ইফতার ও সেহরি ডেলিভারি

রমজানে ছোট পুঁজিতে বড় আয়

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোহাম্মদ আতাউর রহমান

বছর ঘুরে মাহে রমজান এসে গেল। সিয়াম সাধনার এ মাসজুড়ে যে কেউ শুরু করতে পারেন কয়েকটি ছোটখাটো ব্যবসা। কয়েকটি মৌসুমি ব্যবসায় হাত দিয়ে স্বল্প পুঁজি খাটিয়ে বড় ধরনের আয় তুলে নিতে পারেন আপনিও।

রমজানজুড়ে ইফতারসামগ্রী ও সেহরি সরবরাহের ব্যবসায়টি রাজধানী ও বিভাগীয় শহরে বেশ পরিচিত ও লাভজনক। তবে এর জন্য আপনাকে একটু ভেবে-চিন্তে ব্যবসায়ের স্থান ও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

পণ্যের কাঁচামাল কেনায় একটু কৌশলী হতে হবে। সেই সঙ্গে পণ্যের মানের বিষয়টিতে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশনার দিকটিও মাথায় রাখতে হবে।

ইফতার বিক্রি

রমজানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ইফতার। অল্প পুঁজিতেই এক মাসের জন্য শুরু করতে পারেন ইফতারির ব্যবসা। প্রথমেই কোথায় বিক্রি করবেন তা নির্ধারণ করতে হবে। স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন জায়গা বেছে নেয়া উচিত, যেখানে প্রচুর জনসমাগম হয়। একটু স্বাস্থ্যকর খোলামেলা পরিবেশের বিষয়টি স্থান নির্ধারণের সময় গুরুত্ব দেবেন।

ইফতারির মেন্যুতে প্রায় সবারই পছন্দ ছোলা, মুড়ি, পিঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, চপ, খেজুর, ফল, কাবাব ইত্যাদি। চপের আছে নানা পদ-আলুর চপ, শাকের চপ, ডিম চপ, চিকেন চপ ইত্যাদি। সমুচা, পাকোড়া, চিকেন ফ্রাই, ভেজিটেবল রোলও রাখতে পারেন। কাবাবেও রকমভেদ থাকতে পারে। তবে ইফতারির আইটেম তৈরিতে প্রথমেই ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হবে।

পুঁজি

প্রাথমিক অবস্থায় কাঁচামাল ও অন্যান্য জিনিস কেনার জন্য মূলধনের প্রয়োজন হবে। কাঁচামালের জন্য ৫ থেকে ১২ হাজার টাকা পুঁজি হলেই চলবে। খরচ কমাতে চাইলে রান্নার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি বাসা থেকেই জোগান দিতে পারেন।

লাগবে যা যা

ইফতার তৈরির জন্য লাগবে সয়াবিন তেল, ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, আলু, বেগুন, বেসন, ময়দা। আইটেম বেশি হলে লাগতে পারে গাজর, পেঁপে, নানা ধরনের শাক। আইটেম অনুসারে প্রয়োজন হতে পারে ডিম, মুরগি বা গরুর মাংস।

সালাদের আইটেমে লাগবে শসা, টমেটো, ধনেপাতা, লেবু, লেটুস পাতা। একটি নির্দিষ্ট স্থানে তৈরি করে বিক্রি করতে হলে চাই রান্নার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। লাগবে চুলা, কেরোসিন, কড়াই, প্লাস্টিকের বোল, ঝুড়ি, বালতি, বটি, ছুরি।

সাজানোর জন্য প্রয়োজন হবে টেবিল, অ্যালুমিনিয়াম বা মেলামাইনের ডিশ, খাবার ঢেকে রাখার জন্য স্বচ্ছ পলিথিন বা ঢাকনা, বিক্রেতার জন্য হ্যান্ড গ্লাভস। বিক্রির জন্য ঠোঙা, ওয়ানটাইম বক্স, পলিব্যাগ রাখতে পারেন।

ইফতার তৈরির জন্য কমপক্ষে একজন বাবুর্চি লাগবে। দোকানের আকার আর বেচাকেনার ওপর নির্ভর করবে বিক্রেতার সংখ্যা। পরিবেশনের জন্য লাগবে বড় টেবিল। স্বচ্ছ কাচঘেরা ভেন বা টেবিল হলে ভালো হয়। ধুলাবালির থেকে রক্ষা পাওয়া ছাড়াও ক্রেতারা মানের ব্যাপারেও সন্তুষ্ট থাকবেন।

চাই পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ

রমজানে ইফতার তৈরি ও পরিবেশনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিতে। কারণ রোজাদাররা স্বাস্থ্যসম্মত খাবারে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ জন্য চামচ-ছুড়ি থেকে শুরু করে প্রতিটি উপাদান যেন পরিষ্কার থাকে সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

সেই সঙ্গে তেলের ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। খোলা তেল না দিয়ে ব্র্যান্ডের তেল ব্যবহার করা উচিত। স্বাদ ও গুণগত মান ঠিক রাখতে হলে ভালো বাবুর্চি রাখতে হবে। মুখরোচক মসলা দিতে হবে। যারা রাস্তার পাশে বিক্রি করতে চান তাদের উচিত হবে কাচের আয়না ঘেরা ভ্যান বা দোকান ঘরের ব্যবস্থা করা। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে ইফতার তৈরি ও বিপণন করতে হবে। তবে ক্রেতা হারানোর ভয় থাকবে না।

কাঁচামাল সংগ্রহ

রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে গতবার ইফতার বিক্রির ব্যবসা করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া রাফি রাইয়ান ও তার বন্ধু রায়হান। তারা জানান, সাশ্রয়ে রান্নার কাঁচামাল কিনতে চাইলে যেতে হবে কারওয়ান বাজার আর পুরান ঢাকার আনন্দবাজারে।

অন্যান্য মালামাল পাবেন চকবাজার, বাবুবাজার, নয়াবাজার, কামরাঙ্গীরচর আর বাবুবাজারে। বাজার ঘুরে বিভিন্ন দোকান যাচাই করতে হবে। যেখানে কম দামে ভালো পণ্য পাবেন, সেখান থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। দৈনিক হিসেবে বা পুরোমাসের জন্য চুক্তিতে লোকবল নিয়োগ দিতে পারেন।

আয় রোজগার

রাফি ও রায়হান জানান, ইফতারের মান বজায় রাখতে পারলে সব খরচা বাদেও রোজ ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। দোকানটি ভালো জায়গায় দিতে পারলে আরও বেশি আয় করা সম্ভব।

ইফতার ও সেহরির হোম ডেলিভারি

রমজানে ব্যস্ততার কারণে ঘরে খাবার তৈরির সুযোগ পান না অনেকেই। সময়ের অভাবে ও যানজটের কারণে সুস্বাদু আর ঐতিহ্যবাহী খাবার কেনাও হয়ে ওঠে না অনেকের। চাহিদামতো ইফতার ও সেহরি পৌঁছে দেয়াটাও হতে পারে ভালো ব্যবসা। সুতরাং এর স্বত্বাধিকারী ফাহিমা তাবাস্সুম জানান, রমজানজুড়ে ইফতার ও সেহরি সামগ্রী হোম ডেলিভারি একটি লাভজনক ব্যবসা। এ জন্য যে খুব বেশি পুঁজি দরকার তাও কিন্তু নয়। ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পুঁজি হলে সহজেই এ ব্যবসা করা যায়।

প্যাকেজ অফার

ঘরে খাবার তৈরি করতে হলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কিনতে হবে। ইফতারি তৈরির জন্য লাগবে অভিজ্ঞ বাবুর্চি। হোটেল বা রেস্টুরেন্ট থেকে ইফতারি সরবরাহ করতে চাইলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। জেনে নিতে হবে ইফতারির মেন্যু, মান ও বিভিন্ন আইটেমের দাম।

সাশ্রয়ে বিভিন্ন ইফতার সামগ্রী নেয়ার জন্য চুক্তি করে নিতে পারেন। প্রচলিত সাধারণ আইটেমের পাশাপাশি ভোজনরসিক ও স্বাস্থ্য সচেতনদের জন্য আলাদা আইটেমও রাখতে পারেন। সারা শহরে ইফতারি পৌঁছে দেবেন, নাকি কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় সরবরাহ করবেন তা নির্ধারণ করা জরুরি। সব ধরনের ক্রেতার কথা মাথায় রেখে খাবারের মেন্যু সাজাতে হবে। দাম থাকা চাই নাগালের মধ্যে। দেয়া যেতে পারে প্যাকেজ অফার। এ জন্য চাই আগে থেকেই পরিকল্পনা।

প্রযুক্তির সহযোগিতা

হোম ডেলিভারি সার্ভিসের জন্য নির্দিষ্ট ফোন নম্বর, ফেসবুক পেজ গ্রুপ এবং ওয়েবসাইট থাকা চাই। এক মাসের জন্য কার্ড বা লিফলেট ছাপাতে পারেন। প্রচার চালাতে পারেন ফেসবুকে। নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে ফেসবুক পেজ বা গ্রুপ খুলে বন্ধুদের সেখানে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানান।

সেখানে প্রতিটি আইটেমের ছবি পোস্ট করুন। ছবির একপাশে এবং ক্যাপশনে নাম, দাম ও যোগাযোগের নম্বর উল্লেখ করুন। ফোনে ও ফেসবুকে সব সময় সক্রিয় থেকে ক্রেতাদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার, ব্যানারের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানো যেতে পারে। মসজিদের সামনেও প্রচারপত্র বিলি করে প্রচার চালানো যেতে পারে।

দরকার চৌকস ডেলিভারিম্যান

ঘরে তৈরি বা রেস্তোরাঁ থেকে সংগ্রহ করে যেভাবেই বিক্রি করেন, গ্রাহকের ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য লাগবে ডেলিভারিম্যান। ডেলিভারিম্যান নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিচিত ও বিশ্বস্ত লোকদের গুরুত্ব দিতে হবে। স্বল্প সময়ে যানজট ঠেলে নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছতে বাইসাইকেল বা মোটরসাইকেলের বিকল্প নেই।

প্রার্থীকে অবশ্যই দুটি বাহনের যে কোনো একটি চালনায় পারদর্শী হতে হবে। নিজের বাহন আছে এবং উদ্যোমী তরুণদের প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে। শহরের বিভিন্ন এলাকা ও অলিগলি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা চাই।