একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অপেক্ষায়
jugantor
একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অপেক্ষায়

  মামুনুর রশীদ  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাটকে এবং নাট্যপ্রিয় বাঙালির জীবনে নানাবিধ বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পর নাটক। নাটুকে কথাটি উচ্চারিত হল তার কারণ, বাঙালি জাতি হিসেবেও খুব নাটকীয়। তার জীবনে নাটক এত বেশি আবেগপ্রিয় যে সবসময়ই জীবনে সে নাটক আশা করে। স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যে কিছু একটা ঘটবে তা একেবারেই আকাঙ্ক্ষিত নয়। রূপকথার কাহিনীর মতো তার জীবনেও পরিবর্তন ঘটে, কোনো নাটকীয় সংবাদ তার জীবনধারাকে পাল্টে দেয়। লোককাহিনীর মধ্যেও আছে নাটক তাও অধিকাংশ সময় বিয়োগান্তক। কিন্তু গেরাসিম ল্যবেদেফ বাংলায় প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সূচনাকালে বলেছিলেন বাঙালি খুব লাস্যপ্রিয়। তাই মলিয়েরই হবে তার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন নীলদর্পণ রচিত হয় তা কিন্তু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আবার মাইকেল লেখেন প্রহসন। হাস্যরসের অন্তরালে এক করুণ কাহিনী। তাও কালক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজও তার সমসাময়িকতা রয়েছে।

মাইকেলের মেঘনাদবধ মহাকব্যেও আছে এক অনন্তকালের ট্র্যাজেডি। দেখা যাচ্ছে মাইকেল বা তার পরের নাট্যকাররা ট্র্যাজেডিই লিখেছেন এবং শেকসপিয়র দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও শেকসপিয়রকে বিশ্বকবি বলতেন এবং যথার্থই প্রভাবিত হয়েছেন। শেকসপিয়র দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণও সম্ভবত এই যে তিনিও ট্র্যাজেডি আক্রান্ত। দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে বিজন ভট্টাচার্যের নাটক নবান্ন জনপ্রিয় হয়েছিল যার মধ্যেও মানুষের জীবনের করুণতম কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এটাও সত্যি একেবারেই করুণ রসে ঠাসা কোনো কাহিনী মানুষ দেখতে চায় না। তার জন্য ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে তা হল রিলিফ। এ রিলিফ ছাড়া শুধুই শ্বাসরুদ্ধকর নাটক সফল হয় না।

আমাদের যাত্রাপালায় বড় বড় ট্র্যাজেডি আছে সেই ট্র্যাজেডির সঙ্গে যখন কোনোভাবেই হাস্যরসাত্মক কিছু যুক্ত করা যায় না তখন আলাদাভাবে নাট্য কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত নয় এমন দুজন ভাঁড়কে মঞ্চে নামিয়ে দেয়া হয় যারা দর্শককে হাসানোর কাজটি করে থাকে। সার্কাসেও ভাঁড়ের ব্যবহার এ হাস্যরসের কাজটি করে থাকে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কোনো খেলার পর এ রিলিফের কাজ করে থাকে। বাঙালির জীবনে দুঃখ-দুর্দশার অন্ত নেই। বন্যা, মহামারি, নদীর পাড় ভাঙা উদ্বাস্তু মানুষ নিজের জীবনটা যেমন দেখতে চায় তেমনি বিনোদনেও তার প্রত্যাশা থাকে।

একবার টেলিভিশনে গৃহকর্মীদের নিয়ে একটি ধারাবাহিক নাটক লিখেছিলাম। তাদের কষ্টকর জীবন সংগ্রাম ও স্বপ্নের কথা ছিল। গৃহকর্মীরা নাটকটি দেখল না আবার গৃহবধূরাও প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। গৃহকর্মীরা দেখল না কারণ সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর সে তার জীবনের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। নাটকটি প্রচার হওয়ার পর অনেক বাড়িতেই গৃহকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাওয়া গেল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ নাটক প্রচারের পরই গৃহবধূদের ও কর্মজীবী নারীদের অনেক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল। কিন্তু নাটকটি বন্ধ হল না, বরং কাহিনীটি একটু ঘুরিয়ে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হল অতীতে ফেলে আসা গ্রামের কিছু সুখ স্মৃতি যুক্ত হল। তারপর সেই সুখ স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তের ভাঙা-গড়ার গল্প নিয়ে আসায় নাটক নতুনভাবে দানা বেঁধে উঠল। আবার অন্য যারা গৃহকর্মীদের নিয়ে নাটক লিখলেন তাতে এমন সব হাস্যরসাত্মক ঘটনা নিয়ে এলেন যাতে সবাই শুধু বিনোদন খুঁজে পেল, জীবনের কোনো গভীরতাকে স্পর্শ করল না।

বর্তমানে অবশ্য টেলিভিশন নাটক শুধু বিনোদনের পেছনে ছুটছে। নতুন একটি শব্দও তৈরি হয়েছে যার নাম রোমান্টিক কমেডি। এ রোমান্টিক কমেডি আবার ছড়িয়ে পড়েছে ইউটিউবে। রোমান্টিক কমেডি এমন এক জিনিস যার সঙ্গে কিছুটা অশ্লীলতা যুক্ত করতে হয় এবং সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে টেলিভিশন নাটকের মুখ্য প্রবণতা। ভয় হয় কখন না জানি এ প্রবণতা মঞ্চ নাটকেও ঢুকে যায়। টেলিভিশন নাটক একদা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার কারণ দৈনন্দিন পারিবারিক বিনোদনের জন্য তথ্য ও অন্যান্য অনুষ্ঠান পরিবেশিত হতো। অনুষ্ঠানাদিতে থাকত কোনো না কোনো সামাজিক বাণী। এ বাণীর কারণে দর্শকদের একটা মনন গড়ে উঠার সুযোগ ছিল। এখন টিভি নাটকের নিুমুখী প্রযোজনার কারণে দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মাঝ বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত দর্শকরা ভারতীয় টেলিভিশন দেখে থাকে আর তরুণরা ইউটিউব, ওয়েব সিরিজে হামলে পড়েছে। এ ওয়েব সিরিজগুলো আবার বাংলাদেশের নয়।

মঞ্চ নাটকে এখনও রোমান্টিক কমেডি ঢুকতে পারেনি। একটা মর্যাদার লড়াই সেখানে আছে, কিন্তু টেলিভিশনে প্রচারিত বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রযোজনাগুলো যেহেতু মনন সৃষ্টি করতে পারছে না তাই সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে একটা ধস নামিয়ে দিয়েছে। সেই ধসে যাওয়া মানসিকতার দর্শকরা মঞ্চ নাটকে আনন্দ পাচ্ছেন না। তদুপরি রয়েছে নানা সংকট, আজকের দিনে নাটকের জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন তা ভীষণভাবে অপ্রতুল। মঞ্চ নাটকের দর্শক সারা পৃথিবীতেই কম, কারণ মঞ্চ নাটকের কলাকুশলীরা অগ্রসর সমাজের মানুষ। তাদের ভাবনাচিন্তা অগ্রসর মানুষের জন্য। সমসাময়িক কালকে তারা ব্যাখ্যা করেন, সমালোচনা করেন এবং দর্শককে বুদ্ধিদীপ্ত করে তোলার চেষ্টা করেন। এটা বুঝেই উন্নত বিশ্ব বিনোদনের উপাচার হিসেবে নিয়ে এসেছে মিউজিক্যাল। কালজয়ী এবং কঠিন কঠিন বিষয়বস্তুকে মিউজিক্যালের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।

ব্রডওয়েতে ভিক্টর হুগোর লে মিজেরভের (লা মিজারেবল) মতো উপন্যাসকে মিউজিক্যালে পরিণত করায় তা ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। এনা ক্যারেনিনার মতো উপন্যাসকে ব্যালেতে রূপান্তর করাও এক ধরনের কালজয়ী সৃষ্টি। যেসব উচ্চাঙ্গের শিল্প-সাহিত্য আছে তা সাধারণভাবে জনপ্রিয় হয় না। তাই সমাজের মেধাবী মানুষরা এগুলোকে নানাভাবে সংরক্ষণ করে থাকে এবং কালক্রমে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রেও উচ্চাঙ্গের শিল্প-সাহিত্য সবসময়ই বঞ্চিত হয়। কিন্তু টেলিভিশনে প্রচারের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার অভাব হয় না, কারণ তার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কিত থাকে।

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত রাষ্ট্রই এগিয়ে আসে। এটা কোনো করুণা থেকে নয় একেবারেই শিল্পের অধিকার। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এ বঞ্চিত হওয়ার ফলে মানুষের মেধা একটা সাধারণ পর্যায়েই থেকে যায়। আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সে, জাপানে, রাশিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই উচ্চাঙ্গের চর্চ্চা একেবারেই স্থায়ীভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সেখানে পাঠ্য ব্যবস্থায় খুব সুকৌশলে এসব শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করানোর ব্যবস্থাও থাকে।

প্রথমে যে আলোচনা করা হয়েছে তাতে মানুষের মননে কতটুকু সিরিয়াস ধর্মিতা এবং কতটা লাস্যপ্রিয়তা থাকবে তার একটা আনুপাতিক বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ কথাও সত্যি মানুষের জীবনজুড়ে যদি শুধু একটা গুরুগম্ভীর চলন থাকে তাহলে সে বাঁচবে না। তার সঙ্গে অবশ্যই অনেক বৈচিত্র্যময় বিষয়-আশয়ের প্রয়োজন আছে। যার মধ্য দিয়ে সে আনন্দও করবে। তবে এটাও সত্যি অনেক সিরিয়াস ঘটনার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে আবিষ্কারের আনন্দ। এ আবিষ্কারের আনন্দ মানুষকে বৃহত্তর জীবনের সন্ধান দেয়। নাটক বা উচ্চাঙ্গের সব সঙ্গীত, নৃত্যকলা, চারুকলা ও ধ্রুপদী চলচ্চিত্র এসবই মানুষকে মেধার দিক থেকে বড় করে তোলার মাধ্যম। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোয় এসব মেধার ক্রিয়াকলাপকে বর্জন করে স্থূল বিনোদনের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা সৃষ্টি করে। অথচ একেবারেই পৃষ্ঠপোষকতাহীন শিল্প হিসেবে নাটকে কলাকুশলীরা যে মেধার পরিচয় দিয়েছে তা নানা অর্থেই অসাধারণ।

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে শিশু থেকে বৃদ্ধ এমন সব অভিনেতা রয়েছে যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারত। কিন্তু তাদের লালনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। বরং লোকশিল্পের মধ্যে যেসব শিল্পীরা যুগ যুগ ধরে মানুষকে বিনোদন দিয়ে, ভাবনা দিয়ে সেবা করেছে তারাই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় কুসংস্কার। নানা ধরনের ফতোয়া এবং ভ্রান্ত অনুশাসন দিয়ে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের সঠিক উপায় আমার অন্তত জানা নেই। তবে একটা কথা জানি যে, দেশে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন। সেই বিপ্লবের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। অর্থ আর পেশিশক্তির প্রবল উত্থানের মুখে সাংস্কৃতিক আন্দোলন কতটা এগোতে পারবে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়কে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেখানে শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ছে। কিন্তু উপায় নেই ওই বিদ্যালয় থেকেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করতে হবে।

একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অপেক্ষায়

 মামুনুর রশীদ 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাটকে এবং নাট্যপ্রিয় বাঙালির জীবনে নানাবিধ বাধার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পর নাটক। নাটুকে কথাটি উচ্চারিত হল তার কারণ, বাঙালি জাতি হিসেবেও খুব নাটকীয়। তার জীবনে নাটক এত বেশি আবেগপ্রিয় যে সবসময়ই জীবনে সে নাটক আশা করে। স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যে কিছু একটা ঘটবে তা একেবারেই আকাঙ্ক্ষিত নয়। রূপকথার কাহিনীর মতো তার জীবনেও পরিবর্তন ঘটে, কোনো নাটকীয় সংবাদ তার জীবনধারাকে পাল্টে দেয়। লোককাহিনীর মধ্যেও আছে নাটক তাও অধিকাংশ সময় বিয়োগান্তক। কিন্তু গেরাসিম ল্যবেদেফ বাংলায় প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সূচনাকালে বলেছিলেন বাঙালি খুব লাস্যপ্রিয়। তাই মলিয়েরই হবে তার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন নীলদর্পণ রচিত হয় তা কিন্তু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আবার মাইকেল লেখেন প্রহসন। হাস্যরসের অন্তরালে এক করুণ কাহিনী। তাও কালক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আজও তার সমসাময়িকতা রয়েছে।

মাইকেলের মেঘনাদবধ মহাকব্যেও আছে এক অনন্তকালের ট্র্যাজেডি। দেখা যাচ্ছে মাইকেল বা তার পরের নাট্যকাররা ট্র্যাজেডিই লিখেছেন এবং শেকসপিয়র দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও শেকসপিয়রকে বিশ্বকবি বলতেন এবং যথার্থই প্রভাবিত হয়েছেন। শেকসপিয়র দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কারণও সম্ভবত এই যে তিনিও ট্র্যাজেডি আক্রান্ত। দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে বিজন ভট্টাচার্যের নাটক নবান্ন জনপ্রিয় হয়েছিল যার মধ্যেও মানুষের জীবনের করুণতম কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এটাও সত্যি একেবারেই করুণ রসে ঠাসা কোনো কাহিনী মানুষ দেখতে চায় না। তার জন্য ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে তা হল রিলিফ। এ রিলিফ ছাড়া শুধুই শ্বাসরুদ্ধকর নাটক সফল হয় না।

আমাদের যাত্রাপালায় বড় বড় ট্র্যাজেডি আছে সেই ট্র্যাজেডির সঙ্গে যখন কোনোভাবেই হাস্যরসাত্মক কিছু যুক্ত করা যায় না তখন আলাদাভাবে নাট্য কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত নয় এমন দুজন ভাঁড়কে মঞ্চে নামিয়ে দেয়া হয় যারা দর্শককে হাসানোর কাজটি করে থাকে। সার্কাসেও ভাঁড়ের ব্যবহার এ হাস্যরসের কাজটি করে থাকে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কোনো খেলার পর এ রিলিফের কাজ করে থাকে। বাঙালির জীবনে দুঃখ-দুর্দশার অন্ত নেই। বন্যা, মহামারি, নদীর পাড় ভাঙা উদ্বাস্তু মানুষ নিজের জীবনটা যেমন দেখতে চায় তেমনি বিনোদনেও তার প্রত্যাশা থাকে।

একবার টেলিভিশনে গৃহকর্মীদের নিয়ে একটি ধারাবাহিক নাটক লিখেছিলাম। তাদের কষ্টকর জীবন সংগ্রাম ও স্বপ্নের কথা ছিল। গৃহকর্মীরা নাটকটি দেখল না আবার গৃহবধূরাও প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। গৃহকর্মীরা দেখল না কারণ সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর সে তার জীবনের পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। নাটকটি প্রচার হওয়ার পর অনেক বাড়িতেই গৃহকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাওয়া গেল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে এ নাটক প্রচারের পরই গৃহবধূদের ও কর্মজীবী নারীদের অনেক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল। কিন্তু নাটকটি বন্ধ হল না, বরং কাহিনীটি একটু ঘুরিয়ে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হল অতীতে ফেলে আসা গ্রামের কিছু সুখ স্মৃতি যুক্ত হল। তারপর সেই সুখ স্মৃতির সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তের ভাঙা-গড়ার গল্প নিয়ে আসায় নাটক নতুনভাবে দানা বেঁধে উঠল। আবার অন্য যারা গৃহকর্মীদের নিয়ে নাটক লিখলেন তাতে এমন সব হাস্যরসাত্মক ঘটনা নিয়ে এলেন যাতে সবাই শুধু বিনোদন খুঁজে পেল, জীবনের কোনো গভীরতাকে স্পর্শ করল না।

বর্তমানে অবশ্য টেলিভিশন নাটক শুধু বিনোদনের পেছনে ছুটছে। নতুন একটি শব্দও তৈরি হয়েছে যার নাম রোমান্টিক কমেডি। এ রোমান্টিক কমেডি আবার ছড়িয়ে পড়েছে ইউটিউবে। রোমান্টিক কমেডি এমন এক জিনিস যার সঙ্গে কিছুটা অশ্লীলতা যুক্ত করতে হয় এবং সেটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে টেলিভিশন নাটকের মুখ্য প্রবণতা। ভয় হয় কখন না জানি এ প্রবণতা মঞ্চ নাটকেও ঢুকে যায়। টেলিভিশন নাটক একদা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল তার কারণ দৈনন্দিন পারিবারিক বিনোদনের জন্য তথ্য ও অন্যান্য অনুষ্ঠান পরিবেশিত হতো। অনুষ্ঠানাদিতে থাকত কোনো না কোনো সামাজিক বাণী। এ বাণীর কারণে দর্শকদের একটা মনন গড়ে উঠার সুযোগ ছিল। এখন টিভি নাটকের নিুমুখী প্রযোজনার কারণে দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মাঝ বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত দর্শকরা ভারতীয় টেলিভিশন দেখে থাকে আর তরুণরা ইউটিউব, ওয়েব সিরিজে হামলে পড়েছে। এ ওয়েব সিরিজগুলো আবার বাংলাদেশের নয়।

মঞ্চ নাটকে এখনও রোমান্টিক কমেডি ঢুকতে পারেনি। একটা মর্যাদার লড়াই সেখানে আছে, কিন্তু টেলিভিশনে প্রচারিত বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রযোজনাগুলো যেহেতু মনন সৃষ্টি করতে পারছে না তাই সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে একটা ধস নামিয়ে দিয়েছে। সেই ধসে যাওয়া মানসিকতার দর্শকরা মঞ্চ নাটকে আনন্দ পাচ্ছেন না। তদুপরি রয়েছে নানা সংকট, আজকের দিনে নাটকের জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন তা ভীষণভাবে অপ্রতুল। মঞ্চ নাটকের দর্শক সারা পৃথিবীতেই কম, কারণ মঞ্চ নাটকের কলাকুশলীরা অগ্রসর সমাজের মানুষ। তাদের ভাবনাচিন্তা অগ্রসর মানুষের জন্য। সমসাময়িক কালকে তারা ব্যাখ্যা করেন, সমালোচনা করেন এবং দর্শককে বুদ্ধিদীপ্ত করে তোলার চেষ্টা করেন। এটা বুঝেই উন্নত বিশ্ব বিনোদনের উপাচার হিসেবে নিয়ে এসেছে মিউজিক্যাল। কালজয়ী এবং কঠিন কঠিন বিষয়বস্তুকে মিউজিক্যালের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।

ব্রডওয়েতে ভিক্টর হুগোর লে মিজেরভের (লা মিজারেবল) মতো উপন্যাসকে মিউজিক্যালে পরিণত করায় তা ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। এনা ক্যারেনিনার মতো উপন্যাসকে ব্যালেতে রূপান্তর করাও এক ধরনের কালজয়ী সৃষ্টি। যেসব উচ্চাঙ্গের শিল্প-সাহিত্য আছে তা সাধারণভাবে জনপ্রিয় হয় না। তাই সমাজের মেধাবী মানুষরা এগুলোকে নানাভাবে সংরক্ষণ করে থাকে এবং কালক্রমে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রেও উচ্চাঙ্গের শিল্প-সাহিত্য সবসময়ই বঞ্চিত হয়। কিন্তু টেলিভিশনে প্রচারের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার অভাব হয় না, কারণ তার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কিত থাকে।

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত রাষ্ট্রই এগিয়ে আসে। এটা কোনো করুণা থেকে নয় একেবারেই শিল্পের অধিকার। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এ বঞ্চিত হওয়ার ফলে মানুষের মেধা একটা সাধারণ পর্যায়েই থেকে যায়। আমেরিকায়, ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সে, জাপানে, রাশিয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই উচ্চাঙ্গের চর্চ্চা একেবারেই স্থায়ীভাবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। সেখানে পাঠ্য ব্যবস্থায় খুব সুকৌশলে এসব শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করানোর ব্যবস্থাও থাকে।

প্রথমে যে আলোচনা করা হয়েছে তাতে মানুষের মননে কতটুকু সিরিয়াস ধর্মিতা এবং কতটা লাস্যপ্রিয়তা থাকবে তার একটা আনুপাতিক বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এ কথাও সত্যি মানুষের জীবনজুড়ে যদি শুধু একটা গুরুগম্ভীর চলন থাকে তাহলে সে বাঁচবে না। তার সঙ্গে অবশ্যই অনেক বৈচিত্র্যময় বিষয়-আশয়ের প্রয়োজন আছে। যার মধ্য দিয়ে সে আনন্দও করবে। তবে এটাও সত্যি অনেক সিরিয়াস ঘটনার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে আবিষ্কারের আনন্দ। এ আবিষ্কারের আনন্দ মানুষকে বৃহত্তর জীবনের সন্ধান দেয়। নাটক বা উচ্চাঙ্গের সব সঙ্গীত, নৃত্যকলা, চারুকলা ও ধ্রুপদী চলচ্চিত্র এসবই মানুষকে মেধার দিক থেকে বড় করে তোলার মাধ্যম। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোয় এসব মেধার ক্রিয়াকলাপকে বর্জন করে স্থূল বিনোদনের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা সৃষ্টি করে। অথচ একেবারেই পৃষ্ঠপোষকতাহীন শিল্প হিসেবে নাটকে কলাকুশলীরা যে মেধার পরিচয় দিয়েছে তা নানা অর্থেই অসাধারণ।

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে শিশু থেকে বৃদ্ধ এমন সব অভিনেতা রয়েছে যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারত। কিন্তু তাদের লালনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। বরং লোকশিল্পের মধ্যে যেসব শিল্পীরা যুগ যুগ ধরে মানুষকে বিনোদন দিয়ে, ভাবনা দিয়ে সেবা করেছে তারাই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় কুসংস্কার। নানা ধরনের ফতোয়া এবং ভ্রান্ত অনুশাসন দিয়ে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের সঠিক উপায় আমার অন্তত জানা নেই। তবে একটা কথা জানি যে, দেশে একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন। সেই বিপ্লবের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। অর্থ আর পেশিশক্তির প্রবল উত্থানের মুখে সাংস্কৃতিক আন্দোলন কতটা এগোতে পারবে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূতিকাগার বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়কে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেখানে শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ছে। কিন্তু উপায় নেই ওই বিদ্যালয় থেকেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করতে হবে।