লোকসংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা
jugantor
লোকসংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা

  মযহারুল ইসলাম বাবলা  

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের দেশের প্রায় সব অঞ্চলেরই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি রয়েছে। যেগুলোকে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি নামে অভিহিত করা হয়। আঞ্চলিকতা শব্দটির মূলে অঞ্চলভেদ এবং আঞ্চলিক ভাষা। আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি নির্দিষ্ট অঞ্চলসমূহে সীমাবদ্ধ বলেই দেশজুড়ে-এর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটে না। সেটা কেবলমাত্র আঞ্চলিক ভাষার কারণেই। একমাত্র অভিন্ন ভাষাই মানুষকে সহজে নিকটবর্তী করতে পারে। ভাষার ভিন্নতাই মানুষকে দূরবর্তী করে তোলে। অঞ্চলভিত্তিক লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি মাতৃভাষায় দেশজুড়ে যে লোকসংস্কৃতির বলয় রয়েছে, সেটাকেই আমরা লোকসংস্কৃতি বলে থাকি। সৃজনশীল বিনোদনে সাহিত্য, শিল্পকলা, নাচ, গান, নাটক ইত্যাদিতে সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সমাজ জীবনের সংকট-সমস্যা, জীবনযাত্রার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, লড়াই-সংগ্রাম সবই সংস্কৃতির শৈল্পিক ক্যানভাস। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সব বৈচিত্র্যপূর্ণ আচার সংস্কৃতির অন্তর্গত। সংস্কৃতির সৃজনশীল বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। এসবই সংস্কৃতির বৃত্তের অনিবার্য অংশ। লোকসংস্কৃতিতে নানা উপাদান রয়েছে। জারি-সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, দেহতত্ত্ব, মরমি, ধর্মাশ্রিত কীর্তন, আধ্যাত্মিক অজস্র উপাদানে আমাদের লোকসংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির সর্বাধিক শক্তিমান মাধ্যমটি হচ্ছে গান। সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের প্রচলিত লোকসঙ্গীতের বাণী-বিষয়বস্তু সামষ্টিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা বহির্ভূত। একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক দ্রুত মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তবে তার বাণী ও বিষয়বস্তু ব্যক্তির ব্যক্তিগত বোধকে আচ্ছন্ন করে জীবন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এ বিচ্ছিন্নতা মানুষের মনোজগৎকে ভাববাদিতা ও আধ্যাত্মিকতার অভিমুখে ঠেলে দেয়। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক-সুরের অসামান্য শক্তিকে সঠিকভাবে গণসঙ্গীতে সফল প্রয়োগে সক্ষম হয়েছিলেন শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। যিনি মার্কসবাদী ছিলেন। ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম নিবেদিত সংস্কৃতি সংগঠকও। তার রচিত গণসঙ্গীতগুলোর সুরারোপ করেছেন লোকসঙ্গীতের সুরে। সে আঙ্গিক-সুর সহজে গণমানুষকে স্পর্শ করতে পারবে, এ অভিপ্রায়ে। তার রচিত গণসঙ্গীতগুলো প্রচলিত লোকসঙ্গীতের বিষয়বস্তু থেকে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ছিল অধিকারহারা শোষিত জনগণকে অধিকার সচেতন করে সামাজিক বিপ্লব সংঘটনে উদ্বুদ্ধকরণের আহ্বান।

আমাদের প্রচলিত লোকসঙ্গীতজুড়ে ভর করে আছে ব্যক্তিগত আনন্দ, বেদনা, হতাশা, দেহকেন্দ্রিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি। মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা। ব্যক্তির সুখ, দুঃখ, বিরহ, হতাশা সামষ্টিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, লড়াই-সংগ্রামের ঠিক বিপরীত। লোকসঙ্গীতের আধ্যাত্মিকতা নিতান্তই বস্তুতান্ত্রিক, যার কিছুটা পরকালের লোভে-মোহে এবং ইহকালের ভীতির মিশ্রণে। স্থবিরতা এবং বৈচিত্র্যহীনতাও প্রচলিত লোকসঙ্গীতের অন্যতম দুর্বলতা। লোকসংস্কৃতির বলয়ে পাওয়া যাবে না বিকাশশীলতা এবং অগ্রসরমানতা। আমাদের প্রচলিত লোকসংস্কৃতি হতদরিদ্র এবং স্তব্ধগতির সমাজের সংস্কৃতি প্রতিনিধিরূপেই দৃশ্যমান। এ লোকসংস্কৃতি সঙ্গত কারণে আমাদের জাগতিক অগ্রগতির পক্ষে সহায়তাকারী হতে পারে না। বিপরীতে অগ্রগতির প্রতিবন্ধক। লোকসংস্কৃতির মধ্যে আমাদের সামাজিক-নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অবশ্যই রয়েছে। এ সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। সে সত্য বাস্তবিক, তবে তা নিয়ে আনন্দ-উল্লাস আস্ফালনের কিছু নেই। একে নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে মত্ত হওয়া অপরাধতুল্য। লোকজ জাতীয়তাবাদ আত্মতৃপ্তি বা অহমিকার সৃষ্টি করলে সেটা হবে আত্মঘাতী। আমাদের সামষ্টিক জীবনকে অন্ধকারের অতলে নিমজ্জিত করে রেখেছে আমাদের ভাববাদী লোকসংস্কৃতিচর্চা। আজকে আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা। অর্থাৎ আলো ও বিজ্ঞান অভিমুখে ছুটে চলা। অর্থনৈতিক সংগঠনে ও সামাজিক বিন্যাসে আমাদের আত্মপরিচয়ের দিক আরও অধিক উন্মোচিত। এ লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার সময় অধিক সচেতন হওয়া আবশ্যক যেন প্রয়োজনের তাগিদটা আমরা ভুলে না বসি। লোকসংস্কৃতির গণ্ডিতে আমাদের মন-মানসিকতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেললে জাগতিক অগ্রগতির পক্ষে হিতে-বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে। ধর্মান্ধতাকে নিঃসন্দেহে আফিমের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আধুনিকতা ও বিজ্ঞান মনস্কতাকে উপেক্ষা করে লোকসংস্কৃতির বৃত্তে আটকে পড়লে লোকসংস্কৃতিও অনিবার্যভাবে আফিমে আসক্তির শামিল হয়ে পড়বে।

লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে আপত্তি না থাকলেও, বিষয়বস্তুতে আপত্তি নিশ্চয় থাকবে। লোকজ সুরে গণমানুষের অধিকার সচেতনতায় মুক্তির গান আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাইব। কেননা লোকজ সুরে সহজে সমষ্টিগত মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছান সহজ এবং সম্ভব। মুকুন্দ দাস, রমেশ শীল প্রমুখ লোকশিল্পীরা লোকজ আঙ্গিককে গ্রহণ করেছেন বটে তবে তাদের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক এবং উপযুক্ত গানই তারা গেয়েছেন বা করেছেন। আমাদের লোকসঙ্গীতের গায়ক, গীতিকার, সুরকারের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। তবে সে তালিকায় মুকুন্দ দাস, রমেশ শীলদের সংখ্যা হাতে গোনা যাবে।

অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে। তাই বলে অতীত মুখাপেক্ষী হয়ে আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতাকে পরিহার বা এড়ানো আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর। লোকসংস্কৃতিকে সুনির্দিষ্ট অভিধায় চিহ্নিত করে মূলধারা থেকে পৃথক করাও সঠিক নয়। একটি জাতির সংস্কৃতি এক এবং অভিন্ন। শ্রেণি বৈষম্যের ন্যায় সংস্কৃতিকে ভাগ করা পৃথক করা অন্যায়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র মানুষের সংস্কৃতির বিভাজনের আদলে লোকসংস্কৃতিকে পৃথকীকরণ অপরাধতুল্য। আমাদের লক্ষ্য যদি সমাজের শ্রেণি বৈষম্য নিরসনে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার অভিমুখে হয় তবে অবশ্যই সংস্কৃতির বিভাজন পরিত্যাগে শ্রেণি বৈষম্য নিরসনের বিপরীতের ভেদ রেখাটাকে নির্মূল করা অতি অপরিহার্য।

সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য নিশ্চয় বাঞ্চনীয়। কিন্তু বিভেদ সৃষ্টিতে যদি সংস্কৃতি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, সেটা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। লোকসংস্কৃতির চর্চা এবং বিকাশকে অতিমাত্রায় উৎসাহ প্রদান মানেই শ্রেণি বিভাজনকে সমর্থন করা। আমরা শহুরে, ওরা প্রান্তিকের। এ বিভাজনের মধ্য দিয়ে লোকসংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা বৈষম্য টিকিয়ে রাখার নামান্তর। লোকজ গান, যাত্রাপালা, লোকজ কাহিনী সংগ্রহ করে আধুনিক মাধ্যমে আমরা পরিবেশন করব। সংরক্ষণ করব। লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করব ইত্যাদিতে মত্ত হব। কিন্তু শ্রেণি বিভাজনে এরা আর ওরার পার্থক্যটি সযত্নে রক্ষা করে চলা রীতিমতো প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আমাদের জনসংখ্যার আশিভাগ মানুষের বাস প্রান্তিকে। তাদের জীবনের লড়াই-সংগ্রামই তাদের জীবন সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারা থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। সামষ্টিক শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণে সাংস্কৃতিকভাবে তাদের সচেতন করা সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠনের অনিবার্য কর্তব্য। আমরা শহরের তাবৎ নাগরিকরা প্রচুর সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি। শহরের নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি মোচনে গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্র্যের খোঁজে লোকসংস্কৃতির দ্বারে গেলাম। আপ্লুত হলাম, মুগ্ধ হলাম। আত্মতুষ্টিতে তীব্র প্রচার-প্রচারণা করলাম। অর্থাৎ প্রকারান্তরে শ্রেণি বৈষম্যকেই স্থায়ীকরণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করলাম। এরা আর ওরা এ পার্থক্যটি শ্রেণি বিভাজনের ভিত্তিতে স্থায়ীকরণের পক্ষে মদদ দান করলাম।

আমাদের গ্রামীণ প্রান্তিক জীবনাচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ঋতু ও মৌসুমভিত্তিক নানা উৎসব-পার্বণ পালিত হতো। কালের বিবর্তনে সেগুলো এখন লুপ্তপ্রায়। গ্রামীণ সেসব উৎসব-পার্বণকে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনোদনের অভিলাষে শহরের নাগরিক জীবনে পালিত হওয়ার তীব্র হিড়িক লক্ষ করা যায়। এ প্রবণতাকে নিয়মিত আমিষভোজীদের মাঝে মধ্যে নিরামিষভোজের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। বিনোদনের অভিলাষে লোকজ উৎসব-পার্বণে পৃষ্ঠপোষকতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্পোরেট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বাণিজ্যিক পণ্যের প্রচারণা-বিপণন অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে বাজার সৃষ্টিই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। যার অজস্র নমুনা পাওয়া যায় শহরের নাগরিক জীবনের ভোগবাদিতায়। নাগরিক জীবনে মাত্রাতিরিক্ত ভোগবাদিতায় উপলক্ষ হয়েছে এসব নতুন-নতুন উৎসব-পার্বণকে কেন্দ্র করে। লোকজ উৎসব-পার্বণের সঙ্গে প্রান্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনের লড়াই, সংগ্রাম, জীবিকাসহ সামগ্রিক জীবনাচার সম্পৃক্ত। অথচ সব উপেক্ষায় বৈচিত্র্য বিনোদনের স্থুলতায় কেবলই উৎসব বিনোদনে লোকসংস্কৃতির প্রতি আমরা আবেগে ঐতিহ্যের করুণা বর্ষণ করি।

গ্রাম এবং শহরের ব্যবধান-বৈষম্য অতীতের ন্যায় আজও বিদ্যমান। তবে ব্যবধান বা বৈষম্য কমেনি বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। সব নাগরিকের সমঅধিকার, সমমর্যাদা, সমান মৌলিক সুযোগ-সুবিধার কথা সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অথচ বাস্তবতা ঠিক বিপরীত। জীবিকাহীন মানুষ দলে দলে গ্রাম থেকে উৎপাটিত হয়ে শহরে এসে প্রবেশ করছে বস্তিতে, সভ্যতাবর্জিত মানবেতর জীবন অভিমুখে।

শ্রমনির্ভর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের ভবিষ্যৎ বলে অবশিষ্ট কিছু নেই। শহরে এলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ক্রয় তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না অর্থনৈতিক কারণেই। শ্রম বেচে আহার জোটে কিন্তু গ্রামে সেটিরও সুযোগ নেই। এ বাস্তবতায় লোকসংস্কৃতিকে কতটুকু মর্যাদা দিচ্ছি? সেটাও কি গুরুত্বপূর্ণ নয়? আসলে আমরা আমাদের সংস্কৃতির সব মাধ্যমকে শুধু বিনোদননির্ভর করে ফেলেছি। বিনোদনের সঙ্গে শিক্ষা, ইতিহাস, দেশপ্রেম, সামষ্টিক চেতনার সম্পৃক্ততা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের অখণ্ড সংস্কৃতিতে দেশের সব মানুষের সংস্কৃতির উপাদান যুক্ত হবে। বাঙালিসহ সব জাতিসত্তার সংস্কৃতিগত ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু থাকবে মূলধারার মর্যাদায়। সংস্কৃতির বৈচিত্র্য থাকবেই। সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। তবে হতে হবে ইহজাগতিক জীবনমুখী বাস্তবতার উপাদানে সমৃদ্ধ।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার সরকারি-বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোতে সঙ্গীতের নানা অনুষ্ঠান-প্রতিযোগিতা সম্প্রচারিত হয়। এখানেও দেখা যায় অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্রে লোকসঙ্গীতের সীমাহীন আধিক্য। যে লোকসঙ্গীতগুলো অনুষ্ঠানসমূহে প্রচারিত হয় তার সবগুলো ভাববাদী, ধর্মাশ্রিত, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। এতে এরা আর ওরার বিভাজনের পার্থক্যটা প্রবলভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লোকসঙ্গীতকে বাহ্বা দিচ্ছি, পুরস্কৃত করছি। অথচ লোকসঙ্গীতকে আমাদের সংস্কৃতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করে মর্যাদা না দিয়ে সচেতনভাবে ঠেলে দিচ্ছি প্রান্তিকে। সংস্কৃতিগত বিভাজন সৃষ্টির এসব কর্মকাণ্ড প্রতারণা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। লোকসংস্কৃতিকে করুণা বর্ষণের এসব মহৎ(!) উদ্যোগের নেপথ্যে নানা উদ্দেশ্য নিহিত। যেখানে গ্রাম বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন সংগ্রাম, মহাজনী শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কথা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। সব কর্পোরেট পুঁজি এসব অনুষ্ঠানগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অর্থাৎ আমাদের অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা পশ্চাৎপদ অভিমুখে সীমাবদ্ধ থেকে যাব। ভাববাদী-আধ্যাত্মিকতার ধূম্রজালে আটকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-বঞ্চনায় নিশ্চুপ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণকে বিনা বাক্যে মেনে নেব। এবং পারলৌকিক লোভ এবং ইহকালের ভয়-ভীতিতে ডুবে থাকব। সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের অনগ্রসর মানুষদের সন্তুষ্ট এবং অবদমিত রাখার অভিপ্রায়ে লোকসংস্কৃতি চর্চার বৃত্তে আটকানোর গভীর চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে বিভাজনের বীজ রোপণ করে আমাদের সমষ্টিগত মানুষের ঐক্য-সংহতি বিনাশে নানামুখী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। দেশের সব মানুষের অভিন্ন-অখণ্ড সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠকদের প্রধান কর্তব্য বলেই বিবেচনা করি। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠনকে অগ্রসর হতে হবে।

সংস্কৃতির প্রয়োজনটাই গুরুত্বপূর্ণ। উপাদানে নতুন সৃষ্টির পরিচয় অসম্ভব। উপাদানের প্রয়োগ বা ব্যবহারই প্রয়োজনকে অনিবার্য করে। লোকসংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ বাণী, বিষয়বস্তু-মানসিকতা সবই সাবেকী। তার সার্থক নতুন জীবন লাভ সম্ভব নয়। কোনো মানুষই পেছন পানে হাঁটে না। হাঁটবে না। মানুষের অগ্রযাত্রা-গন্তব্য সম্মুখ থেকে আরও সম্মুখ পানে। আঙ্গিক দিয়ে সৃষ্টির পরিচয় নয়। পরিচয় তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু দিয়ে। বিষয়বস্তু নির্বাচনে ভাববাদ, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মযোগ, পরকাল, দেহতত্ত্ব, মরমি ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে লোকসঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি বিবেচনা করা হলে সেটা হবে পেছন দিকে হাঁটার সমতুল্য। আমাদের অতীত এবং চলমান লড়াই-সংগ্রামকে উপজীব্য করে বিষয় নির্বাচন করে লোকজ সুর বা আঙ্গিক ব্যবহার করি; সেটা নিশ্চয় প্রয়োজনের তাগিদে এবং ব্যাপক মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর সুযোগকে কাজে পরিণত করতেই করব। প্রচলিত লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য করব না। লোকসংস্কৃতি শতাব্দীর অধিক কালের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পরাভূত করতে না পারা পর্যন্ত আমাদের সামষ্টিক জীবনে লোকসংস্কৃতি আমাদের অগ্রযাত্রাকে বারংবার রুখে দেবে। এগোতে দেবে না। আমরা তো এগোতে চাই সম্মুখ থেকে আরও সম্মুখে। আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতার অভিমুখে। যেখানে সব মানুষের সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকবে না। সবার জন্য এক এবং অভিন্ন সংস্কৃতি বিরাজ করবে। সংস্কৃতি জাতি পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি। সব জাতিসত্তার সংস্কৃতি ভিন্নতারই অপর নাম সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্য থাকতে হবে। বৈচিত্র্যহীনতা কাম্য হতে পারে না। সংস্কৃতি অটল বা অনড় নয়। সংস্কৃতি বিকাশমান। অপর বা ভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদানে সংস্কৃতি ঋদ্ধ হতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণে সংস্কৃতিতে ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল। প্রচলিত লোকসংস্কৃতিকে যদি পেছনের পানে হাঁটা বলা যায়। তবে ভিন দেশি অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ অন্ধভাবে সামনে ছুটে চলা-ই বলা যাবে। অন্ধত্বের পরিণতি অন্ধকারে। আলোর অভিমুখে নয়। আমরা তো আমাদের সামগ্রিক অনাচার-বৈষম্যের বিপরীতে নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সব মানুষের ঐক্য-সংহতির বিকল্প তো কিছু নেই। সেই অভিলাষে অখণ্ড সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প কিছু হতে পারে না।

লোকসংস্কৃতির পশ্চাৎপদতা

 মযহারুল ইসলাম বাবলা 
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের দেশের প্রায় সব অঞ্চলেরই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি রয়েছে। যেগুলোকে আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি নামে অভিহিত করা হয়। আঞ্চলিকতা শব্দটির মূলে অঞ্চলভেদ এবং আঞ্চলিক ভাষা। আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি নির্দিষ্ট অঞ্চলসমূহে সীমাবদ্ধ বলেই দেশজুড়ে-এর ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটে না। সেটা কেবলমাত্র আঞ্চলিক ভাষার কারণেই। একমাত্র অভিন্ন ভাষাই মানুষকে সহজে নিকটবর্তী করতে পারে। ভাষার ভিন্নতাই মানুষকে দূরবর্তী করে তোলে। অঞ্চলভিত্তিক লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি মাতৃভাষায় দেশজুড়ে যে লোকসংস্কৃতির বলয় রয়েছে, সেটাকেই আমরা লোকসংস্কৃতি বলে থাকি। সৃজনশীল বিনোদনে সাহিত্য, শিল্পকলা, নাচ, গান, নাটক ইত্যাদিতে সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সমাজ জীবনের সংকট-সমস্যা, জীবনযাত্রার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, লড়াই-সংগ্রাম সবই সংস্কৃতির শৈল্পিক ক্যানভাস। ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সব বৈচিত্র্যপূর্ণ আচার সংস্কৃতির অন্তর্গত। সংস্কৃতির সৃজনশীল বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। এসবই সংস্কৃতির বৃত্তের অনিবার্য অংশ। লোকসংস্কৃতিতে নানা উপাদান রয়েছে। জারি-সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, দেহতত্ত্ব, মরমি, ধর্মাশ্রিত কীর্তন, আধ্যাত্মিক অজস্র উপাদানে আমাদের লোকসংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির সর্বাধিক শক্তিমান মাধ্যমটি হচ্ছে গান। সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের প্রচলিত লোকসঙ্গীতের বাণী-বিষয়বস্তু সামষ্টিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা বহির্ভূত। একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় সীমাবদ্ধ। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক দ্রুত মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তবে তার বাণী ও বিষয়বস্তু ব্যক্তির ব্যক্তিগত বোধকে আচ্ছন্ন করে জীবন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এ বিচ্ছিন্নতা মানুষের মনোজগৎকে ভাববাদিতা ও আধ্যাত্মিকতার অভিমুখে ঠেলে দেয়। লোকসঙ্গীতের আঙ্গিক-সুরের অসামান্য শক্তিকে সঠিকভাবে গণসঙ্গীতে সফল প্রয়োগে সক্ষম হয়েছিলেন শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। যিনি মার্কসবাদী ছিলেন। ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম নিবেদিত সংস্কৃতি সংগঠকও। তার রচিত গণসঙ্গীতগুলোর সুরারোপ করেছেন লোকসঙ্গীতের সুরে। সে আঙ্গিক-সুর সহজে গণমানুষকে স্পর্শ করতে পারবে, এ অভিপ্রায়ে। তার রচিত গণসঙ্গীতগুলো প্রচলিত লোকসঙ্গীতের বিষয়বস্তু থেকে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ছিল অধিকারহারা শোষিত জনগণকে অধিকার সচেতন করে সামাজিক বিপ্লব সংঘটনে উদ্বুদ্ধকরণের আহ্বান।

আমাদের প্রচলিত লোকসঙ্গীতজুড়ে ভর করে আছে ব্যক্তিগত আনন্দ, বেদনা, হতাশা, দেহকেন্দ্রিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদি। মূলত ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতা। ব্যক্তির সুখ, দুঃখ, বিরহ, হতাশা সামষ্টিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, লড়াই-সংগ্রামের ঠিক বিপরীত। লোকসঙ্গীতের আধ্যাত্মিকতা নিতান্তই বস্তুতান্ত্রিক, যার কিছুটা পরকালের লোভে-মোহে এবং ইহকালের ভীতির মিশ্রণে। স্থবিরতা এবং বৈচিত্র্যহীনতাও প্রচলিত লোকসঙ্গীতের অন্যতম দুর্বলতা। লোকসংস্কৃতির বলয়ে পাওয়া যাবে না বিকাশশীলতা এবং অগ্রসরমানতা। আমাদের প্রচলিত লোকসংস্কৃতি হতদরিদ্র এবং স্তব্ধগতির সমাজের সংস্কৃতি প্রতিনিধিরূপেই দৃশ্যমান। এ লোকসংস্কৃতি সঙ্গত কারণে আমাদের জাগতিক অগ্রগতির পক্ষে সহায়তাকারী হতে পারে না। বিপরীতে অগ্রগতির প্রতিবন্ধক। লোকসংস্কৃতির মধ্যে আমাদের সামাজিক-নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অবশ্যই রয়েছে। এ সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। সে সত্য বাস্তবিক, তবে তা নিয়ে আনন্দ-উল্লাস আস্ফালনের কিছু নেই। একে নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে মত্ত হওয়া অপরাধতুল্য। লোকজ জাতীয়তাবাদ আত্মতৃপ্তি বা অহমিকার সৃষ্টি করলে সেটা হবে আত্মঘাতী। আমাদের সামষ্টিক জীবনকে অন্ধকারের অতলে নিমজ্জিত করে রেখেছে আমাদের ভাববাদী লোকসংস্কৃতিচর্চা। আজকে আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা। অর্থাৎ আলো ও বিজ্ঞান অভিমুখে ছুটে চলা। অর্থনৈতিক সংগঠনে ও সামাজিক বিন্যাসে আমাদের আত্মপরিচয়ের দিক আরও অধিক উন্মোচিত। এ লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করার সময় অধিক সচেতন হওয়া আবশ্যক যেন প্রয়োজনের তাগিদটা আমরা ভুলে না বসি। লোকসংস্কৃতির গণ্ডিতে আমাদের মন-মানসিকতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেললে জাগতিক অগ্রগতির পক্ষে হিতে-বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে। ধর্মান্ধতাকে নিঃসন্দেহে আফিমের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আধুনিকতা ও বিজ্ঞান মনস্কতাকে উপেক্ষা করে লোকসংস্কৃতির বৃত্তে আটকে পড়লে লোকসংস্কৃতিও অনিবার্যভাবে আফিমে আসক্তির শামিল হয়ে পড়বে।

লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে আপত্তি না থাকলেও, বিষয়বস্তুতে আপত্তি নিশ্চয় থাকবে। লোকজ সুরে গণমানুষের অধিকার সচেতনতায় মুক্তির গান আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাইব। কেননা লোকজ সুরে সহজে সমষ্টিগত মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছান সহজ এবং সম্ভব। মুকুন্দ দাস, রমেশ শীল প্রমুখ লোকশিল্পীরা লোকজ আঙ্গিককে গ্রহণ করেছেন বটে তবে তাদের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক এবং উপযুক্ত গানই তারা গেয়েছেন বা করেছেন। আমাদের লোকসঙ্গীতের গায়ক, গীতিকার, সুরকারের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। তবে সে তালিকায় মুকুন্দ দাস, রমেশ শীলদের সংখ্যা হাতে গোনা যাবে।

অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে। তাই বলে অতীত মুখাপেক্ষী হয়ে আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতাকে পরিহার বা এড়ানো আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর। লোকসংস্কৃতিকে সুনির্দিষ্ট অভিধায় চিহ্নিত করে মূলধারা থেকে পৃথক করাও সঠিক নয়। একটি জাতির সংস্কৃতি এক এবং অভিন্ন। শ্রেণি বৈষম্যের ন্যায় সংস্কৃতিকে ভাগ করা পৃথক করা অন্যায়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র মানুষের সংস্কৃতির বিভাজনের আদলে লোকসংস্কৃতিকে পৃথকীকরণ অপরাধতুল্য। আমাদের লক্ষ্য যদি সমাজের শ্রেণি বৈষম্য নিরসনে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার অভিমুখে হয় তবে অবশ্যই সংস্কৃতির বিভাজন পরিত্যাগে শ্রেণি বৈষম্য নিরসনের বিপরীতের ভেদ রেখাটাকে নির্মূল করা অতি অপরিহার্য।

সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য নিশ্চয় বাঞ্চনীয়। কিন্তু বিভেদ সৃষ্টিতে যদি সংস্কৃতি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, সেটা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। লোকসংস্কৃতির চর্চা এবং বিকাশকে অতিমাত্রায় উৎসাহ প্রদান মানেই শ্রেণি বিভাজনকে সমর্থন করা। আমরা শহুরে, ওরা প্রান্তিকের। এ বিভাজনের মধ্য দিয়ে লোকসংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা বৈষম্য টিকিয়ে রাখার নামান্তর। লোকজ গান, যাত্রাপালা, লোকজ কাহিনী সংগ্রহ করে আধুনিক মাধ্যমে আমরা পরিবেশন করব। সংরক্ষণ করব। লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করব ইত্যাদিতে মত্ত হব। কিন্তু শ্রেণি বিভাজনে এরা আর ওরার পার্থক্যটি সযত্নে রক্ষা করে চলা রীতিমতো প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আমাদের জনসংখ্যার আশিভাগ মানুষের বাস প্রান্তিকে। তাদের জীবনের লড়াই-সংগ্রামই তাদের জীবন সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারা থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। সামষ্টিক শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণে সাংস্কৃতিকভাবে তাদের সচেতন করা সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠনের অনিবার্য কর্তব্য। আমরা শহরের তাবৎ নাগরিকরা প্রচুর সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি। শহরের নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি মোচনে গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্র্যের খোঁজে লোকসংস্কৃতির দ্বারে গেলাম। আপ্লুত হলাম, মুগ্ধ হলাম। আত্মতুষ্টিতে তীব্র প্রচার-প্রচারণা করলাম। অর্থাৎ প্রকারান্তরে শ্রেণি বৈষম্যকেই স্থায়ীকরণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করলাম। এরা আর ওরা এ পার্থক্যটি শ্রেণি বিভাজনের ভিত্তিতে স্থায়ীকরণের পক্ষে মদদ দান করলাম।

আমাদের গ্রামীণ প্রান্তিক জীবনাচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ঋতু ও মৌসুমভিত্তিক নানা উৎসব-পার্বণ পালিত হতো। কালের বিবর্তনে সেগুলো এখন লুপ্তপ্রায়। গ্রামীণ সেসব উৎসব-পার্বণকে বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনোদনের অভিলাষে শহরের নাগরিক জীবনে পালিত হওয়ার তীব্র হিড়িক লক্ষ করা যায়। এ প্রবণতাকে নিয়মিত আমিষভোজীদের মাঝে মধ্যে নিরামিষভোজের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। বিনোদনের অভিলাষে লোকজ উৎসব-পার্বণে পৃষ্ঠপোষকতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্পোরেট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বাণিজ্যিক পণ্যের প্রচারণা-বিপণন অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে বাজার সৃষ্টিই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। যার অজস্র নমুনা পাওয়া যায় শহরের নাগরিক জীবনের ভোগবাদিতায়। নাগরিক জীবনে মাত্রাতিরিক্ত ভোগবাদিতায় উপলক্ষ হয়েছে এসব নতুন-নতুন উৎসব-পার্বণকে কেন্দ্র করে। লোকজ উৎসব-পার্বণের সঙ্গে প্রান্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠের জীবনের লড়াই, সংগ্রাম, জীবিকাসহ সামগ্রিক জীবনাচার সম্পৃক্ত। অথচ সব উপেক্ষায় বৈচিত্র্য বিনোদনের স্থুলতায় কেবলই উৎসব বিনোদনে লোকসংস্কৃতির প্রতি আমরা আবেগে ঐতিহ্যের করুণা বর্ষণ করি।

গ্রাম এবং শহরের ব্যবধান-বৈষম্য অতীতের ন্যায় আজও বিদ্যমান। তবে ব্যবধান বা বৈষম্য কমেনি বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। সব নাগরিকের সমঅধিকার, সমমর্যাদা, সমান মৌলিক সুযোগ-সুবিধার কথা সংবিধানে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অথচ বাস্তবতা ঠিক বিপরীত। জীবিকাহীন মানুষ দলে দলে গ্রাম থেকে উৎপাটিত হয়ে শহরে এসে প্রবেশ করছে বস্তিতে, সভ্যতাবর্জিত মানবেতর জীবন অভিমুখে।

শ্রমনির্ভর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের ভবিষ্যৎ বলে অবশিষ্ট কিছু নেই। শহরে এলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ক্রয় তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না অর্থনৈতিক কারণেই। শ্রম বেচে আহার জোটে কিন্তু গ্রামে সেটিরও সুযোগ নেই। এ বাস্তবতায় লোকসংস্কৃতিকে কতটুকু মর্যাদা দিচ্ছি? সেটাও কি গুরুত্বপূর্ণ নয়? আসলে আমরা আমাদের সংস্কৃতির সব মাধ্যমকে শুধু বিনোদননির্ভর করে ফেলেছি। বিনোদনের সঙ্গে শিক্ষা, ইতিহাস, দেশপ্রেম, সামষ্টিক চেতনার সম্পৃক্ততা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের অখণ্ড সংস্কৃতিতে দেশের সব মানুষের সংস্কৃতির উপাদান যুক্ত হবে। বাঙালিসহ সব জাতিসত্তার সংস্কৃতিগত ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু থাকবে মূলধারার মর্যাদায়। সংস্কৃতির বৈচিত্র্য থাকবেই। সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত নয়। তবে হতে হবে ইহজাগতিক জীবনমুখী বাস্তবতার উপাদানে সমৃদ্ধ।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবাংলার সরকারি-বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোতে সঙ্গীতের নানা অনুষ্ঠান-প্রতিযোগিতা সম্প্রচারিত হয়। এখানেও দেখা যায় অত্যাধুনিক বাদ্যযন্ত্রে লোকসঙ্গীতের সীমাহীন আধিক্য। যে লোকসঙ্গীতগুলো অনুষ্ঠানসমূহে প্রচারিত হয় তার সবগুলো ভাববাদী, ধর্মাশ্রিত, দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। এতে এরা আর ওরার বিভাজনের পার্থক্যটা প্রবলভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লোকসঙ্গীতকে বাহ্বা দিচ্ছি, পুরস্কৃত করছি। অথচ লোকসঙ্গীতকে আমাদের সংস্কৃতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করে মর্যাদা না দিয়ে সচেতনভাবে ঠেলে দিচ্ছি প্রান্তিকে। সংস্কৃতিগত বিভাজন সৃষ্টির এসব কর্মকাণ্ড প্রতারণা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। লোকসংস্কৃতিকে করুণা বর্ষণের এসব মহৎ(!) উদ্যোগের নেপথ্যে নানা উদ্দেশ্য নিহিত। যেখানে গ্রাম বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন সংগ্রাম, মহাজনী শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কথা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। সব কর্পোরেট পুঁজি এসব অনুষ্ঠানগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অর্থাৎ আমাদের অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা পশ্চাৎপদ অভিমুখে সীমাবদ্ধ থেকে যাব। ভাববাদী-আধ্যাত্মিকতার ধূম্রজালে আটকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ-বঞ্চনায় নিশ্চুপ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শোষণকে বিনা বাক্যে মেনে নেব। এবং পারলৌকিক লোভ এবং ইহকালের ভয়-ভীতিতে ডুবে থাকব। সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের অনগ্রসর মানুষদের সন্তুষ্ট এবং অবদমিত রাখার অভিপ্রায়ে লোকসংস্কৃতি চর্চার বৃত্তে আটকানোর গভীর চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের মধ্যে বিভাজনের বীজ রোপণ করে আমাদের সমষ্টিগত মানুষের ঐক্য-সংহতি বিনাশে নানামুখী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। দেশের সব মানুষের অভিন্ন-অখণ্ড সংস্কৃতি গড়ে তোলাই সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠকদের প্রধান কর্তব্য বলেই বিবেচনা করি। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠনকে অগ্রসর হতে হবে।

সংস্কৃতির প্রয়োজনটাই গুরুত্বপূর্ণ। উপাদানে নতুন সৃষ্টির পরিচয় অসম্ভব। উপাদানের প্রয়োগ বা ব্যবহারই প্রয়োজনকে অনিবার্য করে। লোকসংস্কৃতির অভ্যন্তরীণ বাণী, বিষয়বস্তু-মানসিকতা সবই সাবেকী। তার সার্থক নতুন জীবন লাভ সম্ভব নয়। কোনো মানুষই পেছন পানে হাঁটে না। হাঁটবে না। মানুষের অগ্রযাত্রা-গন্তব্য সম্মুখ থেকে আরও সম্মুখ পানে। আঙ্গিক দিয়ে সৃষ্টির পরিচয় নয়। পরিচয় তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু দিয়ে। বিষয়বস্তু নির্বাচনে ভাববাদ, আধ্যাত্মিকতা, ধর্মযোগ, পরকাল, দেহতত্ত্ব, মরমি ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে লোকসঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি বিবেচনা করা হলে সেটা হবে পেছন দিকে হাঁটার সমতুল্য। আমাদের অতীত এবং চলমান লড়াই-সংগ্রামকে উপজীব্য করে বিষয় নির্বাচন করে লোকজ সুর বা আঙ্গিক ব্যবহার করি; সেটা নিশ্চয় প্রয়োজনের তাগিদে এবং ব্যাপক মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানোর সুযোগকে কাজে পরিণত করতেই করব। প্রচলিত লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য করব না। লোকসংস্কৃতি শতাব্দীর অধিক কালের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পরাভূত করতে না পারা পর্যন্ত আমাদের সামষ্টিক জীবনে লোকসংস্কৃতি আমাদের অগ্রযাত্রাকে বারংবার রুখে দেবে। এগোতে দেবে না। আমরা তো এগোতে চাই সম্মুখ থেকে আরও সম্মুখে। আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতার অভিমুখে। যেখানে সব মানুষের সংস্কৃতিগত পার্থক্য থাকবে না। সবার জন্য এক এবং অভিন্ন সংস্কৃতি বিরাজ করবে। সংস্কৃতি জাতি পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি। সব জাতিসত্তার সংস্কৃতি ভিন্নতারই অপর নাম সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্য থাকতে হবে। বৈচিত্র্যহীনতা কাম্য হতে পারে না। সংস্কৃতি অটল বা অনড় নয়। সংস্কৃতি বিকাশমান। অপর বা ভিন্ন সংস্কৃতির আদান-প্রদানে সংস্কৃতি ঋদ্ধ হতে পারে। তবে অন্ধ অনুকরণে সংস্কৃতিতে ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল। প্রচলিত লোকসংস্কৃতিকে যদি পেছনের পানে হাঁটা বলা যায়। তবে ভিন দেশি অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ অন্ধভাবে সামনে ছুটে চলা-ই বলা যাবে। অন্ধত্বের পরিণতি অন্ধকারে। আলোর অভিমুখে নয়। আমরা তো আমাদের সামগ্রিক অনাচার-বৈষম্যের বিপরীতে নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সব মানুষের ঐক্য-সংহতির বিকল্প তো কিছু নেই। সেই অভিলাষে অখণ্ড সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প কিছু হতে পারে না।