ফোরজি : অন্ধকার ঘেরা স্বপ্নযাত্রা

  এম মিজানুর রহমান সোহেল ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফোরজি : অন্ধকার ঘেরা স্বপ্নযাত্রা

বিপুলসংখ্যক সিম রিপ্লেসমেন্ট, উপযুক্ত হ্যান্ডসেটের অভাব, এখনই আইফোনে সুবিধা পাবে না, আন্তর্জাতিক গতির সঙ্গে অসামঞ্জস্য, সেবার মান নিয়ে সংশয়সহ ফোরজি বাস্তবায়নের সঙ্কটগুলোকে নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন এম মিজানুর রহমান সোহেল।

বহুল কাঙ্ক্ষিত চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা ফোরজির লাইসেন্স গতকাল সোমবার মোবাইল অপারেটরদের কাছে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। রাতেই একটি অপারেটর ঢাকার নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে ফোরজি সেবাও চালু করেছে। তবে ফোরজির আলোকবর্তিকা ঘিরে অনেক স্বপ্নযাত্রা শুরু হলেও সেখানে অন্ধকার ঘিরে আছে। নানা সীমাবদ্ধতায় ঢেকে আছে গতির ইন্টারনেট। বিটিআরসির সর্বশেষ হিসাবে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট মোবাইল সিম ব্যবহারকারী ১৪ কোটি ৫১ লাখ ১৪ হাজার। এর মধ্যে মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ৭ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার। প্রায় ১৫ কোটি সিম ব্যবহারকারী সবাই বায়োমেট্রিক সিম রেজিস্ট্রেশন করেছে। এখন কেউ ফোরজি ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে তাকে পুনরায় সিম রিপ্লেসমেন্ট করতে হবে। নতুন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য অপারেটররা প্রস্তুত আছেন। তবে সেটা কতদিনে বা কত বছরে সম্ভব হবে তার উত্তর কারও জানা নেই।

তবে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল ফোলিও বলছেন, আমরা বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন করার সময় যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সেটা দিয়েই পরবর্তী ফোরজি সিম রিপ্লেসমেন্ট জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারব। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিম রিপ্লেসমেন্ট জটিলতা ছাড়াও আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ফোরজি হ্যান্ডসেটের অপ্রতুলতা। ফলে সিম আর হ্যান্ডসেট না থাকার কারণে কাক্সিক্ষত ফোরজি সেবা থেকে দূরে থাকতে হবে গ্রাহকদের। দেশে ১৫ লাখ আইফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। তাদের জন্যও দুঃসংবাদ রয়েছে। অ্যাপল কোম্পানির হ্যান্ডসেটগুলোতে বাংলাদেশের কান্ট্রি কোড ‘+৮৮০’ লক থাকায় আইফোন ব্যবহারকারীরাও বাংলাদেশে ফোরজি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন না। যদিও বিটিআরসি বলছে, শিগগির এটা সমাধান করার জন্য চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

যে তরঙ্গের মাধ্যমে ফোরজি সেবা দেয়া হবে সেটার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, আমাদের প্রশ্ন এতদিন ধরে রবি ৩৬.৪ মেগাহার্টজ দিয়ে যে থ্রিজি সেবা গ্রাহকদের দিয়েছে সেটার মান কি থ্রিজি পর্যায়ে ছিল? এই পরিমাণ তরঙ্গ ইন্টারনেটের গতি ছিল সর্বোচ্চ ৫ এমবিপিএস। ফোরজির জন্য গতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ এমবিপিএস। যেখানে এতদিন এই তরঙ্গ দিয়ে গড়ে ৬ এমবিপিএস গতিই আনা গেল না সেখানে একই পরিমাণ তরঙ্গ দিয়ে বর্তমান বিটিএস ব্যবহার করে কিভাবে ইন্টারনেটের মান বাড়াবে ফোরজি? তিনি আরও বলেন, তরঙ্গ বিক্রি করে সরকার হয়তোবা ৫৪২৩ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে; যা কিনা জনগণের কাছ থেকেই পরোক্ষভাবে আদায় করা হয়েছে। তারপরও নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও অপারেটররা গ্রাহকদের মিথ্যা তথ্য ও আশ্বাস দিচ্ছে যা অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক। কারণ ২০ এমবিপিএস গতি পেতে প্রয়োজন ৬০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে ফোরজি সেবা চালুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করে বলেছেন, ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে থ্রিজি সেবা চালু করা হলেও এখনও রাজধানীর বাইরে থ্রিজির সেবা ঠিকমতো পাওয়া যায় না সেখানে ফোরজি চালুর বিষয়টি হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই না। প্রসঙ্গত, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসির আয়োজনে দেশে ফোরজির নিলাম সম্পন্ন হয়। এই নিলামে অংশ নেয় গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক। নিলামে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ কেনে। যার দর ২৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলালিংক ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ কেনে। এই তরঙ্গের মূল্য ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে গ্রামীণফোন ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ কেনে।

নিলামের পূর্বে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকের কাছে যথাক্রমে বিভিন্ন ব্র্যান্ডে মোট ৩২, ৩৬.৪, ২০ এবং ২৫.২ মেগাহার্জ তরঙ্গ ছিল। নিলামের পর গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের তরঙ্গ বেড়ে দাঁড়ালো যথাক্রমে ৩৭ ও ৩০.৬ মেগাহার্জ তরঙ্গ।

এয়ারটেলের সঙ্গে রবি একীভূত করায় অপারেটরটির তরঙ্গ সব অপারেটরের চেয়ে বেশি ৩৬.৪ মেগাহার্টজ থাকায় নিলামে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল। গ্রামীণফোন ১৮০০ ব্যান্ডের ৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ক্রয়ের মাধ্যমে তাদের তরঙ্গের পরিমাণ দাঁড়ালো ৩৭ মেগাহার্টজ। আর বাংলালিংক ১৮০০ ব্যান্ডের ৫.৬ মেগাহার্টজ ও ২১০০ ব্যান্ডের ৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ক্রয় করায় তাদের তরঙ্গের পরিমাণ দাঁড়ালো ৩০.৬ মেগাহার্টজ। তরঙ্গের প্রতিযোগিতায় গ্রামীণফোন রবির চেয়ে ০.৬ মেগাহার্টজ বেশি রইল। বর্তমান বিশ্বে ১৮০টি দেশে ফোরজি চালু আছে। তাতে গড় গতি ১৬.৬ এমবিপিএস। সবচেয়ে গতি বেশি আছে সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় যথাক্রমে ৪৬.৬৪ ও ৪৫.৮৫ এমবিপিএস। এছাড়া নরওয়ে হাঙ্গেরিতে ৪২ এমবিপিএস। এসব ছাড়াও বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেটের বর্তমান গতি ২.১ এমবিপিএস বা আরও কম।

jugantor-event-ফোরজি-19620--1

ঘটনাপ্রবাহ : ফোরজি

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter