বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোগোর ইতিহাস
jugantor
বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোগোর ইতিহাস

  সাইফ আহমাদ  

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা ব্যবহার করে থাকি, এগুলোর একেকটির রয়েছে নির্দিষ্ট লোগো। বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো তাদের লোগোও খুব পরিচিত। ছবি দেখলেই বলে দেওয়া যায় সেগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের। লোগোগুলো তৈরির পেছনে আছে একেকটি গল্প। বেশিরভাগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই তাদের লোগো দিয়েই বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত। বাইরের সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বহন করতেই লোগোগুলোর ডিজাইন করা হয়। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লোগোর পুরো অর্থ এবং সেগুলো তৈরি ও বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে আজকের আয়োজন। বিস্তারিত লিখেছেন- সাইফ আহমাদ

অ্যাপল

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রথম লোগোটি তৈরি করেছেন রোনাল্ড ওয়াইন। যেটি ছিল সাদা-কালো রঙের; লোগোটি দেখলেই বোঝা যায়, এতে উপস্থিতি স্যার আইজ্যাক নিউটন। লোগোটিতে দেখা যায়, আইজ্যাক নিউটন একটি গাছের নিচে বসে আছেন, বলা হয় নিউটনের বিখ্যাত সেই আপেল তত্ত্বই উঠে এসেছে অ্যাপলের লোগোতে। লোগোটি আকারে বড় হওয়ায় পরবর্তী সময়ে স্টিভ জবস নতুন লোগো তৈরির দায়িত্ব দেন একটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যাপলের নতুন লোগোটি তৈরি করে ১৯৭৬ সালে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে অ্যাপলের বর্তমানের অর্ধেক খাওয়া অ্যাপলের লোগোটি। বর্তমানে অ্যাপলের খাওয়া আপেল এ ডিজাইনটির মেকারের নাম হচ্ছে ‘রব জেনোফ’। তিনি এক সাক্ষাৎকারে এ লোগোটির বর্ণনায় বলেন, ‘আমি এক ব্যাগভর্তি আপেল কিনি এবং সেগুলো একটি বাটিতে রেখে এক সপ্তাহ ধরে কাগজে আঁকার চেষ্টা করি, সহজ কোনো একটি ডিজাইন বের করার জন্য। কিন্তু বিশেষ কিছু তৈরি করতে পারিনি। নিরীক্ষার অংশ হিসাবে, আপেলে একটি কামড় (বাইট) দেই এবং কাকতালীয়ভাবে অনুভব করি, কামড় (নরঃব) কম্পিউটারের ‘বাইট’ (নুঃব)-এর মতোই শোনাচ্ছে।’

অ্যামাজন

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের নামকরণের পেছনের ভাবনাটাও বেশ মজার। প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস চেয়েছিলেন তার প্রতিষ্ঠানের নাম যেন ইংরেজি বর্ণমালার ‘এ’ দিয়ে শুরু হয়। আর এ কারণে ‘এ’ দিয়ে শুরু শব্দকেই অ্যামাজন নামকরণের আগে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদী অ্যামাজনের নামটি বেজসের মাথায় আসে। নদীর মতো প্রতিষ্ঠানটিকেও বাজারে সবার ওপরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই নাম রাখা হয় অ্যামাজন। এমনিতে অ্যামাজনের লোগোটি দেখলে বিশেষ কিছু মনে হয় না। তবে এর বিশেষত্ব, অ্যামাজন লেখার নিচের কমলা রঙের তীর চিহ্নটিতে। প্রথমত, এটি এমনভাবে দেওয়া, যাতে একটি স্মাইলি ফেস বা হাস্যমুখী প্রতীক দেখায়, যাতে বোঝা যায়, এ কোম্পানিটি তার প্রত্যেকটি কাস্টমারকে খুশি করতে চায়। এছাড়াও এর মাধ্যমে আরও একটি অর্থ বোঝানো হয়। খেয়াল করলে দেখবেন ইংরেজি অক্ষরে ‘এমাজনে’র ‘এ’ অক্ষরটি থেকে ‘জেড’ পর্যন্ত সেই তীর চিহ্নটি দেওয়া। অর্থাৎ এ টু জেড সব দরকারি পণ্য এখানে পাওয়া যাবে। অ্যামাজনের এ লোগোটির ডিজাইনার ডেভিড টার্নার।

গুগল

বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় সার্চ জায়ান্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুগলের লোগোটি বোধহয় সবচেয়ে বেশি দেখা লোগো। ১৯৯৮ সালে ল্যারি ও তার বন্ধু সার্জি ব্রিন মিলে যাত্রা শুরু করে বর্তমানের সার্চ জায়ান্ট গুগল। তবে ‘গুগল’ থেকে এসেছে আজকের গুগলের নাম। ইংরেজিতে এর বানান ‘জি ও ও জি ও এল’। যার মানে হচ্ছে, একের পর ১০০টি শূন্য। নামকরণে সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার অঙ্কটিও কিন্তু কম নয়। গুগল’র লোগোটিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন নিজেই ডিজাইন করেন প্রথম লোগোটি। মৌলিক রংগুলো ব্যবহার করে গুগল শব্দটি লিখে ডিজাইন করা এ লোগোর সঙ্গে ছিল একটি বিস্ময়সূচক চিহ্ন। ফন্ট বদলে পরের বছরেই তিন রঙের সঙ্গে আরেকটি রং যুক্ত করে এবং বিস্ময়সূচক চিহ্নটি বাদ দিয়ে নতুন করে লোগো ডিজাইন করে গুগল। পরে ২০১০ সালে রুথ কেডার নতুন রঙে এবং নতুন ফন্টে ডিজাইন করেন গুগলের লোগো। বিশেষ বিশেষ দিবস উপলক্ষ্যে গুগল তাদের লোগো পাল্টে ফেলে। আর এ পাল্টে ফেলা বিশেষ লোগোর নাম ‘ডুডল’।

ইনস্টাগ্রাম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বর্তমান মালিকানাধীন ফটোশেয়ারিং প্লাটফর্ম ইনস্টাগ্রামের জনক কেভিন সিসট্রম ও মাইক ক্রিগারের হাত ধরে ২০১০ সালে বিশ্বখ্যাত ছবি শেয়ারিং-এর অ্যাপ তৈরির পর এর নাম দেওয়া হয় বার্বন। বুদ্ধিমান উদ্যোক্তারা জানতেন মানুষের মনে প্রভাব ফেলার জন্য একটি লোগোর গুরুত্ব কতটুকু হতে পারে। সহপ্রতিষ্ঠাতা কেভিন সিসট্রম আসল লোগোটি ডিজাইন করেন ২০১০ সালে। সেই লোগোটি ছিল পোলারয়েড ক্যামেরার আদলে। ক্যামেরার গায়ে ছিল রংধনু স্ট্রাইপ। কেভিনের বানানো লোগোটি মূলত ছিল দুই সপ্তাহের জন্য। পরে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ও ডিজাইনার কোল রাইজ ৪৫ মিনিটের ইনস্টাগ্রামের লোগোটি পর্যবেক্ষণ করে আগের ক্যামেরায় দুটো লেন্সের একটিকে ভিউ ফাইন্ডার করে দিলেন। ক্যামেরাটির বামপাশে রংধনুর কিছু রংজুড়ে দিয়ে নিচে ইনস্টা বানানটাও দিলেন। ২০১৬ সালের পর আইকন থেকে ক্যামেরাভাব দূর করার জন্য এবার কিছুটা নড়েচড়ে বসলেন ইনস্টাগ্রামের ডিজাইনাররা। নয় মাস ধরে তারা নানা নকশা করলেন, নানাভাবে ভাবলেন, নানা ছবি আঁকলেন এবং ব্যর্থ হলেন। আবারও সেই রাইজের দ্বারস্থ হলেন এবং তিনি আগের লোগোটি বদলে সম্পূর্ণ নতুন চেহারা দিয়ে দিলেন। এবারের লোগোটি ছিল পোলারয়েড ক্যামেরার আউটলাইন ইলাস্ট্রেশন। রংধনুর স্ট্রাইপগুলোও সরিয়ে ফেলা হলো।

নোকিয়া

বিখ্যাত মোবাইলফোন কোম্পানি নোকিয়া শুরুতে ছিল ফিনল্যান্ডের একটি কাঠ প্রক্রিয়াজাত কোম্পনি। ১৯৮৫ সালে ফেড্রিখ আইস্টাইম ফিনল্যান্ডে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর এ মিলটি যখন নোকিয়ানভিরতা নদীর কাছে সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন এর নাম রাখা হয় ‘নোকিয়া এবি’। এডওয়ার্ড পলোন ১৮৯৮ সালে ‘রাবারের’ ব্যবসা শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে নোকিয়ার রাবারের ব্যবসায় পরিণত হয়। সেই সময় নোকিয়া রাবারের নির্মিত গ্যালোসেস (এক প্রকারের বুট জুতা) থেকে টায়ার পর্যন্ত নির্মাণ করত। ১৯১২ সালে অরভিড উইকস্ট্রম ‘ক্যাবলের’ ব্যবসা শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে নোকিয়ার ক্যাবল এবং ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসায় যুক্ত হয়। এ প্রতিষ্ঠানটির ও লোগোর মজার ইতিহাস রয়েছে। প্রথমদিকে নোকিয়ার লোগোতে ছিল মাছের ছবি। ১৯৫৬ সালে লোগোতে এক দফা পরিবর্তন আসে। তবে সেটিতেও ছিল মাছের ছবি। এরপর যথাক্রমে ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৯২, ২০০৫ এবং ২০১১ সালে নোকিয়ার লোগো পরিবর্তন হয়।

মাইক্রোসফট

প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট তাদের যাত্রা শুরু করে ১৯৭৫ সালে। এরপর থেকেই প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এক নাম মাইক্রোসফট। শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মাইক্রোসফট চারবার তাদের লোগো পরিবর্তন করেছে। ১৯৭৫ সালে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা পাউল এলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম লোগোটি তৈরি করেন বেসিক নামে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে। আর লোগোটি তৈরি করতে সময় লাগে মাত্র একদিন। এরপর একই বছর প্রতিষ্ঠানটির নতুন আরেকটি লোগো বানানো হয় যেটির ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল সবুজ। আর এতে মাইক্রোসফটের ও অক্ষরটি একটু ভিন্ন রূপ নেয়। দুই লাইনের এ লোগোতে ওপরে ‘মাইক্রো’ এবং নিচে ‘সফট’ লেখা হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় লোগোটি পুরো নামটি এক সঙ্গে লিখে দেয় তারা। বড় হাতের অক্ষরে লেখা সব অক্ষরের মধ্যে মাইক্রো অংশের ‘ঙ’ অক্ষরটিকে তারা ডিজাইন করে লাইন দিয়ে এবং এ লোগোকে বলা হয় বিবেট লোগো। প্যাকম্যান নামের এ লোগোটি ডিজাইন করে স্কট বেকার। এরপর তারা তাদের নামের সঙ্গে যোগ করে চার রঙের একটি প্রতীক। তাদের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে লোগোতে যে চারটি রং রয়েছে, তা ব্যবহার করে এ লোগোটি ডিজাইন করে।

ইয়াহু

ডেভিড ফিলো ও জেরি ইয়াং গাইড টু ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ নামে প্রতিষ্ঠা করে ইয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় এ ওয়েবসাইট ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়, ইনকরপোরেটেড হয় ১৯৯৫ সালের ১ মার্চ। পরে তারা ইয়াহু নামেই পরিচিত হয়। শুরুতে তাদের লোগোটি ছিল লাল রঙের। আর ইয়াহু শব্দটির শেষে ছিল বিস্ময়সূচক চিহ্ন। প্রায় এক দশক পরে তারা লাল রঙের বদলে পার্পেল রং ব্যবহার করে লোগোটি বদলে দেয়। রঙের সঙ্গে সঙ্গে আগের লোগোতে যে ছায়া ছিল, তাও বাদ দেয় তারা। আর তাদের জনপ্রিয় ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং সার্ভিস ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারের লোগো হিসাবে ব্যবহার করে কেবল ওয়াই (ণ) অক্ষরটি এবং সঙ্গে বিস্ময়সূচক চিহ্ন। ইয়াহু নিয়ে রয়েছে মজার তথ্য, চমকে ওঠার মতো ঘটনা। প্রযুক্তি বিশ্বের এখনকার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গুগলকে দুবার কিনে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ইয়াহু। তাও মাত্র ১০ লাখ মার্কিন ডলারে। কিন্তু গুগলকে সেই সময়ের ইন্টারনেট জগতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ইয়াহু গোনার মধ্যেই ধরেনি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারায় ইয়াহুর অস্তিত্ব হারিয়ে যেতে বসেছে।

বিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর লোগোর ইতিহাস

 সাইফ আহমাদ 
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য ও সেবা ব্যবহার করে থাকি, এগুলোর একেকটির রয়েছে নির্দিষ্ট লোগো। বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো তাদের লোগোও খুব পরিচিত। ছবি দেখলেই বলে দেওয়া যায় সেগুলো কোন প্রতিষ্ঠানের। লোগোগুলো তৈরির পেছনে আছে একেকটি গল্প। বেশিরভাগ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানই তাদের লোগো দিয়েই বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত। বাইরের সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বহন করতেই লোগোগুলোর ডিজাইন করা হয়। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লোগোর পুরো অর্থ এবং সেগুলো তৈরি ও বিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে আজকের আয়োজন। বিস্তারিত লিখেছেন- সাইফ আহমাদ

অ্যাপল

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রথম লোগোটি তৈরি করেছেন রোনাল্ড ওয়াইন। যেটি ছিল সাদা-কালো রঙের; লোগোটি দেখলেই বোঝা যায়, এতে উপস্থিতি স্যার আইজ্যাক নিউটন। লোগোটিতে দেখা যায়, আইজ্যাক নিউটন একটি গাছের নিচে বসে আছেন, বলা হয় নিউটনের বিখ্যাত সেই আপেল তত্ত্বই উঠে এসেছে অ্যাপলের লোগোতে। লোগোটি আকারে বড় হওয়ায় পরবর্তী সময়ে স্টিভ জবস নতুন লোগো তৈরির দায়িত্ব দেন একটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যাপলের নতুন লোগোটি তৈরি করে ১৯৭৬ সালে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে অ্যাপলের বর্তমানের অর্ধেক খাওয়া অ্যাপলের লোগোটি। বর্তমানে অ্যাপলের খাওয়া আপেল এ ডিজাইনটির মেকারের নাম হচ্ছে ‘রব জেনোফ’। তিনি এক সাক্ষাৎকারে এ লোগোটির বর্ণনায় বলেন, ‘আমি এক ব্যাগভর্তি আপেল কিনি এবং সেগুলো একটি বাটিতে রেখে এক সপ্তাহ ধরে কাগজে আঁকার চেষ্টা করি, সহজ কোনো একটি ডিজাইন বের করার জন্য। কিন্তু বিশেষ কিছু তৈরি করতে পারিনি। নিরীক্ষার অংশ হিসাবে, আপেলে একটি কামড় (বাইট) দেই এবং কাকতালীয়ভাবে অনুভব করি, কামড় (নরঃব) কম্পিউটারের ‘বাইট’ (নুঃব)-এর মতোই শোনাচ্ছে।’

অ্যামাজন

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনের নামকরণের পেছনের ভাবনাটাও বেশ মজার। প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজস চেয়েছিলেন তার প্রতিষ্ঠানের নাম যেন ইংরেজি বর্ণমালার ‘এ’ দিয়ে শুরু হয়। আর এ কারণে ‘এ’ দিয়ে শুরু শব্দকেই অ্যামাজন নামকরণের আগে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদী অ্যামাজনের নামটি বেজসের মাথায় আসে। নদীর মতো প্রতিষ্ঠানটিকেও বাজারে সবার ওপরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই নাম রাখা হয় অ্যামাজন। এমনিতে অ্যামাজনের লোগোটি দেখলে বিশেষ কিছু মনে হয় না। তবে এর বিশেষত্ব, অ্যামাজন লেখার নিচের কমলা রঙের তীর চিহ্নটিতে। প্রথমত, এটি এমনভাবে দেওয়া, যাতে একটি স্মাইলি ফেস বা হাস্যমুখী প্রতীক দেখায়, যাতে বোঝা যায়, এ কোম্পানিটি তার প্রত্যেকটি কাস্টমারকে খুশি করতে চায়। এছাড়াও এর মাধ্যমে আরও একটি অর্থ বোঝানো হয়। খেয়াল করলে দেখবেন ইংরেজি অক্ষরে ‘এমাজনে’র ‘এ’ অক্ষরটি থেকে ‘জেড’ পর্যন্ত সেই তীর চিহ্নটি দেওয়া। অর্থাৎ এ টু জেড সব দরকারি পণ্য এখানে পাওয়া যাবে। অ্যামাজনের এ লোগোটির ডিজাইনার ডেভিড টার্নার।

গুগল

বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় সার্চ জায়ান্ট মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুগলের লোগোটি বোধহয় সবচেয়ে বেশি দেখা লোগো। ১৯৯৮ সালে ল্যারি ও তার বন্ধু সার্জি ব্রিন মিলে যাত্রা শুরু করে বর্তমানের সার্চ জায়ান্ট গুগল। তবে ‘গুগল’ থেকে এসেছে আজকের গুগলের নাম। ইংরেজিতে এর বানান ‘জি ও ও জি ও এল’। যার মানে হচ্ছে, একের পর ১০০টি শূন্য। নামকরণে সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার অঙ্কটিও কিন্তু কম নয়। গুগল’র লোগোটিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন নিজেই ডিজাইন করেন প্রথম লোগোটি। মৌলিক রংগুলো ব্যবহার করে গুগল শব্দটি লিখে ডিজাইন করা এ লোগোর সঙ্গে ছিল একটি বিস্ময়সূচক চিহ্ন। ফন্ট বদলে পরের বছরেই তিন রঙের সঙ্গে আরেকটি রং যুক্ত করে এবং বিস্ময়সূচক চিহ্নটি বাদ দিয়ে নতুন করে লোগো ডিজাইন করে গুগল। পরে ২০১০ সালে রুথ কেডার নতুন রঙে এবং নতুন ফন্টে ডিজাইন করেন গুগলের লোগো। বিশেষ বিশেষ দিবস উপলক্ষ্যে গুগল তাদের লোগো পাল্টে ফেলে। আর এ পাল্টে ফেলা বিশেষ লোগোর নাম ‘ডুডল’।

ইনস্টাগ্রাম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বর্তমান মালিকানাধীন ফটোশেয়ারিং প্লাটফর্ম ইনস্টাগ্রামের জনক কেভিন সিসট্রম ও মাইক ক্রিগারের হাত ধরে ২০১০ সালে বিশ্বখ্যাত ছবি শেয়ারিং-এর অ্যাপ তৈরির পর এর নাম দেওয়া হয় বার্বন। বুদ্ধিমান উদ্যোক্তারা জানতেন মানুষের মনে প্রভাব ফেলার জন্য একটি লোগোর গুরুত্ব কতটুকু হতে পারে। সহপ্রতিষ্ঠাতা কেভিন সিসট্রম আসল লোগোটি ডিজাইন করেন ২০১০ সালে। সেই লোগোটি ছিল পোলারয়েড ক্যামেরার আদলে। ক্যামেরার গায়ে ছিল রংধনু স্ট্রাইপ। কেভিনের বানানো লোগোটি মূলত ছিল দুই সপ্তাহের জন্য। পরে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ও ডিজাইনার কোল রাইজ ৪৫ মিনিটের ইনস্টাগ্রামের লোগোটি পর্যবেক্ষণ করে আগের ক্যামেরায় দুটো লেন্সের একটিকে ভিউ ফাইন্ডার করে দিলেন। ক্যামেরাটির বামপাশে রংধনুর কিছু রংজুড়ে দিয়ে নিচে ইনস্টা বানানটাও দিলেন। ২০১৬ সালের পর আইকন থেকে ক্যামেরাভাব দূর করার জন্য এবার কিছুটা নড়েচড়ে বসলেন ইনস্টাগ্রামের ডিজাইনাররা। নয় মাস ধরে তারা নানা নকশা করলেন, নানাভাবে ভাবলেন, নানা ছবি আঁকলেন এবং ব্যর্থ হলেন। আবারও সেই রাইজের দ্বারস্থ হলেন এবং তিনি আগের লোগোটি বদলে সম্পূর্ণ নতুন চেহারা দিয়ে দিলেন। এবারের লোগোটি ছিল পোলারয়েড ক্যামেরার আউটলাইন ইলাস্ট্রেশন। রংধনুর স্ট্রাইপগুলোও সরিয়ে ফেলা হলো।

নোকিয়া

বিখ্যাত মোবাইলফোন কোম্পানি নোকিয়া শুরুতে ছিল ফিনল্যান্ডের একটি কাঠ প্রক্রিয়াজাত কোম্পনি। ১৯৮৫ সালে ফেড্রিখ আইস্টাইম ফিনল্যান্ডে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর এ মিলটি যখন নোকিয়ানভিরতা নদীর কাছে সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন এর নাম রাখা হয় ‘নোকিয়া এবি’। এডওয়ার্ড পলোন ১৮৯৮ সালে ‘রাবারের’ ব্যবসা শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে নোকিয়ার রাবারের ব্যবসায় পরিণত হয়। সেই সময় নোকিয়া রাবারের নির্মিত গ্যালোসেস (এক প্রকারের বুট জুতা) থেকে টায়ার পর্যন্ত নির্মাণ করত। ১৯১২ সালে অরভিড উইকস্ট্রম ‘ক্যাবলের’ ব্যবসা শুরু করেন, যা পরবর্তী সময়ে নোকিয়ার ক্যাবল এবং ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসায় যুক্ত হয়। এ প্রতিষ্ঠানটির ও লোগোর মজার ইতিহাস রয়েছে। প্রথমদিকে নোকিয়ার লোগোতে ছিল মাছের ছবি। ১৯৫৬ সালে লোগোতে এক দফা পরিবর্তন আসে। তবে সেটিতেও ছিল মাছের ছবি। এরপর যথাক্রমে ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৯২, ২০০৫ এবং ২০১১ সালে নোকিয়ার লোগো পরিবর্তন হয়।

মাইক্রোসফট

প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট তাদের যাত্রা শুরু করে ১৯৭৫ সালে। এরপর থেকেই প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এক নাম মাইক্রোসফট। শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মাইক্রোসফট চারবার তাদের লোগো পরিবর্তন করেছে। ১৯৭৫ সালে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা পাউল এলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম লোগোটি তৈরি করেন বেসিক নামে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে। আর লোগোটি তৈরি করতে সময় লাগে মাত্র একদিন। এরপর একই বছর প্রতিষ্ঠানটির নতুন আরেকটি লোগো বানানো হয় যেটির ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল সবুজ। আর এতে মাইক্রোসফটের ও অক্ষরটি একটু ভিন্ন রূপ নেয়। দুই লাইনের এ লোগোতে ওপরে ‘মাইক্রো’ এবং নিচে ‘সফট’ লেখা হয়েছে। তাদের দ্বিতীয় লোগোটি পুরো নামটি এক সঙ্গে লিখে দেয় তারা। বড় হাতের অক্ষরে লেখা সব অক্ষরের মধ্যে মাইক্রো অংশের ‘ঙ’ অক্ষরটিকে তারা ডিজাইন করে লাইন দিয়ে এবং এ লোগোকে বলা হয় বিবেট লোগো। প্যাকম্যান নামের এ লোগোটি ডিজাইন করে স্কট বেকার। এরপর তারা তাদের নামের সঙ্গে যোগ করে চার রঙের একটি প্রতীক। তাদের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে লোগোতে যে চারটি রং রয়েছে, তা ব্যবহার করে এ লোগোটি ডিজাইন করে।

ইয়াহু

ডেভিড ফিলো ও জেরি ইয়াং গাইড টু ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ নামে প্রতিষ্ঠা করে ইয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় এ ওয়েবসাইট ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়, ইনকরপোরেটেড হয় ১৯৯৫ সালের ১ মার্চ। পরে তারা ইয়াহু নামেই পরিচিত হয়। শুরুতে তাদের লোগোটি ছিল লাল রঙের। আর ইয়াহু শব্দটির শেষে ছিল বিস্ময়সূচক চিহ্ন। প্রায় এক দশক পরে তারা লাল রঙের বদলে পার্পেল রং ব্যবহার করে লোগোটি বদলে দেয়। রঙের সঙ্গে সঙ্গে আগের লোগোতে যে ছায়া ছিল, তাও বাদ দেয় তারা। আর তাদের জনপ্রিয় ইনস্ট্যান্ট ম্যাসেজিং সার্ভিস ইয়াহু ম্যাসেঞ্জারের লোগো হিসাবে ব্যবহার করে কেবল ওয়াই (ণ) অক্ষরটি এবং সঙ্গে বিস্ময়সূচক চিহ্ন। ইয়াহু নিয়ে রয়েছে মজার তথ্য, চমকে ওঠার মতো ঘটনা। প্রযুক্তি বিশ্বের এখনকার অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গুগলকে দুবার কিনে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল ইয়াহু। তাও মাত্র ১০ লাখ মার্কিন ডলারে। কিন্তু গুগলকে সেই সময়ের ইন্টারনেট জগতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ইয়াহু গোনার মধ্যেই ধরেনি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারায় ইয়াহুর অস্তিত্ব হারিয়ে যেতে বসেছে।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন