স্টিভ জবস : নিলামে উঠেছে তার অ্যাপল ১

তথ্যপ্রযুক্তির আজকের এ যুগে অ্যাপল কম্পিউটার, আইফোন, আইপ্যাড, অ্যাইপড এ শব্দগুলোর সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। এসব যুগান্তকারী জিনিসের উদ্ভাবক কলেজের গণ্ডি পেরোতে না পারা একজন, নাম তার স্টিভেন পল জবস্। তিনি স্টিভ জবস্ নামে সর্বাধিক পরিচিত। তার রয়েছে একক এবং যৌথভাবে ৩৪২টি পণ্যের পেটেন্ট! কিংবদন্তি এ উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবককে পারসোনাল কম্পিউটার বিপ্লবের পথিকৃৎ বলা হয়। এ কিংবদন্তির জীবনী এবং তার উদ্ভাবনীর প্রারম্ভিকের কথা বিস্তারিত লিখেছেন- সাইফুল আহমাদ

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৯ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্টিভ জবস : নিলামে উঠেছে তার অ্যাপল ১
অ্যাপল ১

স্টিভেন পল জবস ১৯৫৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সানফ্রান্সিসকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তার মায়ের নাম জোন স্কিবল ও পিতা সিরিয়ান ইমিগ্র্যান্ট আবদুল ফাত্তাহ জান্দালি। অবিবাহিত এবং স্টুডেন্ট বাবা-মার সন্তান স্টিভ জবস্কে জন্মের পরপরই দত্তক দিয়ে দেয়া হয় পল ও ক্লারা জবস দম্পতির কাছে। পরে দত্তক পিতা-মাতার দেয়া ‘স্টিভ জবস্’ নাম নিয়ে তিনি হন জগৎবিখ্যাত।

সিলিকন ভ্যালিতে বেড়ে ওঠা:

এক সময়ের ক্যালিফোর্নিয়ার ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে ভাগাড় এখনকার প্রযুক্তির তীর্থস্থান সিলিকন ভ্যালিতেই বেড়ে ওঠেন এ প্রযুক্তিবিদ। অনেক প্রকৌশলী তাদের গ্যারেজ গড়ে তুলেছিলেন সেখানে। হয়ত তাদের দেখেই স্টিভ জবস্ তাদের মতো একজন হয়ে উঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্টিভ জবস কুপারটিনো জুনিয়র হাইস্কুল এবং হোমস্টিড হাইস্কুলে পড়ার পর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি হাইস্কুল শেষ করেন এবং রিড কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু রিড লিবারেল আর্টসের ওপর বেশ ব্যয়বহুল একটি কলেজ ছিল। অসচ্ছল পল-ক্লারা দম্পতির পক্ষে সেই ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর ছিল।

জবসের জন্মদাত্রী মাকে তারা কথা দিয়েছিলেন, ছেলেটাকে ভালো কোথাও পড়াবেন। সেই কথা রক্ষা করতে রিড কলেজেই ভর্তি করালেন জবসকে। কিন্তু এক সেমিস্টারের বেশি আর এগোতে পারেননি জবস। ঝরে পড়েন। যদিও তিনি পরে কলেজ ছেড়ে দেন তার পরেও তিনি ক্যালিগ্রাফিসহ আরও কিছু ক্লাসে যোগদান করেছিলেন। এ সম্পর্কে তার বক্তব্য ছিল ‘যদি আমি ওই কোর্সে না যেতাম তবে ম্যাকের কখনোই বিভিন্ন টাইপফেস বা সামঞ্জস্যপূর্ণ ফন্টগুলো থাকত না।’

ওজনিয়াকের সঙ্গে পরিচয়:

১৯৬৯ সালের দিকে স্টিফেন ওজনিয়াক নামের এক তরুণের সঙ্গে পরিচয় হয় জবসের। ইলেকট্রনিকসের প্রতি দু’জনের গভীর আগ্রহ থাকায় বয়সে তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড় ওজের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে জবসের।

নিয়মিত স্টিফেন ওজনিয়াকের সঙ্গে হোমব্রিউ কম্পিউটার ক্লাবের সভাগুলোতে উপস্থিত থাকতেন এবং ভিডিও গেমস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আটারিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি এ সময় মূলত ভারতে যাওয়ার জন্য অর্থ জমানোর চেষ্টা করছিলেন। আর তাই আলোকিত জীবন গড়তে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন স্টিভ জবস। চলে এসেছিলেন ভারতে। সেখানে নিম কারোলি বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য জবস তার কৈঞ্চি আশ্রমে যান রিড কলেজের বন্ধু ড্যানিয়েল কোটকেকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু তা প্রায় জনশূন্য অবস্থায় ছিল, কারণ নিম কারোলি বাবা ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান। আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন শেষে আবারও সিলিকন ভ্যালির ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে ভাগাড়ে ফিরে এলেন জবস।

প্রথম উদ্ভাবন-ব্লু বক্স:

টেলিফোন নেটওয়ার্ককে নিপূণভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় টোন উৎপন্ন করতে, দুই বন্ধু মিলে প্রথমে যে জিনিসটি তৈরি করেন সেটা হল- একটা ব্লু বক্স। এ ব্লু বক্সটির সাহায্যে টেলিফোনকে বোকা বানিয়ে বিনামূল্য পৃথিবীর যে কোনো স্থানে কথা বলা যেত। এটা যদিও আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু মানুষ এটা পছন্দ করেছিল। এটা করে তারা ৬ হাজার ডলারের মতো জোগাড় করেছিল। ১৯৯৪ সালে একটি সাক্ষাৎকারে, জবস বলেন যে ব্লু বক্স কীভাবে তৈরি করতে হয় তা বুঝে উঠতে তাদের ছয় মাস সময় লেগেছিল। তিনি বলেন যে যদি ব্লু বক্সগুলো তৈরি না হতো, তাহলে হয়ত অ্যাপলও থাকত না।

অ্যাপল কম্পিউটার কোম্পানির যাত্রা:

১৯৭৬ সালে, জবস এবং ওজনিয়াক নিজেদের ব্যবসা শুরু করেন। তারা তাদের কোম্পানির নাম দেন ‘অ্যাপল কম্পিউটার কোম্পানি’। প্রথম দিকে সার্কিট বোর্ড বিক্রয়ের মাধ্যমে তারা এ কোম্পানি চালু করেন। অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্টিভ জবস ও স্টিভ ওজনিয়াক বেশি পরিচিত হলেও শুরুর দিকে কোম্পানিটির তিনজন প্রতিষ্ঠাতা ছিল। বাকি একজন হচ্ছেন রোনাল্ড ওয়েন, যিনি অ্যাপলের প্রথম লোগোটি এঁকেছিলেন।

অ্যাপল ১ এর আবিষ্কার:

১৯৭৬ সালে ওজনিয়াক একক প্রচেষ্টায় অ্যাপল-১ কম্পিউটার উদ্ভাবন করেন। ওজনিয়াক কম্পিউটারটি জবসকে দেখালে, জবস তা বিক্রয় করার পরামর্শ দেন। তখন তারা এটিকে বিক্রয়ের জন্য রোনাল্ড ওয়েনকে সঙ্গে নিয়ে জবসের গ্যারেজে অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। এ বছরই ৬৬৬.৬৬ ডলারে অ্যাপল ১ কম্পিউটার বিক্রি শুরু হয়। সে সময় মাত্র ২০০টি অ্যাপল ১ তৈরি করা হয় যার মধ্যে একটি কম্পিউটার।

পৃথিবীর একেবারে প্রথম যুগের পার্সোনাল কম্পিউটারগুলোর মধ্যে একটি ছিল এই অ্যাপল-১ কম্পিউটার। অবশ্য সে সময় অ্যাপল ১ কম্পিউটারগুলো কেবল মাদারবোর্ড আকারেই বিক্রি হতো। স্টিভ জবস তখন তার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ভক্স ওয়াগন গাড়ি ও স্টিভ ওজনিয়াক তার এইচপি-৬৫ ক্যালকুলেটর বিক্রি করে এই প্রকল্পের জন্য ফান্ড তৈরি করেছিলেন। তবে তখনকার সময়ে অ্যাপল ১ কোনো পাওয়ার সাপ্লাই, কিবোর্ড, মাউস বা মনিটরের সঙ্গে বিক্রি হতো না। ক্রেতাদের এসব আলাদা কিনে জোড়া লাগাতে হতো।

অ্যাপল ২-এর আবিষ্কার:

১৯৭৭ সালের কিছুদিনের মধ্যেই অ্যাপল-১ এর চেয়ে উন্নতমানের কম্পিউটার তৈরি করে ফেলেন। নাম ‘অ্যাপল-২’। দুই বন্ধু আঁচ করতে পারলেন, অ্যাপল-২ বাজারের যে কোনো কম্পিউটারের চেয়ে গুণে-মানে সেরা হবে। ব্যবসার মূলধনের ঘাটতি থাকায় তারা ইন্টেলের তৎকালীন সাবেক পণ্য বিপণন ব্যবস্থাপক মাইক মার্ককুলার কাছে যান অর্থ প্রাপ্তির আশায়। মাইক মার্ককুলা তাদের কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। আড়াই লাখ ডলার পুঁজি দেন এ দুই প্রতিভাবানকে। ১৯৭৭ সালের ৫ জুন প্লাস্টিক কেসে রঙিন মনিটর সমৃদ্ধ অ্যাপল টু বাজারে আসে। দেখতে দেখতে দুই বছরের মাথায় ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে তখন পার্সোনাল কম্পিউটার কেনার হিড়িক। সেই জোয়ারে ১ নম্বর স্থানে সবার পছন্দের তালিকায় উঠে এল অ্যাপল-২। ব্যবসা রমরমা হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরের দিকে স্টিভ জবসের সম্পদের পরিমাণ ২০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেল। তখন তার বয়স মাত্র ২৫।

প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম দিকপাল ও এক সময়কার অ্যাপল সিইও স্টিভ জবস্ অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভোগে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে শেষ শব্দটি ছিল ‘ওহ ওয়াও’। সাংবাদিক ব্রেন্ট স্লেনডার ও রিক টেটজেলি ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশ করেন স্টিভ জবস্রে বায়োগ্রাফি ‘বিকামিং স্টিভ জবস্’।

নিলামে উঠছে সেই অ্যাপল ১:

সম্প্রতি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে নিলামে উঠার ৭০ দশকের একটি পুরোপুরি কার্যকর অ্যাপল-১ কম্পিউটার। আজকের ট্রিলিয়ন ডলার বাজার মূল্যের অ্যাপলের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল অ্যাপল-১। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এ মডেলের পুরোপুরি কার্যকর একটি কম্পিউটার নিলামে বিক্রি করবে বস্টনভিত্তিক আরআর অকশন। অবাক করা বিষয় হচ্ছে অ্যাপল-১ যখন প্রথম বাজারে আসে তখন এর মূল্য ছিল ৬৬৬ মার্কিন ডলার। নিলামে এর দাম উঠতে পারে তিন লাখ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি। এখনও অ্যাপল ১ মাদারবোর্ডকে বর্তমান সময়ের ফ্যাশনেবল ম্যাক কম্পিউটারের পূর্বপুরুষ হিসেবেই ধরা হয়। বিশ্বে এখন ৬০টির মতো অ্যাপল ১ অবশিষ্ট রয়েছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter