আড্ডা থেকে সঞ্চয়
jugantor
আড্ডা থেকে সঞ্চয়

  মাকিদ হায়দার  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের জীবনের সমগ্র শীর্ষে ছুঁয়ে আছে অতীত রোমন্থন, প্রতিটি মানুষই অতীত প্রিয়, অতীতের কোনো সম্ভারই জীবন থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়, আমাদের প্রতিদিনের উচ্চারণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবেই তার সবটুকুই আজ অবধি সম্পৃক্ত। বলা যেতে পারে সবটা পাতার মতো, এমনকি ডানাবিহীন মেঘের মতো, অতীতের স্মৃতি, সুভাষিত চিরকালের চিরদিনের। জীবনের চলার পথে ওইসব ফেলে আসা দিন, রাত এবং বিবিধ আড্ডার সম্ভার এবং তাদের ভূমিকা অপরিসীম। আমরা তখনই অসম্পূর্ণ যদি তাদের বাদ দিই, অথচ পারিনে হেতুই প্রাণের মুক্তি ও মনের সৌকর্য বিধৃত হয়ে আছে পথে প্রান্তরে। চলার পথে। যা কিছু ফেলে এসেছি, বা হারিয়ে ফেলেছি সে সবই খুঁজলে এখন আর পাওয়া যাবে না জেনেও আশঙ্কা জাগে, যদি কখনও কোথাও সামান্য একটু স্মৃতি ভাণ্ডারে গচ্ছিত থাকে, আমার সেসব ছোট ছোট আশায়, ছোট ছোট প্রত্যাশা হয়তো পূরণ হতে পারে, পুনরায় যদি ফিরে যেতে পারি আমাদের শিল্প সাহিত্যের আড্ডায়।

আমাদের অনেকেই হয়তো এখনও স্মৃতি কাতরতার অভাবে অবগাহন করতে গিয়ে দেখতে পান, সেই ৫০ দশকের মধ্যভাগের শিল্প সাহিত্যের আড্ডার স্বরূপ সন্ধান করলে দেখতে পারেন তখনকার দিনে, কবি-শিল্পী-সাহিতিক্যের ভেতরে বিভাজনটা খুব কমই ছিল, দেশ ভাগের পর তৎকালের পূর্ববঙ্গের যে জনাকয়েক শিল্পের সাধনায় নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের প্রধান যিনি ছিলেন তিনি শিল্পী জয়নুল আবেদীন। আবেদীন সাহেবকে ঘিরে বেশ কয়েকজন শিল্পী শুরু করেছিলেন শিল্পের আড্ডা, সেই আড্ডার ভেতরেই ছিল শিল্পের শিক্ষা। তবে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস এবং নাট্যকার, এরা ছিলেন সেকালের ঢাকা শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, তারা কোথায় কোথায় আড্ডা দিতেন- সেটি আমরা অনেকেই জেনেছিলেম মধ্য ৬০-এ এসে।

৬০ দশকের শুরুতেই ছিল, সে সময়ের রাজনীতির একটি ভিন্ন ধরনের আবহ, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের দোর্দণ্ড প্রতাপের শুরুতেই ভিন্ন কণ্ঠস্বরের মানুষেরা যেন চিরদিনের জন্য নিজেদের অবদমিত ভেবেছিল, সেই শাসনামলে, তার মাঝখানেই মাথা উঁচিয়ে কথা শুরু করেছিল তমদ্দুন মজলিশের পাকিস্তানপন্থী খ্যাত-অখ্যাত কবিতায় শিল্পী-সাহিত্যিক। তবে তাদের নিয়ে পরবর্তীতে তরুণেরা সেসব উদ্দিষ্টদের নির্বাসন দিয়েছিলেন, কেন নয়, একটি নতুন ধারার শুরু হয়েছিল, বিশেষত কবিতা গল্প উন্যাসে ও নিুমানের নাটকে। উচ্চমানের নাটকের সন্ধান করলে এখন অবধি পাওয়া দুষ্কর, শুধু যে নাটকই ছিল নিুমানের রচনা তাই নয়, সঙ্গে ছিল, গল্প, কবিতা, উপন্যাস।

কবিতায় দেখতে পেতাম অন্তমিলের প্রভাব বাংলা সাহিত্যের দুই অগ্রজ কবিদের কবিতার নকলে ছিল পূর্ববঙ্গের কবিদের অন্তমিলের ঘনঘটা। সেই ঘনঘটা থেকে বের হয়ে এসেছিলেন ৫০ দশকের গোড়ার দিক থেকেই, এমনও বলা হয়ে থাকে, তখনকার সময়ে- কবিদের কোথাও কোনো আড্ডার জায়গা না থাকায় অনেকেই সাহিত্যের আড্ডা বলতে যা বোঝায়, সেই স্বাদ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করলেও পুরোপুরি বঞ্চিত হতে দেননি, সে কালের বিখ্যাত পত্রিকা ‘সমকাল’-এর সম্পাদক, কবি নাট্যকার সিকান্দার আবু জাফর। সমকাল পত্রিকাটির অফিস মতিঝিলপাড়ার ডিআইটি রোডে হওয়ার সুবাদে, সমকালের অফিসে বসত ৬০ দশকের কবিদের প্রাণবন্ত আড্ডা, মধ্যমণি সিকান্দার আবু জাফর থাকলেও তার আড্ডার অন্যান্য কুশলীরা ছিলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবু হেনা মুস্তফা কামাল, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, জিয়া হায়দার, প্রজেশ রায়, কায়সুল হক, ফজল শাহাবউদ্দিন, কাইয়ুম চৌধুরী, কবি-শিল্পী ছাড়াও আসতেন গল্পকারেরা। সে কালের সমকাল মাসিক পত্রিকায়- গল্প-কবিতা ছাপা হলে, লেখক, কবিরা নিজেদের ধন্য ভাবতেন।

সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, জহির রায়হান এবং জনাকয়েক সাংবাদিকদের শিল্প সাহিত্যের আড্ডা বসত, পুরান ঢাকার প্রহলাল সাহার বিখ্যাত ‘বিউটিবোডিং’-এ সেই আড্ডার মধ্যমণি কখনও থাকনে সৈয়দ হক, কখনাও বা মৃদুভাষী সবার প্রিয় বাচ্চু ভাই, বা কবি শামসুর রাহমান, তবে আড্ডার সঙ্গদাতারা অনেকেই পরবর্তীতে কেউ বা হয়েছেন কবি এবং সংবাদ পাঠক। সে ক্ষেত্রে কবি এবং সংবাদ পাঠক কবি ইমরুল চৌধুরী। তিনি করাচি থেকে বাংলা সংবাদ পাঠ করতেন।

কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার পরিচয় সেই মধ্যষাটে, তিনি একসময় পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা শাখায় যোগ দিয়েছিলেন, তবে তিনি স্থায়ী হওয়ার আগেই নাকি চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি নিয়মিত আড্ডা দিতেন, গুলিস্তান সিনেমা হলের উত্তর দিকের ‘রেক্স’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে। তার আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল, বিদেশি কবি সাহিত্যিকদের গল্প-কবিতা। তবে কবিতাকেই তিনি প্রাধান্য দিতেন এবং সেই আড্ডায় প্রায়শই থাকতাম, আমি আমার বন্ধু প্রাবন্ধিক গাজী আজিজুর রহমান, মাঝেমধ্যে গল্পকার বুলবুল চৌধুরী। ঔপন্যাসিক গল্পকার হরিপদ দত্ত এবং কবি আবুল হাসান। তবে শহীদ কাদরীর নিত্যসঙ্গী ছিলেন ‘বুড়োদা’ এবং আমাদের আরেক বন্ধু বিপ্লব দাশ। তখনকার দিনে শহীদ ভাই আমাদের আপ্যায়ন করতেন ঘিয়ে ভাজা পরোটা ও কফি দিয়ে এবং মাঝে মধ্যে শুদ্ধ উর্দুতে শোনাতেন ভারতীয় উর্দু কবিদের কবিতার চরণ। এবং সেই সঙ্গে কবিতাটির অনুবাদ। কবিতায় যে শহীদ কাদরী অন্তঃপ্রাণ ছিলেন, হেতুই রেক্সের সেই আড্ডাতেই তার কণ্ঠে শুনতে পেয়েছিলেম ‘ফর এভার প্যালেসটাইন’ নামের বই থেকে, যার নাম ছিল ‘এ কালেকশন অব প্যালেসটাইন রেজিস্টেন্স পোয়েমস’ গ্রন্থ বা সংকলনটির নাম, সেই সংকলন থেকে তিনি, সেই শীতসন্ধ্যায় ইংরেজি কবিতা থেকে অনুবাদ মুখে মুখেই শুনিয়েছিলেন আমাদের। তখনও আমরা কবি ফাতওয়া তকান, রশীদ হুসাইন ফৌজি আল আসমার। মাহমুদ দায়কিমা, শামা আল কাসিমের নাম শোনান। মাহমুদ দারবিশের খ্যাতি পৃথিবী জোড়া, এসব বিখ্যাত কবিদের কবিতা রেক্সের আড্ডায় শুনতাম কাদরী ভাইয়ের মুখে। তিনি একদিন ইউরোপীয় তরুণ কবিদের কবিতা শুনিয়েছিলেন সেই দু-একজন কবির নাম স্মৃতির অতল থেকে খুঁজে পেতাম না যদি না দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সম্পাদক কবি জুননু রাইন, কবিদের আড্ডার বিষয় নিয়ে কিছু লিখতে না বলতেন।

ইউরোপীয় কবিদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কাদরী ভাই সেই সন্ধ্যায় বারবার যে কথাটি বলেছিলেন তার গূঢ়ার্থ পশ্চিম দেশীয় সাহিত্য পাঠ না করলে বিশেষত কবিতা- যেমন বুদ্ধদেব বসু কবি বোদলেয়ারকে পরিণিত করিয়েছেন- আমাদের কাছে এবং ম্যাক্সিম গোর্কিকে ননী ভৌমিক। এ ছাড়া তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে অরবীয় কবিদের পরিচিত করিয়েছিলেন কবি আবদুস সাত্তার, কাদরী ভাই বিদেশ পাড়ি দেয়ার বেশ কয়েক মাস আগে পুরানা পল্টনে তার বাসায় আড্ডার ছলে জনাকয়েক ইউরোপীয় কবিদের কবিতার অনুবাদ এবং নাম জানিয়েছিলেন তার ভেতরে কবি হিলারি লাই উইলিয়ান, উইলিয়ামস গ্রাহাম মার্ট, পিটার বার্টন, ছাড়াও এসেছিলেন অন্যান্য কবিদের নাম।

মধ্যষাটে পাকিস্তান গিল্ডের বদান্যতায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক ‘পরিক্রমা’ নামের একটি পত্রিকা, পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান- ১৯৬৬ সালে, পত্রিকাটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল বাংলা একাডেমির অভ্যর্থনা কক্ষে। তৎকালের করোগেটেড টিনের একটি দোচালা কামরায়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী, সম্ভবত শিল্পী কামরুল হাসান, ঔপন্যাসিক সরদার জয়েনউদ্দিনকেও দেখেছিলাম। পরিক্রমা পত্রিকাটির সহযোগী সম্পাদক ছিলেন আমার মেজ ভাই রশীদ হায়দার। সেই পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করেই মাসে একবার করে আড্ডা বসত, একাডেমিতে। কিন্তু পরিক্রমার আয়ুস্কাল দীর্ঘ হয়নি, শুরু হয়েছিল অন্তর্দ্বন্দ্ব। কেউ কেউ কথায় কথায় প্রায়শই বলতেন সম্পাদক শামসুর রাহমানকে করলেই ভালো হতো। তবে পরিক্রমায় সমৃদ্ধশালী লেখা ছাপা হতো এবং সেই কালের গল্পকারদের ভেতরে শওকত আলী, আবু রুশদ, রশীদ করিম, সৈয়দ শামসুল হক, এরাই ছিলেন অগ্রগণ্য। তারাও নিয়মিত অনিয়মিতভাবে শিল্প সাহিত্যের আড্ডা দিতেন, তৎকালের দৈনিক পাকিস্তানে কবি শামসুর রাহমানের কক্ষে। মাঝে আসতেন কবি আহসান হাবীব, ফজল শাহাবউদ্দিন, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ।

মোহাম্মদ মাহফুজউল্লার সম্পাদনায় সেই মধ্যষাটে পুরান ঢাকার ৬৮ নম্বর বেচারাম দেউরী থেকে লঞ্চ, কোম্পানির মালিক জনাব নুরুল হুদা নামের অর্থায়নে প্রকাশিত হতো, মাসিক ‘পূর্বাণী’ পরবর্তীতে কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, সাংবাদিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানে। তবে এদের অধিকাংশের আড্ডা হতো, সমকাল অফিসে, কখনও সিকান্দার আবু জাফরের উপস্থিতিতে। কখনও বা উদয়ন চৌধুরীর উপস্থিতিতে।

আড্ডার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা এবং গদ্য পদ্য উপন্যাস লেখার জন্য ছিল নিরিবিলি ‘বিউটি বোর্ডিং’। কবি শামসুর রাহমান একাধিকবার লিখেছেন তার প্রিয় বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডার এবং কবিতা লেখার কথা, এমনকি সৈয়দ শামসুল হক তার স্মৃতিচারণায় তার বিখ্যাত উপন্যাস, গল্প, কবিতা সবই লিখেছিলেন ওই প্রহ্লাদ সাহার বিউটি বোর্ডিংয়ের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে সৈয়দ হক লিখতেন। যেহেতু হক সাহেবদের বাড়ি লক্ষ্মীবাজারে আর শামসুর রাহমানদের বাড়ি পুরান ঢাকার আওলাদ হোসেন লেন- এ দুটির মাঝামাঝি অবস্থানে বিউটি বোর্ডিং। বিউটি বোর্ডিং হওয়ার সুবাদে অন্য বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে বসত শিল্পের আড্ডা সাহিত্যের আড্ডা।

শিল্প-সাহিত্যের সেই ঐতিহ্যময় আড্ডা ক্রমে ক্রমে হারিয়ে গেল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ১৯৭২ থেকে আমরা যারা ছিলাম তারুণ্যে উদ্দীপ্ত তাদের আড্ডার স্থল ছিল নিউমার্কেটের মনিকা রেস্টুরেন্ট। মনিকায় তখনকার দিনের উঠতি কবি, গল্পকার নাট্য অভিনেতা প্রায় প্রতিদিন বসত শিল্প-সহিত্যের আলাপ-আলোচনায়। নিউমার্কেটের প্রগতি প্রকাশনীতে কবির খানের ওখানে প্রায়শই যেতেন, কবি আবু হেনা মুস্তফা কামাল, কবি হুমায়ুন আজাদ, কবি আব্দুল সাত্তার, মঝে মধ্যে দেখতাম কবি আবু কায়সারকে। ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল যেদিন উপস্থিত থাকতেন সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনদিক দিয়ে যে পেরিয়ে যেত আমরা আড্ডার অংশীদারিরা কিছুতেই বুঝতে পারতাম না। ড. হেনার সুন্দর বাকচাতুর্যের অতলে সময় তলিয়ে যেত। আমার সেই তারুণ্যের কালে মনে হতো ড. হেনার মতো শিক্ষিত আড্ডাবাজ শিল্প-সাহিত্যের একান্ত কথক এবং বাক্যের পর কোন বাক্য সাজাতে হবে, হয়তো তিনিই জানতেন যদিও ড. হেনা আমাদের সম্পর্কের মামা।

এ প্রসঙ্গে ছোট একটি ঘটনার অবতারণা করা যেতে পারে। শীতকাল, কোনো এক ছুটির দিনে, প্রগতি প্রকাশনীর মালিক কবির খান ভাইয়ের ওখানে সেদিন আমিই প্রথম গিয়েছি। বেশ ভারী সোয়েটার এবং একটি কোট শরীরে চাপিয়ে কবির ভাই আমাদের দু’জনার জন্য ২টি চায়ের কথা বললেন, তার এক কর্মচারীকে। চায়ের দোকানটি ছিল সেকালের বিখ্যাত ‘নলেজ হোম’ এর আশপাশে। আমরা দু’জন যখন আমাদের জগন্নাথ কলেজের গল্প করছিলাম (কবির খান জগন্নাথ কলেজে আমার ২ বছরের সিনিয়র ছিলেন)। তখন হঠাৎ করেই হুমায়ুন আজাদ চলে এলেন, হাতে দেখলাম একটি বই। ইতিমধ্যে দুটি চা কে তিন ভাগে ভাগ করে আমরা যখন আড্ডার মাঝামাঝি, ঠিক তখনই কবির ভাই, কেন যেন জানতে চাইলেন হেনা ভাই (ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল) হুমায়ুন, তোমার শিক্ষক ছিলেন কিনা? হুমায়ুন আজাদ কবির খানের কথা শুনেই বললেন- আবু হেনা তো কথায় ব্যস্ত এবং বিবিধ অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত- ওই যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কি যেন সব করেছিল- মেধা যেটুকু ছিল সেটুকু আর নেই, ইংল্যান্ডেই শেষ করে দেশে ফিরে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ১৯৫৮ সালে শিক্ষকতা শুরু করলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নাম ছাড়া শুনাম অর্জন করতে পারেননি, এমনকি জানি মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজশাহী বেতারে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে, ‘গড়গড়ি’ নামের একটি অনুষ্ঠানে... ওই অনুষ্ঠান শব্দের পরের শব্দে হুমায়ুন জানালেন কুটিল চরিত্রের ডাক্তার আবু হেনা মুস্তফা কামাল। আমি আর বশির খান নির্বোধের মতো হুমায়ুনের কথা শুনছিলাম। এমন সময় ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল গুটি গুটি পায়ে এসে ঢুকলেন কবির খানের প্রগতি প্রকাশনীতে।

ড. হেনাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল হুমায়ুন আজাদ। এবং অনুগত ছাত্রের মতো বিনীত কণ্ঠে বললেন, স্যার আমার চেয়ারে বসুন। আর হেনা মৃদু হেসে প্রথমে আমাকে বললেন, ‘তোকে দেখতে মইষের মতো মনে হচ্ছে। এত মোটা- সোয়েটারের ওপর আবার কোট লাগাইছিস’ আমি মাতুলের কথা শুনলাম, এবং মনে মনে রাগ করলাম, তিনি হুমায়ুনকে বললেন, হুমায়ুন কুৎসা রটনায় আপনি নাকি নায়কের ভূমিকায় আছেন শুনলাম- কবির ভাই শুধু জানালেন, হেনা ভাই, বসুন আমি চায়ের ব্যবস্থা করছি। হুমায়ুন চেয়ার ছেড়ে দিয়ে সেদিন আর বেশি সময় আমাদের সঙ্গে আড্ডা না দিয়ে কী একটা ছল দেখিয়ে হাতের বইটি ফেলে দ্রুত পায়ে যেন পালিয়ে গেলেন, হেনা স্যারের সামনে থেকে।

শিল্প-সাহিত্যের প্রাণবন্ত আড্ডা বসত, বাংলা অ্যাকাডেমিতে, কবি রফিক আজাদ, রশীদ হায়দারের রুমে, বাংলাদেশের তরুণ কবি লেখকদের নিত্যনৈমিত্তিক যাওয়া আসা, শিল্প সাহিত্যের আড্ডায় মাঝখানেই প্রতিমাসেই মাসিক ‘উত্তরাধিকার’ এবং মাসিক ধানশালিকের দেশ। ওই দুটি পত্রিকার জন্মসন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই। বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ড. মাজহারুল ইসলাম যিনি একাডেমিতে সেসব যোগ্য লেখক কবিদের ডেকে নিয়ে চাকরি দিয়েছিলেন, সেলিনা হোসেন, আসাদ চৌধুরী, সুব্রত বড়ুয়া, রফিক আজাদ, রশীদ হায়দারসহ আরও অনেকেই। বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকারে এবং ধান শালিকের দেশে আমরা যারা লেখা দিতে যেতাম, তার আগে গিয়ে দেখতাম রফিক ভাই আছেন কিনা, থাকলে বসত নবীনদের নিয়ে প্রাণবন্তু আড্ডা। শিল্প-সাহিত্যের সেই আড্ডা হারিয়ে গেছে কালের অতলে।

ঢাকা শহরের পরিধি বেড়েছে। সংকুচিত হয়েছে আড্ডা। তবে আজকাল শিল্প-সাহিত্যির আড্ডার চেয়ে দলবাজি বেড়েছে লক্ষনীয়ভাবে। বিভাজন সৃষ্টি শুরু হয়েছিল সেই ১৯৭৫ সালের পর থেকে, যার স্বরূপ প্রকট থেকে দিনকে দিন প্রকটতর হচ্ছে। লক্ষ করছি এ শতকের শুরুর ভাগ থেকেই, শিল্প-সাহিত্যের আড্ডা আজকাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, দলাদলি বিভাজনে। এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোন কোন কবি গল্প লেখক নাট্যকার সমাজের ওপর দিকে বিচরণ করছেন ঠিকই তবে তারা শিল্পকে প্রাধান্য না দিয়ে কোথায় কে কীভাবে নিজের স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখেই কেউ কেউ ধরছেন চেয়ার। কেউ কেউ নিচ্ছেন সেই চেয়ারের জোরে জাতীয় পুরস্কার।

বাংলা সাহিত্যে আড্ডাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তার বিখ্যাত ‘দেশে বিদেশে’ আত্মজীবনীতে লিখেছেন বাঙালির আড্ডা প্রসঙ্গে। ঢাকা শহরে বইপাড়া আজিজ মার্কেটে একসময় কিছুটা আড্ডা ছিল- আজিজ মার্কেটের উত্তর দিকেই ছিল ‘রেখায়ন’ নামের একটি ছবি আঁকার স্টুডিও। মালিক ছিলেন রাগীব আহসান। সেই রেখায়নের আড্ডার জন্ম দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। আহমদ ছফা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, শাহনূর খান, এমনকি স্থপতি কবি প্রাবন্ধিক রবিউল হুসাইন, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা এবং আমি, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আড্ডা বসত, নির্দলীয়ভাবে। ছফা ভাই যেদিন আসতেন, সেদিন তিনিই থাকতেন আড্ডার প্রধান ব্যক্তি, আর্ট কলেজের নবীন শিল্পীদের ভেতরে আসতেন অনেকেই। রেখায়ন তখন ছিল শাহবাগের একমাত্র তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার স্থল। শুধু আড্ডার স্থলই ছিল না, ছিল- প্রেমিক-প্রেমিকাদের আশ্রয় কেন্দ্র। কেননা, শিল্পী রাগীব আহসান, ছিলেন উদারমনা, তাই তিনি চা-মুড়ি দিয়ে মাঝে কলা বিস্কিটও মিলত আমাদের সবার জন্য। রেখায়ন, পরবর্তীতে বিশাল আকার ধারণ করল কাঁটাবন গিয়ে এবং একসময় নিউইয়র্ক পাড়ি দিল, মাঝখানে পাড়ি দিলেন আমাদের প্রিয় আহমদ ছফা ভাই, যিনি সত্য বৈ মিথ্যে কখনও বলতেন না, ফলশ্রুতিতে অনেক গদ্যকার-পদ্যকার তার প্রতি উষ্মা প্রকাশ করতেন আড়ালে-আবডালে। আমার বোধে, ওই রেখায়নই ছিল, শাহবাগের একমাত্র আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। যে প্রাণের আড্ডা এখনও মাঝে মাঝে অনুভব করি সেই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্য দিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারী’ ভূমিকা যদি আমরা পাঠ করি, সেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- উপযোগিতা সব কাজেরই একটা উপযোগী সীমা আছে। যা অন্য কাজের পক্ষের বাধা মাত্র, ময়রার দোকানের মধ্যে অ্যাটর্নি নিজের ব্যবসা চালাতে গেলে সহস বিঘ্নের দ্বারা প্রতিহত না হয়ে থাকতে পারে না এবং ভূতপূর্ব অ্যাটর্নির অফিসে যদি বিশেষ কারণবশত ময়রার দোকান খুলতে হয় তাহলে কি চৌকি টেবিল কাগজপত্র এবং স্তরে স্তরে সুসজ্জিত ল রিপোর্টের প্রতি মমতা প্রকাশ করলে চলে?

আমার মনে হয় হারানো আড্ডা, শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে বেসাতি না করে সত্যিকারের সাহিত্যের আড্ডা যদি পুনরায় ফিরে আসে আমাদের, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভেতরে তবে মনে হয় ভালো হয়। য়ুরোপ-যাত্রার ডায়ারী ১২ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, হায়! এ সংসারে কুসুম কণ্টক কলানাথে কলঙ্ক এবং বন্ধুত্বে বিচ্ছেদ আছে- কিন্তু ভাগ্যিস আছে! শুধু নেই সেই আড্ডার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া আমাদের রঙিন দিনগুলো।

আড্ডা থেকে সঞ্চয়

 মাকিদ হায়দার 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের জীবনের সমগ্র শীর্ষে ছুঁয়ে আছে অতীত রোমন্থন, প্রতিটি মানুষই অতীত প্রিয়, অতীতের কোনো সম্ভারই জীবন থেকে বাদ দেয়া সম্ভব নয়, আমাদের প্রতিদিনের উচ্চারণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবেই তার সবটুকুই আজ অবধি সম্পৃক্ত। বলা যেতে পারে সবটা পাতার মতো, এমনকি ডানাবিহীন মেঘের মতো, অতীতের স্মৃতি, সুভাষিত চিরকালের চিরদিনের। জীবনের চলার পথে ওইসব ফেলে আসা দিন, রাত এবং বিবিধ আড্ডার সম্ভার এবং তাদের ভূমিকা অপরিসীম। আমরা তখনই অসম্পূর্ণ যদি তাদের বাদ দিই, অথচ পারিনে হেতুই প্রাণের মুক্তি ও মনের সৌকর্য বিধৃত হয়ে আছে পথে প্রান্তরে। চলার পথে। যা কিছু ফেলে এসেছি, বা হারিয়ে ফেলেছি সে সবই খুঁজলে এখন আর পাওয়া যাবে না জেনেও আশঙ্কা জাগে, যদি কখনও কোথাও সামান্য একটু স্মৃতি ভাণ্ডারে গচ্ছিত থাকে, আমার সেসব ছোট ছোট আশায়, ছোট ছোট প্রত্যাশা হয়তো পূরণ হতে পারে, পুনরায় যদি ফিরে যেতে পারি আমাদের শিল্প সাহিত্যের আড্ডায়।

আমাদের অনেকেই হয়তো এখনও স্মৃতি কাতরতার অভাবে অবগাহন করতে গিয়ে দেখতে পান, সেই ৫০ দশকের মধ্যভাগের শিল্প সাহিত্যের আড্ডার স্বরূপ সন্ধান করলে দেখতে পারেন তখনকার দিনে, কবি-শিল্পী-সাহিতিক্যের ভেতরে বিভাজনটা খুব কমই ছিল, দেশ ভাগের পর তৎকালের পূর্ববঙ্গের যে জনাকয়েক শিল্পের সাধনায় নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের প্রধান যিনি ছিলেন তিনি শিল্পী জয়নুল আবেদীন। আবেদীন সাহেবকে ঘিরে বেশ কয়েকজন শিল্পী শুরু করেছিলেন শিল্পের আড্ডা, সেই আড্ডার ভেতরেই ছিল শিল্পের শিক্ষা। তবে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস এবং নাট্যকার, এরা ছিলেন সেকালের ঢাকা শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, তারা কোথায় কোথায় আড্ডা দিতেন- সেটি আমরা অনেকেই জেনেছিলেম মধ্য ৬০-এ এসে।

৬০ দশকের শুরুতেই ছিল, সে সময়ের রাজনীতির একটি ভিন্ন ধরনের আবহ, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের দোর্দণ্ড প্রতাপের শুরুতেই ভিন্ন কণ্ঠস্বরের মানুষেরা যেন চিরদিনের জন্য নিজেদের অবদমিত ভেবেছিল, সেই শাসনামলে, তার মাঝখানেই মাথা উঁচিয়ে কথা শুরু করেছিল তমদ্দুন মজলিশের পাকিস্তানপন্থী খ্যাত-অখ্যাত কবিতায় শিল্পী-সাহিত্যিক। তবে তাদের নিয়ে পরবর্তীতে তরুণেরা সেসব উদ্দিষ্টদের নির্বাসন দিয়েছিলেন, কেন নয়, একটি নতুন ধারার শুরু হয়েছিল, বিশেষত কবিতা গল্প উন্যাসে ও নিুমানের নাটকে। উচ্চমানের নাটকের সন্ধান করলে এখন অবধি পাওয়া দুষ্কর, শুধু যে নাটকই ছিল নিুমানের রচনা তাই নয়, সঙ্গে ছিল, গল্প, কবিতা, উপন্যাস।

কবিতায় দেখতে পেতাম অন্তমিলের প্রভাব বাংলা সাহিত্যের দুই অগ্রজ কবিদের কবিতার নকলে ছিল পূর্ববঙ্গের কবিদের অন্তমিলের ঘনঘটা। সেই ঘনঘটা থেকে বের হয়ে এসেছিলেন ৫০ দশকের গোড়ার দিক থেকেই, এমনও বলা হয়ে থাকে, তখনকার সময়ে- কবিদের কোথাও কোনো আড্ডার জায়গা না থাকায় অনেকেই সাহিত্যের আড্ডা বলতে যা বোঝায়, সেই স্বাদ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করলেও পুরোপুরি বঞ্চিত হতে দেননি, সে কালের বিখ্যাত পত্রিকা ‘সমকাল’-এর সম্পাদক, কবি নাট্যকার সিকান্দার আবু জাফর। সমকাল পত্রিকাটির অফিস মতিঝিলপাড়ার ডিআইটি রোডে হওয়ার সুবাদে, সমকালের অফিসে বসত ৬০ দশকের কবিদের প্রাণবন্ত আড্ডা, মধ্যমণি সিকান্দার আবু জাফর থাকলেও তার আড্ডার অন্যান্য কুশলীরা ছিলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবু হেনা মুস্তফা কামাল, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, জিয়া হায়দার, প্রজেশ রায়, কায়সুল হক, ফজল শাহাবউদ্দিন, কাইয়ুম চৌধুরী, কবি-শিল্পী ছাড়াও আসতেন গল্পকারেরা। সে কালের সমকাল মাসিক পত্রিকায়- গল্প-কবিতা ছাপা হলে, লেখক, কবিরা নিজেদের ধন্য ভাবতেন।

সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, জহির রায়হান এবং জনাকয়েক সাংবাদিকদের শিল্প সাহিত্যের আড্ডা বসত, পুরান ঢাকার প্রহলাল সাহার বিখ্যাত ‘বিউটিবোডিং’-এ সেই আড্ডার মধ্যমণি কখনও থাকনে সৈয়দ হক, কখনাও বা মৃদুভাষী সবার প্রিয় বাচ্চু ভাই, বা কবি শামসুর রাহমান, তবে আড্ডার সঙ্গদাতারা অনেকেই পরবর্তীতে কেউ বা হয়েছেন কবি এবং সংবাদ পাঠক। সে ক্ষেত্রে কবি এবং সংবাদ পাঠক কবি ইমরুল চৌধুরী। তিনি করাচি থেকে বাংলা সংবাদ পাঠ করতেন।

কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার পরিচয় সেই মধ্যষাটে, তিনি একসময় পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা শাখায় যোগ দিয়েছিলেন, তবে তিনি স্থায়ী হওয়ার আগেই নাকি চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি নিয়মিত আড্ডা দিতেন, গুলিস্তান সিনেমা হলের উত্তর দিকের ‘রেক্স’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে। তার আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল, বিদেশি কবি সাহিত্যিকদের গল্প-কবিতা। তবে কবিতাকেই তিনি প্রাধান্য দিতেন এবং সেই আড্ডায় প্রায়শই থাকতাম, আমি আমার বন্ধু প্রাবন্ধিক গাজী আজিজুর রহমান, মাঝেমধ্যে গল্পকার বুলবুল চৌধুরী। ঔপন্যাসিক গল্পকার হরিপদ দত্ত এবং কবি আবুল হাসান। তবে শহীদ কাদরীর নিত্যসঙ্গী ছিলেন ‘বুড়োদা’ এবং আমাদের আরেক বন্ধু বিপ্লব দাশ। তখনকার দিনে শহীদ ভাই আমাদের আপ্যায়ন করতেন ঘিয়ে ভাজা পরোটা ও কফি দিয়ে এবং মাঝে মধ্যে শুদ্ধ উর্দুতে শোনাতেন ভারতীয় উর্দু কবিদের কবিতার চরণ। এবং সেই সঙ্গে কবিতাটির অনুবাদ। কবিতায় যে শহীদ কাদরী অন্তঃপ্রাণ ছিলেন, হেতুই রেক্সের সেই আড্ডাতেই তার কণ্ঠে শুনতে পেয়েছিলেম ‘ফর এভার প্যালেসটাইন’ নামের বই থেকে, যার নাম ছিল ‘এ কালেকশন অব প্যালেসটাইন রেজিস্টেন্স পোয়েমস’ গ্রন্থ বা সংকলনটির নাম, সেই সংকলন থেকে তিনি, সেই শীতসন্ধ্যায় ইংরেজি কবিতা থেকে অনুবাদ মুখে মুখেই শুনিয়েছিলেন আমাদের। তখনও আমরা কবি ফাতওয়া তকান, রশীদ হুসাইন ফৌজি আল আসমার। মাহমুদ দায়কিমা, শামা আল কাসিমের নাম শোনান। মাহমুদ দারবিশের খ্যাতি পৃথিবী জোড়া, এসব বিখ্যাত কবিদের কবিতা রেক্সের আড্ডায় শুনতাম কাদরী ভাইয়ের মুখে। তিনি একদিন ইউরোপীয় তরুণ কবিদের কবিতা শুনিয়েছিলেন সেই দু-একজন কবির নাম স্মৃতির অতল থেকে খুঁজে পেতাম না যদি না দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সম্পাদক কবি জুননু রাইন, কবিদের আড্ডার বিষয় নিয়ে কিছু লিখতে না বলতেন।

ইউরোপীয় কবিদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কাদরী ভাই সেই সন্ধ্যায় বারবার যে কথাটি বলেছিলেন তার গূঢ়ার্থ পশ্চিম দেশীয় সাহিত্য পাঠ না করলে বিশেষত কবিতা- যেমন বুদ্ধদেব বসু কবি বোদলেয়ারকে পরিণিত করিয়েছেন- আমাদের কাছে এবং ম্যাক্সিম গোর্কিকে ননী ভৌমিক। এ ছাড়া তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে অরবীয় কবিদের পরিচিত করিয়েছিলেন কবি আবদুস সাত্তার, কাদরী ভাই বিদেশ পাড়ি দেয়ার বেশ কয়েক মাস আগে পুরানা পল্টনে তার বাসায় আড্ডার ছলে জনাকয়েক ইউরোপীয় কবিদের কবিতার অনুবাদ এবং নাম জানিয়েছিলেন তার ভেতরে কবি হিলারি লাই উইলিয়ান, উইলিয়ামস গ্রাহাম মার্ট, পিটার বার্টন, ছাড়াও এসেছিলেন অন্যান্য কবিদের নাম।

মধ্যষাটে পাকিস্তান গিল্ডের বদান্যতায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক ‘পরিক্রমা’ নামের একটি পত্রিকা, পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান- ১৯৬৬ সালে, পত্রিকাটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল বাংলা একাডেমির অভ্যর্থনা কক্ষে। তৎকালের করোগেটেড টিনের একটি দোচালা কামরায়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী, সম্ভবত শিল্পী কামরুল হাসান, ঔপন্যাসিক সরদার জয়েনউদ্দিনকেও দেখেছিলাম। পরিক্রমা পত্রিকাটির সহযোগী সম্পাদক ছিলেন আমার মেজ ভাই রশীদ হায়দার। সেই পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করেই মাসে একবার করে আড্ডা বসত, একাডেমিতে। কিন্তু পরিক্রমার আয়ুস্কাল দীর্ঘ হয়নি, শুরু হয়েছিল অন্তর্দ্বন্দ্ব। কেউ কেউ কথায় কথায় প্রায়শই বলতেন সম্পাদক শামসুর রাহমানকে করলেই ভালো হতো। তবে পরিক্রমায় সমৃদ্ধশালী লেখা ছাপা হতো এবং সেই কালের গল্পকারদের ভেতরে শওকত আলী, আবু রুশদ, রশীদ করিম, সৈয়দ শামসুল হক, এরাই ছিলেন অগ্রগণ্য। তারাও নিয়মিত অনিয়মিতভাবে শিল্প সাহিত্যের আড্ডা দিতেন, তৎকালের দৈনিক পাকিস্তানে কবি শামসুর রাহমানের কক্ষে। মাঝে আসতেন কবি আহসান হাবীব, ফজল শাহাবউদ্দিন, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ।

মোহাম্মদ মাহফুজউল্লার সম্পাদনায় সেই মধ্যষাটে পুরান ঢাকার ৬৮ নম্বর বেচারাম দেউরী থেকে লঞ্চ, কোম্পানির মালিক জনাব নুরুল হুদা নামের অর্থায়নে প্রকাশিত হতো, মাসিক ‘পূর্বাণী’ পরবর্তীতে কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, সাংবাদিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানে। তবে এদের অধিকাংশের আড্ডা হতো, সমকাল অফিসে, কখনও সিকান্দার আবু জাফরের উপস্থিতিতে। কখনও বা উদয়ন চৌধুরীর উপস্থিতিতে।

আড্ডার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা এবং গদ্য পদ্য উপন্যাস লেখার জন্য ছিল নিরিবিলি ‘বিউটি বোর্ডিং’। কবি শামসুর রাহমান একাধিকবার লিখেছেন তার প্রিয় বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডার এবং কবিতা লেখার কথা, এমনকি সৈয়দ শামসুল হক তার স্মৃতিচারণায় তার বিখ্যাত উপন্যাস, গল্প, কবিতা সবই লিখেছিলেন ওই প্রহ্লাদ সাহার বিউটি বোর্ডিংয়ের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে সৈয়দ হক লিখতেন। যেহেতু হক সাহেবদের বাড়ি লক্ষ্মীবাজারে আর শামসুর রাহমানদের বাড়ি পুরান ঢাকার আওলাদ হোসেন লেন- এ দুটির মাঝামাঝি অবস্থানে বিউটি বোর্ডিং। বিউটি বোর্ডিং হওয়ার সুবাদে অন্য বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে বসত শিল্পের আড্ডা সাহিত্যের আড্ডা।

শিল্প-সাহিত্যের সেই ঐতিহ্যময় আড্ডা ক্রমে ক্রমে হারিয়ে গেল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ১৯৭২ থেকে আমরা যারা ছিলাম তারুণ্যে উদ্দীপ্ত তাদের আড্ডার স্থল ছিল নিউমার্কেটের মনিকা রেস্টুরেন্ট। মনিকায় তখনকার দিনের উঠতি কবি, গল্পকার নাট্য অভিনেতা প্রায় প্রতিদিন বসত শিল্প-সহিত্যের আলাপ-আলোচনায়। নিউমার্কেটের প্রগতি প্রকাশনীতে কবির খানের ওখানে প্রায়শই যেতেন, কবি আবু হেনা মুস্তফা কামাল, কবি হুমায়ুন আজাদ, কবি আব্দুল সাত্তার, মঝে মধ্যে দেখতাম কবি আবু কায়সারকে। ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল যেদিন উপস্থিত থাকতেন সেদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনদিক দিয়ে যে পেরিয়ে যেত আমরা আড্ডার অংশীদারিরা কিছুতেই বুঝতে পারতাম না। ড. হেনার সুন্দর বাকচাতুর্যের অতলে সময় তলিয়ে যেত। আমার সেই তারুণ্যের কালে মনে হতো ড. হেনার মতো শিক্ষিত আড্ডাবাজ শিল্প-সাহিত্যের একান্ত কথক এবং বাক্যের পর কোন বাক্য সাজাতে হবে, হয়তো তিনিই জানতেন যদিও ড. হেনা আমাদের সম্পর্কের মামা।

এ প্রসঙ্গে ছোট একটি ঘটনার অবতারণা করা যেতে পারে। শীতকাল, কোনো এক ছুটির দিনে, প্রগতি প্রকাশনীর মালিক কবির খান ভাইয়ের ওখানে সেদিন আমিই প্রথম গিয়েছি। বেশ ভারী সোয়েটার এবং একটি কোট শরীরে চাপিয়ে কবির ভাই আমাদের দু’জনার জন্য ২টি চায়ের কথা বললেন, তার এক কর্মচারীকে। চায়ের দোকানটি ছিল সেকালের বিখ্যাত ‘নলেজ হোম’ এর আশপাশে। আমরা দু’জন যখন আমাদের জগন্নাথ কলেজের গল্প করছিলাম (কবির খান জগন্নাথ কলেজে আমার ২ বছরের সিনিয়র ছিলেন)। তখন হঠাৎ করেই হুমায়ুন আজাদ চলে এলেন, হাতে দেখলাম একটি বই। ইতিমধ্যে দুটি চা কে তিন ভাগে ভাগ করে আমরা যখন আড্ডার মাঝামাঝি, ঠিক তখনই কবির ভাই, কেন যেন জানতে চাইলেন হেনা ভাই (ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল) হুমায়ুন, তোমার শিক্ষক ছিলেন কিনা? হুমায়ুন আজাদ কবির খানের কথা শুনেই বললেন- আবু হেনা তো কথায় ব্যস্ত এবং বিবিধ অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত- ওই যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কি যেন সব করেছিল- মেধা যেটুকু ছিল সেটুকু আর নেই, ইংল্যান্ডেই শেষ করে দেশে ফিরে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ১৯৫৮ সালে শিক্ষকতা শুরু করলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নাম ছাড়া শুনাম অর্জন করতে পারেননি, এমনকি জানি মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজশাহী বেতারে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে, ‘গড়গড়ি’ নামের একটি অনুষ্ঠানে... ওই অনুষ্ঠান শব্দের পরের শব্দে হুমায়ুন জানালেন কুটিল চরিত্রের ডাক্তার আবু হেনা মুস্তফা কামাল। আমি আর বশির খান নির্বোধের মতো হুমায়ুনের কথা শুনছিলাম। এমন সময় ড. আবু হেনা মুস্তফা কামাল গুটি গুটি পায়ে এসে ঢুকলেন কবির খানের প্রগতি প্রকাশনীতে।

ড. হেনাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল হুমায়ুন আজাদ। এবং অনুগত ছাত্রের মতো বিনীত কণ্ঠে বললেন, স্যার আমার চেয়ারে বসুন। আর হেনা মৃদু হেসে প্রথমে আমাকে বললেন, ‘তোকে দেখতে মইষের মতো মনে হচ্ছে। এত মোটা- সোয়েটারের ওপর আবার কোট লাগাইছিস’ আমি মাতুলের কথা শুনলাম, এবং মনে মনে রাগ করলাম, তিনি হুমায়ুনকে বললেন, হুমায়ুন কুৎসা রটনায় আপনি নাকি নায়কের ভূমিকায় আছেন শুনলাম- কবির ভাই শুধু জানালেন, হেনা ভাই, বসুন আমি চায়ের ব্যবস্থা করছি। হুমায়ুন চেয়ার ছেড়ে দিয়ে সেদিন আর বেশি সময় আমাদের সঙ্গে আড্ডা না দিয়ে কী একটা ছল দেখিয়ে হাতের বইটি ফেলে দ্রুত পায়ে যেন পালিয়ে গেলেন, হেনা স্যারের সামনে থেকে।

শিল্প-সাহিত্যের প্রাণবন্ত আড্ডা বসত, বাংলা অ্যাকাডেমিতে, কবি রফিক আজাদ, রশীদ হায়দারের রুমে, বাংলাদেশের তরুণ কবি লেখকদের নিত্যনৈমিত্তিক যাওয়া আসা, শিল্প সাহিত্যের আড্ডায় মাঝখানেই প্রতিমাসেই মাসিক ‘উত্তরাধিকার’ এবং মাসিক ধানশালিকের দেশ। ওই দুটি পত্রিকার জন্মসন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই। বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ড. মাজহারুল ইসলাম যিনি একাডেমিতে সেসব যোগ্য লেখক কবিদের ডেকে নিয়ে চাকরি দিয়েছিলেন, সেলিনা হোসেন, আসাদ চৌধুরী, সুব্রত বড়ুয়া, রফিক আজাদ, রশীদ হায়দারসহ আরও অনেকেই। বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকারে এবং ধান শালিকের দেশে আমরা যারা লেখা দিতে যেতাম, তার আগে গিয়ে দেখতাম রফিক ভাই আছেন কিনা, থাকলে বসত নবীনদের নিয়ে প্রাণবন্তু আড্ডা। শিল্প-সাহিত্যের সেই আড্ডা হারিয়ে গেছে কালের অতলে।

ঢাকা শহরের পরিধি বেড়েছে। সংকুচিত হয়েছে আড্ডা। তবে আজকাল শিল্প-সাহিত্যির আড্ডার চেয়ে দলবাজি বেড়েছে লক্ষনীয়ভাবে। বিভাজন সৃষ্টি শুরু হয়েছিল সেই ১৯৭৫ সালের পর থেকে, যার স্বরূপ প্রকট থেকে দিনকে দিন প্রকটতর হচ্ছে। লক্ষ করছি এ শতকের শুরুর ভাগ থেকেই, শিল্প-সাহিত্যের আড্ডা আজকাল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, দলাদলি বিভাজনে। এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোন কোন কবি গল্প লেখক নাট্যকার সমাজের ওপর দিকে বিচরণ করছেন ঠিকই তবে তারা শিল্পকে প্রাধান্য না দিয়ে কোথায় কে কীভাবে নিজের স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখেই কেউ কেউ ধরছেন চেয়ার। কেউ কেউ নিচ্ছেন সেই চেয়ারের জোরে জাতীয় পুরস্কার।

বাংলা সাহিত্যে আড্ডাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তার বিখ্যাত ‘দেশে বিদেশে’ আত্মজীবনীতে লিখেছেন বাঙালির আড্ডা প্রসঙ্গে। ঢাকা শহরে বইপাড়া আজিজ মার্কেটে একসময় কিছুটা আড্ডা ছিল- আজিজ মার্কেটের উত্তর দিকেই ছিল ‘রেখায়ন’ নামের একটি ছবি আঁকার স্টুডিও। মালিক ছিলেন রাগীব আহসান। সেই রেখায়নের আড্ডার জন্ম দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই। আহমদ ছফা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, শাহনূর খান, এমনকি স্থপতি কবি প্রাবন্ধিক রবিউল হুসাইন, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা এবং আমি, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আড্ডা বসত, নির্দলীয়ভাবে। ছফা ভাই যেদিন আসতেন, সেদিন তিনিই থাকতেন আড্ডার প্রধান ব্যক্তি, আর্ট কলেজের নবীন শিল্পীদের ভেতরে আসতেন অনেকেই। রেখায়ন তখন ছিল শাহবাগের একমাত্র তরুণদের শিল্প-সাহিত্যের আড্ডার স্থল। শুধু আড্ডার স্থলই ছিল না, ছিল- প্রেমিক-প্রেমিকাদের আশ্রয় কেন্দ্র। কেননা, শিল্পী রাগীব আহসান, ছিলেন উদারমনা, তাই তিনি চা-মুড়ি দিয়ে মাঝে কলা বিস্কিটও মিলত আমাদের সবার জন্য। রেখায়ন, পরবর্তীতে বিশাল আকার ধারণ করল কাঁটাবন গিয়ে এবং একসময় নিউইয়র্ক পাড়ি দিল, মাঝখানে পাড়ি দিলেন আমাদের প্রিয় আহমদ ছফা ভাই, যিনি সত্য বৈ মিথ্যে কখনও বলতেন না, ফলশ্রুতিতে অনেক গদ্যকার-পদ্যকার তার প্রতি উষ্মা প্রকাশ করতেন আড়ালে-আবডালে। আমার বোধে, ওই রেখায়নই ছিল, শাহবাগের একমাত্র আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। যে প্রাণের আড্ডা এখনও মাঝে মাঝে অনুভব করি সেই স্মৃতি রোমন্থনের মধ্য দিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারী’ ভূমিকা যদি আমরা পাঠ করি, সেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- উপযোগিতা সব কাজেরই একটা উপযোগী সীমা আছে। যা অন্য কাজের পক্ষের বাধা মাত্র, ময়রার দোকানের মধ্যে অ্যাটর্নি নিজের ব্যবসা চালাতে গেলে সহস বিঘ্নের দ্বারা প্রতিহত না হয়ে থাকতে পারে না এবং ভূতপূর্ব অ্যাটর্নির অফিসে যদি বিশেষ কারণবশত ময়রার দোকান খুলতে হয় তাহলে কি চৌকি টেবিল কাগজপত্র এবং স্তরে স্তরে সুসজ্জিত ল রিপোর্টের প্রতি মমতা প্রকাশ করলে চলে?

আমার মনে হয় হারানো আড্ডা, শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে বেসাতি না করে সত্যিকারের সাহিত্যের আড্ডা যদি পুনরায় ফিরে আসে আমাদের, কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভেতরে তবে মনে হয় ভালো হয়। য়ুরোপ-যাত্রার ডায়ারী ১২ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, হায়! এ সংসারে কুসুম কণ্টক কলানাথে কলঙ্ক এবং বন্ধুত্বে বিচ্ছেদ আছে- কিন্তু ভাগ্যিস আছে! শুধু নেই সেই আড্ডার সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া আমাদের রঙিন দিনগুলো।