বঙ্গোপসাগরের সুরক্ষায় অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
jugantor
বঙ্গোপসাগরের সুরক্ষায় অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

  মো. কুতুব উদ্দিন ও ড. কাজী আহসান হাবীব  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগরসহ সব জলাঞ্চলেই পাবলিকের হক আছে; জলজ প্রাণ ও প্রকৃতির থেকে উপকার পাওয়ার হক। জলজ প্রাণ ও প্রকৃতির হেফাজতের জন্য যদি আমরা পাবলিকের অংশগ্রহণ দেখতে চাই, তবে সাগরে পাবলিকের এ হকের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

লোকসমাজের এ প্রতিবেশগত অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দুনিয়ায় নানা পরীক্ষিত ও কার্যকর বলে প্রমাণিত উপায়-বুদ্ধি আছে। কিন্তু, আর সব দেশে সাফল্য পেয়েছে, প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় তেমন সব উপায়-বুদ্ধি যে বঙ্গোপসাগরেও হুবহু কাজে লাগবে, তেমনটাও নয়।

তবে, এ ব্যাপারে একটি কথা দেশকালপাত্র নির্বিশেষে প্রযোজ্য; সেটা হচ্ছে লোকসমাজের প্রতি যদি ইনসাফ করা না হয় প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষার ক্ষেত্রে, তবে সেই ‘পরিবেশবাদ’ আসলে তেমন কাজে আসে না, কাজীর গরু হিসেবেই রয়ে যায়।

সাগরে সব প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষার জন্য, টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রাখার জন্য বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এটা বিবেচনায় রাখতে হবে যে, পাবলিকের অংশগ্রহণ লাগবে এবং সেই অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে যার যার পাওনা প্রতিবেশগত-হক বুঝিয়ে দিতে হবে।

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা দুনিয়ার আর সব জায়গার মতো নয়, ফলে এখানে নিজেদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার থেকেই বড় শিক্ষাটা নিতে হবে বাংলাদেশের লোকদের।

এ চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, লোকসমাজের যেই অংশ বঙ্গোপসাগরের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল- যারা বঙ্গোপসাগর থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উপকার তুলে আনছে জাতীয় অর্থনীতিতে, সাগরে আইনত তাদের হকই সবচেয়ে কম সুরক্ষিত। সমাজের এ অংশটি হচ্ছেন, বাংলাদেশের সাগরে বংশ পরম্পরার জেলেরা; যারা মুনাফা-ব্যবসা করার জন্য নয় বরং নিজেদের সংসার চালানোর জন্য মাছ ধরে আসছেন।

মাছ-সম্পদের তদারকি করার জন্য প্রধান পাবলিক-এজেন্সিটিও এটা এক প্রকারে স্বীকার করেন, যে এসব ‘আর্টিস্যানাল’ (Artisanal) বা ‘খোরাকি’ জেলেদের জন্য সাগরে যথাযথ অভিগম্যতা নিশ্চিত করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

মৎস্য অধিদফতরের নিজস্ব পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে, সাগর থেকে ধরা মাছের প্রায় কমবেশি পঁচাশি শতাংশই ধরেন এই খোরাকি জেলেরা। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা সুচিন্তিত ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে সাগরে এ মাছ ধরার সব অর্থনৈতিক আয়োজনের মালিকানার প্রায় পুরোটাই এখন এই খোরাকি জেলেদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

মাছধরার নৌকার আকার বড় হওয়া, অধিকতর শক্তিশালী ইঞ্জিন, আরও বিরাট সব জাল ব্যবহার করার কারিগরি সামর্থ্য যখন গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঘটেছিল; তখন মাছধরা-ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো খোরাকি জেলেদের স্বার্থ রক্ষায় দরকারি মনোযোগ দেয়নি।

এতে নানা বিপদ ঘটেছে জেলেদের, অর্থনীতির, প্রাণ-প্রকৃতির। একটা বিপদ হল খোরাকির জেলেরা একক বা সমবায়ী মালিকের থেকে এখন বাণিজ্যিক নৌকায় কর্মরত শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন; এই যদিও বলছি ‘কর্মরত’, আসলে এরা যেমন নামমাত্র মজুরিতে কোনো ধরনের নিয়োগ বা পেশাগত সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে তাতে করে এটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভালো ‘কর্মসংস্থান’ আর বলা চলে না। দ্বিতীয়ত, এ খাতে যখন হাজার হাজার নতুন ফটকা টাকার মালিকরা মহাজন বনে গেছেন, তাদের যেহেতু এ ব্যবসায়ে থিতু হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই, ফলে তারা খাতটির উন্নয়নে কোনো বিনিয়োগই করছেন না, কোনো ‘ভ্যালু অ্যাড’ করা বা খাত-উন্নয়নমূলক বা টেকসইমূলক কোনো গবেষণায়ও তারা নেই; কাজেই সাগরে প্রাপ্ত কাঁচামালের (মাছ) যথাযথ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, বংশ পরম্পরায় জেলে-মাঝিগিরি করে আসা এ জেলেরা যখন আরও দূর সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন, তখন এরা যাচ্ছেন শোষণের শিকার শ্রমিক হিসেবে, মাছ-ব্যবসার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, ফলে সাগরের প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় তারা তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের ব্যবহারও করতে পারছেন না, যার পরিণতিতে মাছ ধরার ব্যবসাগুলোর খারাপ সব মাছধরা প্র্যাকটিসের কারণে জাতীয় অর্থনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ খাতটির ধসেপড়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।

সবমিলিয়ে সাগরে মাছ ধরা খাতে ভালো-কর্মসংস্থান হচ্ছে না লাখ লাখ লোকের। একটা সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত কার্যত স্থবির হয়ে আছে এবং প্রাণ-প্রকৃতির হেফাজতের অভাবের কারণে এ খাতটি ধসে পড়ার অপেক্ষায় আছে। আমরা মনে করি, খোরাকি (আর্টিস্যানাল) জেলেদের জন্য সাগরে অভিগম্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ অবস্থার থেকে উত্তরণের একটি রাস্তা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে আইনত, আর্থিক, কারিগরিসহ নানা কারণে সাগরে যথাযথ অভিগম্য নেই খোরাকি জেলেদের। এ নিবন্ধে শুধু উপকূলীয় সাগরে নিয়োজিত এই আর্টিস্যানাল জেলেদের প্রসঙ্গেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি; পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত যেই জেলেরা একত্রে ক্ষুদ্র-উদ্যোগের ভিত্তিতে মাছ ধরেন।

সাগরে আর্টিস্যানাল ফিশিং নানা কারণেই টেকসই উন্নয়ন ও মৎস্যসম্পদের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে একটা কারণ হচ্ছে; এ ধরনের ফিশারিতে জড়িতরা সরাসরি তাদের পুষ্টি চাহিদা মেটানো ও আয়-রোজগার বাড়িয়ে জীবনমান উন্নত করার জন্যই ফিশিং করেন এবং দ্বিতীয়ত, স্বল্পমাত্রার কারিগরি সামর্থ্যরে কারণে এ ফিশারি প্রতিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে কম এবং মৎস্যসম্পদের মজুদ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে রাখতে সাহায্য করে।

দেশে বিগত দুই দশকে ফি-বছর সাগরে মোট ধরা মাছের অল্প অংশই এসেছে বড় আকারের ব্যবসায়ভিত্তিক (ইন্ডাস্ট্রিয়াল) ফিশারি থেকে। কখনও কখনও দেখা গেছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো নয় বা পাঁচ শতাংশ মাছ ধরছে মাত্র। নানা বছরে ওঠানামার মধ্যে পঁচাশি থেকে পঁচানব্বই শতাংশই এসেছে নন-ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশারি থেকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাগরে ধরা মাছের মধ্যে ১৭ শতাংশ এসেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং থেকে।

বাদবাকি মাছ এসেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিংয়ের বাইরের থেকে, নানা ধরনের ফাঁকা জালের নৌকা থেকে, মোটাদাগে বাংলাদেশে যেটা ‘আর্টিস্যানাল’ ফিশারি।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সামুদ্রিক ও আরও বিশেষত উপকূলবর্তী সামুদ্রিক প্রাণসম্পদের ওপর জীবিকা-নির্ভরশীলতা থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হয়। ফলে উপকূলে আর্টিস্যানাল নৌকাগুলো একেকটি খুব কম পরিমাণে মাছ ধরলেও দেখা যায় তুলনামূলক বেশি পরিমাণ মাছ এ জেলেরাই ধরেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিংয়ের তুলনায়।

‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ ফিশারি বললে সহজে আমরা বুঝতে পারি, চল্লিশ মিটারের বেশি গভীরতায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন- ইইজেড) মাছ ধরার অনুমতি দেয়া আছে যেই আড়াইশ’ ট্রলারকে, ওই ট্রলিং থেকে মাছটা আসছে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের মাছ ধরার যেই সংগঠন, বিনিয়োগ এবং কারিগরি সামর্থ্য, সেসব প্রায় কাছাকাছি রকমের।

বিরাট ব্যবসায়িক সংগঠন, প্রচুর বিনিয়োগ, মুনাফাই প্রধান উদ্দেশ্য এবং তুলনামূলক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কারিগরি সামর্থ্য কাজে লাগিয়েই ট্রল নেটে মাছ ধরা হয়।

বিপরীত দিকে, যেই ফিশারিকে মোটা দাগে আর্টিস্যানাল ফিশারি বলা হয় তার মধ্যে সংগঠনের প্রকৃতি, বিনিয়োগের মাত্রা ও কারিগরি সামর্থ্যরে বেশ রকমফের রয়েছে। পাবলিকের জলাঞ্চলে ‘আর্টিস্যানাল’ জেলেদের আরও কী ধরন ও মাত্রার অভিগম্যতার অধিকার দরকার, কীভাবে সেটা দেয়া যায়- এসব আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে আগেভাগে এ রকমফেরের অনুসন্ধান দরকার।

এ অনুসন্ধান ও শনাক্তকরণ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে এ কারণে, সামুদ্রিক সম্পদে আর্টিস্যানাল জেলেদের অভিগম্যতা বাড়ান এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর চতুর্দশ লক্ষ্যটি; টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর ও সাগরসমূহ এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে সামুদ্রিক সম্পদ ও বাজারে আর্টিস্যানাল ক্ষুদ্র জেলেদের অভিগম্যতার ব্যবস্থা করা।

এ লক্ষ্যমাত্রা কদ্দুর অর্জন করা গেল তার নির্দেশক হচ্ছে, সামুদ্রিক সম্পদে ক্ষুদ্র-উদ্যোগভিত্তিক ফিশারিজের অভিগম্যতার অধিকারের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেয় এমন আইনত/বিধিমূলক/নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো রূপরেখা কোনো একটি দেশ কী মাত্রায় বাস্তবায়ন করছে।

জাতিসংঘ কৃষি ও খাদ্য সংস্থার মতে, আর্টিস্যানাল ফিশারি হচ্ছে প্রধানত স্থানীয় ভোগের জন্য তুলনামূলক কম পরিমাণ মূলধন ও জ্বালানি, অপেক্ষাকৃত ছোট জলযানে (যদি আদতে জলযান ব্যবহার করে) উপকূলের কাছাকাছি থেকে অল্পমেয়াদের খ্যাপ মেরে মাছ ধরা জেলে পরিবারগুলোর (যা ব্যবসায়িক সংস্থার থেকে ঠিক উল্টো ব্যাপার) ঐতিহ্যগত ফিশারি।

এ ফিশারি কখনও কখনও ব্যবসায়িক ভিত্তিতেও পরিচালিত হতে পারে, তবে অবশ্যই ক্ষুদ্র ব্যবসা আকারে। আবার পুরোপুরিই নিজেদের খাবার মাছ জোগানোর জন্যই হতে পারে। মাছ আহরণের উদ্দেশ্য স্থানীয় ভোগ বা রফতানি দুটোই হতে পারে। মাছ ধরার জলযানের মালিক জেলেরা হতেও পারেন, নাও হতে পারেন।

এসব রকমফের থাকলেও এসব ধরনের সংগঠন ও বৈশিষ্ট্যই আর্টিস্যানাল ফিশারির অংশ বলে গণ্য হবে। কিন্তু একটা ব্যাপারে রকমফের চলছে না, সেটা হচ্ছে এতে জেলেদের নিযুক্তির বৈশিষ্ট্য হবে হয় আত্ম-কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে কিংবা পারিবারিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে।

বিভিন্ন দেশে এ সংজ্ঞার একটু এদিক-ওদিক হলেও, পারিবারিক সম্পৃক্তি ও মুনাফা অপ্রধান থাকা চাই। মৎস্য অধিদফতরের উল্লিখিত সংজ্ঞায়ও বলা হয়েছে, এ ধরনের ফিশিং মাত্রই জেলে পরিবারের পারিবারিক উদ্যোগে করা হয়।

বাংলাদেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক ক্যাপচার ফিশারিজে নিয়োজিত জলযানের সংখ্যা ৬৭৬৬৯টি। প্রায় আড়াইশ’ ট্রলার ছাড়া বাকি সব ইঞ্জিনচালিত ও ইঞ্জিনবিহীন মাছ ধরা জলযানকেই এ হিসেবে গোনা হয়।

এদের মধ্যে ঠিক কী পরিমাণ জলযান ও কী সংখ্যক জেলে প্রকৃত অর্থে আর্টিস্যানাল ফিশিংয়ে জড়িত তা নিরূপণ করা এখনও বাকি আছে। তবে এ সংখ্যাধিক্যকে বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদের মজুতের প্রসঙ্গে ‘ট্রাজেডি অব কমন্সের’ মতো একটা বর্ণবাদী উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই কোনো প্রামাণ্য তথ্য ছাড়াই উল্লেখ করা হয়।

বিপরীতে তুলনামূলক আহরিত মৎস্যসম্পদের শতাংশ অনেক কম হলেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিংয়ে, হোক সেটা বটম বা মিডওয়াটার ট্রলিং, তাতে যে বঙ্গোপসাগরের মতো উপকূলীয় সাগরে মাছের বসতি স্থায়ীভাবে নষ্ট ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ার সূত্র ধরে মৎস্যের মজুত কমে বলে প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে, সেই বিষয়ে বাংলাদেশে সাধারণত তেমন মনোযোগ নেই।

যার ফলে ঐতিহ্যগত জেলে পরিবারভিত্তিক মাছ ধরার ক্ষুদ্র-উদ্যোগগুলোকে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, প্রাণসম্পদ সুরক্ষা ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার কাজে লাগানোর যেই সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগছে না। এ তুলনামূলক প্রাণ ও প্রতিবেশবান্ধব ফিশারিতে সম্পৃক্ত লোকেদের বিকল্প জীবিকার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয় প্রায়ই নানা দেশি-বিদেশি এনজিওর তরফে, যা অনেক ক্ষেত্রেই টেকসই উন্নয়ন ও প্রাণ-প্রতিবেশের সুরক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তবে ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, দেশে সাবেকি আর্টিস্যানাল ফিশারিজে সংগঠন, জেলেদের সম্পৃক্ততার বৈশিষ্ট্য, বিনিয়োগের পরিমাণ, জ্বালানি খরচ, ও কারিগরি সামর্থ্যরে ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন এসেছে যে এর কতটা অংশকে এখন নেহাতই আর্টিস্যানাল ফিশারির অংশ বললে যথাযথ হবে তা খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে।

অন্তত ষাটের দশক পর্যন্ত উপকূলীয় জলাঞ্চলে প্রধানত সনাতন ধর্মাবলম্বী জলদাসরাই পারিবারিকভাবে মাছ ধরার পেশায় ছিলেন। যারা পরিবারের পুষ্টি ও ভরণপোষণের জন্য মাছ ধরতেন, শতভাগ আর্টিস্যানাল ফিশারি যাকে বলা যায়। সত্তরের দশক থেকেই এক্ষেত্রে পরির্বতন আসতে শুরু করে এ ফিশারির কারিগরি সামর্থ্য বাড়ানোর মাধ্যমে।

এবং বেশি মাত্রায় বিনিয়োগ হতে থাকার ফলে এ ফিশারির সংগঠন, সম্পৃক্ততার ধরন ও মূল উদ্দেশ্য পাল্টাতে শুরু করে। নিজেরা খাওয়া ও স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে জেলে পরিবারের ক্ষুদ্র উদ্যোগের বদলে এর একটা অংশ পরিবর্তিত রূপ পায় পুরোপুরি মুনাফার উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়িক সংস্থার ফিশারি হিসেবে; যেখানে জেলেদের একটা বড় অংশ স্রেফ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন।

এ ধারা সত্তরের দশকেই থেমে থাকেনি। এ নিবন্ধের লেখকদের বিগত কয়েক বছর ধরে তৃণমূল পর্যায়ে পর্যবেক্ষণের থেকে বলা যায় সাগরে আর্টিস্যানাল ফিশারির বলে পরিচিত উদ্যোগগুলোর একটা বিরাট অংশ এখন এ প্রকারের ফিশিংয়ের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো আর ধারণ করে না।

ঐতিহ্যগত জেলে পরিবারের বাইরে থেকে আসা লোকেরা এবং অনেক ক্ষেত্রে মহাজন বা আড়তদারদের মতো সাপ্লাই চেইনের অন্যান্য অংশের লোকেরাও অন্তত একটি বা কয়েকটি ইঞ্জিনঅলা নৌকার মালিক হয়ে বাইরে থেকেই যে কোনো অদক্ষ শ্রমিককে জেলে হিসেবে নিয়োগ করে (প্রায়ই তারা জেলে পরিবারের সদস্যদেরও নিযুক্ত করেন) সম্পূর্ণ মুনাফার উদ্দেশ্যে মাছ ধরার ব্যবসায়ে নামেন।

এখন যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদে আর্টিস্যানাল জেলেদের অভিগম্যতা বাড়াতে কর্মপরিকল্পনা রয়েছে সরকারে, তখন এ চিকন তফাৎগুলো বিবেচনায় নিয়ে অগ্রসর হওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি। এ যাচাই-বাছাই নিঃসন্দেহে খুব সহজ হবে না। কারণ প্রকৃত আর্টিস্যানাল ও পুরোপুরি কমার্শিয়াল বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশারির তফাৎ প্রায়ই খুব পলকা ও অস্পষ্ট হয়।

এরপরেও দুটো সহজ পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে তফাৎ করা সম্ভব। প্রথমত, জেলে-জনশক্তির বিপরীতে প্রযুক্তিগত সামর্থ্য ও বিনিয়োগ যাচাই। নৌকার আকার যত বড়ই হোক না কেন বা একটি নৌকায় যত বেশি সংখ্যক জেলেই থাকুক না কেন যদি জ্বালানি-জাল-ইঞ্জিন ইত্যাদি সীমিত হয় এবং জেলেপ্রতি আর্থিক বিনিয়োগ কম হয় তবে তাকে আর্টিস্যানাল বলা যেতে পারে।

উল্টো দিকে নৌকা যত ছোট হোক না কেন বা জেলে যত কম হোক না কেন, যদি ওই নৌকাপ্রতি মাছ ধরার সামর্থ্য অনেক বেশি হয় তবে তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশারি বলে গণ্য।

দ্বিতীয় সহজ পদ্ধতিটি হল, মৎস্য আহরণের উদ্দেশ্য বিচার করা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিংয়ে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যে কোনো প্রকারে বেশি মাছ ধরে মুনাফা কামানো, যার ফলে মৎস্য-মজুত নষ্টসহ সার্বিক প্রতিবেশগত ঝুঁকি থাকে। বিপরীতে আর্টিস্যানাল ফিশারির উদ্দেশ্য হল খোরাকি করা; পরিবারের ভরণ-পোষণ; সেটা হতে পারে আহরিত মৎস্যেও মাধ্যমে সরাসরি পুষ্টি জোগান কিংবা বাজারে বিক্রি করে জীবিকার্জনের মাধ্যমে।

এ ধরনের ফিশিং প্রতিবেশবান্ধব হয় এবং মৎস্য-মজুতকে ঝুঁকিতে ফেলে না। এসব নির্দেশক ব্যবহার করে দেশে উপকূলীয় সামুদ্রিক খাতে প্রকৃত আর্টিস্যানাল ফিশারির আকার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

যার ধারাবাহিকতায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিং লাইসেন্স দেয়ার মতো করে পৃথক আর্টিস্যানাল ফিশিং লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে ঐতিহ্যগত জেলে পরিবারগুলোকে। এবং বঙ্গোপসাগরে উপকূলীয় জলা ল বা নিয়ারশোর ওয়াটার শুধু আর্টিস্যানাল ফিশিং লাইসেন্সধারীদের জন্যই বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন যাচাই করে সামুদ্রিক সম্পদ ও বাজারে এ জেলেদের অভিগম্যতা বাড়ানোর আরও উপায় খুঁজতে হবে।

মো. কুতুব উদ্দিন : পরিচালক, মেরিন এক্সটেনসন সার্ভিস, এএমআর সলুসনস, ড. কাজী আহসান হাবীব : ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বঙ্গোপসাগরের সুরক্ষায় অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

 মো. কুতুব উদ্দিন ও ড. কাজী আহসান হাবীব 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গোপসাগরসহ সব জলাঞ্চলেই পাবলিকের হক আছে; জলজ প্রাণ ও প্রকৃতির থেকে উপকার পাওয়ার হক। জলজ প্রাণ ও প্রকৃতির হেফাজতের জন্য যদি আমরা পাবলিকের অংশগ্রহণ দেখতে চাই, তবে সাগরে পাবলিকের এ হকের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

লোকসমাজের এ প্রতিবেশগত অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দুনিয়ায় নানা পরীক্ষিত ও কার্যকর বলে প্রমাণিত উপায়-বুদ্ধি আছে। কিন্তু, আর সব দেশে সাফল্য পেয়েছে, প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় তেমন সব উপায়-বুদ্ধি যে বঙ্গোপসাগরেও হুবহু কাজে লাগবে, তেমনটাও নয়।

তবে, এ ব্যাপারে একটি কথা দেশকালপাত্র নির্বিশেষে প্রযোজ্য; সেটা হচ্ছে লোকসমাজের প্রতি যদি ইনসাফ করা না হয় প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষার ক্ষেত্রে, তবে সেই ‘পরিবেশবাদ’ আসলে তেমন কাজে আসে না, কাজীর গরু হিসেবেই রয়ে যায়।

সাগরে সব প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষার জন্য, টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রাখার জন্য বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এটা বিবেচনায় রাখতে হবে যে, পাবলিকের অংশগ্রহণ লাগবে এবং সেই অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে যার যার পাওনা প্রতিবেশগত-হক বুঝিয়ে দিতে হবে।

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে যা দুনিয়ার আর সব জায়গার মতো নয়, ফলে এখানে নিজেদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার থেকেই বড় শিক্ষাটা নিতে হবে বাংলাদেশের লোকদের।

এ চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, লোকসমাজের যেই অংশ বঙ্গোপসাগরের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল- যারা বঙ্গোপসাগর থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক উপকার তুলে আনছে জাতীয় অর্থনীতিতে, সাগরে আইনত তাদের হকই সবচেয়ে কম সুরক্ষিত। সমাজের এ অংশটি হচ্ছেন, বাংলাদেশের সাগরে বংশ পরম্পরার জেলেরা; যারা মুনাফা-ব্যবসা করার জন্য নয় বরং নিজেদের সংসার চালানোর জন্য মাছ ধরে আসছেন।

মাছ-সম্পদের তদারকি করার জন্য প্রধান পাবলিক-এজেন্সিটিও এটা এক প্রকারে স্বীকার করেন, যে এসব ‘আর্টিস্যানাল’ (Artisanal) বা ‘খোরাকি’ জেলেদের জন্য সাগরে যথাযথ অভিগম্যতা নিশ্চিত করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

মৎস্য অধিদফতরের নিজস্ব পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে, সাগর থেকে ধরা মাছের প্রায় কমবেশি পঁচাশি শতাংশই ধরেন এই খোরাকি জেলেরা। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা সুচিন্তিত ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে সাগরে এ মাছ ধরার সব অর্থনৈতিক আয়োজনের মালিকানার প্রায় পুরোটাই এখন এই খোরাকি জেলেদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।

মাছধরার নৌকার আকার বড় হওয়া, অধিকতর শক্তিশালী ইঞ্জিন, আরও বিরাট সব জাল ব্যবহার করার কারিগরি সামর্থ্য যখন গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঘটেছিল; তখন মাছধরা-ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো খোরাকি জেলেদের স্বার্থ রক্ষায় দরকারি মনোযোগ দেয়নি।

এতে নানা বিপদ ঘটেছে জেলেদের, অর্থনীতির, প্রাণ-প্রকৃতির। একটা বিপদ হল খোরাকির জেলেরা একক বা সমবায়ী মালিকের থেকে এখন বাণিজ্যিক নৌকায় কর্মরত শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন; এই যদিও বলছি ‘কর্মরত’, আসলে এরা যেমন নামমাত্র মজুরিতে কোনো ধরনের নিয়োগ বা পেশাগত সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে তাতে করে এটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভালো ‘কর্মসংস্থান’ আর বলা চলে না। দ্বিতীয়ত, এ খাতে যখন হাজার হাজার নতুন ফটকা টাকার মালিকরা মহাজন বনে গেছেন, তাদের যেহেতু এ ব্যবসায়ে থিতু হওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই, ফলে তারা খাতটির উন্নয়নে কোনো বিনিয়োগই করছেন না, কোনো ‘ভ্যালু অ্যাড’ করা বা খাত-উন্নয়নমূলক বা টেকসইমূলক কোনো গবেষণায়ও তারা নেই; কাজেই সাগরে প্রাপ্ত কাঁচামালের (মাছ) যথাযথ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তৃতীয়ত, বংশ পরম্পরায় জেলে-মাঝিগিরি করে আসা এ জেলেরা যখন আরও দূর সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন, তখন এরা যাচ্ছেন শোষণের শিকার শ্রমিক হিসেবে, মাছ-ব্যবসার ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, ফলে সাগরের প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় তারা তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের ব্যবহারও করতে পারছেন না, যার পরিণতিতে মাছ ধরার ব্যবসাগুলোর খারাপ সব মাছধরা প্র্যাকটিসের কারণে জাতীয় অর্থনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ খাতটির ধসেপড়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।

সবমিলিয়ে সাগরে মাছ ধরা খাতে ভালো-কর্মসংস্থান হচ্ছে না লাখ লাখ লোকের। একটা সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত কার্যত স্থবির হয়ে আছে এবং প্রাণ-প্রকৃতির হেফাজতের অভাবের কারণে এ খাতটি ধসে পড়ার অপেক্ষায় আছে। আমরা মনে করি, খোরাকি (আর্টিস্যানাল) জেলেদের জন্য সাগরে অভিগম্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ অবস্থার থেকে উত্তরণের একটি রাস্তা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে আইনত, আর্থিক, কারিগরিসহ নানা কারণে সাগরে যথাযথ অভিগম্য নেই খোরাকি জেলেদের। এ নিবন্ধে শুধু উপকূলীয় সাগরে নিয়োজিত এই আর্টিস্যানাল জেলেদের প্রসঙ্গেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি; পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত যেই জেলেরা একত্রে ক্ষুদ্র-উদ্যোগের ভিত্তিতে মাছ ধরেন।

সাগরে আর্টিস্যানাল ফিশিং নানা কারণেই টেকসই উন্নয়ন ও মৎস্যসম্পদের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে একটা কারণ হচ্ছে; এ ধরনের ফিশারিতে জড়িতরা সরাসরি তাদের পুষ্টি চাহিদা মেটানো ও আয়-রোজগার বাড়িয়ে জীবনমান উন্নত করার জন্যই ফিশিং করেন এবং দ্বিতীয়ত, স্বল্পমাত্রার কারিগরি সামর্থ্যরে কারণে এ ফিশারি প্রতিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে কম এবং মৎস্যসম্পদের মজুদ কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে রাখতে সাহায্য করে।

দেশে বিগত দুই দশকে ফি-বছর সাগরে মোট ধরা মাছের অল্প অংশই এসেছে বড় আকারের ব্যবসায়ভিত্তিক (ইন্ডাস্ট্রিয়াল) ফিশারি থেকে। কখনও কখনও দেখা গেছে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলো নয় বা পাঁচ শতাংশ মাছ ধরছে মাত্র। নানা বছরে ওঠানামার মধ্যে পঁচাশি থেকে পঁচানব্বই শতাংশই এসেছে নন-ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশারি থেকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাগরে ধরা মাছের মধ্যে ১৭ শতাংশ এসেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং থেকে।

বাদবাকি মাছ এসেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিংয়ের বাইরের থেকে, নানা ধরনের ফাঁকা জালের নৌকা থেকে, মোটাদাগে বাংলাদেশে যেটা ‘আর্টিস্যানাল’ ফিশারি।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সামুদ্রিক ও আরও বিশেষত উপকূলবর্তী সামুদ্রিক প্রাণসম্পদের ওপর জীবিকা-নির্ভরশীলতা থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হয়। ফলে উপকূলে আর্টিস্যানাল নৌকাগুলো একেকটি খুব কম পরিমাণে মাছ ধরলেও দেখা যায় তুলনামূলক বেশি পরিমাণ মাছ এ জেলেরাই ধরেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিংয়ের তুলনায়।

‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ ফিশারি বললে সহজে আমরা বুঝতে পারি, চল্লিশ মিটারের বেশি গভীরতায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন- ইইজেড) মাছ ধরার অনুমতি দেয়া আছে যেই আড়াইশ’ ট্রলারকে, ওই ট্রলিং থেকে মাছটা আসছে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের মাছ ধরার যেই সংগঠন, বিনিয়োগ এবং কারিগরি সামর্থ্য, সেসব প্রায় কাছাকাছি রকমের।

বিরাট ব্যবসায়িক সংগঠন, প্রচুর বিনিয়োগ, মুনাফাই প্রধান উদ্দেশ্য এবং তুলনামূলক উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কারিগরি সামর্থ্য কাজে লাগিয়েই ট্রল নেটে মাছ ধরা হয়।

বিপরীত দিকে, যেই ফিশারিকে মোটা দাগে আর্টিস্যানাল ফিশারি বলা হয় তার মধ্যে সংগঠনের প্রকৃতি, বিনিয়োগের মাত্রা ও কারিগরি সামর্থ্যরে বেশ রকমফের রয়েছে। পাবলিকের জলাঞ্চলে ‘আর্টিস্যানাল’ জেলেদের আরও কী ধরন ও মাত্রার অভিগম্যতার অধিকার দরকার, কীভাবে সেটা দেয়া যায়- এসব আলোচনার প্রস্তুতি হিসেবে আগেভাগে এ রকমফেরের অনুসন্ধান দরকার।

এ অনুসন্ধান ও শনাক্তকরণ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে এ কারণে, সামুদ্রিক সম্পদে আর্টিস্যানাল জেলেদের অভিগম্যতা বাড়ান এখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর চতুর্দশ লক্ষ্যটি; টেকসই উন্নয়নের জন্য মহাসাগর ও সাগরসমূহ এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে সামুদ্রিক সম্পদ ও বাজারে আর্টিস্যানাল ক্ষুদ্র জেলেদের অভিগম্যতার ব্যবস্থা করা।

এ লক্ষ্যমাত্রা কদ্দুর অর্জন করা গেল তার নির্দেশক হচ্ছে, সামুদ্রিক সম্পদে ক্ষুদ্র-উদ্যোগভিত্তিক ফিশারিজের অভিগম্যতার অধিকারের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেয় এমন আইনত/বিধিমূলক/নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো রূপরেখা কোনো একটি দেশ কী মাত্রায় বাস্তবায়ন করছে।

জাতিসংঘ কৃষি ও খাদ্য সংস্থার মতে, আর্টিস্যানাল ফিশারি হচ্ছে প্রধানত স্থানীয় ভোগের জন্য তুলনামূলক কম পরিমাণ মূলধন ও জ্বালানি, অপেক্ষাকৃত ছোট জলযানে (যদি আদতে জলযান ব্যবহার করে) উপকূলের কাছাকাছি থেকে অল্পমেয়াদের খ্যাপ মেরে মাছ ধরা জেলে পরিবারগুলোর (যা ব্যবসায়িক সংস্থার থেকে ঠিক উল্টো ব্যাপার) ঐতিহ্যগত ফিশারি।

এ ফিশারি কখনও কখনও ব্যবসায়িক ভিত্তিতেও পরিচালিত হতে পারে, তবে অবশ্যই ক্ষুদ্র ব্যবসা আকারে। আবার পুরোপুরিই নিজেদের খাবার মাছ জোগানোর জন্যই হতে পারে। মাছ আহরণের উদ্দেশ্য স্থানীয় ভোগ বা রফতানি দুটোই হতে পারে। মাছ ধরার জলযানের মালিক জেলেরা হতেও পারেন, নাও হতে পারেন।

এসব রকমফের থাকলেও এসব ধরনের সংগঠন ও বৈশিষ্ট্যই আর্টিস্যানাল ফিশারির অংশ বলে গণ্য হবে। কিন্তু একটা ব্যাপারে রকমফের চলছে না, সেটা হচ্ছে এতে জেলেদের নিযুক্তির বৈশিষ্ট্য হবে হয় আত্ম-কর্মসংস্থানের ভিত্তিতে কিংবা পারিবারিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে।

বিভিন্ন দেশে এ সংজ্ঞার একটু এদিক-ওদিক হলেও, পারিবারিক সম্পৃক্তি ও মুনাফা অপ্রধান থাকা চাই। মৎস্য অধিদফতরের উল্লিখিত সংজ্ঞায়ও বলা হয়েছে, এ ধরনের ফিশিং মাত্রই জেলে পরিবারের পারিবারিক উদ্যোগে করা হয়।

বাংলাদেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক ক্যাপচার ফিশারিজে নিয়োজিত জলযানের সংখ্যা ৬৭৬৬৯টি। প্রায় আড়াইশ’ ট্রলার ছাড়া বাকি সব ইঞ্জিনচালিত ও ইঞ্জিনবিহীন মাছ ধরা জলযানকেই এ হিসেবে গোনা হয়।

এদের মধ্যে ঠিক কী পরিমাণ জলযান ও কী সংখ্যক জেলে প্রকৃত অর্থে আর্টিস্যানাল ফিশিংয়ে জড়িত তা নিরূপণ করা এখনও বাকি আছে। তবে এ সংখ্যাধিক্যকে বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদের মজুতের প্রসঙ্গে ‘ট্রাজেডি অব কমন্সের’ মতো একটা বর্ণবাদী উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই কোনো প্রামাণ্য তথ্য ছাড়াই উল্লেখ করা হয়।

বিপরীতে তুলনামূলক আহরিত মৎস্যসম্পদের শতাংশ অনেক কম হলেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিংয়ে, হোক সেটা বটম বা মিডওয়াটার ট্রলিং, তাতে যে বঙ্গোপসাগরের মতো উপকূলীয় সাগরে মাছের বসতি স্থায়ীভাবে নষ্ট ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ার সূত্র ধরে মৎস্যের মজুত কমে বলে প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে, সেই বিষয়ে বাংলাদেশে সাধারণত তেমন মনোযোগ নেই।

যার ফলে ঐতিহ্যগত জেলে পরিবারভিত্তিক মাছ ধরার ক্ষুদ্র-উদ্যোগগুলোকে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, প্রাণসম্পদ সুরক্ষা ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার কাজে লাগানোর যেই সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগছে না। এ তুলনামূলক প্রাণ ও প্রতিবেশবান্ধব ফিশারিতে সম্পৃক্ত লোকেদের বিকল্প জীবিকার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয় প্রায়ই নানা দেশি-বিদেশি এনজিওর তরফে, যা অনেক ক্ষেত্রেই টেকসই উন্নয়ন ও প্রাণ-প্রতিবেশের সুরক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তবে ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, দেশে সাবেকি আর্টিস্যানাল ফিশারিজে সংগঠন, জেলেদের সম্পৃক্ততার বৈশিষ্ট্য, বিনিয়োগের পরিমাণ, জ্বালানি খরচ, ও কারিগরি সামর্থ্যরে ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন এসেছে যে এর কতটা অংশকে এখন নেহাতই আর্টিস্যানাল ফিশারির অংশ বললে যথাযথ হবে তা খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে।

অন্তত ষাটের দশক পর্যন্ত উপকূলীয় জলাঞ্চলে প্রধানত সনাতন ধর্মাবলম্বী জলদাসরাই পারিবারিকভাবে মাছ ধরার পেশায় ছিলেন। যারা পরিবারের পুষ্টি ও ভরণপোষণের জন্য মাছ ধরতেন, শতভাগ আর্টিস্যানাল ফিশারি যাকে বলা যায়। সত্তরের দশক থেকেই এক্ষেত্রে পরির্বতন আসতে শুরু করে এ ফিশারির কারিগরি সামর্থ্য বাড়ানোর মাধ্যমে।

এবং বেশি মাত্রায় বিনিয়োগ হতে থাকার ফলে এ ফিশারির সংগঠন, সম্পৃক্ততার ধরন ও মূল উদ্দেশ্য পাল্টাতে শুরু করে। নিজেরা খাওয়া ও স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে জেলে পরিবারের ক্ষুদ্র উদ্যোগের বদলে এর একটা অংশ পরিবর্তিত রূপ পায় পুরোপুরি মুনাফার উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়িক সংস্থার ফিশারি হিসেবে; যেখানে জেলেদের একটা বড় অংশ স্রেফ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন।

এ ধারা সত্তরের দশকেই থেমে থাকেনি। এ নিবন্ধের লেখকদের বিগত কয়েক বছর ধরে তৃণমূল পর্যায়ে পর্যবেক্ষণের থেকে বলা যায় সাগরে আর্টিস্যানাল ফিশারির বলে পরিচিত উদ্যোগগুলোর একটা বিরাট অংশ এখন এ প্রকারের ফিশিংয়ের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো আর ধারণ করে না।

ঐতিহ্যগত জেলে পরিবারের বাইরে থেকে আসা লোকেরা এবং অনেক ক্ষেত্রে মহাজন বা আড়তদারদের মতো সাপ্লাই চেইনের অন্যান্য অংশের লোকেরাও অন্তত একটি বা কয়েকটি ইঞ্জিনঅলা নৌকার মালিক হয়ে বাইরে থেকেই যে কোনো অদক্ষ শ্রমিককে জেলে হিসেবে নিয়োগ করে (প্রায়ই তারা জেলে পরিবারের সদস্যদেরও নিযুক্ত করেন) সম্পূর্ণ মুনাফার উদ্দেশ্যে মাছ ধরার ব্যবসায়ে নামেন।

এখন যখন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদে আর্টিস্যানাল জেলেদের অভিগম্যতা বাড়াতে কর্মপরিকল্পনা রয়েছে সরকারে, তখন এ চিকন তফাৎগুলো বিবেচনায় নিয়ে অগ্রসর হওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি। এ যাচাই-বাছাই নিঃসন্দেহে খুব সহজ হবে না। কারণ প্রকৃত আর্টিস্যানাল ও পুরোপুরি কমার্শিয়াল বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশারির তফাৎ প্রায়ই খুব পলকা ও অস্পষ্ট হয়।

এরপরেও দুটো সহজ পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে তফাৎ করা সম্ভব। প্রথমত, জেলে-জনশক্তির বিপরীতে প্রযুক্তিগত সামর্থ্য ও বিনিয়োগ যাচাই। নৌকার আকার যত বড়ই হোক না কেন বা একটি নৌকায় যত বেশি সংখ্যক জেলেই থাকুক না কেন যদি জ্বালানি-জাল-ইঞ্জিন ইত্যাদি সীমিত হয় এবং জেলেপ্রতি আর্থিক বিনিয়োগ কম হয় তবে তাকে আর্টিস্যানাল বলা যেতে পারে।

উল্টো দিকে নৌকা যত ছোট হোক না কেন বা জেলে যত কম হোক না কেন, যদি ওই নৌকাপ্রতি মাছ ধরার সামর্থ্য অনেক বেশি হয় তবে তা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশারি বলে গণ্য।

দ্বিতীয় সহজ পদ্ধতিটি হল, মৎস্য আহরণের উদ্দেশ্য বিচার করা। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিংয়ে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যে কোনো প্রকারে বেশি মাছ ধরে মুনাফা কামানো, যার ফলে মৎস্য-মজুত নষ্টসহ সার্বিক প্রতিবেশগত ঝুঁকি থাকে। বিপরীতে আর্টিস্যানাল ফিশারির উদ্দেশ্য হল খোরাকি করা; পরিবারের ভরণ-পোষণ; সেটা হতে পারে আহরিত মৎস্যেও মাধ্যমে সরাসরি পুষ্টি জোগান কিংবা বাজারে বিক্রি করে জীবিকার্জনের মাধ্যমে।

এ ধরনের ফিশিং প্রতিবেশবান্ধব হয় এবং মৎস্য-মজুতকে ঝুঁকিতে ফেলে না। এসব নির্দেশক ব্যবহার করে দেশে উপকূলীয় সামুদ্রিক খাতে প্রকৃত আর্টিস্যানাল ফিশারির আকার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

যার ধারাবাহিকতায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলিং লাইসেন্স দেয়ার মতো করে পৃথক আর্টিস্যানাল ফিশিং লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে ঐতিহ্যগত জেলে পরিবারগুলোকে। এবং বঙ্গোপসাগরে উপকূলীয় জলা ল বা নিয়ারশোর ওয়াটার শুধু আর্টিস্যানাল ফিশিং লাইসেন্সধারীদের জন্যই বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন যাচাই করে সামুদ্রিক সম্পদ ও বাজারে এ জেলেদের অভিগম্যতা বাড়ানোর আরও উপায় খুঁজতে হবে।

মো. কুতুব উদ্দিন : পরিচালক, মেরিন এক্সটেনসন সার্ভিস, এএমআর সলুসনস, ড. কাজী আহসান হাবীব : ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়