প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এমএ রহমান

শিক্ষকতা অনেকের স্বপ্নের পেশা। সম্মান, মর্যাদা আর মানুষ গড়ার এ পেশায় যারা আত্মনিয়োগ করতে চান তাদের সামনে সুবর্ণ সুযোগ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক পদে সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বড় এ নিয়োগের আবেদনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আবেদনপত্র যারা পূরণ করেছেন তাদের এখন ব্যস্তু সময় কাটছে প্রস্তুতিতে। শেষ মুহূর্তে এসে নিজেদের ঝালিয়ে নেয়ার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী।

আগামী ১৫ মার্চ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এমসিকিউ পদ্ধতির লিখিত পরীক্ষা নিতে ইতিমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষার শেষ করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকের ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এবার প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ২৪ লাখের বেশি চাকরিপ্রত্যাশী আবেদন করেছেন। সারা দেশে ১২ হাজার আসনের বিপরীতে তারা এ ভর্তিযুদ্ধে বসবেন।

লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সুবিধার্থে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির খুঁটিনাটি নানাবিধ বিষয় তুলে ধরা হল।

পরীক্ষা পদ্ধতি

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হবে। লিখিত পরীক্ষায় ৮০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ২০ নম্বর বরাদ্দ থাকে। লিখিত পরীক্ষা হয় বহু নির্বাচনী বা এমসিকিউ পদ্ধতিতে। পরীক্ষার সময় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট। ৮০টি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন থাকে। প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণমান ১ নম্বর। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রশ্ন আসে। প্রতিটি বিষয় থেকে ২০টি করে প্রশ্ন থাকে। প্রতিটি সঠিক উত্তরে ১ নম্বর পাওয়া যাবে। রয়েছে নেগেটিভ মার্কিং। প্রতিটি ভুল উত্তরে কাটা যাবে ০.২৫ নম্বর অর্থাৎ প্রতি চারটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা যাবে ১ নম্বর। প্রতিটি প্রশ্নের নিচে (ক), (খ), (গ), (ঘ) এই রকম ৪টি করে সম্ভাব্য উত্তর দেয়া থাকবে। উত্তর প্রদানের জন্য একটি ওএমআর (OMR) শিট প্রার্থীকে আলাদাভাবে পরীক্ষা কক্ষে দেয়া হবে। প্রার্থী অবশ্যই নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের উত্তরের জন্য সরবরাহকৃত (OMR) শিটটি ব্যবহার করবেন। কোনো অবস্থাতেই সম্ভাব্য উত্তরের ডান পার্শ্বে উত্তর হিসেবে কোনো টিক (?) চিহ্ন বা অন্য কোনো চিহ্ন দেয়া যাবে না।

র্নৈব্যক্তিক প্রশ্নের উত্তরপত্র বা ওএমআর (OMR) শিটের বাম পার্শ্বে প্রশ্ন নম্বর এবং তার ডান পাশে (ক), (খ), (গ), (ঘ) এইভাবে ৪টি বৃত্তাকার ঘর থাকবে। উদাহরণ : প্রশ্ন নম্বর উত্তর : ৩ (ক) (খ) (গ) (ঘ)। প্রার্থী নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর নির্ণয় করে ওএমআর (ঙগজ) শিটে তার বাছাইকৃত সংশ্লিষ্ট উত্তরের বৃত্তাকার ঘরটি কালো কালির বলপয়েন্ট কলম দ্বারা পূরণ করবেন।

বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি

প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় গত দুই বছরে নিয়োগ পাওয়া অন্তত চারজন সহকারী শিক্ষকের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে আলাপে ওঠে আসে বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতির খুঁটিনাটি বিষয়। পাঠক ও চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশে সেগুলো তুলে ধরা হল।

তারা সবাই জোর দিয়ে একটি কথা বলেছেন যে, প্রাথমিকের নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো করতে হলে প্রস্তুতির জন্য দেখতে হবে ৫ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর বোর্ড নির্ধারিত পাঠ্য বই। এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলা

গাজীপুর সদরের ভাদুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া সম্প্রতি নিয়োগ সহকারী শিক্ষক শাহনাজ পারভীন বলেন, বাংলা অংশে ব্যাকরণ থেকে বেশি প্রশ্ন আসে। সাহিত্য থেকেও কিছু প্রশ্ন করা হয়।

ব্যাকরণ অংশে সাধারণত শব্দ, বাক্য, পদ, সন্ধি বিচ্ছেদ, প্রকৃতি-প্রত্যয়, বাগধারা, সমার্থক শব্দ, বানান শুদ্ধি, সমাস, কারক-বিভক্তি, প্রতিশব্দ, দেশি-বিদেশি শব্দ, এক কথায় প্রকাশ, অনুবাদ ইত্যাদি থেকে প্রশ্ন থাকবে। আর সাহিত্য অংশে ইতিহাস, বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ, বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের জন্মতারিখ, জীবন ও কর্ম, উপাধি, ছদ্মনাম, পুরস্কার, চরিত্র ও উক্তি থেকে প্রশ্ন আসতে পারে। এছাড়া থাকতে পারে ভাবসম্প্রসারণ, পত্র ও সারাংশ নিয়ে প্রশ্ন। এগুলো ভালোভাবে আয়ত্তে থাকলে সহজেই উত্তর দেয়া যায়। সাহিত্য অংশের জন্য বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের জীবনী, জন্ম-মৃত্যু সাল, রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে প্রশ্ন আসতে পারে।

ইংরেজি

রূপগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাদিয়া জাবিন জানান, ইংরেজি ব্যাকরণ অংশ থেকে বেশি প্রশ্ন এসে থাকে। গ্রামার থেকে মূলত মৌলিক বিষয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয়। এজন্য Fill in the blanks, Synonym, antonym, phrases and idioms, Tense, Correct Spelling, Sentence Correction, থেকে প্রশ্ন আসে এমসিকিউ অংশে। একটি বিভাগ থেকে কয়েকটি করে প্রশ্ন থাকতে পারে। ইংরেজি সাহিত্য অংশে বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম, কবি-সাহিত্যিকদের জন্মতারিখ, জীবনী, গল্প, উপন্যাস ও নাটকের চরিত্র ও বিশেষ উক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। প্রশ্নে কমপক্ষে এক থেকে দুটি Translation আসবেই।

গণিত

কুমিল্লার দাউদকান্দির একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক রুবাইয়াতুল ইসলাম জানান, গণিত যার চাকরি তার। যে গণিত ভালো জানে তার চাকরি পাওয়া সহজ। তিনি জানান, মাধ্যমিক পর্যায়ের বই আয়ত্তে থাকতে হবে গণিতে ভালো করার জন্য। এমসিকিউ অংশে সহজে উত্তর করার জন্য শর্টকাট টেকনিক ব্যবহার করে নিয়মিত চর্চা করতে হবে। বিশেষ করে ঐকিক নিয়ম, শতকরা, পরিমাপ ও একক, সুদকষা, লাভক্ষতি ও পরিমিতি বিষয়ে। তাই আপনাকে এ-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে দক্ষ হতে হবে। এছাড়া লসাগু-গসাগু, বর্গ, সরল, মাননির্ণয় ও জ্যামিতিক সূত্র ও সংজ্ঞা তো আছেই। দক্ষতা যাচাই করতে বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নও থাকতে পারে।

পরীক্ষার হলে সাধারণত ক্যালকুলেটর ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। তাই এমনভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, যেন মুখেমুখেই অঙ্কের সমাধান করা যায়। প্রয়োজনে প্রশ্নের খালি অংশে পেনসিল দিয়ে সমাধান করা যেতে পারে। তবে সমাধান শেষে রাবার দিয়ে মুছে ফেলা ভালো। প্রতিটি প্রশ্নের সমাধানের জন্য এক মিনিটের বেশি সময় পাওয়া যায় না। তাই শিখতে হবে শর্টকাট টেকনিক।

সাধারণ জ্ঞান

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রশ্ন করা হয়ে থাকে বেশি। সেটি হতে পারে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক যে কোনো বিষয়। এ ছাড়া সাধারণ জ্ঞানের মৌলিক নিয়েও প্রশ্ন হতে পারে। বাংলাদেশ বিষয়ে কৃষিজ, বনজ, প্রাণিজ ও খনিজসম্পদ, মুক্তিযুদ্ধ, শিল্প ও বাণিজ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, আয়তন, সীমানা, নদ-নদী, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, পুরস্কার ও সম্মাননা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে। সুতরাং প্রস্তুত থাকুন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিষয়ে বেশি প্রশ্ন আসে। এর সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতি, দেশ ও জাতি, সীমারেখা, বিশ্ব অর্থনীতি, শিল্প ও বাণিজ্য, খেলাধুলা, বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠন, চুক্তি ও সনদ, পুরস্কার ও সম্মাননা, বিখ্যাত স্থান ও স্থাপনা বিষয়ে জানা থাকলে আপনারই লাভ। এ ছাড়া কোনো দেশে নির্বাচন হলে সেখানে কে সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা কোনো দল ক্ষমতায় এসেছে তা নিয়েও প্রশ্ন হয়ে থাকে।

সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঢাকার রাজিয়া সুলতানা জানান, তথ্য-প্রযুক্তির মৌলিক কিছু প্রশ্নও সাধারণ জ্ঞানে আসতে পারে। বাজারে বিভিন্ন প্রকাশনীর প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ গাইড পাওয়া যায়। দেখতে পারেন গোলাম মোস্তফা কিরণের ‘আজকের বিশ্ব’ কিংবা নতুন বিশ্ব। চোখ রাখতে পারেন কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক মাসিক সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকায়।

বেতন-ভাতা

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুসারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১০২০০-২৪৬৮০ টাকা স্কেলে এবং প্রশিক্ষণবিহীনরা ৯৭০০-২৩৪৯০ টাকা স্কেলে বেতন ও অন্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন।