ফেসবুক থেকে গড়ে ওঠা মানবিক সংগঠন

  যুগান্তর ডেস্ক ০২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবিক সংগঠন
কম্বল বিতরণ করছেন 'হাসিমুখ চিরসুখ' ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতাসগ অন্যরা

ফেসবুক এখন আর শুধু বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং বা ফটো শেয়ারিং এর জন্য নয় বরং ফেসবুক থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম।

সমাজের প্রতিনিয়ত ঘটমান নানা অন্যায় অবিচার এমনকি মাদকের বিরুদ্ধে এই ফেসবুক থেকেই সগঠিত হয়ে রুখে দাড়িয়েছে হাজারো তরুন।

বর্তমান সময়ে ফেসবুকের মাধ্যমে মানবিক আবেদনের আলোড়ন দেখতে পাই আমরা প্রায়শই। এই ফেসবুক থেকেই রক্তদান থেকে শুরু করে ফান্ড রাইজিং এর মাধ্যমে অসহায়দের পাশে দাড়ানোর এমন নজির এখন আর বিরল নয়।

ফেসবুক কেন্দ্রিক সংগঠিত হওয়া এমন কিছু সংগঠন এর কাযক্রম এবং পথচলা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল ফয়সাল

প্রলয় শিখা ফাউন্ডেশন

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষা হোক সবার জন্য। এ স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রলয় শিখা ফাউন্ডেশন শিক্ষার মাধ্যমে দরিদ্রের চক্র ভেঙে এবং জাতির পূর্ণ নির্মাণের আশা নিয়ে পথচলা শুরু করে প্রলয় শিখার মাধ্যমে।

ঢাকা জেলাসহ বাংলাদেশের সব জেলার সুবিধাবঞ্চিত-প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পোশাক, খাবার ইত্যাদি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের শেষের দিকে প্রলয় শিখা ফাউন্ডেশনটি একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।

প্রলয় শিখা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ সান ও তার কিছু ফেসবুকের বন্ধুরা টাকা তুলে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের কম্বল বিতরণ এর মধ্য দিয়ে তাদের পথচলা শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে এ সংগঠনকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষে তাদের ফেসবুকে প্রচার প্রচারণা চালাতে থাকে। ১ টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাবার প্রদান, প্রতিবন্ধী শিশুকে হুইল চেয়ার বিতরণ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী একজন মেয়েকে বিয়ে দেয়া, রাস্তা দুর্ঘটনায় পা হারানো একজনকে চিকিৎসা ও তার আর্থিক উন্নতির জন্য দোকান করে দেয়া, ২০১৭ সালে বন্যার্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদি তাদের উল্লেখ্যযোগ্য কর্মকাণ্ডের অংশ।

শুরুর প্রায় ১ বছর পর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নিজেদের মধ্য থেকে চাঁদা তুলে এবং বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ফান্ড কালেকশনের মাধ্যমে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে আশুলিয়া বেড়িবাঁধে ৪৭ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটি স্কুল শুরু করে ফাউন্ডেশনটি। ফেসবুকে প্রলয় শিখা ফাউডেশন : https://www.facebook.com/প্রলয়-শিখা-১৭৯৬৪৭৭৮৬৭০৩৪৪৪৫

স্বপ্নের দোকান:

স্বপ্নের দোকানের প্রতিষ্ঠাতা, নাঈম অঙ্কন বলেন, একবার একটা ঝকমকে শোরুমের কাচের দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে দুটি সুবিধাবঞ্চিত ভাইবোনকে মিথ্যামিথ্যি ঈদ শপিংয়ের অভিনয় করতে দেখেছিলেন তিনি। সেখানে বড়বোন দোকানি, আর ছোট ভাইটা কাস্টমার সেজেছিল।

শো-রুমের কাচের দেয়ালের বাইরে থেকে ইশারায় একটা জামা পছন্দ করেছিল ছোট ভাইটা। বড়বোনও তখন ইশারায় ঈদের জামাটা ছোট ভাইকে ভাঁজ করে প্যাকেট করে দেয়। ওদের এ করুণ অভিনয় শেষ হলে বড়বোনটা হাসিমুখে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে রাস্তায় পড়ে থাকা বোতল কুড়াতে কুড়াতে চলে যায়।

ওদের এ মিথ্যা অভিনয়, নাঈম অঙ্কনের মনে দাগ কাটে। সেখান থেকেই স্বপ্নের দোকানের আইডিয়াটা তার মাথায় আসে। এরপর ২০১৭ রমজানে রমজানে নাঈম অঙ্কন, তার বোন রোকাইয়া এবং বন্ধু ঈশিতা রশিদকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম স্বপ্নের দোকান পরিচালনা করে ধানমণ্ডি এলাকার ফুটপাতে।

তারপর একটি ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে তারা তাদের আইডিয়া ফেসবুকে প্রচার করে। আইডিয়াটা খুব কম সময়ের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অসংখ্য মানুষ নিজে থেকেই স্বপ্নের দোকানের দোকানদার হতে এগিয়ে আসেন। নাঈম আরও বলেন স্বপ্নের দোকান ঈদের জামা বিতরণ করে না। স্বপ্নের দোকান বিনে পয়সায় ঈদের জামা বিক্রি করে।

পথশিশুদের ঈদ-শপিংয়ের আনন্দ দেয়াই স্বপ্নের দোকানের মূল উদ্দেশ্য। কারণ, ঈদে বিভিন্ন জায়গা থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা জাকাতে কাপড় বা টাকা পায়। কিন্তু সেখানে তাদের ঈদ শপিংয়ের আনন্দ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই এ বাচ্চাগুলোর সঙ্গে ঈদে শপিং করার আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য স্বপ্নের দোকানের দোকানিরা সমাজের অবস্থাপন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রথমে ফান্ড সঞ্চয় করে।

তারপর সেই ফান্ডের টাকা দিয়ে স্বপ্নের দোকানের জন্য শিশুদের কাপড় কেনে। তারপর সেই কাপড়ের বাহার নিয়ে নিজেরাই ফুটপাতে বসে পড়ে দোকানদার সেজে। তারপর সেই দোকান থেকে পথশিশুদের নিজের পছন্দ মতো পোশাক বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়। সেই সঙ্গে পথশিশুদের সর্বোচ্চ লেভেলের কাস্টমার-সার্ভিসও প্রদান করে স্বপ্নের দোকান। এতে করে পথশিশুরা ঈদের শপিং করার আনন্দ উপভোগ করতে পারে।

গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবার কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট ফর পিস ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশব্যাপী মোট ১২টি শাখায় স্বপ্নের দোকান পরিচালিত হচ্ছে।

নাঈম অঙ্কনের নেতৃত্বে এসব দোকানের মালিকানা নিয়েছেন যথাক্রমে শর্মী হাসান, মাজেদুল আলম রাকিব, সজীব সাহা, রোকাইয়া মনি, ইভানা আসফারা, আবু বকর সিদ্দিকী, শাহাদাত হোসাইন তপু, আর কে কাব্য রহমান, মিরাজুল, নাভেদ চৌধুরী, মো. এহসানুল মালিক চৌধুরী, সিঞ্জন চৌধুরী এবং রায়হানা জান্নাত নামের একদল তরুণ-তরুণী। স্বপ্নের দোকানকে তারা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চান বলেও যোগ করেন নাঈম অঙ্কন। ফেসবুকে স্বপ্নের দোকান : https://www.facebook.com/groups/2097861990499848

হাসিমুখ চিরসুখ:

নীলফামারী জেলার কিছু তরুণ ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপের মানবসেবা মূলক কর্মকাণ্ড দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০১৭ সালের জুন মাসে হাসিমুখ চিরসুখকে সংগঠিত করে।

শুরুতেই তারা নীলফামারী জেলার কমলমতী শিক্ষার্থীদের পরিবেশ বন্ধু গাছ দিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে এর কার্যকর্মকে এগিয়ে নেয়ার জন্য ফেসবুক ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রচারণা মাধ্যমে বন্যার্তদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান, শীতার্তদের কম্বল বিতরণ, অসুস্থদের চিকিৎসা সাহায্য প্রদান, নিয়মিত রক্তদান কর্মসূচি, ফ্রি ব্লাড ক্যাম্পেইন ও কিছু সংখ্যক এতিম শিশুদের লেখাপড়া ও চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দশ থেকে বারো জন বন্ধুকে নিয়ে শুরু করা সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা এখন প্রায় ৫০ জনের বেশি। হোসনে আরা পম্পি বলেন, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কিছু করার মানবিক তাড়না থেকেই এ হাসিমুখ চিরসুখের প্রতিষ্ঠা।

ফেসবুকে তার এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন কাছের কিছু বন্ধুদের। শুরুতে অনেকেই হাসির ছলে উড়িয়ে দেয় তার কথাকে তবুও থেমে যাননি পম্পি। সমমনা অনেকেই তার প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়ে সেদিন সহযাত্রী হয়েছিলেন তার।

সবার মতামতে সাংগঠনিক রূপ দেন হাসিমুখ চিরসুখ নামের সংগঠনের মাধ্যমে। ফেসবুকের মেসেজ বক্স থেকে একদিন ডাক আসে মিটিংয়ের, সবুজ ঘাসে বসে আলোচনার মাধ্যমে যে সংগঠনের পথচলা সময় পেরিয়ে সেটি পেয়েছে একটি অফিস কার্যালয়।

হাসিমুখ চিরসুখ এর সদস্যরা সর্বত্র চেষ্টা করেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। ফেসবুকে হাসিমুখ চিরসুখ : https://www.facebook.com/groups/491965121154812/

হলিডে মিশন বাংলাদেশ:

হলিডে মিশন বাংলাদেশ নামে আরেকটি ফেসবুক কেন্দ্রিক সংঠিত হওয়া প্লাটফর্ম সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী মানব কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত এ সংগঠনটি।

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মানবিক সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি শিক্ষিত, মাদকমুক্ত, সু-স্বাস্থ্য এবং ন্যায় ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য ও উদ্দশ্য নিয়ে এর পথচলা। প্রতিষ্ঠাতা সিএম মাইনুল হাসানের হাত ধরে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমে ফেসবুকে একটি পেজের মাধ্যমে এটির কার্যক্রম শুরু হয়।

বর্তমানে হলিডে মিশনের কার্যক্রমকে আরও ত্বরান্বিত করছেন হলিডে মিশন ফেসবুক পেজের প্রধান অ্যাডমিন জান্নাতুল ফেরদোস। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেকে এ মানবতার কাজে ব্যস্ত রাখছেন প্রতিনিয়ত।

হলিডে মিশন মানবিক সাহায্য প্রদান, বেকারত্ব দূরীকরণ, পুনর্বাসন ব্যবস্থা, শিক্ষার ব্যবস্থা, শিশুশ্রম প্রতিরোধ, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, মাদক ও নেশামুক্ত সমাজ গঠন, স্বেচ্ছায় রক্তদান, পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণসহ নানাবিধ সমাজসেবামূলক কাজ করছেন। ফেসবুকে হলিডে মিশন : https://www.facebook.com/HolidayMission.bd

মানবতার কিছু পাগল প্রেমিক

নাম শুনলেই একটু কেমন মনে হতেই পারে অথচ এ পাগলগুলো দিন রাত স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছে মানবতার কল্যাণে মানুষের পাশে দাঁড়াতে। মূলত মানবতার কিছু পাগল প্রেমিক একটি অনলাইন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভিত্তিক ফেসবুক প্লাটফর্ম। যেখানে মানবতার জন্য রক্তদান নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ এডমিন- লিও রাসেল সরকার, এডমিন কেয়া রহমান, মো. রাকিব হোসেন (বড় রাকিব)। এ গ্র“পটি সম্পর্কে জানতে চাইলে মানবতার কিছু পাগল প্রেমিক গ্রুপের প্রধান আয়াডমিন লিও রাসেল সরকার বলেন, একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য ইমার্জেন্সি রক্তের প্রয়োজন।

চারদিকে হন্য হয়ে খুঁজেও রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তখনি আমি ফেসবুকে একটা স্টাটাস দেই এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তদাতা ম্যানেজ হয়ে যায়। এরপরই চিন্তা আসে ফেসবুকে রাকিবের সঙ্গে

নিজের চিন্তা শেয়ার করি রাকিব ও সহমত পোষণ করে সহযাত্রী হয় আর এভাবেই পথচলা। আর রক্তদান কার্যক্রমগুলো যেহেতু এককভাবে বা সংগঠন ভিত্তিক আলাদা আলাদাভাবে সমাধান করতে পারে না সেহেতু রক্তদানের মতো মহৎ কাজটি সবাই একসঙ্গে করার জন্যই এই গ্রুপ। ফেসবুকে মানবতার কিছু পাগল প্রেমিক : https://www.facebook.com/groups/ ManobotarKichuPagolPremik/

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter