এক ইঞ্চি নদীও বেদখল থাকবে না
jugantor
এক ইঞ্চি নদীও বেদখল থাকবে না

  এ কে এম আরিফ উদ্দিন  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। নদীকে কেন্দ্র করেই এর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বয়ে চলা। শুধু কি তাই? আমাদের এই অনিন্দ্য সুন্দর মনোরম দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপও।

বাংলাদেশকে নদীমাতৃক কিংবা নদীবিধৌত দেশ বলার আরেকটি কারণ হল, পৃথিবীর অনেক দেশের জন্ম নদীকেন্দ্রিক হলেও কোনো দেশেই এমন জালের মতো নদী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই।

একমাত্র বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডেই এমন বিরল সৌন্দর্য বড় আশ্চর্য সহজভাবে ফুটে উঠেছে। মানবদেহে যেমন হাজারও শিরা-উপশিরা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের দেহেও হাজারও নদী-উপনদী প্রবাহিত হচ্ছে। যেদিন এ প্রবাহধারা বন্ধ হয়ে যাবে, মানবদেহের মতো এ দেশ দেহটিরও সেদিন মৃত্যু ঘটবে। আমার লেখা বিআইডব্লিইটিএ’র থিমসংয়েও সে কথাই উচ্চারিত হয়েছে দৃপ্তকণ্ঠে- ‘শিরায় শিরায় রক্তধারায় যেমনি বাঁচে প্রাণ, বাংলাদেশের জীবন তেমন হাজার নদীর দান।’

বিআইডব্লিউটিএর স্লোগানটিও আমরাই দেয়া- ‘প্রবহমান নদীর সঙ্গে’। অর্থাৎ বিআইডব্লিউটিএ নদীগুলো প্রবহমান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পাশাপাশি আমরা এও জানান দিতে চাই, আমাদের সব কার্যক্রম প্রবহমান নদী ঘিরে। কোনো মৃত বা জীর্ণ কিংবা যৌবনহারা নদী রাজধানীর বুকে থাকবে না। গ্রাম-বাংলার মতোই রাজধানী ঢাকার গোড়াপত্তনও ঘটেছে নদীকে কেন্দ্র করে।

শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, শীতলক্ষ্যা নদীর আশপাশে ঘুরলেও দেখা যাবে সেখানে নদীকেন্দ্রিক প্রাচীন সভ্যতার বহু নির্দশন এখনও ‘নদীর ঢাকা’ কথাটি নিভু নিভু আলোয় জানান দিচ্ছে। শীতলক্ষ্যার তীরঘেঁষে এখনও বহু অলি-আউলিয়ার মাজার জীবিত রয়েছে।

বুড়িগঙ্গার পাড়ঘেঁষা জিঞ্জিরায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী দীর্ঘ সময় বন্দি জীবন কাটিয়েছেন, এর আগে নবাবরা আহসান মঞ্জিল এবং লালবাগ কেল্লা গড়ে তুলেছে মূলত নদীর পাড়ঘেঁষেই। আহসান মঞ্জিলের পাশে তো এখনও বুড়িগঙ্গা নদী দৃশ্যমান। লালবাগ কেল্লাও কিন্তু গড়ে ওঠেছিল বুড়িগঙ্গার একটি শাখা নদী কেন্দ্র করে। ওই নদীর চিহ্ন এখনও বিদ্যমান রেয়েছে।

ব্রিটিশ আমলেও ঢাকার জীবনযাত্রায় নদীর ব্যাপক প্রভাব ছিল। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে বুড়িঙ্গার নাম উল্লেখ না করলেই নয়। বিখ্যাত বিউটি বোডিং গড়েই ওঠেছে বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষে। আজও ঢাকা যতটুকু বেঁচে আছে নদীর কারণেই, আর যতটুকু মরে গেছে এবং মরে যাচ্ছে তাও নদীকে মেরে ফেলার কারণেই।

পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে, যেখানে রাজধানীর চারাপাশ নদীবেষ্টিত। অনেক উন্নত দেশ রাজধানীর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম নদী বানিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার মানুষকে ভাগ্যবান বলতেই হয়। চরম দুর্ভাগ্যের কথা হল, রাজধানীর মানুষ এ নদীর সঙ্গে চরমতম অন্যায় করেছে। এ অন্যায় যে কত বড় তা বলার ভাষা আমাদের জানা নেই। নদীকে আমরা বানিয়েছি বর্জ্য ফেলার একমাত্র গর্ত।

শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা, বাসা-বাড়ির ময়লা, হাসপাতালের নোংরা, কনস্ট্রাকশনের ভাঙ্গারি সবকিছু ফেলার একমাত্র ঠিকানা হল নদী। শুধু কি তাই? রাজধানীর সুয়্যারেজ লাইনও সরাসরি সংযোগ করা হয়েছে নদীর সঙ্গে।

বাসা-বাড়ির বর্জ্য, ড্রেনের বর্জ্য এবং মানববর্জ্য সরাসরি যাচ্ছে নদীতে! এত অত্যাচারের পরও নদীর ওপর সবচেয়ে নির্মম আঘাত হেনেছে একদল মানুষরূপী নদীখেকো জানোয়ার। যারা নির্দয়ের মতো অল্প অল্প করে নদী হত্যা করছে বছরের পর বছর। এরাই রাজধানীর নদীগুলো দখল করে বড় বড় বিল্ডিং, কারখানা এবং হাউজিং গড়ে তোলে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে।

যদিও ১৯৯৯ সাল থেকেই প্রতি বছর বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছে; কিন্তু উল্লেখযোগ্য সফলতা তেমন একটা পাওয়া হয়নি। টেমস নদীও দখলমুক্ত করতে চল্লিশ বছর লেগেছে। অবশ্য এটি আজ থেকে তিনশ বছর আগের কথা। আজকের আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের চল্লিশ বছর লাগবে না ঠিক; কিন্তু ইতিমধ্যে বিশ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ বছর সময় কিন্তু একেবারেই কম নয়।

স্বীকার করতে দোষ নেই বিগত বিশ বছরে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং নদী আরও বেশি দূষণ এবং দখলের স্বীকার হয়েছে। কোথাও উচ্ছেদ অভিযান হলে অল্পদিনের মাথায় তা আবারও কীভাবে যেন দখল হয়ে যেত। ফলে সাধারণ মানুষ এবং সরকারের কাছে বিআইডব্লিউটিএর ভাবমূর্তি পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

উচ্চ আদালত এ কথা পর্যন্ত বলেছেন, উচ্ছেদ অভিযানের নামে এ ধরনের কানামাছি খেলা বন্ধ হোক। তো আমি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিআইডব্লিউটিকে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। উচ্ছেদ-দখল, আবার উচ্ছেদ-আবার দখল এ বৃত্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কাজটি মুখে বলা যত সহজ বাস্তবে তত সহজ নয়।

প্রথমত, আমরা বলি নদী মরলে দেশ মরবে, ঢাকা মরবে; কিন্তু আমরাই নদী ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত। ঢাকার ৫৬টি খাল তো এ ঢাকাবাসীই মেরে ফেলেছে। খাল মানে কিন্তু খাল নয়, খাল মানে হচ্ছে নদীর শাখা। বিশাল বিশাল ৫৬টি শাখা নদী ছিল ঢাকার বুকে। আজ ক’টি আছে? সবই ব্যক্তিলোভের আক্রোশে মরে এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তো এগুলো উদ্ধার করা মানে হচ্ছে একাধিক শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে নেমে পড়া।

যারা নদী দখল এবং দূষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তারা সাধারণ কোনো মানুষ নয়। আইনের নাকের ডগায় বসে দিন-রাত প্রকাশ্যে নদী দখল-দূষণের উৎসবে মেতে থাকে ওই চক্ররা।

তো আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একটি কঠোর যুদ্ধ এবং সাঁড়াশি অভিযান না হলে নদী বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটিও ব্যর্থ হবে। দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায় তখন সামনে আগানো ছাড়া যেমন কিছুই করার থাকে না, তেমনি আমাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

এ যুদ্ধে আমরা ধনী-গরিব, দুর্বল-শক্তিশালী, এমপি-মন্ত্রী এক কথায় নদীর স্বার্থে কাউকেই চুল পরিমাণও ছাড় দেব না সিদ্ধান্ত নিয়েই মাঠে নামি। গত বছরের জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখ থেকে আমাদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।

বহু শক্তিশালী ব্যক্তিবর্গের অবৈধ স্থাপনা আমরা ভেঙে দিই, কারখানা গুঁড়িয়ে দিই এবং নদী ভরাট করে যে চক্রগুলো হাউজিং বাণিজ্য করে আসছে তাদেরকেও নিশ্চিহ্ন করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিই। আনন্দের কথা হল, আমরা শুধু উচ্ছেদ অভিযানই করিনি, নদী খনন করে ওই জায়গায় নদী প্রবাহিত পর্যন্ত করে দিয়েছি। এ কাজে সফলতা পাওয়া সহজ ছিল না। প্রাণের হুমকি, বিত্তের প্রলোভন, অর্থের লোভ, চিত্তের সংকোচ সবকিছুই আমাদের চারপাশে মৌ মৌ করেছে।

কিন্তু আমরা আমাদের আদর্শে, আমাদের লড়াইয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম- জীবন গেলেও এক ইঞ্চি নদী বেদখল রেখে ঘরে ফেরব না। ফলে আমরা সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা এক সাগর রক্তের বিনিময় দেশ স্বাধীন করেছে, এখন আমরা নদী দখলমুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ শোধ করব। নদীরক্ষার এ যুদ্ধে আমরা যদি হেরে যাই তাহলে আর কখনোই নদীমুক্ত করা সম্ভব হবে না। অভিযান চলাকালীন একবার আমার হার্টঅ্যাটাক হয়। মাত্র পাঁচ দিনে বাইপাস অপারেশন করে আবার আমি নদীমুক্তির যুদ্ধে সশরীরে মাঠে শরিক হই।

গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট পঞ্চাশ কার্যদিবসে আমরা তিনটি নদী যথা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ এবং বালিতে অভিযান চালিয়ে ১১৩টি ধর্মীয়-সামাজিক, স্থাপনা বাদ দিয়ে বাকি সব (প্রায় ছয় হাজার) স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিই এবং সেখানে খুব অল্পসময়ের মধ্যে নদী প্রবাহিত করি। আমরা আরেকটি কাজ করেছি, আমিন মহম্মদ হাউজিংসহ একাধিক হাউজিং প্রকল্প নদী ভরাট করে দীর্ঘদিন ধরে প্লট ব্যবসা করে আসছিল। আমরা এদের সবাইকে উচ্ছেদ এবং জরিমানা করেছি।

আরও কয়েকটি হাউজিং আমরা কেটে ফেলব বলে আমাদের প্লানে আছে। অভিযানে প্রাপ্ত সম্পত্তি প্রায় ১৪ কোটি টাকা নিলামে বিক্রি করেছি এবং ১৭০ একর জমি আমরা নদীকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আশা করছি, আগামী বর্ষায় ঢাকাবাসীকে একটি সমৃদ্ধ বহমান নদী উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ। দুর্গন্ধের যে দুর্নাম বুড়িগঙ্গার ঘাড়ে বইছিল এবারই সে দুর্গন্ধ অনেকটা কমে গেছে। পানির রংও বেশ স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে। আগামীতে ঢাকার তিনটি নদীই প্রবাহিত থাকবে।

একটি নদীর যতগুলো গুণ থাকা দরকার সবই আমরা নদীর মাঝে ফুটিয়ে তুলব। নদীর পানি স্বচ্ছ থাকবে। পানিতে মাছ থাকবে। গোসল করা যাবে। এমনকি নদীর পানি পানও করা যাবে। এসব টার্গেট পূরণ হলেই আমাদের নদী বাঁচানোর যুদ্ধ শেষ হবে।

আমরা ঘোষণা করেছি, এবারের সংগ্রাম নদী দখলমুক্ত করার সংগ্রাম। মাননীয় নৌ প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের চেয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বড় হতে পারে না।’ আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র চাইলে এক ইঞ্চি নদীর জমিও বেদখল থাকবে না। নদী দখলমুক্তির এ অভিযান এখনও চলছে। মিশন পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।

সাময়িক কিছু কারণে আমরা মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রাখি। যেমন ইজতেমার সময় বন্ধ ছিল। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে কয়েকটি স্থানে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রেখেছি। তার মানে এই নয়, এসব জায়গায় অভিযান হবে না বা অভিযান হওয়া জায়গাগুলো ফের বেদখল হয়ে যাবে।

মজার ব্যাপার হল, যেসব জায়গা আমরা দখলমুক্ত করেছি সেগুলো বেদখল করার আর কোনো সুযোগ থাকছে না। আমরা ম্যাপ দেখে ১০০ বছর মেয়াদের ২৫ ফিট গভীর এবং ১৫ ফিট দৃশ্যমান সীমান্ত খুঁটি গেঁথে দিচ্ছি এবং নদীর পাশে স্থায়ী ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিচ্ছি। ফলে দলখদাররা চাইলেও আর নদী বেদখল করতে পারবে না।

আরেকটি কাজ আমরা করেছি তাহল, যারা নদী দখলের সঙ্গে জড়িত, দীর্ঘদিন ধরে নদী ভরাট করে ইট-বালুর ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে, এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আমরা মামলা করেছি। দ্রুত বিচার আইনেও মামলা করেছি। মামলার চার্জশিটও বেরুচ্ছে। যদিও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো কোনো আসামি পার পেয়ে যাচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। এসব খবর অবশ্যই আমাদের জন্য দুঃখের; কারণ তবুও আমরা থেমে থাকব না।

আমাদের চলমান প্রজেক্ট সম্পর্কে একটু বলি। নদীর পাশে আমরা দৃষ্টিনন্দন ওয়েকওয়ে করা ছাড়াও মনোরম পরিবেশে আরও ৩টি ইকোপার্কের কাজ চলছে। ইকোপার্কে সংখ্যা আরও বাড়বে। আমরা নদীর মাঝে ওঠা চরে আধুনিক ভাসমান পার্ক করব। যেন মানুষ ওখানে গিয়ে বিয়েশাদি, সামাজিক অনুষ্ঠাসহ গেটটুগেদার প্রোগ্রামগুলো করতে পারে।

এ কাজগুলো ঢাকার বাইরে নয়, ভেতরের নদীগুলোর মধ্যেই হবে। আমাদের টার্গেট হল নদীই হবে রাজধানীবাসীর বিনোদন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। নদী যাতে দূষণ না হয় এজন্য আমরা আবর্জনা রিসাইকেলিংয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার টেন্ডার করেছি, নদীতে যেন কেউ ময়লা ফেলে পার পেয়ে না যায় এ জন্য সিসিটিভি মনিটরিং সিস্টেম থাকবে।

ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যেই নদীতে ময়লা ফেলবে অতি দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলতে হলে রিসাইকেলিং করে ফেলতে হবে। যারা এমনটি করবে না তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক কথায় আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে নদীর দূষণ সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছি।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, নদী সমৃদ্ধ করলে দেশ, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। সভ্যতার শুরু থেকে এখনও নদীপথে বাণিজ্য বহরের জনপ্রিয়তা একবিন্দুও কমেনি। শুধু তাই নয়, নদীপথে যাতায়াতে সুবিধার মতো সাশ্রয় এবং প্রশান্তি আর কিছুতেই নেই। মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে একজন মানুষ ঢাকা থেকে বরিশাল চলে যাচ্ছে। আবার অল্প খরচে বাণিজ্যিক পণ্যও নিয়ে যাচ্ছে।

এসব দিক বিবেচনা করলে অর্থনীতিতে নদীর অবদান অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। ভাবুন তো, যদি চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আনন্দের কথা হল, এখন সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতেই বাণিজ্যিক জাহাজ ভিড়বে। পোর্ট নির্মাণের কাজও অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

সবশেষে পাঠকের উদ্দেশে বলতে চাই, এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মদরদি, কোরআন বিশ্বাসী। আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে যখনই অনিন্দ্য সুন্দর জান্নাতের বর্ণনা এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন নদীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নদী ছাড়া জান্নাতের কল্পনাও যেন অসুন্দর মনে হবে।

নয়তো সৌন্দর্যের এত এত কিছু থাকতে আল্লাহপাক নদীর কথাই কেন বারবার উল্লেখ করবেন। তো দুনিয়ায় যারা নদী ভালোবাসবে, নদীর জন্য যারা কাজ করবে, নদীকে দূষণমুক্ত রাখবে এবং এজন্য মানুষকে উৎসাহ দেবে তারা সবাই পরকালে নদীঘেরা জান্নাতে জায়গা পাবে এ আশা পরম করুণাময়ের কাছে করাই যায়। আসুন! আমরা নদী ভালোবাসি, নদীর স্রষ্টা আমাদের ওপর দুনিয়া-আখেরাতের সমৃদ্ধি ঢেলে দেবেন।

লেখক : যুগ্ম পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ ও নদীবন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শ্রুতি লিখন : আল ফাতাহ মামুন

এক ইঞ্চি নদীও বেদখল থাকবে না

 এ কে এম আরিফ উদ্দিন 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। নদীকে কেন্দ্র করেই এর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বয়ে চলা। শুধু কি তাই? আমাদের এই অনিন্দ্য সুন্দর মনোরম দেশটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপও।

বাংলাদেশকে নদীমাতৃক কিংবা নদীবিধৌত দেশ বলার আরেকটি কারণ হল, পৃথিবীর অনেক দেশের জন্ম নদীকেন্দ্রিক হলেও কোনো দেশেই এমন জালের মতো নদী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই।

একমাত্র বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডেই এমন বিরল সৌন্দর্য বড় আশ্চর্য সহজভাবে ফুটে উঠেছে। মানবদেহে যেমন হাজারও শিরা-উপশিরা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের দেহেও হাজারও নদী-উপনদী প্রবাহিত হচ্ছে। যেদিন এ প্রবাহধারা বন্ধ হয়ে যাবে, মানবদেহের মতো এ দেশ দেহটিরও সেদিন মৃত্যু ঘটবে। আমার লেখা বিআইডব্লিইটিএ’র থিমসংয়েও সে কথাই উচ্চারিত হয়েছে দৃপ্তকণ্ঠে- ‘শিরায় শিরায় রক্তধারায় যেমনি বাঁচে প্রাণ, বাংলাদেশের জীবন তেমন হাজার নদীর দান।’

বিআইডব্লিউটিএর স্লোগানটিও আমরাই দেয়া- ‘প্রবহমান নদীর সঙ্গে’। অর্থাৎ বিআইডব্লিউটিএ নদীগুলো প্রবহমান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পাশাপাশি আমরা এও জানান দিতে চাই, আমাদের সব কার্যক্রম প্রবহমান নদী ঘিরে। কোনো মৃত বা জীর্ণ কিংবা যৌবনহারা নদী রাজধানীর বুকে থাকবে না। গ্রাম-বাংলার মতোই রাজধানী ঢাকার গোড়াপত্তনও ঘটেছে নদীকে কেন্দ্র করে।

শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, শীতলক্ষ্যা নদীর আশপাশে ঘুরলেও দেখা যাবে সেখানে নদীকেন্দ্রিক প্রাচীন সভ্যতার বহু নির্দশন এখনও ‘নদীর ঢাকা’ কথাটি নিভু নিভু আলোয় জানান দিচ্ছে। শীতলক্ষ্যার তীরঘেঁষে এখনও বহু অলি-আউলিয়ার মাজার জীবিত রয়েছে।

বুড়িগঙ্গার পাড়ঘেঁষা জিঞ্জিরায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী দীর্ঘ সময় বন্দি জীবন কাটিয়েছেন, এর আগে নবাবরা আহসান মঞ্জিল এবং লালবাগ কেল্লা গড়ে তুলেছে মূলত নদীর পাড়ঘেঁষেই। আহসান মঞ্জিলের পাশে তো এখনও বুড়িগঙ্গা নদী দৃশ্যমান। লালবাগ কেল্লাও কিন্তু গড়ে ওঠেছিল বুড়িগঙ্গার একটি শাখা নদী কেন্দ্র করে। ওই নদীর চিহ্ন এখনও বিদ্যমান রেয়েছে।

ব্রিটিশ আমলেও ঢাকার জীবনযাত্রায় নদীর ব্যাপক প্রভাব ছিল। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে বুড়িঙ্গার নাম উল্লেখ না করলেই নয়। বিখ্যাত বিউটি বোডিং গড়েই ওঠেছে বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষে। আজও ঢাকা যতটুকু বেঁচে আছে নদীর কারণেই, আর যতটুকু মরে গেছে এবং মরে যাচ্ছে তাও নদীকে মেরে ফেলার কারণেই।

পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে, যেখানে রাজধানীর চারাপাশ নদীবেষ্টিত। অনেক উন্নত দেশ রাজধানীর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম নদী বানিয়েছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার মানুষকে ভাগ্যবান বলতেই হয়। চরম দুর্ভাগ্যের কথা হল, রাজধানীর মানুষ এ নদীর সঙ্গে চরমতম অন্যায় করেছে। এ অন্যায় যে কত বড় তা বলার ভাষা আমাদের জানা নেই। নদীকে আমরা বানিয়েছি বর্জ্য ফেলার একমাত্র গর্ত।

শিল্পকারখানার বর্জ্য থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা, বাসা-বাড়ির ময়লা, হাসপাতালের নোংরা, কনস্ট্রাকশনের ভাঙ্গারি সবকিছু ফেলার একমাত্র ঠিকানা হল নদী। শুধু কি তাই? রাজধানীর সুয়্যারেজ লাইনও সরাসরি সংযোগ করা হয়েছে নদীর সঙ্গে।

বাসা-বাড়ির বর্জ্য, ড্রেনের বর্জ্য এবং মানববর্জ্য সরাসরি যাচ্ছে নদীতে! এত অত্যাচারের পরও নদীর ওপর সবচেয়ে নির্মম আঘাত হেনেছে একদল মানুষরূপী নদীখেকো জানোয়ার। যারা নির্দয়ের মতো অল্প অল্প করে নদী হত্যা করছে বছরের পর বছর। এরাই রাজধানীর নদীগুলো দখল করে বড় বড় বিল্ডিং, কারখানা এবং হাউজিং গড়ে তোলে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে।

যদিও ১৯৯৯ সাল থেকেই প্রতি বছর বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছে; কিন্তু উল্লেখযোগ্য সফলতা তেমন একটা পাওয়া হয়নি। টেমস নদীও দখলমুক্ত করতে চল্লিশ বছর লেগেছে। অবশ্য এটি আজ থেকে তিনশ বছর আগের কথা। আজকের আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের চল্লিশ বছর লাগবে না ঠিক; কিন্তু ইতিমধ্যে বিশ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ বছর সময় কিন্তু একেবারেই কম নয়।

স্বীকার করতে দোষ নেই বিগত বিশ বছরে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং নদী আরও বেশি দূষণ এবং দখলের স্বীকার হয়েছে। কোথাও উচ্ছেদ অভিযান হলে অল্পদিনের মাথায় তা আবারও কীভাবে যেন দখল হয়ে যেত। ফলে সাধারণ মানুষ এবং সরকারের কাছে বিআইডব্লিউটিএর ভাবমূর্তি পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

উচ্চ আদালত এ কথা পর্যন্ত বলেছেন, উচ্ছেদ অভিযানের নামে এ ধরনের কানামাছি খেলা বন্ধ হোক। তো আমি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিআইডব্লিউটিকে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। উচ্ছেদ-দখল, আবার উচ্ছেদ-আবার দখল এ বৃত্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কাজটি মুখে বলা যত সহজ বাস্তবে তত সহজ নয়।

প্রথমত, আমরা বলি নদী মরলে দেশ মরবে, ঢাকা মরবে; কিন্তু আমরাই নদী ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত। ঢাকার ৫৬টি খাল তো এ ঢাকাবাসীই মেরে ফেলেছে। খাল মানে কিন্তু খাল নয়, খাল মানে হচ্ছে নদীর শাখা। বিশাল বিশাল ৫৬টি শাখা নদী ছিল ঢাকার বুকে। আজ ক’টি আছে? সবই ব্যক্তিলোভের আক্রোশে মরে এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তো এগুলো উদ্ধার করা মানে হচ্ছে একাধিক শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে নেমে পড়া।

যারা নদী দখল এবং দূষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তারা সাধারণ কোনো মানুষ নয়। আইনের নাকের ডগায় বসে দিন-রাত প্রকাশ্যে নদী দখল-দূষণের উৎসবে মেতে থাকে ওই চক্ররা।

তো আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একটি কঠোর যুদ্ধ এবং সাঁড়াশি অভিযান না হলে নদী বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটিও ব্যর্থ হবে। দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায় তখন সামনে আগানো ছাড়া যেমন কিছুই করার থাকে না, তেমনি আমাদের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

এ যুদ্ধে আমরা ধনী-গরিব, দুর্বল-শক্তিশালী, এমপি-মন্ত্রী এক কথায় নদীর স্বার্থে কাউকেই চুল পরিমাণও ছাড় দেব না সিদ্ধান্ত নিয়েই মাঠে নামি। গত বছরের জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখ থেকে আমাদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।

বহু শক্তিশালী ব্যক্তিবর্গের অবৈধ স্থাপনা আমরা ভেঙে দিই, কারখানা গুঁড়িয়ে দিই এবং নদী ভরাট করে যে চক্রগুলো হাউজিং বাণিজ্য করে আসছে তাদেরকেও নিশ্চিহ্ন করে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিই। আনন্দের কথা হল, আমরা শুধু উচ্ছেদ অভিযানই করিনি, নদী খনন করে ওই জায়গায় নদী প্রবাহিত পর্যন্ত করে দিয়েছি। এ কাজে সফলতা পাওয়া সহজ ছিল না। প্রাণের হুমকি, বিত্তের প্রলোভন, অর্থের লোভ, চিত্তের সংকোচ সবকিছুই আমাদের চারপাশে মৌ মৌ করেছে।

কিন্তু আমরা আমাদের আদর্শে, আমাদের লড়াইয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম- জীবন গেলেও এক ইঞ্চি নদী বেদখল রেখে ঘরে ফেরব না। ফলে আমরা সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা এক সাগর রক্তের বিনিময় দেশ স্বাধীন করেছে, এখন আমরা নদী দখলমুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ শোধ করব। নদীরক্ষার এ যুদ্ধে আমরা যদি হেরে যাই তাহলে আর কখনোই নদীমুক্ত করা সম্ভব হবে না। অভিযান চলাকালীন একবার আমার হার্টঅ্যাটাক হয়। মাত্র পাঁচ দিনে বাইপাস অপারেশন করে আবার আমি নদীমুক্তির যুদ্ধে সশরীরে মাঠে শরিক হই।

গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট পঞ্চাশ কার্যদিবসে আমরা তিনটি নদী যথা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ এবং বালিতে অভিযান চালিয়ে ১১৩টি ধর্মীয়-সামাজিক, স্থাপনা বাদ দিয়ে বাকি সব (প্রায় ছয় হাজার) স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিই এবং সেখানে খুব অল্পসময়ের মধ্যে নদী প্রবাহিত করি। আমরা আরেকটি কাজ করেছি, আমিন মহম্মদ হাউজিংসহ একাধিক হাউজিং প্রকল্প নদী ভরাট করে দীর্ঘদিন ধরে প্লট ব্যবসা করে আসছিল। আমরা এদের সবাইকে উচ্ছেদ এবং জরিমানা করেছি।

আরও কয়েকটি হাউজিং আমরা কেটে ফেলব বলে আমাদের প্লানে আছে। অভিযানে প্রাপ্ত সম্পত্তি প্রায় ১৪ কোটি টাকা নিলামে বিক্রি করেছি এবং ১৭০ একর জমি আমরা নদীকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা আশা করছি, আগামী বর্ষায় ঢাকাবাসীকে একটি সমৃদ্ধ বহমান নদী উপহার দিতে পারব ইনশাআল্লাহ। দুর্গন্ধের যে দুর্নাম বুড়িগঙ্গার ঘাড়ে বইছিল এবারই সে দুর্গন্ধ অনেকটা কমে গেছে। পানির রংও বেশ স্বচ্ছ হতে শুরু করেছে। আগামীতে ঢাকার তিনটি নদীই প্রবাহিত থাকবে।

একটি নদীর যতগুলো গুণ থাকা দরকার সবই আমরা নদীর মাঝে ফুটিয়ে তুলব। নদীর পানি স্বচ্ছ থাকবে। পানিতে মাছ থাকবে। গোসল করা যাবে। এমনকি নদীর পানি পানও করা যাবে। এসব টার্গেট পূরণ হলেই আমাদের নদী বাঁচানোর যুদ্ধ শেষ হবে।

আমরা ঘোষণা করেছি, এবারের সংগ্রাম নদী দখলমুক্ত করার সংগ্রাম। মাননীয় নৌ প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের চেয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বড় হতে পারে না।’ আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র চাইলে এক ইঞ্চি নদীর জমিও বেদখল থাকবে না। নদী দখলমুক্তির এ অভিযান এখনও চলছে। মিশন পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।

সাময়িক কিছু কারণে আমরা মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রাখি। যেমন ইজতেমার সময় বন্ধ ছিল। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে কয়েকটি স্থানে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রেখেছি। তার মানে এই নয়, এসব জায়গায় অভিযান হবে না বা অভিযান হওয়া জায়গাগুলো ফের বেদখল হয়ে যাবে।

মজার ব্যাপার হল, যেসব জায়গা আমরা দখলমুক্ত করেছি সেগুলো বেদখল করার আর কোনো সুযোগ থাকছে না। আমরা ম্যাপ দেখে ১০০ বছর মেয়াদের ২৫ ফিট গভীর এবং ১৫ ফিট দৃশ্যমান সীমান্ত খুঁটি গেঁথে দিচ্ছি এবং নদীর পাশে স্থায়ী ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিচ্ছি। ফলে দলখদাররা চাইলেও আর নদী বেদখল করতে পারবে না।

আরেকটি কাজ আমরা করেছি তাহল, যারা নদী দখলের সঙ্গে জড়িত, দীর্ঘদিন ধরে নদী ভরাট করে ইট-বালুর ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে, এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আমরা মামলা করেছি। দ্রুত বিচার আইনেও মামলা করেছি। মামলার চার্জশিটও বেরুচ্ছে। যদিও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কোনো কোনো আসামি পার পেয়ে যাচ্ছে বলে শুনতে পাচ্ছি। এসব খবর অবশ্যই আমাদের জন্য দুঃখের; কারণ তবুও আমরা থেমে থাকব না।

আমাদের চলমান প্রজেক্ট সম্পর্কে একটু বলি। নদীর পাশে আমরা দৃষ্টিনন্দন ওয়েকওয়ে করা ছাড়াও মনোরম পরিবেশে আরও ৩টি ইকোপার্কের কাজ চলছে। ইকোপার্কে সংখ্যা আরও বাড়বে। আমরা নদীর মাঝে ওঠা চরে আধুনিক ভাসমান পার্ক করব। যেন মানুষ ওখানে গিয়ে বিয়েশাদি, সামাজিক অনুষ্ঠাসহ গেটটুগেদার প্রোগ্রামগুলো করতে পারে।

এ কাজগুলো ঢাকার বাইরে নয়, ভেতরের নদীগুলোর মধ্যেই হবে। আমাদের টার্গেট হল নদীই হবে রাজধানীবাসীর বিনোদন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। নদী যাতে দূষণ না হয় এজন্য আমরা আবর্জনা রিসাইকেলিংয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার টেন্ডার করেছি, নদীতে যেন কেউ ময়লা ফেলে পার পেয়ে না যায় এ জন্য সিসিটিভি মনিটরিং সিস্টেম থাকবে।

ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যেই নদীতে ময়লা ফেলবে অতি দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলতে হলে রিসাইকেলিং করে ফেলতে হবে। যারা এমনটি করবে না তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক কথায় আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে নদীর দূষণ সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছি।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, নদী সমৃদ্ধ করলে দেশ, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। সভ্যতার শুরু থেকে এখনও নদীপথে বাণিজ্য বহরের জনপ্রিয়তা একবিন্দুও কমেনি। শুধু তাই নয়, নদীপথে যাতায়াতে সুবিধার মতো সাশ্রয় এবং প্রশান্তি আর কিছুতেই নেই। মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে একজন মানুষ ঢাকা থেকে বরিশাল চলে যাচ্ছে। আবার অল্প খরচে বাণিজ্যিক পণ্যও নিয়ে যাচ্ছে।

এসব দিক বিবেচনা করলে অর্থনীতিতে নদীর অবদান অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। ভাবুন তো, যদি চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আনন্দের কথা হল, এখন সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতেই বাণিজ্যিক জাহাজ ভিড়বে। পোর্ট নির্মাণের কাজও অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

সবশেষে পাঠকের উদ্দেশে বলতে চাই, এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মদরদি, কোরআন বিশ্বাসী। আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে যখনই অনিন্দ্য সুন্দর জান্নাতের বর্ণনা এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন নদীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নদী ছাড়া জান্নাতের কল্পনাও যেন অসুন্দর মনে হবে।

নয়তো সৌন্দর্যের এত এত কিছু থাকতে আল্লাহপাক নদীর কথাই কেন বারবার উল্লেখ করবেন। তো দুনিয়ায় যারা নদী ভালোবাসবে, নদীর জন্য যারা কাজ করবে, নদীকে দূষণমুক্ত রাখবে এবং এজন্য মানুষকে উৎসাহ দেবে তারা সবাই পরকালে নদীঘেরা জান্নাতে জায়গা পাবে এ আশা পরম করুণাময়ের কাছে করাই যায়। আসুন! আমরা নদী ভালোবাসি, নদীর স্রষ্টা আমাদের ওপর দুনিয়া-আখেরাতের সমৃদ্ধি ঢেলে দেবেন।

লেখক : যুগ্ম পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ ও নদীবন্দর নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শ্রুতি লিখন : আল ফাতাহ মামুন

 

ঘটনাপ্রবাহ : ২১ বছরে যুগান্তর