স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রা
jugantor
স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রা

  ড. তৌফিক জোয়ার্দার  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সংস্কৃতি শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চিত্র। হারমোনিয়াম হাতে লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে কোনো নারীর অবয়ব হয়ত ভেসে ওঠে, রমনার বটমূলে যে হয়ত সুললিত কণ্ঠে গেয়ে চলেছে, ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। অথবা শমীম আরা নিপার অপরূপ নৃত্য সৌকর্য; কিংবা শিমুল মুস্তাফার ভরাট কণ্ঠে,’ স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো মহান পুরুষ’। এসব কিছুই সংস্কৃতির বাহ্যিক রূপ, সন্দেহ নেই তাতে; কিন্তু, সংস্কৃতির মূল নিহিত আছে এরও অনেক গভীরে। সংস্কৃতির শতাধিক সংজ্ঞা প্রচলিত থাকলেও অ্যাডওয়ার্ড টেইলরের দেয়া সংজ্ঞাটি সবচেয়ে সমাদৃত : ‘‘সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, কলা, নৈতিকতা, আইন, রীতি এবং অন্যান্য যোগ্যতা এবং অভ্যাস- এসব কিছুর জটিল সমষ্টিই হল ‘সংস্কৃতি’।’’

মার্কিন নৃ-তাত্ত্বিক অ্যাডওয়ার্ড টি. হলের মতে, সংস্কৃতির তিনটি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অপ্রধান স্তরটি হল সুব্যক্ত ও স্পষ্ট সংস্কৃতি, যা সবাই বাইরে থেকে দেখতে পায়। এর মধ্যে পড়ে সামাজিক রীতিনীতি, প্রচলিত পোশাক, দৈনন্দিক খাবার, সামাজিক উৎসব ইত্যাদি। এগুলো যদি অপ্রধান হয়, সংস্কৃতির মধ্যম ও প্রধান স্তরগুলো তাহলে কী? হল বলেন, মধ্যম স্তরে রয়েছে অপ্রত্যক্ষ ধারণা, বিশ্বাস ও নিয়ম- যা একটি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের গুপ্ত ব্যাকরণ হিসেবে কাজ করে। এরও গভীরে একটি স্তর আছে, সংস্কৃতির প্রধানতম স্তর, যা ওই জনগোষ্ঠীর সবাই জানে, মানে কিন্তু সচেতনভাবে তা উল্লেখ করে না।

এটা ভাবলে ভুল হবে, সমাজের সব মানুষ সংস্কৃতির সব অনুষঙ্গের প্রতি সমানভাবে সমর্পিত। সব সংস্কৃতিই তার সদস্যদের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিতে বিভক্ত করে, যেমন- নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, স্বাস্থ্যবান-অসুস্থ ইত্যাদি। নৃ-বিজ্ঞানী লীচ বলেন, সব সমাজেই তার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক গণ্ডির ভেতরেও বিরাজ করে আরও অনেক সংস্কৃতির চোরাস্রোত। যেমন- শহুরে বাঙালি আর গ্রামীণ বাঙালি একই বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করলেও, তাদের চলন-বলন, পোশাক-পরিচ্ছদ আর দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে তারতম্য।

এমন শ্রেণিবিভাজন রয়েছে পেশার ক্ষেত্রেও। এমন ‘উপসংস্কৃতি’র দেখা পাওয়া যায় ডাক্তার, নার্স, আইনজীবী, সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে হালের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের মাঝেও। একটি বৃহত্তর সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হয়েও এদের সবারই রয়েছে স্বতন্ত্র পোশাক, জার্গন তথা পেশা সংশ্লিষ্ট বিশেষ শব্দাবলী সমৃদ্ধ ভাষা এবং সর্বোপরি স্বতন্ত্র একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে কোনো একটি সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে অভিষিক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে ‘এনকালচারেশন’ তথা সংস্কৃতিভুক্তিকরণ।

ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এ এনকালচারেশন প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করে তা দেখে নেয়া যাক। পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী সন্তানটিকে ঘিরে বাবা-মার স্বপ্ন থাকে সে হয় ইঞ্জিনিয়ার হবে, না হয় ডাক্তার। ডাক্তারিতে ঢোকামাত্র বাবা-মার সঙ্গে এবার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শী যুক্ত হয় প্রত্যাশার ঝাঁপি নিয়ে। এভাবে একটা প্রত্যাশার চাপের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এনকালচারেশন প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোতে সহপাঠী আর শিক্ষকদের কাছ থেকে তার মস্তিষ্কে ব্যাপন হতে থাকে তার উৎকৃষ্টতার হোমমন্ত্র’- তুমি ক্রিম অফ দা সোসাইটি’, ‘তোমার ক্লাসে যারা ব্যাক বেঞ্চার ছিল, তারা সবাই ওঁত পেতে আছে তোমার ওপর শোধ নেবার জন্য’, ‘তুমি একটা আলাদা জাতির সদস্য, বাকিরা নন-মেডিকেল’। মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের আছে নিজস্ব কৌতুক, যার মর্মোদ্ধার করা অচিকিৎসক নিকটাত্মীয়দের পক্ষেও সম্ভব নয়। স্বজনদের প্রত্যাশার বীজ মেডিকেলের উর্বর ক্ষেত্রের সান্নিধ্যে কখন যে তরুণ চিকিৎসকের মনে অঙ্কুরিত করে উচ্চাভিলাষের বিষবৃক্ষ- তা সে নিজেও টের পায় না। অথচ, বাংলাদেশ তো বহুদূর, বিশ্বের কোথাওই মাত্রাহীন উচ্চাভিলাষের হয় না পরিতৃপ্তি। প্রখ্যাত বাংলাদেশি চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক ড. শাহাদুজ্জামান তার ‘একটি হাসপাতাল একজন নৃ-বিজ্ঞানী কয়েকটি ভাঙ্গা হাড়’ গ্রন্থে যার নাম দিয়েছেন- ‘দম্ভ ও হতাশার যুগলবন্দী’।

ডাক্তারদের পরিণত পর্যায়ের এনকালচারেশন প্রক্রিয়ার ও তার পরিণতির কিছুটা হদিস পাওয়া যায় ড. শাহাদুজ্জামানের গ্রন্থে। তার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় : প্রফেসরের রাউন্ডের সময়ে তটস্থতায়, একত্রিত হয়ে নাস্তার বিরতির কথোপকথনে, সীমাবদ্ধতার মাঝে কাজ করে যাওয়ার সংহতিতে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতার হতাশায় ডাক্তারদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঐক্য। মেডিকেল পেশার প্রশিক্ষণের ধরন, পেশার ঐতিহাসিক বিবর্তন, ডাক্তারদের কাজের পরিবেশ- এসব কিছু মিলিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক ধরনের কর্তৃত্ব পরায়ণতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্য। বলাই বাহুল্য, এত সব জটিল মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রূপ পাওয়া ডাক্তারদের উপসংস্কৃতিটি ক্রমেই বৃহত্তর জনসংস্কৃতি থেকে হয়ে পড়ে দূরবর্তী। সেই দূরবর্তী সংস্কৃতির একজন মানুষ যখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়, তখন তাকে গভীরভাবে বুঝে ওঠার সুযোগ আর একজন ডাক্তারের পরিপূর্ণ রূপে থাকে না।

আমাদের সাধারণ কথোপকথনে আমরা যাকে ‘অসুস্থতা’ বলি, নৃ-বিজ্ঞানের পরিভাষায় তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে দুটি পৃথক শব্দ ডিজিজ এবং ইলনেস। ডিজিজ হল ডাক্তারের দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ, স্বাভাবিক শারীরবৃত্তিয় অবস্থা থেকে পরিমাপযোগ্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতি। রোগী যা-ই অভিযোগ করুক, ডাক্তার তাপমাত্রা, রক্তচাপ, রক্তকণিকা এরকম আরও অনেক শারীরবৃত্তিয় সূচক ব্যবহার করে ডিজিজ সম্পর্কে তার রায় প্রতিষ্ঠিত করেন। পক্ষান্তরে ইলনেস হল রোগীর দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ, আত্ম-উপলব্ধ ভালো বোধ না করার অনুভূতি। এমন অসংখ্য অনুভূতির উল্লেখ নানা সংস্কৃতিতে পাওয়া যায় যার ব্যাখ্যা ডাক্তারদের মোটা বইতে লিখিত নেই। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ‘নজর লাগা’, উত্তর আফ্রিকার ‘জার’, পশ্চিম আফ্রিকার ‘মাথায় কুয়াশার মতো অনুভূতি’, মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার ‘মাতা-এলাপ’, চীনের ‘পা’ লেঙ’, এবং আমাদের দেশের ‘মন্দ বাতাস লাগা’ হতে পারে এমন সব রোগের উদাহরণ যা রোগীর কাছে বাস্তব সমস্যা মনে হলেও ডাক্তারের কাছে যা কেবল বুজরুকি।

কেবল ডাক্তার-রোগীর মিথষ্ক্রিয়াতেই নয়, স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রাটি প্রভাব রাখে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে, ওষুধ-পথ্যে, শরীর সম্পর্কে ধারণায়, যৌন সম্পর্কে, ব্যথার অনুভূতিতে, মানসিক রোগের উপশম কামনায় ইত্যাদি আরও অসংখ্য জীবন-ঘনিষ্ঠ দিনানুদৈনিকতায়। যেমন- ধরা যাক আমাদের খাদ্যাভ্যাস। দীর্ঘদিনের লালিত অভ্যাসে আমাদের ভাত ছাড়া চলে না। একটু সম্মানিত অতিথি এলে তার সামনে সবজি, ভর্তা- এসব দিলে চলবে না; দরকার চর্বিদার গরু অথবা খাসির মাংস। চিনির সুরায় চোবানো রসগোল্লা ছাড়া কোনো উৎসব অথবা আনন্দ-সংবাদের ভাগাভাগি অচিন্তনীয়। অথচ, এসব ক’টা খাবারই বর্তমানে অসংক্রামক ব্যাধির প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দাওয়াতে গেলে হৃদরোগী কিংবা ডায়াবেটিক রোগীদেরও নিস্তার নেই এসব খাবার এস্তেমাল করার হাত থেকে। কেননা, অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রণ কর্তার আতিথেয়তায় সায় দিয়ে যাওয়াও আমাদের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ।

অন্যদিকে শহুরে তরুণদের খাদ্য-সংস্কৃতিতে গত কয়েক দশকে ঘটে গিয়েছে নীরব অথচ ক্ষতিকর আরেক বিপ্লব। ফাস্ট ফুডের দোকানে বসা, অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ঠাণ্ডা পানীয় সেবন করা ইত্যাদি এখন তারুণ্য সংস্কৃতির অংশ। এসবের বাইরেও কোনো বস্তুগুলোকে আমরা খাবার বলে গণ্য করব আর কোনগুলো অখাদ্য, খাবারের ধর্মীয় পবিত্রতা, কোন খাবারগুলোকে স্বাস্থ্যদায়ক বলে মনে করা হবে- এমন অনেক বিষয়েই এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে রয়েছে মতানৈক্য।

এমনকি বাংলাদেশেও, অন্যান্য বেশিরভাগ বিষয়ে যথেষ্ট সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য থাকলেও মুসলমান ও হিন্দুর খাবারে রয়েছে পার্থক্য : মুসলমানের প্রিয় খাবার গরুর মাংস হিন্দুর কাছে প্রশ্নাতীতভাবে পরিত্যাজ্য। সংস্কৃতিজাত এসব খাদ্যাভ্যাসেরই রয়েছে সুদূরপ্রসারী স্বাস্থ্যগত প্রভাব।

শারীরিক স্থূলতাকে এখনও আমাদের দেশে স্বাস্থ্যের সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। অথচ বর্তমানে কৃশতা অথবা অপুষ্টিতে যত মানুষ মারা যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী স্থূলতার কারণে মারা যাচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ। আমাদের চোখে স্থূলতাকে কেন স্বাস্থ্যকর বলে মনে হয়, তা নিয়েও আছে কৌতূহলোদ্দীপক নৃ-তাত্ত্বিক আলোচনা। দুয়েক প্রজন্ম আগেও দুর্ভিক্ষ এ ভূখণ্ডে খুব একটা বিরল ঘটনা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে শরীরকে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তি জুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় ছিল শরীরে চর্বির সঞ্চয় বজায় রাখা। খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এ সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারটিই হয়েছে এখন ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এদিকে সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে শারীরিক গঠনের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আছে বৈপরীত্য। বিবাহের সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চোখে পড়ে তরুণ বনাম বয়স্ক, ধনী বনাম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে পছন্দের তারতম্য। এমন সংস্কৃতিজাত পছন্দ অপছন্দ কালক্রমে হতে পারে শারীরিক অসুস্থতার হেতু। এ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা নামক জটিল মনোরোগের কারণও আমাদের শরীরের কাঠামো নিয়ে আমাদের প্রত্যাশার চাপ।

একসময় আমাদের দেশে বেশিরভাগ সন্তানের জন্ম হতো দাইয়ের হাতে। এখন গ্রামাঞ্চলেও হাসপাতালে প্রসব করার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অনেক মা-ই; বিশেষ করে উচ্চ আর্থসামাজিক অবস্থানের গর্ভবতী নারীরা প্রসব বেদনা থেকে রেহাই পেতে স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছেন অত্যন্ত ক্ষতিকর সিজারিয়ান সেকশন, যা উন্নত বিশ্বে জীবন সংশয় না হলে কখনও প্রয়োগ করা হয় না। মুসলমান ছেলেদের খতনা করানোর ভার এখন হাজামের কাছ থেকে স্থানান্তর হয়েছে শৈল্যবিদের হাতে। সহস্র বছর ধরে বংশানুক্রমে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাওয়া হেকিম-কবিরাজরা এখন অ্যালোপেথিক ডাক্তারদের পসারের মুখে সমাজ থেকে অপসৃতপ্রায়। এভাবে যুগের বিবর্তনে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের নির্দেশক হিসেবে দেখতে পাই স্বাস্থ্য-সন্ধান আচরণের (health-seeking behavior) পরিবর্তন। এসব আচরণের প্রভাব পড়ে জনসাধারণের স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর।

ডাক্তারের কাছে গেলে অনেকেই দাবি করেন ইনজেকশনের, তার প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক। কেউ আবার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে খোঁজ করেন খাবার স্যালাইনের, ডায়রিয়া থাকুক বা না থাকুক। তাদের ধারণা, ইনজেকশন ওষুধ হিসেবে উৎকৃষ্টতর, স্যালাইন বলবর্ধক। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার অন্যতম স্তম্ভ ছিল পথ্য, যা ওষুধের পাশাপাশি সেব্য ছিল। এর সাংস্কৃতিক অবশেষ আমরা বহন করে চলেছি আজও। ডাক্তারের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র বুঝে নেয়ার পর রোগী প্রায়ই জানতে চান ওষুধের সঙ্গে কী খাবেন, কী পরিহার করবেন, কোন কাজগুলো করবেন বা করবেন না। অনেক রোগের সঙ্গে এ প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রেই, অ্যালোপেথিক চিকিৎসা মতে পথ্যের এ প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক। সাংস্কৃতিক দক্ষতা (cultural competency) সম্পন্ন ডাক্তার এ ধরনের পরিস্থিতি হাসিমুখে সামাল দিতে পারলেও, অনেক ডাক্তার রোগীর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখে হয়ে পড়েন বিরক্ত ও ধৈর্য্যহীন।

ওষুধ নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার এমন বৈচিত্র্য বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বিরল নয়। আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য বা হাস্যকর মনে হলেও, ওষুধের বাহ্যিক বৈশিষ্টাবলী, যেমন এর রং, তারল্য, প্রকৃতি, স্বাদ ইত্যাদিও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে ওষুধের কার্যকারিতার নির্ণায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। মার্ক নিকটার দেখেছেন দক্ষিণ ভারতে কালো রঙের ওষুধ পিত্তজনিত রোগের উপশমে অধিক কার্যকর বলে মনে করা হয়, কিন্তু দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতায় এসবকে মনে করা হয় অকার্যকর। ফলশ্রুতিতে, সেখানে প্রসূতি মায়েদের জন্য যখন কালো রঙের আয়রন ট্যাবলেট চালু করা হল, ডাক্তারদের চরম হতবুদ্ধিকর হতাশায় নিমজ্জিত করে মায়েরা তা প্রত্যাখ্যান করে বসল।

আমাদের সংস্কৃতির এমন দৃশ্যমান চর্চাগুলোর বাইরেও আছে এমন অনেক বিশ্বাস ও আচরণ, যা সরাসরি সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য নয়, কিন্তু এসব আচরণের গভীরে প্রোথিত আছে লৌকিক সংস্কৃতির প্রচ্ছন্ন প্রভাব। এ আচরণগুলো আপাতত দৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও স্বাস্থ্যচর্চা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য প্রকল্প পরিচালনা ইত্যাদির ওপর রয়েছে এসব আচরণের গভীর প্রভাব। বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহ হয় জাতীয় অথবা সামাজিক স্বাস্থ্যবীমার মাধ্যমে। সেবা গ্রহণের মুহূর্তে অনেকের হাতেই যথেষ্ট অর্থ থাকে না, তাই অসুস্থতার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক মানুষকেই নেমে যেতে হয় দারিদ্যসীমার নিচে। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের স্বীকৃত পদ্ধতি হল জাতীয় অথবা সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা, যেখানে জনগণ তাদের সঙ্গতি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রিমিয়াম হিসেবে একটি কেন্দ্রীয় পুলে জমা করতে থাকে। পরে যদি সে স্বাস্থ্য ব্যয়ের সম্মুখীন হয়, সেই কেন্দ্রীয় পুল থেকে প্রয়োজনমতো সে ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এ ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রধান সূত্র হল পরস্পরের প্রতি আস্থা ও সংহতি। একবার এক গবেষণার সূত্রে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ এক সরকারি কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে নিবন্ধের লেখককে বলেছিলেন, ‘টাকা পয়সার ব্যাপারে আমরা বীমা প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, নিজেদের আত্মীয় স্বজনদেরই বিশ্বাস করতে পারি না’।

প্রশ্ন থাকে, আমাদের সমাজে বিশ্বাস আর সংহতির অভাব কেন? এর উত্তরও খোঁজা যেতে পারে আমাদের নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাসে। হাজার হাজার বছর ধরে এ ভূখণ্ডে নানা দেশ ও জাতির মানুষ এসে বসবাস করেছে। এদের অনেকেই ভাগ্যান্বেষণে আবার অনেকেই শাসক ও শোষকরূপে এখানে এসেছেন। এ ভূখণ্ডের বাসিন্দারা বহিরাগতদের উদার বাহু তুলে বরণ করে নিলেও বেশিরভাগ সময়ই তারা বহিরাগতদের দ্বারা হয়েছে প্রতারিত। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস মূলত বহিরাগত শক্তি দ্বারা শাসিত, শোষিত, প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হওয়ারই ইতিহাস। এমন ঐতিহাসিক জখম পুষে যে জাতির বেড়ে ওঠা, সে জাতি যে সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে চাইবে না, তা আর বিচিত্র কি? সাচিকো ওজাওয়া কম্বোডিয়ায় এক গবেষণায়ও দেখেছেন, পলপটের গণহত্যার স্মৃতি লালন করা দেশটিতে ক্ষয়িষ্ণু আস্থার বলি হয়েছে তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা। এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, আমাদের নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাস-সঞ্জাত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, অনেক কিছুর পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়নেও প্রভাব রাখে।

স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রার আরও অসংখ্য উদাহরণ আছে, কিন্তু এ সম্পর্কে আলোচনার উপকারিতা কী? সে প্রশ্নের উত্তর রেখেই শেষ করব। আমরা সবাই উন্নয়নের প্রত্যাশী। উন্নয়নের সংকীর্ণ সংজ্ঞা, তথা উন্নয়নকে কেবল অর্থনীতির আলোকে বিচার করার রীতি, বিশ্বব্যাপী বহু আগেই বাতিল বলে গণ্য হয়েছে। উন্নয়ন বলতে এখন বোঝানো হয় সামষ্টিক উন্নয়ন, টেকসই উন্নয়ন। এর জন্য অর্থনীতির পাশাপাশি চাই স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার, ব্যক্তি স্বাধীনতার উন্মেষ, সুশাসনের বিকাশ ইত্যাদি। আর এই অভিধাগুলোর প্রত্যেকটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঐতিহাসিক রূপরেখা। সামষ্টিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই জনমানুষের সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারগুলোকে চিনতে শেখা। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট পেশায় যারা নিয়োজিত আছেন, তাদের উচিত নিজেদের সাংস্কৃতিক দক্ষতাকে বাড়িয়ে তোলা। জনগণের সামাজিক সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন আমরা দেখি, যা নিজের সংস্কৃতিকে, এর বহুমাত্রিকতাকে উপলব্ধি করা ব্যতিরেকে কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রা

 ড. তৌফিক জোয়ার্দার 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সংস্কৃতি শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের চিত্র। হারমোনিয়াম হাতে লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে কোনো নারীর অবয়ব হয়ত ভেসে ওঠে, রমনার বটমূলে যে হয়ত সুললিত কণ্ঠে গেয়ে চলেছে, ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’। অথবা শমীম আরা নিপার অপরূপ নৃত্য সৌকর্য; কিংবা শিমুল মুস্তাফার ভরাট কণ্ঠে,’ স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি দোলানো মহান পুরুষ’। এসব কিছুই সংস্কৃতির বাহ্যিক রূপ, সন্দেহ নেই তাতে; কিন্তু, সংস্কৃতির মূল নিহিত আছে এরও অনেক গভীরে। সংস্কৃতির শতাধিক সংজ্ঞা প্রচলিত থাকলেও অ্যাডওয়ার্ড টেইলরের দেয়া সংজ্ঞাটি সবচেয়ে সমাদৃত : ‘‘সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, কলা, নৈতিকতা, আইন, রীতি এবং অন্যান্য যোগ্যতা এবং অভ্যাস- এসব কিছুর জটিল সমষ্টিই হল ‘সংস্কৃতি’।’’

মার্কিন নৃ-তাত্ত্বিক অ্যাডওয়ার্ড টি. হলের মতে, সংস্কৃতির তিনটি স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অপ্রধান স্তরটি হল সুব্যক্ত ও স্পষ্ট সংস্কৃতি, যা সবাই বাইরে থেকে দেখতে পায়। এর মধ্যে পড়ে সামাজিক রীতিনীতি, প্রচলিত পোশাক, দৈনন্দিক খাবার, সামাজিক উৎসব ইত্যাদি। এগুলো যদি অপ্রধান হয়, সংস্কৃতির মধ্যম ও প্রধান স্তরগুলো তাহলে কী? হল বলেন, মধ্যম স্তরে রয়েছে অপ্রত্যক্ষ ধারণা, বিশ্বাস ও নিয়ম- যা একটি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের গুপ্ত ব্যাকরণ হিসেবে কাজ করে। এরও গভীরে একটি স্তর আছে, সংস্কৃতির প্রধানতম স্তর, যা ওই জনগোষ্ঠীর সবাই জানে, মানে কিন্তু সচেতনভাবে তা উল্লেখ করে না।

এটা ভাবলে ভুল হবে, সমাজের সব মানুষ সংস্কৃতির সব অনুষঙ্গের প্রতি সমানভাবে সমর্পিত। সব সংস্কৃতিই তার সদস্যদের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিতে বিভক্ত করে, যেমন- নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, স্বাস্থ্যবান-অসুস্থ ইত্যাদি। নৃ-বিজ্ঞানী লীচ বলেন, সব সমাজেই তার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক গণ্ডির ভেতরেও বিরাজ করে আরও অনেক সংস্কৃতির চোরাস্রোত। যেমন- শহুরে বাঙালি আর গ্রামীণ বাঙালি একই বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করলেও, তাদের চলন-বলন, পোশাক-পরিচ্ছদ আর দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে তারতম্য।

এমন শ্রেণিবিভাজন রয়েছে পেশার ক্ষেত্রেও। এমন ‘উপসংস্কৃতি’র দেখা পাওয়া যায় ডাক্তার, নার্স, আইনজীবী, সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে হালের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের মাঝেও। একটি বৃহত্তর সমাজ-সংস্কৃতির অংশ হয়েও এদের সবারই রয়েছে স্বতন্ত্র পোশাক, জার্গন তথা পেশা সংশ্লিষ্ট বিশেষ শব্দাবলী সমৃদ্ধ ভাষা এবং সর্বোপরি স্বতন্ত্র একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে কোনো একটি সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে অভিষিক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে ‘এনকালচারেশন’ তথা সংস্কৃতিভুক্তিকরণ।

ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এ এনকালচারেশন প্রক্রিয়া কিভাবে কাজ করে তা দেখে নেয়া যাক। পরিবারের সবচেয়ে মেধাবী সন্তানটিকে ঘিরে বাবা-মার স্বপ্ন থাকে সে হয় ইঞ্জিনিয়ার হবে, না হয় ডাক্তার। ডাক্তারিতে ঢোকামাত্র বাবা-মার সঙ্গে এবার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শী যুক্ত হয় প্রত্যাশার ঝাঁপি নিয়ে। এভাবে একটা প্রত্যাশার চাপের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এনকালচারেশন প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়গুলোতে সহপাঠী আর শিক্ষকদের কাছ থেকে তার মস্তিষ্কে ব্যাপন হতে থাকে তার উৎকৃষ্টতার হোমমন্ত্র’- তুমি ক্রিম অফ দা সোসাইটি’, ‘তোমার ক্লাসে যারা ব্যাক বেঞ্চার ছিল, তারা সবাই ওঁত পেতে আছে তোমার ওপর শোধ নেবার জন্য’, ‘তুমি একটা আলাদা জাতির সদস্য, বাকিরা নন-মেডিকেল’। মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের আছে নিজস্ব কৌতুক, যার মর্মোদ্ধার করা অচিকিৎসক নিকটাত্মীয়দের পক্ষেও সম্ভব নয়। স্বজনদের প্রত্যাশার বীজ মেডিকেলের উর্বর ক্ষেত্রের সান্নিধ্যে কখন যে তরুণ চিকিৎসকের মনে অঙ্কুরিত করে উচ্চাভিলাষের বিষবৃক্ষ- তা সে নিজেও টের পায় না। অথচ, বাংলাদেশ তো বহুদূর, বিশ্বের কোথাওই মাত্রাহীন উচ্চাভিলাষের হয় না পরিতৃপ্তি। প্রখ্যাত বাংলাদেশি চিকিৎসা নৃ-বিজ্ঞানী ও কথাসাহিত্যিক ড. শাহাদুজ্জামান তার ‘একটি হাসপাতাল একজন নৃ-বিজ্ঞানী কয়েকটি ভাঙ্গা হাড়’ গ্রন্থে যার নাম দিয়েছেন- ‘দম্ভ ও হতাশার যুগলবন্দী’।

ডাক্তারদের পরিণত পর্যায়ের এনকালচারেশন প্রক্রিয়ার ও তার পরিণতির কিছুটা হদিস পাওয়া যায় ড. শাহাদুজ্জামানের গ্রন্থে। তার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় : প্রফেসরের রাউন্ডের সময়ে তটস্থতায়, একত্রিত হয়ে নাস্তার বিরতির কথোপকথনে, সীমাবদ্ধতার মাঝে কাজ করে যাওয়ার সংহতিতে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতার হতাশায় ডাক্তারদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঐক্য। মেডিকেল পেশার প্রশিক্ষণের ধরন, পেশার ঐতিহাসিক বিবর্তন, ডাক্তারদের কাজের পরিবেশ- এসব কিছু মিলিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক ধরনের কর্তৃত্ব পরায়ণতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঔদ্ধত্য। বলাই বাহুল্য, এত সব জটিল মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রূপ পাওয়া ডাক্তারদের উপসংস্কৃতিটি ক্রমেই বৃহত্তর জনসংস্কৃতি থেকে হয়ে পড়ে দূরবর্তী। সেই দূরবর্তী সংস্কৃতির একজন মানুষ যখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়, তখন তাকে গভীরভাবে বুঝে ওঠার সুযোগ আর একজন ডাক্তারের পরিপূর্ণ রূপে থাকে না।

আমাদের সাধারণ কথোপকথনে আমরা যাকে ‘অসুস্থতা’ বলি, নৃ-বিজ্ঞানের পরিভাষায় তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে দুটি পৃথক শব্দ ডিজিজ এবং ইলনেস। ডিজিজ হল ডাক্তারের দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ, স্বাভাবিক শারীরবৃত্তিয় অবস্থা থেকে পরিমাপযোগ্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্যুতি। রোগী যা-ই অভিযোগ করুক, ডাক্তার তাপমাত্রা, রক্তচাপ, রক্তকণিকা এরকম আরও অনেক শারীরবৃত্তিয় সূচক ব্যবহার করে ডিজিজ সম্পর্কে তার রায় প্রতিষ্ঠিত করেন। পক্ষান্তরে ইলনেস হল রোগীর দৃষ্টিকোণ, অর্থাৎ, আত্ম-উপলব্ধ ভালো বোধ না করার অনুভূতি। এমন অসংখ্য অনুভূতির উল্লেখ নানা সংস্কৃতিতে পাওয়া যায় যার ব্যাখ্যা ডাক্তারদের মোটা বইতে লিখিত নেই। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ‘নজর লাগা’, উত্তর আফ্রিকার ‘জার’, পশ্চিম আফ্রিকার ‘মাথায় কুয়াশার মতো অনুভূতি’, মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার ‘মাতা-এলাপ’, চীনের ‘পা’ লেঙ’, এবং আমাদের দেশের ‘মন্দ বাতাস লাগা’ হতে পারে এমন সব রোগের উদাহরণ যা রোগীর কাছে বাস্তব সমস্যা মনে হলেও ডাক্তারের কাছে যা কেবল বুজরুকি।

কেবল ডাক্তার-রোগীর মিথষ্ক্রিয়াতেই নয়, স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রাটি প্রভাব রাখে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে, ওষুধ-পথ্যে, শরীর সম্পর্কে ধারণায়, যৌন সম্পর্কে, ব্যথার অনুভূতিতে, মানসিক রোগের উপশম কামনায় ইত্যাদি আরও অসংখ্য জীবন-ঘনিষ্ঠ দিনানুদৈনিকতায়। যেমন- ধরা যাক আমাদের খাদ্যাভ্যাস। দীর্ঘদিনের লালিত অভ্যাসে আমাদের ভাত ছাড়া চলে না। একটু সম্মানিত অতিথি এলে তার সামনে সবজি, ভর্তা- এসব দিলে চলবে না; দরকার চর্বিদার গরু অথবা খাসির মাংস। চিনির সুরায় চোবানো রসগোল্লা ছাড়া কোনো উৎসব অথবা আনন্দ-সংবাদের ভাগাভাগি অচিন্তনীয়। অথচ, এসব ক’টা খাবারই বর্তমানে অসংক্রামক ব্যাধির প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দাওয়াতে গেলে হৃদরোগী কিংবা ডায়াবেটিক রোগীদেরও নিস্তার নেই এসব খাবার এস্তেমাল করার হাত থেকে। কেননা, অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রণ কর্তার আতিথেয়তায় সায় দিয়ে যাওয়াও আমাদের সংস্কৃতির অনুষঙ্গ।

অন্যদিকে শহুরে তরুণদের খাদ্য-সংস্কৃতিতে গত কয়েক দশকে ঘটে গিয়েছে নীরব অথচ ক্ষতিকর আরেক বিপ্লব। ফাস্ট ফুডের দোকানে বসা, অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ঠাণ্ডা পানীয় সেবন করা ইত্যাদি এখন তারুণ্য সংস্কৃতির অংশ। এসবের বাইরেও কোনো বস্তুগুলোকে আমরা খাবার বলে গণ্য করব আর কোনগুলো অখাদ্য, খাবারের ধর্মীয় পবিত্রতা, কোন খাবারগুলোকে স্বাস্থ্যদায়ক বলে মনে করা হবে- এমন অনেক বিষয়েই এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে রয়েছে মতানৈক্য।

এমনকি বাংলাদেশেও, অন্যান্য বেশিরভাগ বিষয়ে যথেষ্ট সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য থাকলেও মুসলমান ও হিন্দুর খাবারে রয়েছে পার্থক্য : মুসলমানের প্রিয় খাবার গরুর মাংস হিন্দুর কাছে প্রশ্নাতীতভাবে পরিত্যাজ্য। সংস্কৃতিজাত এসব খাদ্যাভ্যাসেরই রয়েছে সুদূরপ্রসারী স্বাস্থ্যগত প্রভাব।

শারীরিক স্থূলতাকে এখনও আমাদের দেশে স্বাস্থ্যের সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। অথচ বর্তমানে কৃশতা অথবা অপুষ্টিতে যত মানুষ মারা যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী স্থূলতার কারণে মারা যাচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ। আমাদের চোখে স্থূলতাকে কেন স্বাস্থ্যকর বলে মনে হয়, তা নিয়েও আছে কৌতূহলোদ্দীপক নৃ-তাত্ত্বিক আলোচনা। দুয়েক প্রজন্ম আগেও দুর্ভিক্ষ এ ভূখণ্ডে খুব একটা বিরল ঘটনা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে শরীরকে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তি জুগিয়ে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায় ছিল শরীরে চর্বির সঞ্চয় বজায় রাখা। খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এ সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারটিই হয়েছে এখন ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এদিকে সমাজের নানা শ্রেণির মধ্যে শারীরিক গঠনের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আছে বৈপরীত্য। বিবাহের সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে চোখে পড়ে তরুণ বনাম বয়স্ক, ধনী বনাম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে পছন্দের তারতম্য। এমন সংস্কৃতিজাত পছন্দ অপছন্দ কালক্রমে হতে পারে শারীরিক অসুস্থতার হেতু। এ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা নামক জটিল মনোরোগের কারণও আমাদের শরীরের কাঠামো নিয়ে আমাদের প্রত্যাশার চাপ।

একসময় আমাদের দেশে বেশিরভাগ সন্তানের জন্ম হতো দাইয়ের হাতে। এখন গ্রামাঞ্চলেও হাসপাতালে প্রসব করার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অনেক মা-ই; বিশেষ করে উচ্চ আর্থসামাজিক অবস্থানের গর্ভবতী নারীরা প্রসব বেদনা থেকে রেহাই পেতে স্বেচ্ছায় বেছে নিচ্ছেন অত্যন্ত ক্ষতিকর সিজারিয়ান সেকশন, যা উন্নত বিশ্বে জীবন সংশয় না হলে কখনও প্রয়োগ করা হয় না। মুসলমান ছেলেদের খতনা করানোর ভার এখন হাজামের কাছ থেকে স্থানান্তর হয়েছে শৈল্যবিদের হাতে। সহস্র বছর ধরে বংশানুক্রমে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাওয়া হেকিম-কবিরাজরা এখন অ্যালোপেথিক ডাক্তারদের পসারের মুখে সমাজ থেকে অপসৃতপ্রায়। এভাবে যুগের বিবর্তনে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের নির্দেশক হিসেবে দেখতে পাই স্বাস্থ্য-সন্ধান আচরণের (health-seeking behavior) পরিবর্তন। এসব আচরণের প্রভাব পড়ে জনসাধারণের স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর।

ডাক্তারের কাছে গেলে অনেকেই দাবি করেন ইনজেকশনের, তার প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক। কেউ আবার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে খোঁজ করেন খাবার স্যালাইনের, ডায়রিয়া থাকুক বা না থাকুক। তাদের ধারণা, ইনজেকশন ওষুধ হিসেবে উৎকৃষ্টতর, স্যালাইন বলবর্ধক। আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার অন্যতম স্তম্ভ ছিল পথ্য, যা ওষুধের পাশাপাশি সেব্য ছিল। এর সাংস্কৃতিক অবশেষ আমরা বহন করে চলেছি আজও। ডাক্তারের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র বুঝে নেয়ার পর রোগী প্রায়ই জানতে চান ওষুধের সঙ্গে কী খাবেন, কী পরিহার করবেন, কোন কাজগুলো করবেন বা করবেন না। অনেক রোগের সঙ্গে এ প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রেই, অ্যালোপেথিক চিকিৎসা মতে পথ্যের এ প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক। সাংস্কৃতিক দক্ষতা (cultural competency) সম্পন্ন ডাক্তার এ ধরনের পরিস্থিতি হাসিমুখে সামাল দিতে পারলেও, অনেক ডাক্তার রোগীর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের মুখে হয়ে পড়েন বিরক্ত ও ধৈর্য্যহীন।

ওষুধ নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার এমন বৈচিত্র্য বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বিরল নয়। আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য বা হাস্যকর মনে হলেও, ওষুধের বাহ্যিক বৈশিষ্টাবলী, যেমন এর রং, তারল্য, প্রকৃতি, স্বাদ ইত্যাদিও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে ওষুধের কার্যকারিতার নির্ণায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। মার্ক নিকটার দেখেছেন দক্ষিণ ভারতে কালো রঙের ওষুধ পিত্তজনিত রোগের উপশমে অধিক কার্যকর বলে মনে করা হয়, কিন্তু দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতায় এসবকে মনে করা হয় অকার্যকর। ফলশ্রুতিতে, সেখানে প্রসূতি মায়েদের জন্য যখন কালো রঙের আয়রন ট্যাবলেট চালু করা হল, ডাক্তারদের চরম হতবুদ্ধিকর হতাশায় নিমজ্জিত করে মায়েরা তা প্রত্যাখ্যান করে বসল।

আমাদের সংস্কৃতির এমন দৃশ্যমান চর্চাগুলোর বাইরেও আছে এমন অনেক বিশ্বাস ও আচরণ, যা সরাসরি সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য নয়, কিন্তু এসব আচরণের গভীরে প্রোথিত আছে লৌকিক সংস্কৃতির প্রচ্ছন্ন প্রভাব। এ আচরণগুলো আপাতত দৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও স্বাস্থ্যচর্চা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য প্রকল্প পরিচালনা ইত্যাদির ওপর রয়েছে এসব আচরণের গভীর প্রভাব। বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্বাহ হয় জাতীয় অথবা সামাজিক স্বাস্থ্যবীমার মাধ্যমে। সেবা গ্রহণের মুহূর্তে অনেকের হাতেই যথেষ্ট অর্থ থাকে না, তাই অসুস্থতার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক মানুষকেই নেমে যেতে হয় দারিদ্যসীমার নিচে। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের স্বীকৃত পদ্ধতি হল জাতীয় অথবা সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা, যেখানে জনগণ তাদের সঙ্গতি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রিমিয়াম হিসেবে একটি কেন্দ্রীয় পুলে জমা করতে থাকে। পরে যদি সে স্বাস্থ্য ব্যয়ের সম্মুখীন হয়, সেই কেন্দ্রীয় পুল থেকে প্রয়োজনমতো সে ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এ ব্যবস্থা কার্যকর করার প্রধান সূত্র হল পরস্পরের প্রতি আস্থা ও সংহতি। একবার এক গবেষণার সূত্রে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের শীর্ষ এক সরকারি কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে নিবন্ধের লেখককে বলেছিলেন, ‘টাকা পয়সার ব্যাপারে আমরা বীমা প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, নিজেদের আত্মীয় স্বজনদেরই বিশ্বাস করতে পারি না’।

প্রশ্ন থাকে, আমাদের সমাজে বিশ্বাস আর সংহতির অভাব কেন? এর উত্তরও খোঁজা যেতে পারে আমাদের নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাসে। হাজার হাজার বছর ধরে এ ভূখণ্ডে নানা দেশ ও জাতির মানুষ এসে বসবাস করেছে। এদের অনেকেই ভাগ্যান্বেষণে আবার অনেকেই শাসক ও শোষকরূপে এখানে এসেছেন। এ ভূখণ্ডের বাসিন্দারা বহিরাগতদের উদার বাহু তুলে বরণ করে নিলেও বেশিরভাগ সময়ই তারা বহিরাগতদের দ্বারা হয়েছে প্রতারিত। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস মূলত বহিরাগত শক্তি দ্বারা শাসিত, শোষিত, প্রতারিত ও সর্বস্বান্ত হওয়ারই ইতিহাস। এমন ঐতিহাসিক জখম পুষে যে জাতির বেড়ে ওঠা, সে জাতি যে সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে চাইবে না, তা আর বিচিত্র কি? সাচিকো ওজাওয়া কম্বোডিয়ায় এক গবেষণায়ও দেখেছেন, পলপটের গণহত্যার স্মৃতি লালন করা দেশটিতে ক্ষয়িষ্ণু আস্থার বলি হয়েছে তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা। এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, আমাদের নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাস-সঞ্জাত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, অনেক কিছুর পাশাপাশি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়নেও প্রভাব রাখে।

স্বাস্থ্যের সাংস্কৃতিক মাত্রার আরও অসংখ্য উদাহরণ আছে, কিন্তু এ সম্পর্কে আলোচনার উপকারিতা কী? সে প্রশ্নের উত্তর রেখেই শেষ করব। আমরা সবাই উন্নয়নের প্রত্যাশী। উন্নয়নের সংকীর্ণ সংজ্ঞা, তথা উন্নয়নকে কেবল অর্থনীতির আলোকে বিচার করার রীতি, বিশ্বব্যাপী বহু আগেই বাতিল বলে গণ্য হয়েছে। উন্নয়ন বলতে এখন বোঝানো হয় সামষ্টিক উন্নয়ন, টেকসই উন্নয়ন। এর জন্য অর্থনীতির পাশাপাশি চাই স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার, ব্যক্তি স্বাধীনতার উন্মেষ, সুশাসনের বিকাশ ইত্যাদি। আর এই অভিধাগুলোর প্রত্যেকটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঐতিহাসিক রূপরেখা। সামষ্টিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই জনমানুষের সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকারগুলোকে চিনতে শেখা। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট পেশায় যারা নিয়োজিত আছেন, তাদের উচিত নিজেদের সাংস্কৃতিক দক্ষতাকে বাড়িয়ে তোলা। জনগণের সামাজিক সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন আমরা দেখি, যা নিজের সংস্কৃতিকে, এর বহুমাত্রিকতাকে উপলব্ধি করা ব্যতিরেকে কখনোই অর্জন করা সম্ভব নয়।