দূষণের শোষণে রক্তাক্ত ক্ষত
jugantor
দূষণের শোষণে রক্তাক্ত ক্ষত

  কানিজ কবির  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দূষণের শোষণে রক্তাক্ত ক্ষত

পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। পরিবেশের আনুকূল্যে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন পরস্পরের নির্ভরশীলতায় বিকাশ লাভ করে, সেই পরিবেশ আজ বিপন্নের পথে।

প্রতিটি প্রাণীই তার নিজ নিজ পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকার সামগ্রী গ্রহণ করে। সেসব সামগ্রী থেকে প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের পর পরিত্যক্ত অংশ পরিবেশে ফিরে যায়।

এভাবে জীবজগৎ ও পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকার সামগ্রী গ্রহণ ও বর্জন চলে। এ গ্রহণ বর্জনের ভারসাম্য নষ্টেই পরিবেশ দূষণ হয়। পরিবেশের যে কোনো অস্বাভাবিক বিধ্বংসী পরিবর্তনই পরিবেশ দূষণ হিসেবে পরিগণিত। পরিবেশ দূষণ নতুন কিছু নয়, সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই পরিবেশ দূষিত হয়ে আসছে। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞানের আবিষ্কার, পারমাণবিক পরীক্ষা, বিস্ফোরণ এবং মনুষ্য ও প্রকৃতি সৃষ্ট হাজারও কারণে এ পরিবেশ দূষিত হয়। বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণকেই আমরা প্রধান দূষণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকি। বাতাসের ভেতর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান রয়েছে। এসব জীবন ধারণের উপযোগী উপাদান হ্রাস পেয়ে বাতাসে ক্ষতিকর উপাদান বেড়ে গেলেই বায়ুদূষণ হয়।

যানবাহন, চুল্লি, কল-কারখানার চিমনি, ইটেরভাটা ইত্যাদি থেকে নির্গত ধোঁয়ার দ্বারা বায়ু প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। ধুলো, বালি, কীটনাশক, রাসায়নিক বর্জ্য, গ্যাস ইত্যাদি দূষণকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া জীবজন্তুর গলিত দেহ, পচা বর্জ্য, আবর্জনার মতো অন্যান্য উপাদানও বাতাসকে দূষিত করছে। ফলে হৃদরোগ, ফুসফুসের প্রদাহ, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, যক্ষ্মা, অঙ্গবিকৃতিসহ নানারকম ব্যাধি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। পানিদূষণ পরিবেশ দূষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। সারা পৃথিবীতে শিল্প নগরীগুলো গড়ে উঠেছে নদী বা সমুদ্রকে কেন্দ্র করে।

শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পৌর ও শিল্পের বর্জ্য নদী, হ্রদ বা সাগরে ফেলা হয়। এসব বর্জ্যরে অতি উঁচু মাত্রার বিষপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান দ্বারা জলাধারের পানি দূষিত হয় এবং এর ফলে জলজ প্রাণী মারা যায়। এছাড়া কৃষিতে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। কীটনাশক পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এছাড়া তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল নিঃসৃত হয়ে পানি দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও পানি দূষণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বর্তমান বিশ্বে দূষণের ক্ষেত্রে শব্দ দূষণকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যায় না।

রাস্তাঘাটে উৎকট হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইরেন, নির্মাণ সামগ্রীর শব্দ, মিছিল-শোভাযাত্রায় অস্বাভাবিক কোলাহল, বোমা-পটকার আওয়াজ, মাইকের শব্দ ইত্যাদি আমাদের পরিবেশ দূষণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এ দূষণে নিদ্রাহীনতা, শিরঃপীড়া, বধিরতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো রোগ দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার দাবানলকে আমরা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ ধরতে পারি।

অস্ট্রেলিয়ায় গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এবারের দাবানল সম্প্রতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে দাবানল শহরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকায় উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে লাখো মানুষ। অঙ্গরাজ্য দুটিতে এখন পর্যন্ত ২৪ জন মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এ দাবানলে প্রায় ৫০ কোটি প্রাণী মারা গেছে। দাবানল কেন এত মারাত্মক? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার এ ভয়ঙ্কর দাবানল মূলত তীব্র তাপদাহ, অনেকদিন ধরে চলা খরা এবং ঝড়ো বাতাসের কারণে এমন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। দেশটিতে অনেকদিন ধরেই তাপদাহ চলছে। বিগত তিন মাসের উষ্ণতা ভেঙে দিয়েছে ১২০ বছরের রেকর্ড।

পৃথিবীবাসী নিজেদের তৈরি কার্যকলাপে প্রতিনিয়ত পরিবেশকে দূষিত করছে। এতে সবুজ গ্রহ ধূসর মরুতে পরিণত হচ্ছে, প্রাণিজগতের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে সভ্যতা। ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কৃষি বিপ্লব সৃষ্টি করছে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া।

এটি মারাত্মক সংকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও ক্লোরোফ্লোরো কার্বন গ্যাস বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা অতিমাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে। এতে আর্কটিক ও এন্টার্কটিকার বরফ গলে জনপদ, দেশ, অঞ্চল ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে, উপরন্তু খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঝড়, ঘূর্ণিবার্তা ভয়াবহ রূপে বেড়ে যাচ্ছে। পৃথিবী থেকে ৭৬ রকমের প্রাণী ও কয়েক হাজার গাছপালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৩২ রকমের স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৬ প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত ও বিলুপ্তির পথে। সমতলভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, বায়ুতে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।

গ্রিনহাউস ইফেক্টের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ গ্যাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড ৫০%, মিথেন ২০%, সিএফসি ১০%, নাইট্রাস অক্সাইড ১০% এবং অবশিষ্ট ১০% কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন পারঅক্সাইড ও কিছু অন্যান্য গ্যাস থাকে। গ্রিনহাউস হল পুরু কাচের প্রাচীর দ্বারা নির্মিত একটি কাচঘর। শীতপ্রধান এবং মরুর দেশে এ কাচের ঘর তৈরি করে কৃত্রিমভাবে তাপ, আলো ও জলীয়বাষ্প নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃষি গবেষণা/ফসল উৎপাদন করা হয়।

ঠিক এ গ্রিনহাউসের কাচের প্রাচীরের মতো পৃথিবীকে ঘিরে বিদ্যমান গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো সূর্যের পতিত তাপ বিকিরণে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধি করে। বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধির এ প্রক্রিয়াই হল গ্রিনহাউস ইফেক্ট। বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রিনহাউস ইফেক্টের কারণে তাপ বৃদ্ধির ফলে শিগগিরই মেরু অঞ্চল ও পর্বতশ্রেণীর বরফ গলে সাগরের পানির উচ্চতা ১ থেকে ২ মিটার বৃদ্ধি পাবে।

এর ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ দ্বীপ সমুদ্রের লোনা পানির নিচে ডুবে যাবে এবং কোটি কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে ও প্রকট খাদ্য সংকট দেখা দেবে। রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, পলিথিন, প্লাস্টিক ও রঙ তৈরির কারখানা থেকে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (সিএফসি) গ্যাস নির্গত হয়। এ গ্যাস বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তরকে ধ্বংস করে। এক অণু সিএফসি প্রায় দুই হাজার ওজন অণুকে ধ্বংস করতে পারে। এ গ্যাস বৃদ্ধির কারণে ওজন স্তরের অনেক স্থান পাতলা ও কোথাও কোথাও ছিদ্রও হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।

ওজন স্তর ছিদ্র হলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি এবং কসমিক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে প্রথমে ফাইটোপ্লাংটনসহ বিভিন্ন অণুজীব ও উদ্ভিদ জগৎ ও প্রাণিকুলের মারাত্মক ক্ষতি করবে। এতে ক্যান্সার ও বিভিন্ন প্রকার রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে।

সমগ্র বিশ্বে জৈব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানা থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) নির্গমনের কারণে বাতাসে এ গ্যাসের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এসব CO2 সূর্যের বিকিরিত তাপের একটা অংশ আটকে রেখে বৈষ্ণয়িক উষ্ণায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। উদ্ভিদ ও প্রাণী ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এদের সমাবেশই হল জীববৈচিত্র্য।

ভূ-পৃষ্টে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব ও এদের জড় পরিবেশ নিজেদের মধ্যে এবং পরস্পরের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতি হল ইকোসিস্টেম বা পরিবেশতন্ত্র। মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর খাদ্যের প্রধান উৎস বৃক্ষ। বৃক্ষ পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও অণুজীবের আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বিচারে বন নিধন এবং প্রাণী শিকারের কারণে বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ ও পশুপাখি বিলুপ্তির পথে।

অতি সাধারণ প্রাণী, যেমন- শিয়াল, বেজি, খরগোশ, বানর, হনুমান, চিল, শকুন, ডাহুক, বাবুইসহ আরও অনেক পশুপাখি আগের মতো দেখা যায় না।

বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ ফাইটোপ্লাংক্টন, জুওপ্লাংক্টন, শৈবাল, ক্ষুদিপানা, টোপাপানা ইত্যাদি খায় এবং বড় বড় মাছ, কুমির ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ছোট মাছগুলোকে খেয়ে বাঁচে। পানি দূষণ, জলাশয় সমস্যা এবং অবাধে শিকারের কারণে বহু ছোট-বড় নানা জাতের দেশি মাছ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্তির পথে।

মৌমাছিসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ফুল থেকে মধু আহরণকালে পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। অণুজীবগুলো মরা বৃক্ষ ও প্রাণীর কোষের জৈবপদার্থ খেয়ে বাঁচে এবং এসব মাটির সঙ্গে পচিয়ে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখে। বিভিন্ন জীবস্তরের মধ্য দিয়ে খাদ্যশক্তির এ প্রবাহকে খাদ্য শৃঙ্খল বা ফুড চেইন বলে। খাদ্য শৃঙ্খল ইকোসিস্টেমের গতিশীলতা বজায় রাখে।

পরিবেশ রক্ষায় করণীয় কি? এখনও অনেক পথ খোলা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু পৃথিবীবাসীর মিলিত প্রচেষ্টা। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ এবং বৃক্ষ কর্তনের ওপর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। অবাধে পাহাড় কাটা, নদী ভরাট এবং বালু উত্তোলন রোধ ও আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে।

কাঠের ফার্নিচারের বিকল্প হিসেবে লোহা ও স্টিলের তৈরি ফার্নিচার ব্যবহার করতে হবে। খড়ির বিকল্প হিসেবে চারকোল, গ্যাস, কয়লা ও ঘুটের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত চুলায় কম ধোঁয়া নির্গমন ও অল্প খড়ির প্রয়োজন হয়। তাই এ চুলার ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। যানবাহনে সীসামুক্ত জ্বালানি ও সিএনজি ব্যবহার করতে হবে। শিল্পকারখানা এবং ইটভাটার চিমনি অনেক উঁচু করে তৈরি ও ধোঁয়া নির্গমন হ্রাস করতে হবে।

বিষাক্ত বর্জ্য ও ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটজাত ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করতে হবে। দূষণরোধে পলিথিন, প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য রিসাইক্লিনিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে।

বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ডাস্টবিনের ময়লা-আর্বজনা এবং জৈব বর্জ্য দ্বারা বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন করতে হবে। বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির সাহায্যে সুপার ফানশনাল ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন করে বর্জ্য বা আবর্জনাকে দ্রুত পচনশীল করার মাধ্যমে সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধ, বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো মজবুত করে তৈরি করতে হবে যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

লবণাক্ত পানি সহজে নিষ্কাশনের জন্য এক মিটার গভীর করে ড্রেন ও সাব ড্রেন তৈরি করতে হবে। জলাশয় তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যেন এ পানি শুকনো মৌসুমে ফসলের জমিতে ব্যবহার করা যায়। কৃষি গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার ফসলের শীত, তাপ, বন্যা ও লবণসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন এবং বালাইনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পাশাপাশি জৈব কৃষির ওপর অধিক জোর দিতে হবে। নির্বিচারে বন্য ও জলজ প্রাণী শিকার বন্ধ করতে হবে। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পদকে সংরক্ষণের জন্য অভয়ারণ্য, উদ্ভিদ উদ্যান, অভয়াশ্রম, শিকার সংরক্ষিত এলাকা ইত্যাদি সৃষ্টি এবং বন-জঙ্গল, জলাশয়, নদী, সাগর দূষণমুক্ত রাখতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ ঘটানো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শব্দ দূষণরোধে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ ও বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন হওয়া শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এছাড়া হাজারও উপায় রয়েছে যা আমাদের সবুজ পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। এখন শুধু প্রয়োজন পৃথিবীবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আসুন, আমরা মিলেমিশে একটি সজীব সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি, পরবর্তী প্রজন্মকে সুন্দর ভুবন উপহার দেয়ার লক্ষ্যে।

লেখক : সাহিত্যিক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

দূষণের শোষণে রক্তাক্ত ক্ষত

 কানিজ কবির 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
দূষণের শোষণে রক্তাক্ত ক্ষত
অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল। ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। পরিবেশের আনুকূল্যে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন পরস্পরের নির্ভরশীলতায় বিকাশ লাভ করে, সেই পরিবেশ আজ বিপন্নের পথে।

প্রতিটি প্রাণীই তার নিজ নিজ পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকার সামগ্রী গ্রহণ করে। সেসব সামগ্রী থেকে প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের পর পরিত্যক্ত অংশ পরিবেশে ফিরে যায়।

এভাবে জীবজগৎ ও পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকার সামগ্রী গ্রহণ ও বর্জন চলে। এ গ্রহণ বর্জনের ভারসাম্য নষ্টেই পরিবেশ দূষণ হয়। পরিবেশের যে কোনো অস্বাভাবিক বিধ্বংসী পরিবর্তনই পরিবেশ দূষণ হিসেবে পরিগণিত। পরিবেশ দূষণ নতুন কিছু নয়, সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকেই পরিবেশ দূষিত হয়ে আসছে। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিজ্ঞানের আবিষ্কার, পারমাণবিক পরীক্ষা, বিস্ফোরণ এবং মনুষ্য ও প্রকৃতি সৃষ্ট হাজারও কারণে এ পরিবেশ দূষিত হয়। বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণকেই আমরা প্রধান দূষণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকি। বাতাসের ভেতর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অনেক উপাদান রয়েছে। এসব জীবন ধারণের উপযোগী উপাদান হ্রাস পেয়ে বাতাসে ক্ষতিকর উপাদান বেড়ে গেলেই বায়ুদূষণ হয়।

যানবাহন, চুল্লি, কল-কারখানার চিমনি, ইটেরভাটা ইত্যাদি থেকে নির্গত ধোঁয়ার দ্বারা বায়ু প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে। ধুলো, বালি, কীটনাশক, রাসায়নিক বর্জ্য, গ্যাস ইত্যাদি দূষণকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া জীবজন্তুর গলিত দেহ, পচা বর্জ্য, আবর্জনার মতো অন্যান্য উপাদানও বাতাসকে দূষিত করছে। ফলে হৃদরোগ, ফুসফুসের প্রদাহ, হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার, যক্ষ্মা, অঙ্গবিকৃতিসহ নানারকম ব্যাধি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। পানিদূষণ পরিবেশ দূষণে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। সারা পৃথিবীতে শিল্প নগরীগুলো গড়ে উঠেছে নদী বা সমুদ্রকে কেন্দ্র করে।

শিল্পোন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পৌর ও শিল্পের বর্জ্য নদী, হ্রদ বা সাগরে ফেলা হয়। এসব বর্জ্যরে অতি উঁচু মাত্রার বিষপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান দ্বারা জলাধারের পানি দূষিত হয় এবং এর ফলে জলজ প্রাণী মারা যায়। এছাড়া কৃষিতে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। কীটনাশক পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এছাড়া তেলবাহী জাহাজ থেকে তেল নিঃসৃত হয়ে পানি দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও পানি দূষণে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বর্তমান বিশ্বে দূষণের ক্ষেত্রে শব্দ দূষণকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যায় না।

রাস্তাঘাটে উৎকট হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইরেন, নির্মাণ সামগ্রীর শব্দ, মিছিল-শোভাযাত্রায় অস্বাভাবিক কোলাহল, বোমা-পটকার আওয়াজ, মাইকের শব্দ ইত্যাদি আমাদের পরিবেশ দূষণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এ দূষণে নিদ্রাহীনতা, শিরঃপীড়া, বধিরতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার মতো রোগ দেখা দিতে পারে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ার দাবানলকে আমরা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ ধরতে পারি।

অস্ট্রেলিয়ায় গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এবারের দাবানল সম্প্রতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে দাবানল শহরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকায় উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে লাখো মানুষ। অঙ্গরাজ্য দুটিতে এখন পর্যন্ত ২৪ জন মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এ দাবানলে প্রায় ৫০ কোটি প্রাণী মারা গেছে। দাবানল কেন এত মারাত্মক? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার এ ভয়ঙ্কর দাবানল মূলত তীব্র তাপদাহ, অনেকদিন ধরে চলা খরা এবং ঝড়ো বাতাসের কারণে এমন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। দেশটিতে অনেকদিন ধরেই তাপদাহ চলছে। বিগত তিন মাসের উষ্ণতা ভেঙে দিয়েছে ১২০ বছরের রেকর্ড।

পৃথিবীবাসী নিজেদের তৈরি কার্যকলাপে প্রতিনিয়ত পরিবেশকে দূষিত করছে। এতে সবুজ গ্রহ ধূসর মরুতে পরিণত হচ্ছে, প্রাণিজগতের অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে সভ্যতা। ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, কৃষি বিপ্লব সৃষ্টি করছে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া।

এটি মারাত্মক সংকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও ক্লোরোফ্লোরো কার্বন গ্যাস বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা অতিমাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে। এতে আর্কটিক ও এন্টার্কটিকার বরফ গলে জনপদ, দেশ, অঞ্চল ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে, উপরন্তু খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঝড়, ঘূর্ণিবার্তা ভয়াবহ রূপে বেড়ে যাচ্ছে। পৃথিবী থেকে ৭৬ রকমের প্রাণী ও কয়েক হাজার গাছপালা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৩২ রকমের স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৬ প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত ও বিলুপ্তির পথে। সমতলভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, বায়ুতে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।

গ্রিনহাউস ইফেক্টের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ গ্যাসে কার্বন ডাইঅক্সাইড ৫০%, মিথেন ২০%, সিএফসি ১০%, নাইট্রাস অক্সাইড ১০% এবং অবশিষ্ট ১০% কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন পারঅক্সাইড ও কিছু অন্যান্য গ্যাস থাকে। গ্রিনহাউস হল পুরু কাচের প্রাচীর দ্বারা নির্মিত একটি কাচঘর। শীতপ্রধান এবং মরুর দেশে এ কাচের ঘর তৈরি করে কৃত্রিমভাবে তাপ, আলো ও জলীয়বাষ্প নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃষি গবেষণা/ফসল উৎপাদন করা হয়।

ঠিক এ গ্রিনহাউসের কাচের প্রাচীরের মতো পৃথিবীকে ঘিরে বিদ্যমান গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো সূর্যের পতিত তাপ বিকিরণে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধি করে। বায়ুমণ্ডলের তাপ বৃদ্ধির এ প্রক্রিয়াই হল গ্রিনহাউস ইফেক্ট। বিজ্ঞানীদের ধারণা গ্রিনহাউস ইফেক্টের কারণে তাপ বৃদ্ধির ফলে শিগগিরই মেরু অঞ্চল ও পর্বতশ্রেণীর বরফ গলে সাগরের পানির উচ্চতা ১ থেকে ২ মিটার বৃদ্ধি পাবে।

এর ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ দ্বীপ সমুদ্রের লোনা পানির নিচে ডুবে যাবে এবং কোটি কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে ও প্রকট খাদ্য সংকট দেখা দেবে। রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, পলিথিন, প্লাস্টিক ও রঙ তৈরির কারখানা থেকে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (সিএফসি) গ্যাস নির্গত হয়। এ গ্যাস বায়ুমণ্ডলের ওজন স্তরকে ধ্বংস করে। এক অণু সিএফসি প্রায় দুই হাজার ওজন অণুকে ধ্বংস করতে পারে। এ গ্যাস বৃদ্ধির কারণে ওজন স্তরের অনেক স্থান পাতলা ও কোথাও কোথাও ছিদ্রও হয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।

ওজন স্তর ছিদ্র হলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি এবং কসমিক রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে প্রথমে ফাইটোপ্লাংটনসহ বিভিন্ন অণুজীব ও উদ্ভিদ জগৎ ও প্রাণিকুলের মারাত্মক ক্ষতি করবে। এতে ক্যান্সার ও বিভিন্ন প্রকার রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে।

সমগ্র বিশ্বে জৈব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্পকারখানা থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) নির্গমনের কারণে বাতাসে এ গ্যাসের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এসব CO2 সূর্যের বিকিরিত তাপের একটা অংশ আটকে রেখে বৈষ্ণয়িক উষ্ণায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে। উদ্ভিদ ও প্রাণী ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং এদের সমাবেশই হল জীববৈচিত্র্য।

ভূ-পৃষ্টে উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব ও এদের জড় পরিবেশ নিজেদের মধ্যে এবং পরস্পরের মধ্যে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গতিময় পদ্ধতি হল ইকোসিস্টেম বা পরিবেশতন্ত্র। মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর খাদ্যের প্রধান উৎস বৃক্ষ। বৃক্ষ পশুপাখি, কীটপতঙ্গ ও অণুজীবের আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নির্বিচারে বন নিধন এবং প্রাণী শিকারের কারণে বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ ও পশুপাখি বিলুপ্তির পথে।

অতি সাধারণ প্রাণী, যেমন- শিয়াল, বেজি, খরগোশ, বানর, হনুমান, চিল, শকুন, ডাহুক, বাবুইসহ আরও অনেক পশুপাখি আগের মতো দেখা যায় না।

বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ ফাইটোপ্লাংক্টন, জুওপ্লাংক্টন, শৈবাল, ক্ষুদিপানা, টোপাপানা ইত্যাদি খায় এবং বড় বড় মাছ, কুমির ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ছোট মাছগুলোকে খেয়ে বাঁচে। পানি দূষণ, জলাশয় সমস্যা এবং অবাধে শিকারের কারণে বহু ছোট-বড় নানা জাতের দেশি মাছ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্তির পথে।

মৌমাছিসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গ ফুল থেকে মধু আহরণকালে পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। অণুজীবগুলো মরা বৃক্ষ ও প্রাণীর কোষের জৈবপদার্থ খেয়ে বাঁচে এবং এসব মাটির সঙ্গে পচিয়ে পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখে। বিভিন্ন জীবস্তরের মধ্য দিয়ে খাদ্যশক্তির এ প্রবাহকে খাদ্য শৃঙ্খল বা ফুড চেইন বলে। খাদ্য শৃঙ্খল ইকোসিস্টেমের গতিশীলতা বজায় রাখে।

পরিবেশ রক্ষায় করণীয় কি? এখনও অনেক পথ খোলা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু পৃথিবীবাসীর মিলিত প্রচেষ্টা। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ এবং বৃক্ষ কর্তনের ওপর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করতে হবে। অবাধে পাহাড় কাটা, নদী ভরাট এবং বালু উত্তোলন রোধ ও আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন করতে হবে।

কাঠের ফার্নিচারের বিকল্প হিসেবে লোহা ও স্টিলের তৈরি ফার্নিচার ব্যবহার করতে হবে। খড়ির বিকল্প হিসেবে চারকোল, গ্যাস, কয়লা ও ঘুটের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত চুলায় কম ধোঁয়া নির্গমন ও অল্প খড়ির প্রয়োজন হয়। তাই এ চুলার ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। যানবাহনে সীসামুক্ত জ্বালানি ও সিএনজি ব্যবহার করতে হবে। শিল্পকারখানা এবং ইটভাটার চিমনি অনেক উঁচু করে তৈরি ও ধোঁয়া নির্গমন হ্রাস করতে হবে।

বিষাক্ত বর্জ্য ও ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পাটজাত ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহার করতে হবে। দূষণরোধে পলিথিন, প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য রিসাইক্লিনিংয়ের মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে।

বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ডাস্টবিনের ময়লা-আর্বজনা এবং জৈব বর্জ্য দ্বারা বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন করতে হবে। বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির সাহায্যে সুপার ফানশনাল ব্যাকটেরিয়া উৎপাদন করে বর্জ্য বা আবর্জনাকে দ্রুত পচনশীল করার মাধ্যমে সার্বিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাঁধ, বেড়িবাঁধ, স্লুইস গেট এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো মজবুত করে তৈরি করতে হবে যেন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

লবণাক্ত পানি সহজে নিষ্কাশনের জন্য এক মিটার গভীর করে ড্রেন ও সাব ড্রেন তৈরি করতে হবে। জলাশয় তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে যেন এ পানি শুকনো মৌসুমে ফসলের জমিতে ব্যবহার করা যায়। কৃষি গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার ফসলের শীত, তাপ, বন্যা ও লবণসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন এবং বালাইনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পাশাপাশি জৈব কৃষির ওপর অধিক জোর দিতে হবে। নির্বিচারে বন্য ও জলজ প্রাণী শিকার বন্ধ করতে হবে। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও প্রাণী সম্পদকে সংরক্ষণের জন্য অভয়ারণ্য, উদ্ভিদ উদ্যান, অভয়াশ্রম, শিকার সংরক্ষিত এলাকা ইত্যাদি সৃষ্টি এবং বন-জঙ্গল, জলাশয়, নদী, সাগর দূষণমুক্ত রাখতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ও বিস্ফোরণ ঘটানো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শব্দ দূষণরোধে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ ও বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন হওয়া শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এছাড়া হাজারও উপায় রয়েছে যা আমাদের সবুজ পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। এখন শুধু প্রয়োজন পৃথিবীবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আসুন, আমরা মিলেমিশে একটি সজীব সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি, পরবর্তী প্রজন্মকে সুন্দর ভুবন উপহার দেয়ার লক্ষ্যে।

লেখক : সাহিত্যিক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

 

ঘটনাপ্রবাহ : ২১ বছরে যুগান্তর