যে মন্ত্রের বিশ্বাসে রবীন্দ্রনাথ সফল

  আল ফাতাহ মামুন ১৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যার হাত ধরে বিশ্বের দুয়ারে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন এক-দু’জন ছাড়া সমসাময়িক প্রায় সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কী লেখে ছোকরাটা? এসব কোনো লেখা হল? সম্ভবত সাহিত্য জগতের সেরা অপমানের ক্রেচটা কবিগুরুর ঝুলিতেই জমা পড়েছে। তার রচনা থেকে প্যারা তুলে বিভিন্ন পরীক্ষায় বলা হত-শুদ্ধ বাংলায় লেখ।

কাঁচা বয়সে রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখাই পাকা বয়সের শক্তিশালী লেখার মতো হয়নি। বিষয়টি কবিগুরু নিজেই স্বীকার করেছেন। ‘সঞ্চয়িতা’র ভূমিকায় তিনি বলেন- কিছু কবিতা ও গান ছাপার অক্ষরে প্রকাশের পর আমাকে দারুণ লজ্জা দিয়ে আসছে। এসব নিয়ে অনেকেই আমার কবিত্বের পঙ্গুত্বও প্রমাণ করতে চাইছেন। তাদের দোষ দিতে পারি না। কারণ, ছাপার অক্ষরে ওইসব প্রকাশ করে তার সমর্থনই আমি করেছি, যা তারা বলছে। অল্প বয়সে এমন অনেক কবিতাই আমি লিখেছি, যা আসলে কবিতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ নয়। আজ আমি নিজেই ওইসব বাদ দিয়েছি। সে কবিতাগুলোই এখানে সংকলন করেছি, যেগুলো সমালোচকদের চোখে কবিতা হয়ে ওঠেছে।

সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের শুরু দিকের লেখার সঙ্গে শেষের দিকের লেখা মিলিয়ে পড়লে খুব ভালো করেই বোঝা যায় নিজেকে গড়ে তোলতে কতবেশি চেষ্টা করেছেন তিনি।’ সবাই যখন কবিগুরুকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করেছে, তার লেখা কিছুই হয়নি বলে উড়িয়ে দিয়েছে- তখন যদি তিনি থেমে যেতেন, ভেঙে পড়তেন, নিজেকে নতুন করে গড়ে না তোলতেন, তাহলে কী ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামটির পাশে ‘বিশ্বকবি’ শব্দটি লেখা হত? অবশ্যই না।

শুরুর দিকে অবশ্যই কবিগুরু ভুল-ভালো কিছু লিখেছেন। তা দেখে অনেকে হাসাহাসিও করেছে। কিন্তু কবিগুরু থেমে যাননি। লেগেছিলেন। সফল হয়েছেন। আমরাও যারা সফল হত চাই, আমাদের সে কাজটিই করতে হবে- কবিগুরুসহ বিশ্বের সব সফল মানুষ যে কাজটি করেছেন। লেগে থাকতে হবে। লেগে থাকব সৎভাবে। স্বপ্ন জয় আমারই হবে।

স্বপ্ন জয়ের পথে অবশ্যই হাজারও বাধা-বিঘ্ন, ঝড়-ঝাপটা আসবে। তখন কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। অনেক চেষ্টা করার পরও যখন কেউ সফলতার মুখ দেখে না তখন সে ধরেই নেয়- সফলতা বুঝি আমার ভাগ্যেই নেই। এ ধরনের মানসিকতা সত্যিই খুব ভয়ঙ্কর। ভাগ্যের ওপর দোষ চাপিয়ে আমরা চেষ্টা বন্ধ করে দিতে পারি না। তাহলে কী করব? চেষ্টা তো কম করিনি! পরিশ্রমও কম হচ্ছে না! দুর্ভাগ্য যেন আমার পিছুই ছাড়ে না। এসব কথা যারা বলেন, তাদের উদ্দেশেই কবিগুরু লিখেছেন ‘হতভাগ্যের গান’ কবিতাটি।

‘কিসের তরে অশ্র“ ঝরে, কিসের লাগি দীর্ঘশ্বাস?

হাস্যমুখে অদৃষ্টরে করব মোরা পরিহাস।

রিক্ত যারা সর্বহারা সর্বজয়ী বিশ্বে তারা,

গর্বময়ী ভাগ্যদেবীর নয়কো তারা ক্রীতদাস।

হাস্যমুখে অদৃষ্টরে করব মোরা পরিহাস॥’

কেন আমরা হতাশ? আমাদের চোখে কেন জল? ভাগ্য আমাদের সঙ্গে নেই তাই বলে? ভাগ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সফলতা ছিনিয়ে এনে প্রমাণ করব আমরা ভাগ্যের গোলাম নই, আমরা কর্মে বিশ্বাসী। ভাগ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সেরাদের সেরা হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কিন্তু পৃথিবীতে কম নয়। সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়েও একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্টিফেন হকিং। ছোট বেলা থেকেই পায়ে সমস্যা নিয়ে ফুটবল বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন লিওনেল মেসি। পঙ্গুত্ব নিয়েও মাঠ কাঁপিয়ে তুলছেন আমাদের মাশরাফি। এমন হাজারের বেশি উদাহরণ আপনাদের দিতে পারব, যারা হাসি মুখে অদৃষ্টকে পরিহাস করে সফল হয়েছেন। যারা সর্বহারা থেকে সর্বজয়ী হয়ে প্রমাণ করেছেন- আমরা ভাগ্যদেবীর কেনা গোলাম নই।

২৫শে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন। যার জীবনের প্রতিটি দিকই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। যিনি হতভাগ্যদের জন্য লিখেছেন সৌভাগ্যের সব গান। তাই কবিগুরুর জন্মলগ্নে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে স্মরণ করছি। শেষ করছি ‘হতভাগ্যের গান’র কটি চরণ দিয়ে।

‘আমরা সুখের স্ফীত বুকের ছায়ার তলে নাহি চরি।

আমরা দুঃখের বক্র মুখের চক্র দেখে ভয় না করি।

ভগ্ন ঢাকে যথাসাধ্য বাজিয়ে যাব জয়বাদ্য

ছিন্ন আশার ধ্বজা তুলে ভিন্ন করব নীলাকাশ।

হাস্যমুখে অদৃষ্টরে করব মোরা পরিহাস।’

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

E-mail : [email protected]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter