প্রকৃতি-দুঃখ নাও-সুখ দিয়ে
jugantor
প্রকৃতি-দুঃখ নাও-সুখ দিয়ে

  গৌতম কুমার রায়  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতি তার সৃষ্টিতে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য তৈরি করলেও সৃষ্টিগত কোনো বিভেদ সৃষ্টি করে না। তবে মানুষ তার আহার, শাসন, ধর্ম, রাজনীতি, ভাষা ইত্যাদি কারণে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।

যেজন্য মানুষ কোথাও বিস্তর ভৌগোলিক সীমায় অল্প, আবার কোথাও অল্প সীমারেখায় বিস্তর বসবাস করে আসছে। যেখানে সে অল্প সীমানায় অনেকে বসবাস করছে সেখানে প্রকৃতি ব্যবহার হচ্ছে নানাভাবে। এতে প্রকৃতি ক্ষয় হয়ে পড়ছে দ্রুত।

মানুষ এখানে বিশাল অভাবকে মোকাবেলা করতে গিয়ে যাচ্ছেতাই প্রকৃতিকে ব্যবহার করার জন্য প্রকৃতির আক্রোশের শিকার হচ্ছে। আবার এ আক্রোশের প্রভাব গিয়ে পড়ছে তার সীমারেখার পার্শ্বে প্রাণিকুলের পরে। এতে অন্যরা প্রকৃতিকে লোভে ব্যবহার না করেও আক্রোশের আগুনে জ্বলছে ঠিকই। তবে তারা দোষে দৃষ্ট নয়।

মানুষের জন্য জমি বদলে যাচ্ছে। কৃষি জমি বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অ-কৃষিতে চলে যাচ্ছে। দেশে প্রায় ৫ হাজার ইটভাটা রয়েছে, যা থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি পিস ইট হয়। এ ইটের জন্য আনুমানিক ৯ হাজার কোটি টন মাটি কাটা পরে। আবার এ ইট তৈরি করতে গিয়ে আমরা হারাচ্ছি কৃষি জমির মূল্যবান ‘টপ সয়েল’কে। বন, টিলা, পরিবেশগুলোকে। আমাদের পাহাড় টিকছে না।

পাহাড় কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে তা ধসে যাচ্ছে। যে খাড়া পাহাড় সূর্যের তাপ, বাতাস, প্রবল বৃষ্টিকে নিজের শরীরে নিয়ে প্রকৃতির ক্ষয় রোধ করত, সেই পাহাড় ক্ষয়ে যাওয়ায় তাপের চাপে বাতাসে প্রচুর বালু ও মাটিবাহিত হচ্ছে। উপকূলে পলি জমে জলস্তর উঁচু হচ্ছে। নদী-নালা, সাগরের সঙ্গমপথ ভড়াট হচ্ছে।

উজান জলস্রোতে পলি ভেসে আসতে থাকায় নদী মরেছে। এতে ভয়ংকর প্রভাবে পড়েছে আমাদের পরিবেশ। এসবের পেছনেও ক্রীড়ানক হিসেবে কাজ করছে আমাদের সীমিত সীমারেখায় বসবাসকারী অধিক জনসংখ্যা।

যারা কিনা নিজেদের ভোগ-বিলাসে প্রকৃতির সামান্য সম্পদের ওপর হামলে পড়ছে অহরহ। বসতবাটি, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল, মন্দির-মসজিদ করতে গিয়ে জমি বা মাটি টিকছে না। শিল্প ও বিদ্যুৎ, রাস্তা এবং যানবাহন গড়তে গিয়ে মাটি, জল, জলজসম্পদ ও বায়ু টিকছে না। যানবাহন আমাদের নিঃশ্বাসের বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। আমরা বেঁচে আছি যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে। যেজন্য বলতে পারি,

‘ শরীরটাকে নদী ভেবে দেখ, জলের ধারা বটে,

কখনও তা উথাল-পাথাল, কখনও গড়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।’

ইসলামাবাদ বা দিল্লি নয়, আমাদের ঢাকা শহরের বাতাসও বিষে ভরা। এ শহরের জল গেছে, শব্দ গেছে, বায়ু গেছে, গাছ-মাছ-মাটি হারিয়েছে। এখানকার মানুষ নিত্য যে জল পান করে তা-ও নিরাপদ নয়। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে এ শহরে মানুষ চলতে গিয়ে পায়ে পায়ে বাধা পাবে। তবে এখনকার অবস্থা যে ভালো, তা-ও বলছি না। সীমিত বাতাস এবং পানি যেভাবে প্রতিনিয়ত টেনে নিচ্ছি, তাতে সবসময় এই ঢাকার প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। ভাবতে গেলে মনে পরে যেন, সময়ই বদলে দেয়, সময়ের সমস্ত সংলাপ

তবে এখন যেন বেঁচে আছি স্রেফ বাঁচার খাতিরে।

আমাদের সমস্যা হল, সমাজ বৈষম্যে ভরা। আমাদের নীতিবোধ এবং বিবেক নিয়ন্ত্রিত নয়। লোভ এবং তার জন্য ক্ষোভ বেশি কাজ করে। সরকার আইন করে, আমরা তা না-মানার জন্য প্রতিবাদ করি। আমরা আইন বাতিলের জন্য রাস্তায় নামি। ভাংচুর করি। আমাদের সীমিত কৃষি জমিতে নদী এবং বৃষ্টি সারা বছর রস জোগান দিয়ে উৎপাদনশীলতাকে জিইয়ে রেখেছে।

আমরা হিমালয় সৃষ্ট পলিবাহিত এলাকার ভাটি অঞ্চলের মানুষ হলেও আমাদের দেশের প্রবাহিত জলের ৯৩ শতাংশ আসে সীমান্তের বাইরে থেকে, আর মাত্র ৭ শতাংশ আমাদের অভ্যন্তরের। অথচ আমাদের লোকসংখ্যা বিস্তর। ভারতের নদী গবেষক ববি চন্দ্রের কথায় শুধু হিন্দুকুশের পাহাড়-পর্বতেই বসবাস করে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ।

যাদের জীবন জোগানের প্রয়োজনে অর্থনীতি, কৃষি, জলবিদুৎ তৈরিতে এ পর্বতের জলই শক্তি জোগাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। আরেকটু ভাবলে দেখা মেলে, এ অঞ্চলের তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণে এ পর্বতের ভূমিকা রয়েছে। নিরাশার কথা হল, ১৯৭০ সালের আগে ৫০ বছরের হিসেবে এ পর্বতের প্রায় ১৫ শতাংশ বরফ গলে গেছে। অর্থাৎ ১৯০০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরফ গলেছে।

সেজন্য এ এলাকার ঠাণ্ডার পরিমাণও কমেছে। একটি হিসাব দাবি করেছে, প্রতি দশকে এ এলাকায় ১টি ঠাণ্ডার রাত এবং ১.২টি ঠাণ্ডার দিন যেমন কমেছে, আবার একই ধারায় ওই সময়ে গরমে গড়ে ১.৭টি রাত এবং ১.২টি দিন বেড়েছে। আমাদের দেশে দাবানলের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকলেও আমাদের রয়েছে খরা এবং বন্যা।

শৈত্যপ্রবাহ ও দাবদহ। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয় নিয়ন্ত্রিত না হলেও তার ক্ষিপ্রতা সৃষ্টিতে আমাদের বিস্তর ভূমিকা থাকে সবসময়। আমাদের বায়ুদূষণের ঘনত্ব এতটাই যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুলের সৌরভ ১০-১২ শত মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়; কিন্তু এখন সেই দূরত্ব কমে হয়েছে ২-৩ শত মিটার পর্যন্ত। ফুল কমে গেছে।

পতঙ্গ কমেছে সঙ্গত নিয়মে মধু উৎপাদনও কমে গেছে। যার জন্যও মানুষ দায়ী। ১৯৯৪ সালে দেশে মধু উৎপাদন হয়েছিল ৪৩৭.৪৭৮ টন। মাত্র চার বছর ব্যবধানে ১৯৯৮ সালে তার উৎপাদন ছিল ৩৯৩.৫০ টন।

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকলে বাড়তি জনবসতি কখনও বোঝা হয় না। আবার শিল্পায়নের যুগে যদি শিল্পসমৃদ্ধ দেশ থাকত তবে এ জনসংখ্যার প্রতিজনের দুটি হাতকে সক্ষম বা কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা গেলে তা হতো আশীর্বাদের। আমরা এখনও সেই পর্যায়ে দেশ এবং জাতিকে এগিয়ে নিতে পারিনি। তবে সরকারের অদম্য যে চেষ্টা রয়েছে তাতে এ স্বপ্ন হয়তো সফল হবে। আমাদের ১.৮১ লাখ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র জলরাশির সঙ্গে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মানচিত্রে পেয়েছি ১,৪৩,৯৯৮ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশকে।

সে লক্ষ্যে বর্তমানে ১,৪৩,৯৯৮ বর্গকিলোমিটার সেই মানচিত্রের আয়তনে লোক সংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮০০ জনের কিছু ওপরে। আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ জন লোক সংখ্যার ক্রুড বার্থ রেসিও বা সিবিআর জন্ম ৩৫.২ শতাংশ এবং মৃত্যু ১০.৬ শতাংশ, অর্থাৎ উঁচু জন্ম বা প্রজনন হার এবং নিু মৃত্যুহার।

যা দেশে বাড়তি লোক সংখ্যা জন্ম হওয়ার হুমকি। পক্ষান্তরে এতে দ্রুত হারে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে এবং এ সম্পদের ক্ষয় হতে থাকে। সামগ্রিকভাবে এজন্য আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ-সম্পদ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরে অস্থিরতার প্রলেপ দেয়।

প্রকৃতিতে মানুষ হল উন্নত বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ প্রকৃতির অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করেছে স্রেফ নিজেদের প্রয়োজনে। প্রকৃতির অনেক রহস্যের নিগূঢ়তাকে জেনেছে। এজন্য মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে তার সঙ্গে এক ধরনের সখ্যতা গড়তে সক্ষম হয়েছে। বলতে গেলে এ মানুষের প্রয়োজনে প্রকৃতির পরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরবর্তী ঘটনার কারণে যেমন সমাজ সৃষ্টি হয়েছে আবার যুক্ত সামাজিক ব্যবহারের ফলে প্রকৃতিকে যাচ্ছেতাই ভোগ করে চলেছে।

আর প্রকৃতির রুষ্টতার কারণ ঠিক এখানেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীতে যে বৈষয়িক পরিবর্তন তা মানুষের জন্য। এমনকি তার জন্য প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণিকুলের ওপরে যে রুষ্টতা অথবা শান্তিময়তা তা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রভাব। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আজকের প্রকৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য যথাযথ বাসযোগ্য হিসেবে রেখে যাওয়াও আমাদের এ প্রজন্মের মানুষের অঙ্গীকার।

সেজন্য প্রকৃতির ওপরে মানুষের প্রভাব, প্রকৃতিকে স্বাভাবিকতায় চলতে দিয়ে বিজ্ঞান-সমাজ এবং সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি এখনই ভাবতে হবে। শোষণ, বিস্তীর্ণ দূষণ, ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা পরিহার করে পরিবেশকে সুসংহত করে, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের প্রধান কাজ। নিয়তির জন্য আমাদের নিত্যপ্রার্থনা হোক, প্রকৃতি, আমাদের শান্তি দাও, অশান্তি দূর করে। যেন

‘ প্রকৃতি তুমি চিতার দাহিকায় ঝলসে গেলেও

আমার শিখায় ছড়াও তোমার স্নিগ্ধ সবুজ আলো।’

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব

প্রকৃতি-দুঃখ নাও-সুখ দিয়ে

 গৌতম কুমার রায় 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতি তার সৃষ্টিতে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য তৈরি করলেও সৃষ্টিগত কোনো বিভেদ সৃষ্টি করে না। তবে মানুষ তার আহার, শাসন, ধর্ম, রাজনীতি, ভাষা ইত্যাদি কারণে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।

যেজন্য মানুষ কোথাও বিস্তর ভৌগোলিক সীমায় অল্প, আবার কোথাও অল্প সীমারেখায় বিস্তর বসবাস করে আসছে। যেখানে সে অল্প সীমানায় অনেকে বসবাস করছে সেখানে প্রকৃতি ব্যবহার হচ্ছে নানাভাবে। এতে প্রকৃতি ক্ষয় হয়ে পড়ছে দ্রুত।

মানুষ এখানে বিশাল অভাবকে মোকাবেলা করতে গিয়ে যাচ্ছেতাই প্রকৃতিকে ব্যবহার করার জন্য প্রকৃতির আক্রোশের শিকার হচ্ছে। আবার এ আক্রোশের প্রভাব গিয়ে পড়ছে তার সীমারেখার পার্শ্বে প্রাণিকুলের পরে। এতে অন্যরা প্রকৃতিকে লোভে ব্যবহার না করেও আক্রোশের আগুনে জ্বলছে ঠিকই। তবে তারা দোষে দৃষ্ট নয়।

মানুষের জন্য জমি বদলে যাচ্ছে। কৃষি জমি বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অ-কৃষিতে চলে যাচ্ছে। দেশে প্রায় ৫ হাজার ইটভাটা রয়েছে, যা থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি পিস ইট হয়। এ ইটের জন্য আনুমানিক ৯ হাজার কোটি টন মাটি কাটা পরে। আবার এ ইট তৈরি করতে গিয়ে আমরা হারাচ্ছি কৃষি জমির মূল্যবান ‘টপ সয়েল’কে। বন, টিলা, পরিবেশগুলোকে। আমাদের পাহাড় টিকছে না।

পাহাড় কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে তা ধসে যাচ্ছে। যে খাড়া পাহাড় সূর্যের তাপ, বাতাস, প্রবল বৃষ্টিকে নিজের শরীরে নিয়ে প্রকৃতির ক্ষয় রোধ করত, সেই পাহাড় ক্ষয়ে যাওয়ায় তাপের চাপে বাতাসে প্রচুর বালু ও মাটিবাহিত হচ্ছে। উপকূলে পলি জমে জলস্তর উঁচু হচ্ছে। নদী-নালা, সাগরের সঙ্গমপথ ভড়াট হচ্ছে।

উজান জলস্রোতে পলি ভেসে আসতে থাকায় নদী মরেছে। এতে ভয়ংকর প্রভাবে পড়েছে আমাদের পরিবেশ। এসবের পেছনেও ক্রীড়ানক হিসেবে কাজ করছে আমাদের সীমিত সীমারেখায় বসবাসকারী অধিক জনসংখ্যা।

যারা কিনা নিজেদের ভোগ-বিলাসে প্রকৃতির সামান্য সম্পদের ওপর হামলে পড়ছে অহরহ। বসতবাটি, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল, মন্দির-মসজিদ করতে গিয়ে জমি বা মাটি টিকছে না। শিল্প ও বিদ্যুৎ, রাস্তা এবং যানবাহন গড়তে গিয়ে মাটি, জল, জলজসম্পদ ও বায়ু টিকছে না। যানবাহন আমাদের নিঃশ্বাসের বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। আমরা বেঁচে আছি যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে। যেজন্য বলতে পারি,

‘ শরীরটাকে নদী ভেবে দেখ, জলের ধারা বটে,

কখনও তা উথাল-পাথাল, কখনও গড়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।’

ইসলামাবাদ বা দিল্লি নয়, আমাদের ঢাকা শহরের বাতাসও বিষে ভরা। এ শহরের জল গেছে, শব্দ গেছে, বায়ু গেছে, গাছ-মাছ-মাটি হারিয়েছে। এখানকার মানুষ নিত্য যে জল পান করে তা-ও নিরাপদ নয়। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে এ শহরে মানুষ চলতে গিয়ে পায়ে পায়ে বাধা পাবে। তবে এখনকার অবস্থা যে ভালো, তা-ও বলছি না। সীমিত বাতাস এবং পানি যেভাবে প্রতিনিয়ত টেনে নিচ্ছি, তাতে সবসময় এই ঢাকার প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। ভাবতে গেলে মনে পরে যেন, সময়ই বদলে দেয়, সময়ের সমস্ত সংলাপ

তবে এখন যেন বেঁচে আছি স্রেফ বাঁচার খাতিরে।

আমাদের সমস্যা হল, সমাজ বৈষম্যে ভরা। আমাদের নীতিবোধ এবং বিবেক নিয়ন্ত্রিত নয়। লোভ এবং তার জন্য ক্ষোভ বেশি কাজ করে। সরকার আইন করে, আমরা তা না-মানার জন্য প্রতিবাদ করি। আমরা আইন বাতিলের জন্য রাস্তায় নামি। ভাংচুর করি। আমাদের সীমিত কৃষি জমিতে নদী এবং বৃষ্টি সারা বছর রস জোগান দিয়ে উৎপাদনশীলতাকে জিইয়ে রেখেছে।

আমরা হিমালয় সৃষ্ট পলিবাহিত এলাকার ভাটি অঞ্চলের মানুষ হলেও আমাদের দেশের প্রবাহিত জলের ৯৩ শতাংশ আসে সীমান্তের বাইরে থেকে, আর মাত্র ৭ শতাংশ আমাদের অভ্যন্তরের। অথচ আমাদের লোকসংখ্যা বিস্তর। ভারতের নদী গবেষক ববি চন্দ্রের কথায় শুধু হিন্দুকুশের পাহাড়-পর্বতেই বসবাস করে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ।

যাদের জীবন জোগানের প্রয়োজনে অর্থনীতি, কৃষি, জলবিদুৎ তৈরিতে এ পর্বতের জলই শক্তি জোগাচ্ছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। আরেকটু ভাবলে দেখা মেলে, এ অঞ্চলের তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণে এ পর্বতের ভূমিকা রয়েছে। নিরাশার কথা হল, ১৯৭০ সালের আগে ৫০ বছরের হিসেবে এ পর্বতের প্রায় ১৫ শতাংশ বরফ গলে গেছে। অর্থাৎ ১৯০০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরফ গলেছে।

সেজন্য এ এলাকার ঠাণ্ডার পরিমাণও কমেছে। একটি হিসাব দাবি করেছে, প্রতি দশকে এ এলাকায় ১টি ঠাণ্ডার রাত এবং ১.২টি ঠাণ্ডার দিন যেমন কমেছে, আবার একই ধারায় ওই সময়ে গরমে গড়ে ১.৭টি রাত এবং ১.২টি দিন বেড়েছে। আমাদের দেশে দাবানলের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকলেও আমাদের রয়েছে খরা এবং বন্যা।

শৈত্যপ্রবাহ ও দাবদহ। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয় নিয়ন্ত্রিত না হলেও তার ক্ষিপ্রতা সৃষ্টিতে আমাদের বিস্তর ভূমিকা থাকে সবসময়। আমাদের বায়ুদূষণের ঘনত্ব এতটাই যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুলের সৌরভ ১০-১২ শত মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়; কিন্তু এখন সেই দূরত্ব কমে হয়েছে ২-৩ শত মিটার পর্যন্ত। ফুল কমে গেছে।

পতঙ্গ কমেছে সঙ্গত নিয়মে মধু উৎপাদনও কমে গেছে। যার জন্যও মানুষ দায়ী। ১৯৯৪ সালে দেশে মধু উৎপাদন হয়েছিল ৪৩৭.৪৭৮ টন। মাত্র চার বছর ব্যবধানে ১৯৯৮ সালে তার উৎপাদন ছিল ৩৯৩.৫০ টন।

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা থাকলে বাড়তি জনবসতি কখনও বোঝা হয় না। আবার শিল্পায়নের যুগে যদি শিল্পসমৃদ্ধ দেশ থাকত তবে এ জনসংখ্যার প্রতিজনের দুটি হাতকে সক্ষম বা কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা গেলে তা হতো আশীর্বাদের। আমরা এখনও সেই পর্যায়ে দেশ এবং জাতিকে এগিয়ে নিতে পারিনি। তবে সরকারের অদম্য যে চেষ্টা রয়েছে তাতে এ স্বপ্ন হয়তো সফল হবে। আমাদের ১.৮১ লাখ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র জলরাশির সঙ্গে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মানচিত্রে পেয়েছি ১,৪৩,৯৯৮ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশকে।

সে লক্ষ্যে বর্তমানে ১,৪৩,৯৯৮ বর্গকিলোমিটার সেই মানচিত্রের আয়তনে লোক সংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮০০ জনের কিছু ওপরে। আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ জন লোক সংখ্যার ক্রুড বার্থ রেসিও বা সিবিআর জন্ম ৩৫.২ শতাংশ এবং মৃত্যু ১০.৬ শতাংশ, অর্থাৎ উঁচু জন্ম বা প্রজনন হার এবং নিু মৃত্যুহার।

যা দেশে বাড়তি লোক সংখ্যা জন্ম হওয়ার হুমকি। পক্ষান্তরে এতে দ্রুত হারে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ে এবং এ সম্পদের ক্ষয় হতে থাকে। সামগ্রিকভাবে এজন্য আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ-সম্পদ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরে অস্থিরতার প্রলেপ দেয়।

প্রকৃতিতে মানুষ হল উন্নত বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ প্রকৃতির অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করেছে স্রেফ নিজেদের প্রয়োজনে। প্রকৃতির অনেক রহস্যের নিগূঢ়তাকে জেনেছে। এজন্য মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে তার সঙ্গে এক ধরনের সখ্যতা গড়তে সক্ষম হয়েছে। বলতে গেলে এ মানুষের প্রয়োজনে প্রকৃতির পরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরবর্তী ঘটনার কারণে যেমন সমাজ সৃষ্টি হয়েছে আবার যুক্ত সামাজিক ব্যবহারের ফলে প্রকৃতিকে যাচ্ছেতাই ভোগ করে চলেছে।

আর প্রকৃতির রুষ্টতার কারণ ঠিক এখানেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীতে যে বৈষয়িক পরিবর্তন তা মানুষের জন্য। এমনকি তার জন্য প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণিকুলের ওপরে যে রুষ্টতা অথবা শান্তিময়তা তা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রভাব। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আজকের প্রকৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য যথাযথ বাসযোগ্য হিসেবে রেখে যাওয়াও আমাদের এ প্রজন্মের মানুষের অঙ্গীকার।

সেজন্য প্রকৃতির ওপরে মানুষের প্রভাব, প্রকৃতিকে স্বাভাবিকতায় চলতে দিয়ে বিজ্ঞান-সমাজ এবং সম্পর্ক তৈরির বিষয়টি এখনই ভাবতে হবে। শোষণ, বিস্তীর্ণ দূষণ, ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা পরিহার করে পরিবেশকে সুসংহত করে, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের প্রধান কাজ। নিয়তির জন্য আমাদের নিত্যপ্রার্থনা হোক, প্রকৃতি, আমাদের শান্তি দাও, অশান্তি দূর করে। যেন

‘ প্রকৃতি তুমি চিতার দাহিকায় ঝলসে গেলেও

আমার শিখায় ছড়াও তোমার স্নিগ্ধ সবুজ আলো।’

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব

 

ঘটনাপ্রবাহ : ২১ বছরে যুগান্তর