সামাজিক অবক্ষয় ও নারী নির্যাতন
jugantor
সামাজিক অবক্ষয় ও নারী নির্যাতন

  ড. রিয়াজুল হক  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিককালে পত্রিকার পাতা কিংবা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধির প্রবণতা আমাদের চিন্তিত করে তুলেছে। প্রতিদিন একে পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ ব্যাপারে যতই সরব, ঠিক উল্টা চিত্র পাওয়া যায় রাষ্ট্রতন্ত্র যারা পরিচালনা করছে, তাদের কাছ থেকে। প্রতিদিনই আমরা দেখছি নারী ঘরে, বাইরে কর্মস্থলে, বাসে, ট্রেনে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শুধু তাই নয় নির্যাতনের পর তাকে হত্যাও করা হচ্ছে। এসব ঘটনার পরও সুষ্ঠু ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করা যায় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। নাজনীন ধর্ষণ মামলার চূড়ান্ত রায় পেতেও তার প্রভাবশালী ধনাঢ়্য পরিবারকে এক যুগেরও বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাহলে প্রত্যেক নির্যাতিতা নারী ও শিশুদের সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার আশা করা যে যাচ্ছে না তা বোঝা যাচ্ছে।

প্রশ্ন জাগতেই পারে স্বাধীনতার ৫০ বছর এর প্রাক্কালে এর জাতির পিতার জন্মশর্ত বার্ষিকীর সময় এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা একের পর ঘটেই চলেছে। নাজনীন নিজগৃহে তনু তার আবাসস্থলে এবং নুসরাত নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক দ্বারা নির্যাতিত। দুই মাস বয়সের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা নারী কেউই এ সহিংসতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখলেও ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নারীরা। মানবাধিকার সংস্থা- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়- গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের প্রচলিত আইন কী এ অনাচার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। তবে আইন জানা ও আইনের প্রায়োগিক দিক না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই তা অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই আইনের ৯ (২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে।’ একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে সর্বনিু জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।’ এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে- এত কঠিন আইন থাকাসত্ত্বে শুধু প্রয়োগের অভাবে এ জঘন্য অপরাধের বিচার হচ্ছে না।

ধর্ষণ আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে অনেকেই বিশেষ করে নারী সংস্থাগুলো আদৌ সন্তুষ্ট নয়। বহুভাবেই পুরুষ নারীর ওপর যৌন-অত্যাচার (sexual assault) করতে পরে যা আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আর তাই এ ধরনের আপত্তিকর আচরণ আইনের আওতায় পড়বে না। এ কারণে আমরা কর্পোরেট অফিসগুলোতে নারী নির্যাতনের হার বাড়তে দেখি। আইন যাই থাকুক না কেন আমাদের সমাজের অতি-রক্ষণশীলতা এবং পারিবারিক সমস্যাকে গোপন রাখার চেষ্টা ধর্ষণকারীদের শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়।

নারী নির্যাতন কেন বাড়ছে?

মহিলা আইনজীবী সমিতির এক জরিপে বলা হয়েছে নানা কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে থাকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে ‘প্রশাসনে দলীয় লোক থাকার কারণে এসব ঘটনার অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়ার আরেক কারণ। এছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে ধর্ষণ মহামারি রূপ নিয়েছে। তাই আইনের প্রয়োগে জনতার অংশগ্রহণ ও সামাজিকভাবে ধর্ষকদের শাস্তি দিতে হবে। এক্ষেত্রে হতে পারে চিহ্নিত ধর্ষকদের ছবি বা পোস্টার এলাকায় এলাকায় ছড়ানো। তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক না রাখা। সামাজিকভাবে সর্বত্র তাদের চলা ফেরায় সীমাহীন লজ্জা বা অপমান করা। যাতে করে লজ্জার সংস্কৃতি সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে। কারণ লজ্জার সংস্কৃতির অভাবেই আজ একটি পরিবার নির্লজ্জ হয়ে তার ধর্ষক ছেলে, ভাই ও আত্মীয়দের বাঁচাতে আসে। জাপানে একজন মানুষ সাধারণ লজ্জায় আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। অথচ এদেশে ধর্ষণ করে মিষ্টি খাওয়ানোর সংস্কৃতি চালু ছিল। যেসব পুরুষ এ ধরনের অপরাধ একের পর এক করেই যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক একটি গোপনীয় প্রায়ই যোগসৃত পাওয়া যায়। ফলস্বরূপ পুলিশ ও মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং সর্বোপরি বিচার বিভাগ লোক ন্যায়বিচার পাওয়া সুদূর পরাহত বিষয়ে নরপশুরা একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার সহিংসতার সঙ্গে রাজনৈতিক পেশি শক্তির সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কিছুদিন পূর্বে জাতীয় সংসদে ধর্ষকদের প্রকাশ্যে শাস্তি প্রদান করার জন্য ফাঁসি দেয়ার কথা বলা হয়। এতে করে সরকারের/রাষ্ট্রের অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠে।

নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের মানসিকতা কোথা থেকে আসে?

পুঁজিবাদ মানুষকে ঢেলে দিচ্ছে প্রতিযোগিতার মধ্যে যেখানে নারীকে উপস্থাপন করা হচ্ছে পণ্য হিসেবে। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। বয়ঃসন্ধির সমস্যা, স্কুলের চাপ, বিশৃঙ্খল বা কঠোর পারিবারিক পরিবেশ-প্রভৃতি ভুলে থাকতেই অনেক কিশোর-কিশোরী নেটের আশ্রয় নেয়। বাবা-মা অনেক সময় এ আসক্তির ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না, যতক্ষণ না বাচ্চার আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। আর এ আসক্তির মধ্যেই তারা হঠাৎ সেই পর্নোগ্রাফির নীল জগতে প্রবেশ করে। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বয়স্করাও আসক্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতে। পর্নোগ্রাফির ছোবলে নৈতিকতার অবক্ষয় যেমন হচ্ছে, নারী নির্যাতন বাড়ছে, দম্পতিদের মধ্যে বিশ্বাস ভঙ্গের কারণসহ নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ইন্টারনেট ফিল্টার রিভিউ ডটকম বলছে-পর্নোগ্রাফি দেখছে এমন দর্শকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছর। এমনকি ১১ বছরের শিশুরাও পর্নোগ্রাফির ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছে। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিকে ভীতিকর হিসেবেই দেখছেন সামাজিক বিজ্ঞানীরা।

তাছাড়া বিবাহিত দম্পতিদের মাঝে এর রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। পর্নোগ্রাফি প্রথমত সাংসারিক জীবনে বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। অথচ বিয়ে জীবনটা বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তৈরি হয়। পর্নোগ্রাফি অপ্রাকৃতিক ও অপ্রত্যাশিত সমস্যা তৈরি করে। এটি একটি চলচ্চিত্র। যেখানে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের টাকার বিনিময়ে অভিনয়টুকু শুধু করেন। তাদের বিকৃতভাবে ও অনিচ্ছাকৃতভাবে কম বয়সীদের মাদকাসক্ত করে অস্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। যার কোনো বাস্তব ও সুস্থ ভিত্তি নেই। এজন্য অনেকে পর্নোগ্রাফি দেখার পর তা নিজেদের যৌন জীবনে প্রয়োগ করতে গিয়ে সংসার জীবনে অশান্তি ডেকে আনেন। পর্নো একধরনের আসক্তি যা আপনাকে কখনও তৃপ্ত করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে পর্নো মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক উম্মাদনা তৈরি করে বলে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পাওয়া যায়, যা কোকেনের চেয়েও বেশি আসক্ত করে তোলে। এ পর্নো ইন্ডাস্ট্রির বিশ্বব্যাপী বাজারের পরিমাণ প্রায় ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল ২০১৭ সালে। আমেরিকার নিজ দেশে বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এ ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বব্যাপী কী পরিমাণ ব্যবসা করছে তা নিুের চিত্রে তুলে ধরা হল বিলিয়ন ডলার হিসাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে এমন কেন হচ্ছে? যুব সমাজের একটা বিশাল অংশ কার্যত বেকার। বছরের পর বছর আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকলেও- আমাদের কর্মসংস্থান সহায়ক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিড্যান্ডের কথা বললেও আমরা এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি! আজকে শুধু কর্মসংস্থানের অভাবে আমাদের প্রায় ৯৯ লাখ জনশক্তি দেশের বাইরে কাজ করছে বৈধ ও অবৈধ অভিবাসী হয়ে। অথচ সেই আমরা দেশে দক্ষতা নির্ভর কাজ যেমন মার্চেন্ডাইজিং, ম্যানেজমেন্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং কাজে নিয়োজিত বিদেশি দক্ষ শ্রমিকদের বছরে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেতন প্রদান করি। আমাদের দেশে এত চিকিৎসক ও হাসপাতাল থাকাসত্ত্বে ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর ভারতে আমাদের উন্নত চিকিৎসা নিতে ব্যয় করি ৫ হাজার কোটি টাকা। তাহলে আমাদের এ শিক্ষা ব্যবস্থা বাজার চাহিদা অনুপাতে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই উচ্চশিক্ষা অর্জন করে চাকরি না পেয়ে জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে হাজার যুবক। যারা শুধু কর্মসংস্থান বলতে বিসিএস বা সরকারি চাকরি বোঝে। সুস্থ বিনোদনের অভাব। শহুরে এলাকায় এখন আর পাঠাগার নেই, নেই খেলার মাঠ। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সবাই টেকনোলজিক্যাল স্টুপিড হয়ে যাচ্ছে। একজন আরেকজনের পাশে বসে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়। কিন্তু কেউ কারও পাশে বসে একটু কথা বলার সময় হয় না। একটা মিথ্যা ভার্চুয়াল জগতের মোহ আমাদের তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করে রেখেছে। এর মাধ্যমে বাড়ছে চরম একাকিত্ব। আর এ হতাশায় ও একাকিত্বে ভুগে মানুষ সেবন করছে মাদক। দেখছে পর্নোগ্রাফি। পুঁজিবাদের ছোঁয়ায় ভোগের মাত্রা এ পরিমাণ বেড়েছে যে- একজন কিশোরী যেখানে বন্ধু বা প্রেমিক হিসেবে সময় কাটানোর কথা তরুণ বা কিশোরের সঙ্গে, সে এখন শুধুই আর্থিক নিরাপত্তার কারণে একজন বয়সী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। তরুণীদের মাঝে রঙিন পৃথিবীর মোহ স্বাভাবিক ভালোবাসা থেকে তাদের অস্বাভাবিক সম্পর্ক জড়াতে উৎসাহিত করছে।

নারী নির্যাতন রোধের উপায়

আইন থাকাসত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান হারে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে প্রণীত আইনগুলোর বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা ও আইনের প্রয়োগ-পদ্ধতিতে ত্রুটি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের পর্যবেক্ষণ- আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। দায়িত্ব, জবাবদিহি, কৌশল ইত্যাদি আইনে সঠিকভাবে বলা নেই। ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের সঠিক নির্দেশনা নেই। আমরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখছি যে ধর্ষককে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা এবং ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার পর সাধারণ জনগণ এর পক্ষে বক্তব্য দিতে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ জনগণ এ ধরনের দৃঢ় বক্তব্য দিচ্ছে, যা কাম্য নয়। আমাদের অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধী যেই হোক তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা না দিয়ে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি বিচর ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারী ও শিশুর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্যের পরিবর্তে নারী/কন্যা সন্তানকে মা/বোন কন্যা রূপে নারীকে নম্র, দয়াবান ও মায়াবতীর চিত্রায়ন থেকে বের করে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিবর্তিত হবে না।

অনেকেই বলেন- ভালো মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয় না। পোশাকের সমস্যার কারণে মেয়েরা ধর্ষিত হয়। আর কোনো আলেম বলবেন- পর্দা প্রথায় ফিরে আসলে ধর্ষণ আর হবে না। আবার অনেকে বলবেন- কঠোর শাস্তি দিলে ধর্ষণ কমবে। সেই মক্কা-মদিনায় আরব দেশে পর্দা মানা হয়, সেখানেও তো ভূরি ভূরি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তাদের শাস্তি প্রকাশ্য শিরশ্ছেদ। সেখানেও ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। যৌন নির্যাতন বন্ধে আগে মানসিকতা বদলাতে হবে। ধর্মে নারীকে পর্দা করতে বললেও পুরুষদেরও চোখ অবনত রাখতে বলা হয়েছে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, নেশা, উচ্চাভিলাষ, সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ও তরুণ প্রজন্মকে পর্নোগ্রাফির নীল ছোবল থেকে থেকে বাঁচাতে হবে। অনলাইনে সবগুলো পর্নো সাইট বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বন্ধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পিতামাতাকে ভাবতে হবে- আপনার সন্তান অনলাইনে কী করছে, তা জানার দায়িত্ব আপনার। পাশাপাশি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী ও কন্যা নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার আইনে সাজা প্রদান, জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষানীতি ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে জেন্ডার ও মানবাধিকার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তাছাড়া, যুবসমাজকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। স্বাভাবিক, সুস্থ ও সমতা ভিত্তিক সমাজ বির্নিমাণে তাই সব প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হবে। তাহলেই এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

সামাজিক অবক্ষয় ও নারী নির্যাতন

 ড. রিয়াজুল হক 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিককালে পত্রিকার পাতা কিংবা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধির প্রবণতা আমাদের চিন্তিত করে তুলেছে। প্রতিদিন একে পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ ব্যাপারে যতই সরব, ঠিক উল্টা চিত্র পাওয়া যায় রাষ্ট্রতন্ত্র যারা পরিচালনা করছে, তাদের কাছ থেকে। প্রতিদিনই আমরা দেখছি নারী ঘরে, বাইরে কর্মস্থলে, বাসে, ট্রেনে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শুধু তাই নয় নির্যাতনের পর তাকে হত্যাও করা হচ্ছে। এসব ঘটনার পরও সুষ্ঠু ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা করা যায় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। নাজনীন ধর্ষণ মামলার চূড়ান্ত রায় পেতেও তার প্রভাবশালী ধনাঢ়্য পরিবারকে এক যুগেরও বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাহলে প্রত্যেক নির্যাতিতা নারী ও শিশুদের সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার আশা করা যে যাচ্ছে না তা বোঝা যাচ্ছে।

প্রশ্ন জাগতেই পারে স্বাধীনতার ৫০ বছর এর প্রাক্কালে এর জাতির পিতার জন্মশর্ত বার্ষিকীর সময় এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা একের পর ঘটেই চলেছে। নাজনীন নিজগৃহে তনু তার আবাসস্থলে এবং নুসরাত নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক দ্বারা নির্যাতিত। দুই মাস বয়সের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা নারী কেউই এ সহিংসতার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি বড় ভূমিকা রাখলেও ঘরের মধ্যে নারীর অবস্থা তেমন বদলায়নি। দেশের বিবাহিত নারীদের ৮৭ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নারীরা। মানবাধিকার সংস্থা- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়- গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের প্রচলিত আইন কী এ অনাচার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে? বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। তবে আইন জানা ও আইনের প্রায়োগিক দিক না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই তা অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই আইনের ৯ (২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে।’ একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে সর্বনিু জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।’ এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে- এত কঠিন আইন থাকাসত্ত্বে শুধু প্রয়োগের অভাবে এ জঘন্য অপরাধের বিচার হচ্ছে না।

ধর্ষণ আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়ে অনেকেই বিশেষ করে নারী সংস্থাগুলো আদৌ সন্তুষ্ট নয়। বহুভাবেই পুরুষ নারীর ওপর যৌন-অত্যাচার (sexual assault) করতে পরে যা আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আর তাই এ ধরনের আপত্তিকর আচরণ আইনের আওতায় পড়বে না। এ কারণে আমরা কর্পোরেট অফিসগুলোতে নারী নির্যাতনের হার বাড়তে দেখি। আইন যাই থাকুক না কেন আমাদের সমাজের অতি-রক্ষণশীলতা এবং পারিবারিক সমস্যাকে গোপন রাখার চেষ্টা ধর্ষণকারীদের শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে বিরাট অন্তরায়।

নারী নির্যাতন কেন বাড়ছে?

মহিলা আইনজীবী সমিতির এক জরিপে বলা হয়েছে নানা কারণে ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে থাকে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে ‘প্রশাসনে দলীয় লোক থাকার কারণে এসব ঘটনার অপরাধীরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়ার আরেক কারণ। এছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে ধর্ষণ মহামারি রূপ নিয়েছে। তাই আইনের প্রয়োগে জনতার অংশগ্রহণ ও সামাজিকভাবে ধর্ষকদের শাস্তি দিতে হবে। এক্ষেত্রে হতে পারে চিহ্নিত ধর্ষকদের ছবি বা পোস্টার এলাকায় এলাকায় ছড়ানো। তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক না রাখা। সামাজিকভাবে সর্বত্র তাদের চলা ফেরায় সীমাহীন লজ্জা বা অপমান করা। যাতে করে লজ্জার সংস্কৃতি সৃষ্টি হয় বাংলাদেশে। কারণ লজ্জার সংস্কৃতির অভাবেই আজ একটি পরিবার নির্লজ্জ হয়ে তার ধর্ষক ছেলে, ভাই ও আত্মীয়দের বাঁচাতে আসে। জাপানে একজন মানুষ সাধারণ লজ্জায় আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। অথচ এদেশে ধর্ষণ করে মিষ্টি খাওয়ানোর সংস্কৃতি চালু ছিল। যেসব পুরুষ এ ধরনের অপরাধ একের পর এক করেই যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক একটি গোপনীয় প্রায়ই যোগসৃত পাওয়া যায়। ফলস্বরূপ পুলিশ ও মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং সর্বোপরি বিচার বিভাগ লোক ন্যায়বিচার পাওয়া সুদূর পরাহত বিষয়ে নরপশুরা একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার সহিংসতার সঙ্গে রাজনৈতিক পেশি শক্তির সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কিছুদিন পূর্বে জাতীয় সংসদে ধর্ষকদের প্রকাশ্যে শাস্তি প্রদান করার জন্য ফাঁসি দেয়ার কথা বলা হয়। এতে করে সরকারের/রাষ্ট্রের অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠে।

নারী নির্যাতন বা ধর্ষণের মানসিকতা কোথা থেকে আসে?

পুঁজিবাদ মানুষকে ঢেলে দিচ্ছে প্রতিযোগিতার মধ্যে যেখানে নারীকে উপস্থাপন করা হচ্ছে পণ্য হিসেবে। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। বয়ঃসন্ধির সমস্যা, স্কুলের চাপ, বিশৃঙ্খল বা কঠোর পারিবারিক পরিবেশ-প্রভৃতি ভুলে থাকতেই অনেক কিশোর-কিশোরী নেটের আশ্রয় নেয়। বাবা-মা অনেক সময় এ আসক্তির ব্যাপারটা বুঝতে পারেন না, যতক্ষণ না বাচ্চার আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। আর এ আসক্তির মধ্যেই তারা হঠাৎ সেই পর্নোগ্রাফির নীল জগতে প্রবেশ করে। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বয়স্করাও আসক্ত হচ্ছে পর্নোগ্রাফিতে। পর্নোগ্রাফির ছোবলে নৈতিকতার অবক্ষয় যেমন হচ্ছে, নারী নির্যাতন বাড়ছে, দম্পতিদের মধ্যে বিশ্বাস ভঙ্গের কারণসহ নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ইন্টারনেট ফিল্টার রিভিউ ডটকম বলছে-পর্নোগ্রাফি দেখছে এমন দর্শকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছর। এমনকি ১১ বছরের শিশুরাও পর্নোগ্রাফির ছোবলে আক্রান্ত হচ্ছে। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিকে ভীতিকর হিসেবেই দেখছেন সামাজিক বিজ্ঞানীরা।

তাছাড়া বিবাহিত দম্পতিদের মাঝে এর রয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। পর্নোগ্রাফি প্রথমত সাংসারিক জীবনে বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। অথচ বিয়ে জীবনটা বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তৈরি হয়। পর্নোগ্রাফি অপ্রাকৃতিক ও অপ্রত্যাশিত সমস্যা তৈরি করে। এটি একটি চলচ্চিত্র। যেখানে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের টাকার বিনিময়ে অভিনয়টুকু শুধু করেন। তাদের বিকৃতভাবে ও অনিচ্ছাকৃতভাবে কম বয়সীদের মাদকাসক্ত করে অস্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। যার কোনো বাস্তব ও সুস্থ ভিত্তি নেই। এজন্য অনেকে পর্নোগ্রাফি দেখার পর তা নিজেদের যৌন জীবনে প্রয়োগ করতে গিয়ে সংসার জীবনে অশান্তি ডেকে আনেন। পর্নো একধরনের আসক্তি যা আপনাকে কখনও তৃপ্ত করতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে পর্নো মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক উম্মাদনা তৈরি করে বলে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পাওয়া যায়, যা কোকেনের চেয়েও বেশি আসক্ত করে তোলে। এ পর্নো ইন্ডাস্ট্রির বিশ্বব্যাপী বাজারের পরিমাণ প্রায় ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল ২০১৭ সালে। আমেরিকার নিজ দেশে বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এ ইন্ডাস্ট্রি বিশ্বব্যাপী কী পরিমাণ ব্যবসা করছে তা নিুের চিত্রে তুলে ধরা হল বিলিয়ন ডলার হিসাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে এমন কেন হচ্ছে? যুব সমাজের একটা বিশাল অংশ কার্যত বেকার। বছরের পর বছর আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ভালো থাকলেও- আমাদের কর্মসংস্থান সহায়ক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। ডেমোগ্রাফিক ডিভিড্যান্ডের কথা বললেও আমরা এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি! আজকে শুধু কর্মসংস্থানের অভাবে আমাদের প্রায় ৯৯ লাখ জনশক্তি দেশের বাইরে কাজ করছে বৈধ ও অবৈধ অভিবাসী হয়ে। অথচ সেই আমরা দেশে দক্ষতা নির্ভর কাজ যেমন মার্চেন্ডাইজিং, ম্যানেজমেন্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং কাজে নিয়োজিত বিদেশি দক্ষ শ্রমিকদের বছরে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেতন প্রদান করি। আমাদের দেশে এত চিকিৎসক ও হাসপাতাল থাকাসত্ত্বে ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী প্রতিবছর ভারতে আমাদের উন্নত চিকিৎসা নিতে ব্যয় করি ৫ হাজার কোটি টাকা। তাহলে আমাদের এ শিক্ষা ব্যবস্থা বাজার চাহিদা অনুপাতে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই উচ্চশিক্ষা অর্জন করে চাকরি না পেয়ে জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে হাজার যুবক। যারা শুধু কর্মসংস্থান বলতে বিসিএস বা সরকারি চাকরি বোঝে। সুস্থ বিনোদনের অভাব। শহুরে এলাকায় এখন আর পাঠাগার নেই, নেই খেলার মাঠ। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সবাই টেকনোলজিক্যাল স্টুপিড হয়ে যাচ্ছে। একজন আরেকজনের পাশে বসে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়। কিন্তু কেউ কারও পাশে বসে একটু কথা বলার সময় হয় না। একটা মিথ্যা ভার্চুয়াল জগতের মোহ আমাদের তরুণ সমাজকে আকৃষ্ট করে রেখেছে। এর মাধ্যমে বাড়ছে চরম একাকিত্ব। আর এ হতাশায় ও একাকিত্বে ভুগে মানুষ সেবন করছে মাদক। দেখছে পর্নোগ্রাফি। পুঁজিবাদের ছোঁয়ায় ভোগের মাত্রা এ পরিমাণ বেড়েছে যে- একজন কিশোরী যেখানে বন্ধু বা প্রেমিক হিসেবে সময় কাটানোর কথা তরুণ বা কিশোরের সঙ্গে, সে এখন শুধুই আর্থিক নিরাপত্তার কারণে একজন বয়সী পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। তরুণীদের মাঝে রঙিন পৃথিবীর মোহ স্বাভাবিক ভালোবাসা থেকে তাদের অস্বাভাবিক সম্পর্ক জড়াতে উৎসাহিত করছে।

নারী নির্যাতন রোধের উপায়

আইন থাকাসত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান হারে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে প্রণীত আইনগুলোর বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা ও আইনের প্রয়োগ-পদ্ধতিতে ত্রুটি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের পর্যবেক্ষণ- আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। দায়িত্ব, জবাবদিহি, কৌশল ইত্যাদি আইনে সঠিকভাবে বলা নেই। ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের সঠিক নির্দেশনা নেই। আমরা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখছি যে ধর্ষককে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা এবং ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার পর সাধারণ জনগণ এর পক্ষে বক্তব্য দিতে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ জনগণ এ ধরনের দৃঢ় বক্তব্য দিচ্ছে, যা কাম্য নয়। আমাদের অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার জন্য সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধী যেই হোক তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা না দিয়ে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি বিচর ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নারী ও শিশুর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্যের পরিবর্তে নারী/কন্যা সন্তানকে মা/বোন কন্যা রূপে নারীকে নম্র, দয়াবান ও মায়াবতীর চিত্রায়ন থেকে বের করে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিবর্তিত হবে না।

অনেকেই বলেন- ভালো মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয় না। পোশাকের সমস্যার কারণে মেয়েরা ধর্ষিত হয়। আর কোনো আলেম বলবেন- পর্দা প্রথায় ফিরে আসলে ধর্ষণ আর হবে না। আবার অনেকে বলবেন- কঠোর শাস্তি দিলে ধর্ষণ কমবে। সেই মক্কা-মদিনায় আরব দেশে পর্দা মানা হয়, সেখানেও তো ভূরি ভূরি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। তাদের শাস্তি প্রকাশ্য শিরশ্ছেদ। সেখানেও ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। যৌন নির্যাতন বন্ধে আগে মানসিকতা বদলাতে হবে। ধর্মে নারীকে পর্দা করতে বললেও পুরুষদেরও চোখ অবনত রাখতে বলা হয়েছে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, নেশা, উচ্চাভিলাষ, সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ও তরুণ প্রজন্মকে পর্নোগ্রাফির নীল ছোবল থেকে থেকে বাঁচাতে হবে। অনলাইনে সবগুলো পর্নো সাইট বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বন্ধে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পিতামাতাকে ভাবতে হবে- আপনার সন্তান অনলাইনে কী করছে, তা জানার দায়িত্ব আপনার। পাশাপাশি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী ও কন্যা নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচার আইনে সাজা প্রদান, জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষানীতি ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে জেন্ডার ও মানবাধিকার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তাছাড়া, যুবসমাজকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। স্বাভাবিক, সুস্থ ও সমতা ভিত্তিক সমাজ বির্নিমাণে তাই সব প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হবে। তাহলেই এ অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।