১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৭তম অবস্থান) এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকা। তবে পরিকল্পনার সময়কালে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে বলে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই পাঁচ বছর সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৫ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। ২০১৫ সালে তা ১৩ হাজার ৫৪০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। এর পাশাপাশি ৭৪ শতাংশ মানুষের বিদ্যুৎ প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েছে এবং মাথাপিছু বিদ্যুৎ বরাদ্দের যে লক্ষ্য ছিল, তার চেয়ে বেশি অর্জিত হয়েছে। এর বাইরে অবকাঠামো খাতের বিভিন্ন অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই পাঁচ বছর সময়ে নতুন ৬২৮ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মিত হয়ে মোট মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৪১০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়। শিক্ষা খাতে মেয়েদের অংশগ্রণের ক্ষেত্রে পূর্ণ জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে। তবে শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা অত্যন্ত নগণ্য বলে উল্লেখ করা হয়। তবে দারিদ্র্য হ্রাসকরণে অগ্রগতি সন্তোষজনক বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এ সময়ে উচ্চ দারিদ্র্য ও নিম্নদারিদ্র্য উভয়ই কমেছে। আর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকীর সময়েই দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এটি ভালো উদ্যোগ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধির সাফল্য তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১০ সালে যেখানে দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ৮৪৩ মার্কিন ডলার। সেখানে পরিকল্পনা পাঁচ বছরে বেড়ে ২০১৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৬ মার্কিন ডলার। সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ২০১৭ সালে এসে হয়েছে ১ হাজার ৬১০ মার্কিন ডলার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে মান বাড়াতে হবে। এখন সব কলেজেই অনার্স ও মাস্টার্স করানো হচ্ছে। কিন্তু এসব শিক্ষা কী কাজে আসবে তা বোঝা যাচ্ছে না। শিক্ষার মান বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, সামাজিক খাতে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেলেও বৈষম্য সেইভাবে কমাতে পারিনি। আমরা অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করছি। পদ্মা সেতু বানাচ্ছি, বন্দর উন্নয়ন করছি, রাস্তাঘাট উন্নয়ন করছি। কিন্তু যদি শিল্পকারখানা না হয় তাহলে কর্মসংস্থান হবে কী করে? বৈষম্য কমাতে হলে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তিনি জানান, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন অনেক বেড়েছে। এজন্য সরকার নানা রকম ভর্তুকি ও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

এমএম মান্নান বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। দেশে বৈষম্য কেন বাড়ছে তা গভীরভাবে মূল্যায়ন করে দেখতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ এ ধরনের জায়গায় বেশি বেশি বিনিয়োগ করলে তার সুফল একেবারেই নিচের দিকের লোকদের কাছে সহজেই পৌঁছাবে। এতে অতিদরিদ্রদের উপকার হবে।

প্রফেসরে ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, এই পরিকল্পনাটির মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি উন্নয়নের জীবন্ত দলিল। এতে ইতবাচক ও নেতিবাচক সব দিকই রয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস আছে বলেই এই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয় একটা অন্যতম চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যার বোনাসকালকে কাজে লাগাতে হলে মানব সম্পদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি বড় সমস্যা। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কৃষির অবদান কমে আসছে। এটা ভালো লক্ষণ। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে শ্রম শক্তির একটি বড় অংশেরই প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি। ফলে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি বললেই চলে। যেটুকু বেড়েছে সেটুকু ভিত্তিবছর পরিবর্তনের কারণে বেড়েছে মনে হয়।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, উন্নয়নের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা ভালো থাকলে উন্নয়ন হয়, সেটি এই প্রতিবেদনেই প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদে অনেক বিষয় পিছিয়ে রয়েছি। কিন্তু সেগুলো তৈরি হতে যাওয়া অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×