তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় অমর একুশে গ্রন্থমেলা

  সাইফুল আহমাদ। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় অমর একুশে গ্রন্থমেলা
বইমেলা-২০১৮

বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভ বলেছিলেন, ‘আগামীতে কাগজের বই বলে কিছুই থাকবে না। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কাগজের বই হয়ে যাবে ডিজিটাল।’ কাগজের বইয়ের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে অনেকটা জায়গা দখল করে নিচ্ছে ডিজিটাল ডিভাইস। ডিজিটাল কিছু প্লাটফর্মের দেখা মিলছে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। মেলা ঘুরে ই-বুক এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইফুল আহমাদ।

কাগজের বইয়ের পাশাপাশি পাঠকের হৃদয়ে জায়গা দখল করে নিচ্ছে ডিজিটাল ডিভাইস এবং ই-বই। তবে কাগজের বই হারায়নি বরং বহাল তবিয়তেই প্রত্যেকটি স্টলে তারা নিজেদের নানা রঙের প্রচ্ছদে রাঙিয়ে রাজত্ব করছে। তবে কাগজের বই না হারালেও মেলায় দর্শকদের একটি অংশ টেনে নিচ্ছে ই-বই। ই-বইকে প্রযুক্তির ভাষায় ই-বুক বলা হয়। ই-বুকগুলো সাধারণত পিডিএফ ফরম্যাটের ফাইলে হয়ে থাকে বা ই-রিডারের উপযুক্ত করে তৈরি হয়ে থাকে, যা কোনো পাঠক চাইলেই তার স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ বা তার ডেস্কটপের মাধ্যমে পড়তে পারে। ই-বইয়ের অন্যান্য সুবিধাগুলো হল ই-বই হারিয়ে যাওয়া বা ছোট বাচ্চাদের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে ই-বইয়ের কদর বাড়তে থাকে। লাইব্রেরির হাজারও বই থেকে পছন্দের বই খুঁজে বের করা যত কঠিন, ই-বুকের অ্যাপস থেকে কয়েক ক্লিকে সেই বই বের করে পড়া যায় তত সহজে। অথচ কাগুজে বইয়ের ক্ষেত্রে সেটি বহনসহ নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখকদের বইগুলো ই-বুক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাপসে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়াও অ্যাপসগুলোয় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বইগুলো সাজানো রয়েছে। পাঠক নিজের পছন্দ অনুযায়ী কয়েক ক্লিকেই পছন্দের বই ডাউনলোড করতে পারেন। এবারের গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখা যায়, বেশকয়েকটি ই-বুকের স্টল রয়েছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। এগুলো হল- বইঘর, বেঙ্গল ই-বই, সেই বই ইত্যাদি। মেলায় আসা অধিকাংশ তরুণ দর্শনার্থী ভিড় করছেন এসব স্টলে। স্টলগুলোয় ই-বুকের সেবাকর্মীরা তাদের নিজস্ব অ্যাপস সম্পর্কে ধারণা দেয়া থেকে অ্যাপস ডাউনলোড, পাঠকদের রেজিস্ট্রেশন করা ও বই ডাউনলোডের নিয়ম দেখানো নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দর্শনার্থীরা ই-বই সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে পারাসহ নিজেদের পছন্দমতো অ্যাপস ডাউনলোড করে রেজিস্ট্রেশনও করিয়ে নিচ্ছেন এসব স্টল থেকে। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলাচ্ছেন প্রিয় লেখকের বই খুঁজে। এসব অ্যাপসে গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, রম্য রচনা, জীবনী, আত্মজীবনী, অনুবাদ, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ সব ক্যাটাগরির বই খুঁজে পেতে পারেন পাঠক। বইঘরের রিপ্রেজেন্টার ইমানা আলম ইমু জানান, তাদের অ্যাপসে ১ হাজারের অধিক বই পাওয়া যাচ্ছে। দুটি মোবাইল অপারেটরের ৬০ হাজারের বেশি পাঠক রয়েছে। পাঠক চাইলে পছন্দ অনুযায়ী সেসব বই নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে ডাউনলোড করে পড়তে পারেন। এছাড়াও বিনামূল্যে বিভিন্ন বই পড়ার সুযোগ রয়েছে অ্যাপসটির ব্যবহারকারীদের। তিনি জানান, তাদের অ্যাপসের বইগুলো সর্বনিু ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫ টাকা মূল্যে কিনতে পারবে গ্রাহকরা। সেই বইয়ের সূত্রে জানা গেছে, তাদের সংরক্ষণে রয়েছে ১ হাজারেরও বেশি বই। গ্রন্থমেলা উপলক্ষে ৫০ শতাংশ ছাড়ে গ্রাহকরা বই কিনতে পারছেন।

গ্রন্থমেলা শুরুর পরপরই মেলার ৬৯নং স্টলে ভিড় বাড়তে থাকে শিশুদের। অভিভাবকদের হাত ধরে অনেক শিশুই উঁকি দিয়ে দেখছে স্টলটিতে কী কী আছে। স্টলে থাকা ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষার নতুন দিগন্ত অগমেন্টেড রিয়েলিটির বাইনো অ্যাপ ও বইগুলো দেখে অবাক হচ্ছে শিশুরা। শিশু শিক্ষার বই ও কার্ডগুলো বাইনো অ্যাপের মাধ্যমে স্ক্যান করলেই হাজির হচ্ছে পাতায় থাকা প্রাণী অথবা বস্তুর থ্রি-ডি মডেল, ট্যাপ করে শোনা যাচ্ছে তার ডাক। এছাড়া স্ক্রিনে থাকা পাতার অন্য অংশে ট্যাপ করে সে সম্পর্কে আরও তথ্য শোনা যাবে। অগমেন্টেড রিয়েলিটি ছাড়াও বাইনো অ্যাপে রয়েছে বর্ণমালা লেখা শেখার জন্য ইন্টারঅ্যাকটিভ গেম। প্রতিটি বর্ণ সঠিকভাবে স্ক্রিনে এঁকে পরের বর্ণে পৌঁছানো যাবে, দ্রুত ও নির্ভুলভাবে লেখার জন্য রয়েছে পয়েন্ট। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়–য়া আনিকা তাবাসসুম বলেন, এ স্টলে থাকা বই ও ফোনের অ্যাপটি দেখে অবাক হয়েছি। আম্মু আমাকে বাইনোর দুটি বই কিনে দিয়েছে। আনিকা তাবাসুমের মা জাকিয়া বেগম বলেন, বাচ্চারা বেশিরভাগ সময় মোবাইল ফোনে গেম খেলে। এ অ্যাপ ও বইগুলো দিয়ে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারবে বলেই আমার ধারণা। গ্রন্থমেলা উপলক্ষে কিছুটা ছাড়ে বাইনোর বইগুলো পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কারণে মেলায় না আসতে পারলেও ঘরে বসেই অনলাইনে অর্ডার করা যাবে বাইনোর বইগুলো এবং বিস্তারিত জেনে নেয়া যাবে। এটুআই একুশে গ্রন্থমেলায় স্টল দিয়েছে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই)। স্টলটিতে ১৩ থেকে ১৮ বছরের শিশু-কিশোরদের জন্য শিক্ষামূলক প্লাটফর্ম কিশোর বাতায়ন প্রদর্শিত হচ্ছে। অনেক শিশু ও অভিভাবক স্টলে ভিড় করে ট্যাবে নেড়েচেড়ে দেখছেন প্লাটফর্মটি। কিশোর বাতায়ন ‘কানেক্ট’ কিশোরদের জন্য নির্মিত একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা আগ্রহী যে কেউ অনলাইন কোর্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন। বাংলাদেশের সব কিশোর যে কোনো প্রান্তে বসে এ কিশোর বাতায়নে একই সঙ্গে বিদ্যমান কনটেন্ট দেখতে পারবে ও নতুন কনটেন্ট যুক্ত করতে পারবে। বাতায়ন থেকে কিশোরেরা বই পড়া, ডাউনলোড করা, সিনেমা দেখা ও ভিডিও তৈরি করে আপলোড করা যাবে।

এছাড়াও এতে বিজ্ঞান, বাংলাদেশ স্টাডিজ, পদার্থ, রসায়ন ও বায়োলজির নানা বিষয়ভিত্তিক কমিকস পড়া যাবে। এছাড়া, স্টলটিতে প্রদর্শিত হচ্ছে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর বিজ্ঞানবিষয়ক কনটেন্টের ওপর নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম এডুকেশনাল মোবাইল অ্যাপভিত্তিক গেম ‘বিজ্ঞানের রাজ্যে’; যা খেলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলা সহজেই শিখতে পারবে। পুরো গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে ওয়াইফাই ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সে সংযোগ পাওয়া বেশ কঠিনই বলা চলে। মেলায় এ ওয়াইফাই ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে নিরাপদ মিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মেলায় ইন্টারনেট বিভ্রাটের কথা জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির বিক্রয়, বিপণন ও পুনর্ম–দ্রণ বিভাগের পরিচালক জালাল আহমেদ বলেন, ‘আসলে আমাদের কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি যে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া একসঙ্গে অনেক ব্যবহারকারী ইন্টারনেট ব্যবহার করলে একটু সমস্যা হতে পারে।’ মেলায় এসে পথ হারিয়ে ফেলেছেন অথবা নির্দিষ্ট কোনো স্টল খুঁজে পাচ্ছেন না, কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। গুগল স্ট্রিট ভিউয়ে দেখতে পাবেন মেলার সব স্টলের অবস্থান। এবং গুগল স্ট্রিট ভিউ আপনাকে পথ দেখাবে ।

ডিজিটাল পেমেন্টের অংশ হিসেবে মেলায় রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশের সুবিধা। বিকাশে ১০ শতাংশ ক্যাশব্যাক এবং ৫ মিনিটে অ্যাকাউন্ট খোলা। গ্রন্থমেলায় বই কিনতে কিনতে আশিকুর রহমানের টাকা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু পছন্দ হয়েছে আরও কয়েকটি বই। পরে সেই বইগুলো বিকাশে পেমেন্ট করে কিনে নিলেন। এতে মিলল বাড়তি ১০ শতাংশ ক্যাশব্যাক অর্থাৎ ১০০ টাকার বই কিনে ক্রেতা পেলেন নগদ ১০ টাকা। সরকারি চাকরি করা নাজমুস সাকিব জানান, ক্যাশব্যাক অফারটা বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে ১ হাজার টাকার বই কিনলে ১০০ টাকার ক্যাশব্যাক পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে একটি বই কেনা যায়। এছাড়া মেলায় চোখে পড়বে বিকাশের দুটি প্যাভিলিয়ন। সেখানে ৫ মিনিটেই বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হচ্ছে। কোনো ছবি না থাকলে অ্যাকাউন্ট খোলার সময় বিকাশের প্যাভিলিয়নে রয়েছে ছবি তোলার ব্যবস্থা। বিকাশের প্যাভিলিয়নে থাকা মোহাম্মদ রাব্বানী বলেন, মেলায় শুরু থেকেই বিকাশ বেশ সাড়া পাচ্ছে। অনেকেই বিকাশে অ্যাকাউন্ট খুলছেন। মেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে একশ’র বেশি অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। বিকাশ থেকে টাকা ক্যাশআউটের সুবিধাও মিলছে বিকাশের প্যাভিলিয়নে। এছাড়াও গ্রন্থমেলায় একজন ক্রেতা ডেবিট কার্ড, মাস্টারকার্ড, ক্রেডিট কার্ড ও ভিসা কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করে বই কিনতে ও পড়তে পারবে।

ঘটনাপ্রবাহ : বইমেলা-২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter