রাজস্বের লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী আদায়ে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে বর্ণনা করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা।

তারা বলেছেন, এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা প্রতিবছরই রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় দুই দফায় তা সংশোধন করা হয়। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবছরের বাজেটে এনবিআর খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তা বছর শেষে আদায় হয় না। ফলে পরের অর্থবছরে সংশোধিত বাজেট দেয়ার সময় এ লক্ষ্যমাত্রা কমাতে হয়। সংশোধিত বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, সেটিও অর্থবছর শেষে চূড়ান্ত হিসেবে আদায় হয় না। এ কারণে সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও কমাতে হয়। এভাবে দুই দফায় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমাতে হচ্ছে। প্রায় প্রতিবছরই এ ঘটনা ঘটছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তা সবসময়ই উচ্চাভিলাষী থাকে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে মাঠপর্যায়ে চাপ রাখতে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় কম হলে পরে তা সংশোধন করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় লক্ষ করা যাচ্ছে, রাজস্ব আদায়ের যে প্রক্ষেপণ থাকে, তা এতটাই উচ্চাভিলাষী যে দুই দফা সংশোধন করতে হয়। তিনি আরও বলেন, বাজেটে যে আয়-ব্যয়ের হিসাব করা হয়, তা অনেকটা রাজস্বনির্ভর। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা বেশি হলে ব্যয়ের হিসাবটিও বেশি থাকে। ফলে আয় কম হলেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল রাজস্বের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা ১৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে, যা মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ কম। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীও রাজস্ব আদায় হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেননা আগের অর্থবছরগুলোয়ও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীও রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে তা-ও আবার সংশোধন করতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের হিসাব চূড়ান্ত করতে আগামী মার্চ পর্যন্ত লেগে যাবে। কেননা ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায় করার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব আগামী অর্থবছরের বাজেটে দেয়া হবে। প্রতিবছরই এভাবে হিসাব করা হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত না হওয়ায় তা আবার সংশোধন করে ১ লাখ ৮৭ হাজার ১০৬ কোটি টাকা করা হয়। অর্থাৎ দুই দফা সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে ৬১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা বা প্রায় ২৫ শতাংশ। সম্প্রতি এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বছরের শুরুতে সব খাতেই বেশি হিসাব করে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ধরা হয়। কিন্তু বছর শেষে তা আদায় না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়। এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রকৃত আদায় ২৫ শতাংশ কম হলে ওই বাজেট বাস্তবায়ন হবে কীভাবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম আদায় হওয়াটাও বাজেট বাস্তবায়নের হার কমার একটি অন্যতম কারণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আহরণের মূল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা করা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রাও আদায় না হওয়ায় পরে তা আরও কমিয়ে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় দুই দফা সংশোধন করে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে ৩১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা সাড়ে ১৫ শতাংশের বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা করা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীও রাজস্ব আদায় না হওয়ায় পরে তা আরও সংশোধন করে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪১ কোটি টাকা করা হয়। মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চূড়ান্ত হিসাবে রাজস্ব আয় কমানো হয়েছে ৩০ হাজার ১২৯ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশের বেশি।