আশাবাদই ভরসা
jugantor
বাজেট বাস্তবায়ন
আশাবাদই ভরসা

  যুগান্তর রিপোর্ট  

১১ জুন ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দেশে এই প্রথমবারের মতো বাজেট তৈরি ও ঘোষণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। করোনার ছোবলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। আগামীতে এ বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে। সেই শঙ্কা থেকে এবারের বাজেট তৈরিতে যেসব প্রক্ষেপণ করা হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবতার বাইরে থেকে করা হয়েছে। এখানে আশাবাদকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের পুরো বিষয়টিই নির্ভর করছে আশাবাদের ওপর।

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী করোনার ছোবল কত দিন থাকবে, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে এটি দীর্ঘায়িত হবে। করোনার বিস্তার রোধ হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে থাকতে পারে আরও কমপক্ষে দুই বছর। কেননা ইতোমধ্যে প্রায় তিন মাস ধরে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। এর প্রভাবে সরকারের ব্যয় নির্বাহের অন্যতম পথ রাজস্ব আয় ভয়ানকভাবে কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের গত এপ্রিল পর্যন্ত ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। এ ঘাটতি আরও বেড়ে বছর শেষে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। এ পুরো ঘাটতি মেটাতে হবে বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নিয়ে। এ বিশাল ঘাটতির মধ্যেও আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিজ থেকেই বলছে এত বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়। তারপরও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়নি। একই সঙ্গে ঘাটতি অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ ঋণের সংস্থান করা সম্ভব হবে না। কেননা বিশ্ব মন্দার কারণে বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ বাড়ানো কঠিন হবে। বহুজাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকই কেবল ঋণের জোগান দিচ্ছে। অন্য সংস্থাগুলো এখন ঋণের জোগান দিতে পারছে না। কেননা ওই সংস্থাগুলোর নিজ দেশেই করোনার ছোবল এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, তাদেরই সরকার চালাতে ঋণের জন্য হাত পাততে হচ্ছে উন্নয়ন সংস্তাগুলোর কাছে। ফলে তাদের কাছ থেকে ঋণের জোগান পাওয়া কঠিন হবে। ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য প্রবাহ অনেক কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে জোগান দিচ্ছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ থেকে দিচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেবে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে অর্থায়নের পর সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এসব কারণে প্রস্তাবিত বাজেটে আশাবাদই একমাত্র ভরসা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন হয়ে যাচ্ছে ঋণনির্ভর। করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকেও ঋণ পাওয়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন করতে এবার কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। যেটুকু বাস্তবায়ন হবে তার একটি বড় অংশই থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। এ ঋণ অর্থনীতিকে আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।

সূত্র জানায়, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক অনুদান থাকত ১ শতাংশেরও কম। এবারও ১ শতাংশের বেশি দেখানো হয়েছে। কিন্তু অনুদান পাওয়াও কঠিন হয়ে যাবে। কেননা চলতি অর্থবছরেই গত অর্থবছরের তুলনায় অনুদানের হার কমে গেছে। আগামী বছরে আরও কমতে পারে। কেননা রোহিঙ্গাদের জন্য অনুদান ছাড়ের হার কমে গেছে। এছাড়া এখন বিশ্বব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধের প্রবণতা কমে গেছে বলে বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণও কমে গেছে। ফলে আগামী অর্থবছরেও এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, করোনার ধাক্কা কেটে গেলেও অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে আরও দুই বছর সময় লেগে যাবে। কেননা অর্থনীতিতে ভোক্তার চাহিদা বাড়াতে হবে আগে। চাহিদা বাড়াতে হলে আগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান বাড়ার পরিবর্তে এখন কমছে। যারা কর্মে আছেন তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান বাড়িয়ে মানুষের চাহিদা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে বিশ্বব্যাংকসহ বহুজাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশসহ অনেক দেশের জন্য আগামী অর্থবছরে অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে নিপতিত হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। দেশের অর্থনীতিবিদরাও এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে আগের ধারায় নিয়ে আসতে হলে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে দ্রুত। কিন্তু বাস্তবতা হল ব্যাংকিং খাত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করবে। তারাই এখন প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে ভরসা পাচ্ছে না। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার থেকে চাপ রয়েছে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে।

বাজেট বাস্তবায়ন

আশাবাদই ভরসা

 যুগান্তর রিপোর্ট 
১১ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দেশে এই প্রথমবারের মতো বাজেট তৈরি ও ঘোষণায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। করোনার ছোবলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। আগামীতে এ বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে। সেই শঙ্কা থেকে এবারের বাজেট তৈরিতে যেসব প্রক্ষেপণ করা হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবতার বাইরে থেকে করা হয়েছে। এখানে আশাবাদকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। ফলে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের পুরো বিষয়টিই নির্ভর করছে আশাবাদের ওপর।

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী করোনার ছোবল কত দিন থাকবে, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। আশঙ্কা করা হচ্ছে এটি দীর্ঘায়িত হবে। করোনার বিস্তার রোধ হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে থাকতে পারে আরও কমপক্ষে দুই বছর। কেননা ইতোমধ্যে প্রায় তিন মাস ধরে করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। এর প্রভাবে সরকারের ব্যয় নির্বাহের অন্যতম পথ রাজস্ব আয় ভয়ানকভাবে কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের গত এপ্রিল পর্যন্ত ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। এ ঘাটতি আরও বেড়ে বছর শেষে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। এ পুরো ঘাটতি মেটাতে হবে বিভিন্ন খাত থেকে ঋণ নিয়ে। এ বিশাল ঘাটতির মধ্যেও আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিজ থেকেই বলছে এত বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব নয়। তারপরও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়নি। একই সঙ্গে ঘাটতি অর্থায়নে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এত বিপুল পরিমাণ ঋণের সংস্থান করা সম্ভব হবে না। কেননা বিশ্ব মন্দার কারণে বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ বাড়ানো কঠিন হবে। বহুজাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংকই কেবল ঋণের জোগান দিচ্ছে। অন্য সংস্থাগুলো এখন ঋণের জোগান দিতে পারছে না। কেননা ওই সংস্থাগুলোর নিজ দেশেই করোনার ছোবল এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, তাদেরই সরকার চালাতে ঋণের জন্য হাত পাততে হচ্ছে উন্নয়ন সংস্তাগুলোর কাছে। ফলে তাদের কাছ থেকে ঋণের জোগান পাওয়া কঠিন হবে। ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। করোনার প্রভাব মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য প্রবাহ অনেক কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে জোগান দিচ্ছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ থেকে দিচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দেবে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে অর্থায়নের পর সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এসব কারণে প্রস্তাবিত বাজেটে আশাবাদই একমাত্র ভরসা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন হয়ে যাচ্ছে ঋণনির্ভর। করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাতে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকেও ঋণ পাওয়া বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন করতে এবার কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। যেটুকু বাস্তবায়ন হবে তার একটি বড় অংশই থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। এ ঋণ অর্থনীতিকে আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।

সূত্র জানায়, বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক অনুদান থাকত ১ শতাংশেরও কম। এবারও ১ শতাংশের বেশি দেখানো হয়েছে। কিন্তু অনুদান পাওয়াও কঠিন হয়ে যাবে। কেননা চলতি অর্থবছরেই গত অর্থবছরের তুলনায় অনুদানের হার কমে গেছে। আগামী বছরে আরও কমতে পারে। কেননা রোহিঙ্গাদের জন্য অনুদান ছাড়ের হার কমে গেছে। এছাড়া এখন বিশ্বব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধের প্রবণতা কমে গেছে বলে বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণও কমে গেছে। ফলে আগামী অর্থবছরেও এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, করোনার ধাক্কা কেটে গেলেও অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে আরও দুই বছর সময় লেগে যাবে। কেননা অর্থনীতিতে ভোক্তার চাহিদা বাড়াতে হবে আগে। চাহিদা বাড়াতে হলে আগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান বাড়ার পরিবর্তে এখন কমছে। যারা কর্মে আছেন তাদের ছাঁটাই করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান বাড়িয়ে মানুষের চাহিদা বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে বিশ্বব্যাংকসহ বহুজাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশসহ অনেক দেশের জন্য আগামী অর্থবছরে অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে নিপতিত হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। দেশের অর্থনীতিবিদরাও এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন। এ অবস্থায় অর্থনীতিকে আগের ধারায় নিয়ে আসতে হলে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে দ্রুত। কিন্তু বাস্তবতা হল ব্যাংকিং খাত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করবে। তারাই এখন প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে ভরসা পাচ্ছে না। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার থেকে চাপ রয়েছে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে।